‘বাংলাদেশে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা
‘বাংলাদেশে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

বাংলাদেশে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) বিগত চার বছর ধরে ‘বাংলাদেশে সামগ্রিক শিশু বিকাশ’ প্রোগ্রামের মূল্যায়ন করেছে। এ লক্ষ্যে বিআইজিডি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এই মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন ও অংশীজনদের মতামত তুলে ধরা হয়।

অংশগ্রহণকারী:

মো. আব্দুর রহিম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, উপসচিব, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।

মেহনাজ রব্বানী, ডিরেক্টর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।

জেনা দেরাখশানি হামাদানি, ইমেরিটাস বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি।

এষা হোসেন, কান্ট্রি ডিরেক্টর, সিনারগোস বাংলাদেশ।

সৈয়দা সাজিয়া জামান, প্রোগ্রাম হেড, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট।

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, কর্মসূচি প্রধান, উন্নয়ন শিক্ষা কর্মসূচি, ব্র্যাক।

শায়লা আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।

আহলাম আহসান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ফুলকি।

ফারাহ মুনীর, সিনিয়র রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।

মোসতান জিদা আলনূর, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ।

সাইদুর রহমান মাশরেকী, অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ (জনস্বাস্থ্য) বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

কামরান উল বাছেত, ডিন ও সহযোগী অধ্যাপক, স্কুল অব ফার্মাসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।

এম. রিজওয়ান খান, সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, সিনারগোস বাংলাদেশ।

তানজিনা দিনা, কনসালট্যান্ট, সোশ্যাল পলিসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক।

এ্যানি দ্রং, ন্যাশনাল প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর, আইএলও।

আহসান মাহমুদ, উপদেষ্টা, ইসিডি অ্যান্ড আইকিউই প্রোগ্রাম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

ফয়সাল হোসেন, ইসিডি ফোকাল পারসন, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট।

মীর মাসরুর জামান, নির্বাহী পরিচালক, সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন।

জেমস ওয়ার্ড খকশী, সিনিয়র রিসার্চ কোঅর্ডিনেটর, বিআইজিডি।

ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

মো.আব্দুর রহিম

অতিরিক্ত মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

শিশুর বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের গর্ভ থেকেই। তাই মায়ের পুষ্টি, যত্ন ও বিশ্রামের ওপরও শিশুর বিকাশ অনেকখানি নির্ভর করে। জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর এবং প্রাথমিক ও প্রাক্‌-প্রাথমিক বয়স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি, নিরাপত্তা, শেখা ও সাড়া দেওয়া যত্নের পাশাপাশি জ্ঞানীয়, সামাজিক, আবেগীয়, শারীরিক ও চারিত্রিক বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ একটি বিস্তৃত কাজ। বাংলাদেশে এক লাখের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক কোটি শিশু পড়ালেখা করে। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করে সরকার এসব নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

‘শেখার সহায়ক হিসেবে ভবন’ প্রকল্পে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে শেখার উপকরণ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। ‘আনন্দের সঙ্গে শেখা’ কার্যক্রমে শিশুর শেখাকে আনন্দময় ও চাপমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমাতে মধ্যাহ্নভোজ ও স্কুল ফিডিং, ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ ও জুতা দেওয়ার প্রকল্প রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষা ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে দুটি নতুন বই দেওয়ার উদ্যোগও চলছে।

তবে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে ধারাবাহিকতা জরুরি। শিক্ষক নিয়োগে শিশু মনোবিজ্ঞান ও শারীরিক-মানসিক প্রয়োজন বোঝার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনে যেন কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। তাহলেই শিশুর সামগ্রিক বিকাশ আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন

উপসচিব, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীল করার বড় সুযোগ রয়েছে। দেশে ১৪ হাজার ৪৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এগুলোকে আরও কার্যকর করতে পারলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিশু ও পরিবারের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কমিউনিটি ক্লিনিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রথম যোগাযোগস্থল। নবজাতক, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের সেবা, পুষ্টি, টিকাদানসহ নানা কার্যক্রম এখানে পরিচালিত হয়। তবে তিন ধরনের কর্মী তিনটি ব্যবস্থার অধীনে কাজ করায় সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। তাই তিন ধরনের কর্মীকে একটি প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। কমিউনিটি ক্লিনিককে ‘কমিউনিটি স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, কার্যক্রম ও ফলাফল আরও ভালোভাবে তদারক করা সম্ভব হবে। শুধু প্রশিক্ষণ নয়, এর ফলাফলও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোন সেবা কত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং শিশুর বিকাশে তার কী প্রভাব পড়ছে, তা-ও পরিমাপ করা জরুরি।

কমিউনিটি ক্লিনিকের বিশাল প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগাতে পারলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।

মেহনাজ রব্বানী

ডিরেক্টর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট

শিশুর বিকাশের জন্য প্রথম শূন্য থেকে আট বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শিশু কী খাচ্ছে, কী খেলছে, কেমন চিকিৎসা ও পরিবেশ পাচ্ছে—সবকিছু মিলেই তার মস্তিষ্কের বিকাশ হয়। পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশে বিষয়টি স্বীকৃত এবং ১৯টি মন্ত্রণালয় এ বয়সী শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয়। একই শিশুকে ঘিরে বিভিন্ন সেবা ও উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

আমাদের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন খাতে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে কাজ করা অংশীজনদের একসঙ্গে আনা। বিভিন্ন অংশীদার সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করছে। আমরা সরকারের ব্যবস্থার ভেতরেই পরিবর্তন ও সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কাজটি কঠিন এবং অগ্রগতিও ধীর। তবু্ও সরকারের ব্যবস্থার ভেতরেই কাজ করতে পারলে এর প্রভাব স্থায়ী হবে। এতে সরকারের বিদ্যমান কাঠামো আরও কার্যকর হবে এবং শিশু ও পরিবারের জন্য সেবার মান উন্নত করা সম্ভব।

অভিন্ন ফলাফল কাঠামো দরকার কি না, শীর্ষ কোনো সমন্বয় কাঠামো প্রয়োজন কি না—এসব নিয়ে ভাবতে হবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করা সম্ভব। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও মাঠপর্যায়ের অংশীজনদের ভূমিকা স্পষ্ট করাও জরুরি।

জেনা দেরাখশানি হামাদানি

ইমেরিটাস বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি

স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গেলে এটি শিশুর বিকাশ কার্যক্রমের সবচেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকের অবকাঠামো আছে, স্বাস্থ্যকর্মী আছেন। আইসিডিডিআরবি সারা দেশের ৬০০ কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যকর্মী ও শিশুর অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কর্মসূচি শেষ হলেও তাঁরা এগুলো ব্যবহার করে কাজ করতে পারবেন। এভাবে বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যেই শিশুর সামগ্রিক বিকাশের কার্যক্রমকে দীর্ঘ মেয়াদে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং প্রান্তিক পরিবারের কাছেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যাবে।

সরকারকে  শিশুর সামগ্রিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তাটি আরও গুরুত্ব  দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। শূন্য থেকে আট বছর বয়সকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ হলেও চার থেকে পাঁচ বছরের জায়গায় একটি ঘাটতি রয়েছে। এই বয়সে শিশুর শেখা, খেলাধুলা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেসব সরকারি প্ল্যাটফর্মে কাজ করে কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলোকে নিয়মিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ ও সহজলভ্য উপকরণ রয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা সপ্তাহে এক দিন এক ঘণ্টা শিশুর সামগ্রিক বিকাশের একটি সেশন নিতে পারেন। এটি তাঁদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হলে কাজটি করা সম্ভব। এ কাজ একদিন বাস্তব রূপ নেবে—এই প্রত্যাশা আমাদের আছে।

এষা হুসাইন

নির্বাহী পরিচালক, সিনার্গোজ বাংলাদেশ

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় শিশুর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে পারস্পরিক সমন্বয় করে একসঙ্গে কাজ করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে শুরু থেকেই কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ও স্থায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোনো প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে যেন কার্যক্রমও থেমে না যায়, তা পরিকল্পনার শুরুতেই নিশ্চিত করতে হবে। আমরা অনেক সময় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবের কথা বলি। কিন্তু একই বিষয় নিয়ে আমরাও বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজ করছি। তাই নিজেদের মধ্যেও সমন্বয় ও একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কে কোথায় কাজ করছে ও সহযোগিতার সুযোগ কোথায় আছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি। এতে কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাবে।

আমরা এত দিন যেভাবে কাজ করেছি, তা নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে।

 শুধু একটি প্রকল্প বা এককালীন গবেষণা দিয়ে বড় পরিবর্তন আশা করা কতটা যৌক্তিক, সেটিও ভাবতে হবে। শিশুর সামগ্রিক বিকাশ এগিয়ে নিতে হলে চলমান প্রক্রিয়া, ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি প্রয়োজন। অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী কার্যক্রমে কাজে লাগাতে হবে। আমরা আরও একসঙ্গে কাজ করতে চাই এবং শিশুর সামগ্রিক বিকাশে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে এগিয়ে যেতে চাই।

সৈয়দা সাজিয়া জামান

প্রোগ্রাম হেড, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট

বাংলাদেশে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণীত হয়েছে, বিভিন্ন কার্যকর মডেল তৈরি হয়েছে, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা ও খেলাভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতিতেও অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির বদল হলে অনেক সময় কাজের গতি থেমে যায়। ফলে বারবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। এ জায়গায় একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন দরকার। এত দিনের অর্জন যেন ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। নীতির আওতায় থাকা সমন্বয় কমিটিগুলোও নিয়মিত ও কার্যকর করতে হবে।

১৯টি মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি শিশুর প্রথম আট বছরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত মন্ত্রণালয়গুলোকে নিয়ে ছোট ও কার্যকর কাঠামো করা যায় কি না, তা ভাবতে হবে। এই কাঠামোর নিয়মিত সভা, দায়িত্ব ও কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। আমাদের ইতিমধ্যে অনেক পরীক্ষিত মডেল ও প্রমাণ আছে, সেগুলোকে বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করতে হবে। নীতি, বাস্তবায়ন, প্রমাণ তৈরি ও জনস্বার্থে প্রচার—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সফল উদ্যোগের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করে পরবর্তী পরিকল্পনায় তা কাজে লাগাতে হবে। তবেই শিশুর সামগ্রিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব হবে।

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন

কর্মসূচিপ্রধান, উন্নয়ন শিক্ষা কর্মসূচি, ব্র্যাক

চার বছরের শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন মায়েরাও স্কুলে থাকেন। তাঁদের এই সময়টাকে কীভাবে শিশুর শেখায় কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, সেখান থেকেই আমাদের ভাবনা শুরু। খেলাভিত্তিক শেখার কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক অভিভাবকদের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁরা পালাক্রমে প্লেলিডারকে সহায়তা করেন, শিশুদের গুছিয়ে বসানো, গল্প বলার মতো কাজে যুক্ত থাকেন। এতে অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা অর্থবহ হয়েছে এবং শিশুর স্কুলে আগ্রহ তৈরিতেও তাঁরা প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছেন।

আমরা ‘অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি’ নিয়েও কাজ করেছি। ২০০০ সালের পরিপত্রে বছরে দুটি সভার কথা থাকলেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সরকারি বিদ্যালয়ে পাইলট করে আমরা চারটি সভা, উঠান বৈঠক ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক অভিভাবক সভার কার্যকর পদ্ধতি দেখিয়েছি। গবেষণাভিত্তিক এই কাজের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকা স্পষ্ট করেছি।

আমরা আগামী বছর দুই হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্লেল্যাব চালু করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য, এই শিক্ষাগুলো কাজে লাগিয়ে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিষয়টি ছড়িয়ে দেওয়া। এটি আমাদের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।

শায়লা আহমেদ

সহকারী অধ্যাপক ও রিসার্চ ফেলো, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ (ইসিডি) একটি বড় বিষয়। এর বিভিন্ন দিক আলাদাভাবে গুরুত্ব দিলে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণযোগ্য ও টেকসই করার সুযোগ বোঝা সহজ হবে। আমাদের গবেষণায় দেখেছি, শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে শূন্য থেকে তিন বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ হয় এবং ইতিবাচক ফল পাওয়ার সুযোগ বেশি। তাই অভিভাবকত্ব ও মানসিক উদ্দীপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমরা চাই, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে অভিভাবকত্ব ও মানসিক উদ্দীপনাকে একীভূত করা হোক। টিকাদান, প্রসবের আগে ও প্রসব–পরবর্তী সেবা নিতে আসা মা বা যত্নকারীদের বয়সভিত্তিক বার্তা দিতে হবে। কম শিক্ষিতদের জন্য বার্তাগুলো দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরা দরকার। স্থানীয় নেতা ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করলে মালিকানাবোধ তৈরি হবে। কমিউনিটি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর মধ্যেই এসব কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ফল পাওয়া সম্ভব।

আহলাম আহসান

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ফুলকি

নীতিগত অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নের জায়গায় যে গ্যাপটি রয়ে যায়, সেটি দূর করা আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তবায়নের সময় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও দেখা দেয়। কমিউনিটিভিত্তিক কাজ বা শিশুর যত্ন—সব ক্ষেত্রেই শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন। কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি মান নিশ্চিত করতে পারলে সমাজকে একটি সুন্দর মডেল দেওয়া সম্ভব। আমরা সবাই সচেতনতা নিয়ে কাজ করি, কিন্তু বার্তাটি কতটা কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তারা তা কাজে লাগাচ্ছে কি না এবং আচরণে পরিবর্তন কতটা হচ্ছে—এসবও ভাবতে হবে।

সবাই যদি একে অন্যের কাজের পুনরাবৃত্তি না করে পরস্পরের কাজকে পরিপূরক করি, তাহলে কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানো ও টেকসই করা সহজ হবে। আমরা ইতিমধ্যে শিশু ও কমিউনিটিতে পরিবর্তন দেখছি। কার্যক্রমকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায় এবং বড় পরিসরে করা যায়, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগই কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ ও টেকসই করতে পারে।

ফারাহ মুনীর

সিনিয়র রিসার্চ কো–অর্ডিনেটর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

বিআইজিডি যে প্রোগ্রামটি মূল্যায়ন করেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল শূন্য থেকে আট বছর বয়সী শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবাগুলো সরকারি ব্যবস্থার মূলধারায় যুক্ত করা। এ লক্ষ্যে প্রোগ্রামটি তিনটি মন্ত্রণালয়কে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উদ্যোগের ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সম্মুখসারির কর্মী ও পরিচর্যাকারীদের জ্ঞান বেড়েছে এবং শিশুর বিকাশে খেলাভিত্তিক শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তবে এই জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে চর্চার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত কাজের চাপ, প্রণোদনার ঘাটতি, কর্মক্ষেত্রে যথাযথ মূল্যায়ন, শিশু উপযোগী পরিবেশ ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এর বড় কারণ। একইভাবে উদ্যোগগুলো টেকসই করতে সরকারি ব্যবস্থায় তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই প্রোগ্রামের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে সরকারি অংশীজনদের নিয়ে কাজ করতে পারা, নতুন চ্যাম্পিয়ন তৈরি এবং একটি সংযুক্ত অংশীজন নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা।

মোসতান জিদা আলনূর

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ

পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও খেলাভিত্তিক শেখার মাধ্যমে একটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। ইউনিসেফের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। প্রথমত, সরকারের সঙ্গে সহ–সৃষ্টি জরুরি। কাজের শুরুতেই সরকারি ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি আছে, তা চিহ্নিত করতে পারলে পুরো চিত্রটি বোঝা সহজ হয় এবং সরকারেরও সুবিধা হয়।

দ্বিতীয়ত, আমরা যে প্রমাণ ও তথ্য তৈরি করছি, তা সরকারি তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে পরিপূরক হতে হবে। সরকারি ব্যবস্থার বাইরে আলাদা তথ্য তৈরি করলে সমন্বিতভাবে কাজ করা কঠিন হয়। তৃতীয়ত, কার্যক্রম কতটা কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী হয়েছে, সেই তথ্যও সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে, যাতে কাজের মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণ সহজ হয়।

সবশেষে বলব, শিশুর সামগ্রিক বিকাশে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসহ সব খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ১৯টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় কঠিন। এ কাজের ধারাবাহিকতা ও গতিশীলতা ধরে রাখতে একটি কার্যকর শীর্ষ সমন্বয় কাঠামো জরুরি।

সাইদুর রহমান মাশরেকী

অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ (জনস্বাস্থ্য) বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

শিশুর সামগ্রিক বিকাশের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বুকের দুধ, টিকাদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে গবেষণার যোগসূত্র তৈরি করা জরুরি। গবেষণার ফল কোথায় ব্যবহৃত হবে—গবেষণার নকশায় অনেক সময় সেটি বিবেচনায় রাখা হয় না। আবার গবেষণার মালিকানা ও মূল্যায়নের জায়গাতেও ঘাটতি আছে। গবেষণাকে এমনভাবে দেখতে হবে, যাতে গবেষক ও বাস্তবায়নকারী উভয়েই এর মূল্যকে সম্মান করেন। আমরা যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে ধারণা তৈরির শুরু থেকেই সহ-উন্নয়ন এবং শক্তিশালী পদ্ধতিতে প্রমাণ তৈরি করতে হবে। গবেষণার পদ্ধতিগত মান ঠিক না থাকলে সেই প্রমাণ নীতিতে নেওয়া কঠিন।

তথ্য ও প্রমাণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে তার প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। তাই শিশুর সামগ্রিক বিকাশের নীতিতে গবেষণাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে। কোন গবেষণা হবে, কীভাবে হবে এবং তার মান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসবের পরিকল্পনা ও সমন্বয় দরকার। গবেষণা পদ্ধতিগতভাবে শক্তিশালী হলে তা নীতিতে ও বাস্তব কার্যক্রমে নেওয়া অনেক সহজ হয়।

কামরান উল বাছেত

ডিন ও সহযোগী অধ্যাপক, স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি

আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিশুর সামগ্রিক বিকাশকে অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকারে আনা। শুধু শিশুকে যত্ন করলেই হবে না, শিশুর বিকাশের জন্য কী ধরনের যত্ন প্রয়োজন, সে বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দরকার। আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ শিক্ষা আছে; কিন্তু প্রকল্প শেষ করার মধ্যেই আমরা থেমে যাই। বাস্তবায়ন থেকে পাওয়া শিক্ষা ও গবেষণাকে নীতিতে নেওয়ার জন্য জ্ঞান ব্যবস্থাপনায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুর যথাযথ যত্ন ও বিকাশের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। তাই সেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি এর মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীদের নিয়মিত সচেতনতা তৈরির কাজে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যেতে পারে। শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি শিশুর মানসিক বিকাশেও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর সামগ্রিক বিকাশকে কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে মালিকানা নিতে হবে। কারণ, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে শিশুর ভবিষ্যৎ।

এম. রিজওয়ান খান

সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, সিনার্গোজ বাংলাদেশ

আমরা প্রায় এক দশক ধরে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে কাজ করছি। সরকারি নেতৃত্ব ও অংশীদারদের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিশুর ডুবে যাওয়া প্রতিরোধের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের সঙ্গে একীভূত করা সম্ভব। সরকারের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগটি ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের তত্ত্বাবধান, খেলাভিত্তিক শেখা ও ইতিবাচক অভিভাবকত্বকে একসঙ্গে আনা হয়েছে।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্জনগুলো নথিবদ্ধ করে সংরক্ষন করতে হবে, যাতে নেতৃত্ব বদলালেও কাজ থেমে না যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ইসিডি কমিটিগুলোকে মূলধারায় আনা হয়েছে।এভাবে শক্তিশালী সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুর বিকাশের কাজ আরও কার্যকর ও টেকসই হবে।

তানজিনা দিনা

কনসালট্যান্ট, সোশ্যাল পলিসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কর্মজীবন ও সমাজের নেতৃত্ব দেবে। তার দক্ষতা অনেকটাই নির্ভর করবে জীবনের প্রথম পাঁচ থেকে আট বছরের অভিজ্ঞতার ওপর। ফলে শিশুর বিকাশে বিনিয়োগের গুরুত্ব আমাদের আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে।স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষাসহ ১৯টি মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ জন্য সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও সমন্বয়কারী সংস্থার বাস্তব কর্তৃত্ব, আলাদা বাজেট ও অভিন্ন ফলাফল কাঠামো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফ্রন্টলাইন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, তদারকি ও মান নিশ্চিত করতে হবে।ছোট পরিসরে কার্যকর উদ্যোগ বড় পরিসরে কাজ করবে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।

এ্যানি দ্রং

ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো–অর্ডিনেটর, আইএলও

শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো গেলে এ উদ্যোগ দেশব্যাপী বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের প্রতিফলন নিয়মিত পাওয়া গেলে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত। একই সঙ্গে প্রাথমিক শৈশবের উন্নয়নকে সহজলভ্য ও মানসম্মত করতে অভিভাবকদের আস্থা তৈরি এবং শিশুর যত্নের মূল্যায়নেও কাজ করতে হবে।

যত্নদাতাদের ভালোভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে কাজের পরিবেশ ও সেবার মান নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণ ও সেবাদাতাদের দক্ষতার মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর সঙ্গে এসব উদ্যোগ যুক্ত করার সুযোগ আছে। বিভিন্ন সংস্থার কাজেও সমন্বয় জরুরি। তাই সেবা প্রদানের সক্ষমতা ও ঘাটতি —এসব তথ্য নিয়ে একটি সমন্বিত ড্যাশবোর্ড থাকলে সবাই অর্থবহভাবে অবদান রাখতে পারবে।

আহসান মাহমুদ

উপদেষ্টা, ইসিডি অ্যান্ড আইকিউই প্রোগ্রাম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

কমিউনিটিকেন্দ্রিক পদ্ধতি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের কাজে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কী প্রয়োজন, কোথায় ও কী নিয়ে কাজ করতে হবে—এসব আমরা কমিউনিটির কাছ থেকেই চিহ্নিত করি। আমাদের স্পনসরশিপ কর্মসূচিতে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু ও পরিবারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা করা হয়।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারি কার্যক্রমে সমন্বিতভাবে কাজ করে। আমাদের কাজগুলো সরকারের কাছে পৌঁছানো এবং বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন করাই মূল লক্ষ্য। জন্মনিবন্ধন ও প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষাক্রম নিয়েও দীর্ঘদিনের কাজ রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো উদ্যোগগুলো সরকারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা।

স্থায়িত্বের জন্য শুরু থেকেই পরিবার ও সরকারি ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখি। উদ্যোগ টেকসই করতে পরিবারকে সম্পৃক্ত করে সরকারি ব্যবস্থায় কাজটি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

ফয়সাল হোসেন

ইসিডি ফোকাল পারসন, সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট

আমরা প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করি। শিশুর সামগ্রিক বিকাশে প্রতিবন্ধী শিশুরাও ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত কি না এবং সবার সমান সুযোগ ও প্রবেশাধিকার আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও কমিউনিটির অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ইসিডি ডেটাবেজের ঘাটতি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। টেকসই পরিবর্তনের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা জরুরি।

 একই সঙ্গে খেলাও যে শিশুর শেখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো বিদ্যমান ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব। পাশাপাশি প্রি-প্রাইমারিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রয়োজন নিশ্চিত করে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

মীর মাসরুর জামান

নির্বাহী পরিচালক, সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

গণমাধ্যম ও যোগাযোগ উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে জনস্বার্থে সাংবাদিকতার প্রসার এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে আমরা কাজ করি। ‘জনস্বার্থ সাংবাদিকতার’জায়গা থেকেই আমরা এ কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে সেটিকে কীভাবে টেকসই করা ও সরকারি অর্থায়ন স্থায়িত্বশীল করার বিষয়ে অ্যাডভোকেসির সঙ্গে যুক্ত হই। এর ধারাবাহিকতায় শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রমের  জন্যও অ্যাডভোকেসিতে যুক্ত হওয়া।

অ্যাডভোকেসির সময় আমরা গণমাধ্যমের সহায়তা নিলেও অনেক সময় গণমাধ্যমকে শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে দেখি—কাজের শুরুতে ডাকি, মাঝখানে ভুলে যাই, শেষে ডাকি। এতে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। গণমাধ্যমকে ধারাবাহিক অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রমে গণমাধ্যমকে যুক্ত করে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা যাবে।