অংশগ্রহণকারী:
অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী
সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
অধ্যাপক ডা. হারুন-আর-রশিদ
চেয়ারম্যান, কিডনি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন-নেসা মালিক
মহাসচিব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ;
চিফ কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন
কো-অর্ডিনেটর অ্যান্ড ফর্মার লাইন ডিরেক্টর, নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত
সভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিসিয়ানস অব বাংলাদেশ
অধ্যাপক ডা. এস কে জিন্নাত আরা নাসরীন
অধ্যাপক, প্রসূতি ও গাইনি, জেড এইচ শিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ
অধ্যাপক ডা. শারমিন জাহান
অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি
অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল ইসলাম
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা
অধ্যাপক ডা. তওফিক শাহরিয়ার হক
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি অ্যান্ড
অ্যাডাল্ট কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
ডা. মীর ইশরাকুজ্জামান
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজি,
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন তালুকদার
ডিরেক্টর, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং,
অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী
সভাপতি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ নানা জটিলতায় বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাই উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। দেশে প্রতিবছর প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ এ কারণে মৃত্যুবরণ করেন। এই ভয়াবহতার কারণেই ২০০৫ সাল থেকে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হচ্ছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশও শুরু থেকেই দিবসটি পালন করে আসছে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ জানেই না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। যাঁরা জানেন, তাঁদের বড় অংশ চিকিৎসা নেন না। আবার যাঁরা চিকিৎসা নেন, তাঁদের অনেকের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সচেতন করা। উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি রোগ নয়, এটি শরীরের প্রায় সব অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। জীবনাচরণে পরিবর্তন আনলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘একসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি’। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আগে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন, এখন প্রতি চারজনের একজন আক্রান্ত। ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার আরও বেশি। তরুণদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে মৃত্যুর হার বাড়ছে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা জরুরি। এখন ঘরেও ডিজিটাল যন্ত্রে রক্তচাপ মাপা যায়। উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে কার্যকর চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগে হয়। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশ মৃত্যু হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকজনিত। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ধূমপান, অতিরিক্ত লবণ ও ক্ষতিকর চর্বি কমানোর কাজও করছে। সরকারের সহযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চলছে। ২০১৮ সালে চার উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া কর্মসূচি এখন ৩২৮ উপজেলায় বিস্তৃত হয়েছে। এ ছাড়া বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে নিয়মিত ওষুধ বিতরণ সেবা চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি রোগীদের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
অধ্যাপক ডা. হারুন-আর-রশিদ
চেয়ারম্যান, কিডনি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ
কিডনি রোগের প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে প্রথম দুটি হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও এই দুটি রোগ দ্রুত বাড়ছে। ১০ বছর আগে দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে সাড়ে ৩ কোটিতে পৌঁছেছে। একইভাবে ২০১০ সালে উচ্চ রক্তচাপের হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ, এখন তা ২৪ শতাংশ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ নেফ্রাইটিস, যা শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সেই হতে পারে। এ রোগে শরীর ফুলে যায় বলে সহজে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি রোগ সহজে বোঝা যায় না।
এই দুটি রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে আগে শনাক্ত করতে হবে। ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত, উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক। একইভাবে নিয়মিত রক্তচাপও পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ সেবা নিতে আসেন। এই পর্যায়ে নিয়মিত রক্তচাপ, উচ্চতা ও ওজন পরীক্ষা করা গেলে রোগ অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।
আমরা জানি, ১২০/৮০ রক্তচাপ স্বাভাবিক। ১৪০/৯০-এর বেশি হলে সতর্ক হতে হবে। নিয়মিত হাঁটা, ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ ও ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চললে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিনিট হাঁটা জরুরি। রক্তচাপ বেশি হলে ওষুধের প্রয়োজন হয়, আর বাংলাদেশে এসব ওষুধ খুব কম দামেই পাওয়া যায়।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও হৃদ্রোগ একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শুধু উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও কিডনি রোগের ঝুঁকি অন্তত ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়।
কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ২০০৩ সাল থেকে অলাভজনকভাবে কাজ করছে। আমাদের হাসপাতালে কম খরচে ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু আছে। আমরা মরণোত্তর কিডনি প্রতিস্থাপনও শুরু করেছি। পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতা পেলে গ্রামাঞ্চলেও বাসায় আধুনিক পদ্ধতিতে ডায়ালাইসিস (সিএপিডি) পদ্ধতি সহজলভ্য করা যাবে।
অধ্যাপক ডা. ফজিলা-তুন-নেসা মালিক
মহাসচিব, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ; চিফ কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
সারা বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। এর একটি বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের মানুষ। উন্নত দেশে সচেতনতা তুলনামূলক কর্মকাণ্ড বেশি হলেও আমাদের মতো দেশে এখনো অনেক মানুষ জানেন না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। যাঁরা জানেন, তাঁদের অনেকেই চিকিৎসা নেন না। আবার যাঁরা চিকিৎসা নেন, তাঁদেরও বড় অংশ নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত খুব অল্পসংখ্যক মানুষই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।
উচ্চ রক্তচাপের বড় সমস্যা হলো, অধিকাংশ সময় এর কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিরা বুঝতেই পারেন না যে তিনি ঝুঁকির মধ্যে আছেন। অথচ এটি শরীরের প্রায় সব অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মস্তিষ্ক, চোখ, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি—সবখানেই এর প্রভাব পড়ে। হঠাৎ অন্ধত্ব হতে পারে, স্ট্রোক হতে পারে, এমনকি পায়ে পচনও ধরতে পারে। একজন সুস্থ মানুষও হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে যেতে পারেন। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। হৃদ্রোগের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক খুবই গভীর। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ–সম্পর্কিত পেশি মোটা হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন না। তখন শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা ও হৃদ্যন্ত্র বিকলের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালিতে চর্বি জমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। রক্তচাপ ১৪০/৯০-এর মধ্যে থাকলে জীবনাচরণে পরিবর্তন আনা খুব জরুরি। ধূমপান বন্ধ করতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে এবং নিয়মিত হাঁটতে হবে। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোও জরুরি। এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, ক্যালিব্রেটেড স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে বাসায় রক্তচাপ মাপা ভালো।
নারীরা চিকিৎসা সেবায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত। তাঁরা সহজে নিজের সমস্যার কথা বলেন না। অনেক নারী গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে আসেন। তাই আমি মনে করি, নারীদের সচেতন, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন হলে শুধু তাঁর নিজের নয়, পুরো পরিবারের স্বাস্থ্যসেবাই উন্নত হবে।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন
কো-অর্ডিনেটর অ্যান্ড ফর্মার লাইন ডিরেক্টর, নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
এবারের বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করি এবং নীরব ঘাতককে জয় করি’। এটি মোকাবিলা করার জন্য সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বর্তমানে সারা বিশ্বে ১৩০ থেকে ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। প্রতিবছর এ কারণে ১ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছেন। শুধু মৃত্যুই নয়, সুস্থ জীবনের বিপুল ক্ষতিও হচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব ভয়াবহ। বিশ্বব্যাপী বছরে ২ থেকে ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে, আর বাংলাদেশে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। তাই উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি রোগ নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক হুমকিও।
আমাদের দেশে অনিয়মিত জীবনযাপন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করেন না। ৮৯ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় ফল ও সবজি খান না। তামাক ব্যবহারও অনেক বেশি, বিশেষ করে ধোঁয়াবিহীন তামাক। স্থূলতা বাড়ছে। আবার ৬৩ শতাংশ মানুষ কখনো রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করেননি।
এ বাস্তবতায় আমরা ‘এনসিডি কর্নার’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছি। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এখানে ১৭ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন। দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ এবং ডায়াবেটিসের রোগী ১ কোটি ২২ লাখ হলেও নিবন্ধনের হার এখনো মাত্র ৫ শতাংশ। তবে আশার কথা হলো, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫৯ শতাংশ রোগীর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে দক্ষ জনবল ও ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার কম দামে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনা মূল্যে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আমি মনে করি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারলে জটিল রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত
সভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব বাংলাদেশ
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা ক্রনিক রোগের ক্ষেত্রে ‘ফিফটি রুল’ বা পঞ্চাশের নিয়মের কথা বলি। দেখা যায়, ৫০ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে তাঁদের রোগ আছে, যাঁরা জানেন তাঁদের ৫০ শতাংশ চিকিৎসা নেন, আর চিকিৎসা নিলেও মাত্র ৫০ শতাংশ রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে। উচ্চ রক্তচাপও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে এখনো এটি ১৮ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
রোগ শনাক্ত হওয়ার পরও যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখা যায়, তাহলে ভয়াবহ ক্ষতি হয়—যা আমরা প্রতিনিয়ত দেখি। উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির রোগ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপে কিডনি নষ্ট হয়, আবার কিডনির রোগ থেকেও উচ্চ রক্তচাপ হয়।
একইভাবে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক মানুষের কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং এটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করে। তাই রোগীদের মানসিকভাবে সচেতন ও উৎসাহিত করা এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। অনেকেই মনে করেন, কোনো উপসর্গ না থাকলে রোগ নেই। মাথা বা ঘাড় ব্যথা হলেই অনেকে প্রেশার মনে করেন, আবার অন্যের ওষুধও খেয়ে ফেলেন—যা ভুল ধারণা। অনেকেই ভয় পান যে ওষুধ শুরু করলে সারা জীবন খেতে হবে। কিন্তু আমি বলি, ওষুধ কোনো নির্ভরতা তৈরি করে না; এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয়। কেউ কেউ কিছুদিন ওষুধ খেয়ে ভালো লাগলে বন্ধ করে দেন, যা আরও বিপজ্জনক। কারণ, ওষুধ বন্ধ করলে রক্তচাপ আবার বেড়ে যায়।
অনেকে অন্যের পরামর্শে ওষুধ শুরু করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিটি রোগীর অবস্থা আলাদা, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। আবার কিছু রোগী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে ওষুধ বন্ধ করেন, এতে রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাস্তবে বাংলাদেশে মানসম্মত ওষুধ কম দামে পাওয়া যায়।
নিয়মিত ওষুধ খাওয়া একটি জীবনবিমার মতো। পাশাপাশি নিজের রক্তচাপ নিজে মাপা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, ক্যালিব্রেটেড স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে বাসায় রক্তচাপ মাপাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
অধ্যাপক ডা. এস কে জিন্নাত আরা নাসরীন
অধ্যাপক, প্রসূতি ও গাইনি, জেড এইচ শিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ
গর্ভকালীন সময়ে উচ্চ রক্তচাপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অবস্থা, যা ২০ থেকে ২৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণও এটি। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে রোগীকে ঘন ঘন পর্যবেক্ষণে রাখতে হয় এবং নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে আসতে হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা সময়মতো গর্ভকালীন সেবা না নেওয়ায় মাতৃমৃত্যুর হার বাড়ছে।
গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ দুই ধরনের হতে পারে। এক ধরনের ক্ষেত্রে নারীর আগেই উচ্চ রক্তচাপ থাকে এবং তিনি সেই অবস্থাতেই গর্ভধারণ করেন, এতে গর্ভপাতের ঝুঁকি বেশি থাকে। আরেকটি ক্ষেত্রে একজন সুস্থ নারী গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন, যাকে প্রি-একলাম্পসিয়া বলা হয়। এই অবস্থায় গর্ভপাত, এমনকি প্রসবের আগে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যদি কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা হয় এবং তা ১৪০/৯০-এর ওপরে পাওয়া যায়, তাহলে রোগীকে খুব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দিতে হবে। এতে মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে একলাম্পসিয়া বা খিঁচুনি হতে পারে, যা মায়ের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে শিশুরও ক্ষতি হয়—জন্মের আগে মৃত্যু, ব্রেনের সমস্যা বা বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, যাকে ইন্ট্রা ইউটেরাইন গ্রোথ রেসট্রিকশন বলা হয়। তাই গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশু—উভয়ের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
গর্ভাবস্থার আগে যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে এনে তারপর গর্ভধারণ করা উচিত। গর্ভকালীন সময়ে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—অতিরিক্ত লবণ, ভাজা খাবার, ফাস্ট ফুড, ফিজি ড্রিংকস এবং অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সমতল জায়গায় নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে।
গর্ভবতী নারীদের অন্তত চারটি নিয়মিত গর্ভকালীন সেবা গ্রহণ করা জরুরি। এতে এই জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের মাধ্যমে চিকিৎসা দিলে মা ও শিশুর জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ ফলাফল নিশ্চিত করা সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. শারমিন জাহান
অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনলজি, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি
উচ্চ রক্তচাপের প্রায় ১৫ শতাংশের পেছনে নির্দিষ্ট সেকেন্ডারি কারণ থাকে। এর মধ্যে হরমোনজনিত কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৪ ধরনের হরমোনজনিত রোগ রয়েছে, যেগুলো উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে। ভালো দিক হলো, এগুলো শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। কিন্তু শনাক্ত না হলে অনেক সময় তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
কখন আমরা হরমোনজনিত উচ্চ রক্তচাপ সন্দেহ করব—এ বিষয়ে কিছু লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়া, পারিবারিক ইতিহাস স্পষ্ট থাকা, রক্তে পটাশিয়াম বারবার কমে যাওয়া, একাধিক ওষুধেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না আসা বা খুব বেশি ওঠানামা করা। আবার বারবার প্যানিক অ্যাটাকের মতো উপসর্গ থাকলেও সন্দেহ করা হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে ফিওক্রোমোসাইটোমা নামের একটি হরমোনজনিত রোগ থাকতে পারে, যা নির্ণয় করলে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য, কিন্তু না হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
মূলত কিডনির ওপরের গ্রন্থি, অর্থাৎ অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ড থেকে নির্গত হরমোন এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে প্রাইমারি অ্যালডোস্টেরনিজম এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ধারণা করা হয়, উচ্চ রক্তচাপের প্রায় ১০ জনে ১ জনের এই সমস্যা থাকতে পারে। রেজিস্ট্যান্ট হাইপারটেনশনের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি পাওয়া যায়। এতে অ্যালডোস্টেরন হরমোন বেড়ে গিয়ে শরীরে লবণ ও পানি ধরে রাখে এবং পটাশিয়াম কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে না।
আমরা এন্ডোক্রাইন হাইপারটেনশন রিসার্চ গ্রুপ হিসেবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হরমোনজনিত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে কাজ করছি এবং নিয়মিত ক্লিনিক পরিচালনা করছি। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসায় স্বল্প ডোজের ওষুধেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে, আবার কিছু ক্ষেত্রে টিউমার অপসারণে রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।
যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাঁরা অন্তত একবার হলেও হরমোনজনিত কারণ আছে কি না তা পরীক্ষা করুন।
অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল ইসলাম
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট
অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে ৫২.৪ শতাংশ মানুষ জানেন যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। তাঁদের মধ্যে ৪২ শতাংশ ওষুধ খান এবং মাত্র ২১ শতাংশ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। বাংলাদেশে ২৭.৪ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং মাত্র ৩৩.৮ শতাংশ রোগী নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। অর্থাৎ অধিকাংশই স্ট্রোকের ঝুঁকিতে আছেন।
উচ্চ রক্তচাপে মস্তিষ্কের রক্তনালি সরু বা ছিঁড়ে যেতে পারে, ফলে ইস্কেমিক ও হেমোরেজিক স্ট্রোক হয়। অনিয়মিত ওষুধ সেবনে এই ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়, আর নিয়মিত ওষুধে ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ কমে।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখি, রোগীরা কিছুদিন ওষুধ খেয়ে ভালো লাগলে বন্ধ করে দেন বা অনিয়মিতভাবে খান, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক। অনেকে ভাবেন সুস্থ থাকলে ওষুধ দরকার নেই, কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। রিবাউন্ড হাইপারটেনশনে রক্তচাপ আরও বেড়ে গিয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ‘ফাস্ট’ লক্ষণ—মুখ বেঁকে যাওয়া, এক পাশ দুর্বল হওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া—দেখা গেলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে, কারণ সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা দিলে রোগী সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
একটি বাস্তব ঘটনা শেয়ার করি—নরসিংদীর ৫৫ বছর বয়সী এক রিকশাচালক পাঁচ বছর আগে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ তিন মাস খাওয়ার পর নিজেকে সুস্থ মনে করে ওষুধ বন্ধ করে দেন। কিছুদিন পর তাঁর স্ত্রী তাঁকে অচেতন অবস্থায় পান—মুখ বাঁকা, কথা জড়ানো, শরীরের এক পাশ অসাড়। তিনি মারাত্মক স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
৪০ বছরের বেশি বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, স্থূলতা বা ধূমপান থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা জরুরি। ওষুধ কখনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করা যাবে না। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খাওয়া, তিন মাস পরপর চিকিৎসকের ফলোআপ করা এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তন জরুরি। নিয়মিত হাঁটা, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণই স্ট্রোক প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
অধ্যাপক ডা. তওফিক শাহরিয়ার হক
অধ্যাপক ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি অ্যান্ড অ্যাডাল্ট কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
উচ্চ রক্তচাপ শুধু বড়দের সমস্যা নয়, শিশুদের মধ্যেও কিডনি ও হরমোনজনিত সমস্যার কারণে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয় এবং বড়দের মতোই ঝুঁকি থাকে। গবেষণায় দেখা যায় হাজারে একজন শিশু কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং সে কারণে উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। এ ছাড়া হরমোনজনিত রোগেও শিশুরা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারে, যা অনেক সময় আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জন্মগত হৃদ্রোগ, যেখানে প্রতি জীবিত শিশুর মধ্যে অন্তত আটজন হৃদ্রোগ নিয়ে জন্মায় এবং তাদের বড় একটি অংশ জন্মের পর থেকেই উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাধারণ লক্ষণ যেমন শরীর ফোলা—এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, ফলে রোগ নির্ণয় দেরিতে হয় এবং জটিলতা বেড়ে যায়।
আমরা দেখি তরুণ সমাজেও ২৪ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে, যা আগে সাধারণত ভাবা হতো না। এর একটি বড় কারণ হলো জীবনযাপনের পরিবর্তন। অনেক তরুণ পড়াশোনা ও শহরে এসে একাকী জীবন, অনিয়মিত ঘুম, অনলাইন গেমিং ও গভীর রাত পর্যন্ত মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে স্বাভাবিক রুটিন হারিয়ে ফেলছে। এ ছাড়া ধূমপান, ই-সিগারেট, ভেপিং ও সিসা বার তরুণদের মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং এটি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক সময় তরুণেরা নিজেরাও বুঝতে পারে না যে তারা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে আছে, তাই বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণদের স্বাস্থ্য নিয়ে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ঘুম, ব্যায়াম ও ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রক্তচাপ মাপার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উচ্চ রক্তচাপের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
ডা. মীর ইশরাকুজ্জামান
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজি,
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জীবনধারা পরিবর্তনই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। উচ্চ রক্তচাপ যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখা যায়, তাহলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনির সমস্যা—এ ধরনের ভয়াবহ জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। জীবনধারা পরিবর্তন বলতে আমরা সাধারণত বুঝি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার এবং পর্যাপ্ত ঘুম। খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী দৈনিক লবণ গ্রহণ ৫ গ্রাম, অর্থাৎ এক চা-চামচের মতো হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে এটি প্রায় দ্বিগুণ। যদি শুধু লবণ কমানো যায়, তাহলে সিস্টোলিক রক্তচাপ ৬ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত কমতে পারে। আলাদা করে লবণ না খাওয়া এবং প্যাকেটজাত খাবার, যেমন চিপস, চানাচুর, বিস্কুট—এগুলোতে থাকা লুকানো লবণ এড়িয়ে চলা জরুরি।
আমাদের অবশ্যই শাকসবজি, ফলমূল, গোটা শস্যদানা, যেমন লাল চাল, আটা, ওটস—এগুলো বেশি খেতে হবে। কম চর্বিযুক্ত দুধজাত খাবার, দই, সামুদ্রিক মাছ ও জলপাই তেলের মতো স্বাস্থ্যকর তেল ভালো। ড্যাশ ডায়েটও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। অন্যদিকে এনার্জি ড্রিংক, কোমল পানীয়, ধূমপান, তামাক, জর্দা—এগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা উচিত।
ওজন নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ৫ শতাংশ ওজন কমাতে পারলেই উচ্চ রক্তচাপ অনেকটা কমে যায়। প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন দ্রুত হাঁটা বা ব্যায়াম করা অত্যন্ত কার্যকর। ঘরে হাঁটা কিংবা সিঁড়ি ব্যবহার—সবই উপকারী। ঘুমের বিষয়েও জোর দিতে চাই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন রাতের ঘুম দরকার। নিজের যত্ন নিজেকেই নিতে হবে। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে, নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে, সচেতনতাই আমাদের সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি।
মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন তালুকদার
ডিরেক্টর, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ওষুধকে দৈনিক ব্যয় হিসেবে নয়; বরং একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ, নিয়মিত ওষুধ না খেলে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক, কিডনি রোগ বা স্ট্রোকের মতো জটিল রোগ হতে পারে, যার চিকিৎসা অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং কর্মক্ষমতাও নষ্ট করে দেয়।
বাংলাদেশে ওষুধের দাম এখনো যথেষ্ট সহনীয়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বেশির ভাগ ওষুধের দৈনিক চিকিৎসা খরচ সাধারণত ১ থেকে ১০ টাকার মধ্যে। যেমন আমাদের একটি ব্র্যান্ডের ২.৫ মিলিগ্রামের ওষুধের দৈনিক খরচ প্রায় ৭ টাকা। আর একই জেনেরিক ওষুধ পাশের দেশে প্রায় ২২ টাকা পর্যন্ত পড়ে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককে গেলে এই খরচ আরও বেশি। ইউরোপ-আমেরিকায় তো আরও অনেক বেশি।
বাংলাদেশে ওষুধের দাম আমরা সরাসরি নির্ধারণ করি না। কোম্পানিগুলো কাঁচামাল, প্যাকেজিংসহ উৎপাদন খরচ হিসাব করে ঔষধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষের কাছে দাম প্রস্তাব করে, পরে কর্তৃপক্ষ তা যাচাই-বাছাই করে নির্ধারণ করে দেয়। অনেক সময় দাম আরও কমিয়ে দেওয়া হয়।
গত কয়েক বছরে ডলারের দাম ও কাঁচামালের খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও গত আড়াই বছরে বাংলাদেশে কোনো বড় ধরনের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়নি।
সচেতনতার অভাবে রোগীরা অনিয়মিতভাবে ঔষধ গ্রহণ করেন৷ অনেক রোগী ঔষধ খেয়ে ভালো বোধ করলে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ঔষধ সেবন বন্ধ করে দেন। এখানে চিকিৎসক, ফার্মেসি, ওষুধ কোম্পানি, গণমাধ্যম ও সরকারের সমন্বিত ভূমিকা দরকার।
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপন পরিবর্তন—কম লবণ গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্য, নিয়মিত হাঁটা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ—জাতীয়ভাবে প্রচার করা।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় (কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা পর্যায়) নিয়মিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ওজন স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক ও সম্প্রসারণ করা।
নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি ক্লিনিকসহ মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় নজরদারি বাড়ানো।
শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ঘুম ও শারীরিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা জোরদার করা।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ওষুধের ধারাবাহিক সরবরাহ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।