
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় নাগরিক কোথায়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২০ জুলাই ২০২৫।
ড. তোফায়েল আহমেদ
প্রধান, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন
মাহীন সুলতান
সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস, জেন্ডার অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন, বিআইজিডি;
সদস্য, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন
শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
সৈয়দা সেলিনা আজিজ
ফেলো অব প্র্যাকটিস, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিকস বিভাগ, বিআইজিডি
ইলিরা দেওয়ান
মানবাধিকারকর্মী; সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন
সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন
সমন্বয়কারী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন
নুরুল হুদা সাকিব
অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আসিফ মোহাম্মদ শাহান
অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাজ্জাদ শরিফ
নির্বাহী সম্পাদক, প্রথম আলো
ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
ড. তোফায়েল আহমেদ
প্রধান, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন
স্থানীয় শাসন মানে শুধু স্থানীয় সরকার নয়। স্থানীয় শাসন বলতে বোঝায় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, পরিবার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকারসহ স্টেকহোল্ডারের সম্মিলিত গঠন। এরা কিন্তু সবাই মিলেই স্থানীয় শাসনটাকে ধারণ করে।
স্থানীয় শাসনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যেসব কাঠামোগত ও বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তা একবারে সরলভাবে উপস্থাপন করা যায় না। গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের কাঠামো, যেমন ওয়ার্ড সভার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে ওয়ার্ড সভা বিষয়টা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ওয়ার্ড সভা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার একটা সভা হয়ে গেছে। একটা করে ব্যানার টাঙিয়ে ছবি তুলেই সভা শেষ হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ, এখানে কোনো জবাবদিহি নেই। এখানে জবাবদিহির জায়গাটা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে যে বাজেট হয়, সেটা ফিক্টিসিয়াস বাজেট। জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এগুলো কোনো বাজেট নয়, এগুলো বাজেটের নামে একটা কাগজ। এই বাজেটকে সত্যিকারের বাজেট করতে হবে। বাজেট করার আগে লোকাল স্থায়ী কমিটি করতে হবে। সেই স্থায়ী কমিটি ওই বাজেটের সঙ্গে সম্পর্কিত লোকগুলোকে নিয়ে আলোচনা করে বাজেটটা তৈরি করবে। তৈরি করে নিজেদের মধ্যে আবার আলোচনা করবে। পরে বাজেটটা জনগণকে দেবে। জনগণ এটার ওপর মন্তব্য করবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবার বসে এটা ঠিক করবে এবং ফাইনালি বসে এটাকে রিয়াল বাজেট হিসেবে অ্যাপ্রুভ করতে হবে।
আমাদের স্থানীয় সরকারে একমাত্র সমস্যা কিন্তু নাগরিক সম্পৃক্ততার অভাব নয়। সত্যিকার নির্বাচন হলে নাগরিক সম্পৃক্ততা আসবে এবং তাতে কিন্তু অন্যান্য জিনিস ফলো করবে। জন–অংশগ্রহণটা কতটুকু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করবে, তার ওপর এর ফলাফল নির্ভর করে। এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণটা আমরা কীভাবে করতে পারি? জন–অংশগ্রহণের প্রতিষ্ঠান করার একটা উপায় হচ্ছে নির্বাচন।
আমরা যে কাঠামোটা করেছি, এটা দু–একটা অংশ। একটা হচ্ছে লেজিসলেটিভ পার্ট। এর মধ্যে স্পিকারের মতো একটা পজিশন সভাধিপতির পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই সভাধিপতি নিশ্চিত করবেন স্থানীয় সরকারের প্রতিটা স্থায়ী কমিটির মিটিং সময়মতো হচ্ছে। মিটিংয়ের আলোচিত বিষয়গুলো পরবর্তী সাইকেলে আবার জেনারেল মিটিংয়ের মধ্যে এগুলো আসছে। প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মধ্যে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আর এই স্থায়ী কমিটিগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট নাগরিকদেরও কিন্তু আনার সুযোগ আছে। সেই সঙ্গে মিটিংগুলো উন্মুক্ত করতে হবে। গোপনীয়তা আছে—এ রকম কোনো মিটিং না হলে সব মিটিংয়ে উন্মুক্তভাবে জনগণের এসে বসার–শোনার–দেখার সুযোগ থাকবে। এটা অবারিত করতে হবে।
তারপর মেম্বারকে রিকল করার সিস্টেম করেছি আমরা। সরকার মানবে কি না, জানি না। আমরা শপথের সিস্টেম করেছি এ রকম যে শপথটা কোনো অফিসে হবে না। শপথ হবে জনগণ বা ভোটারদের সামনে। তাঁর ধর্মগ্রন্থে হাত দিয়ে শপথ পড়বেন। ওই শপথের মধ্যে বাক্যগুলোর মধ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমি কী করব, কী করব না—এ কথাগুলো কিন্তু সেখানে বলবে; মানুষের সামনে মানুষকে সাক্ষী রেখে। তাহলে একটা মোরাল প্রেশার তাঁর ওপর থাকবে।
সৈয়দা সেলিনা আজিজ
ফেলো অব প্র্যাকটিস, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিকস বিভাগ, বিআইজিডি
বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোয় স্থানীয় সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এই স্তর নাগরিকদের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখলেও বাস্তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হলে কেবল আইন ও কাঠামোগত সংস্কার নয়, প্রয়োজন গণমুখী প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর এবং নাগরিকদের সক্রিয় ও সামষ্টিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
স্থানীয় সরকার কমিশনের রিপোর্টে স্থানীয় সরকারের আইন, আর্থিক সক্ষমতা, নারী অংশগ্রহণ এবং বিকল্প নির্বাচনী মডেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এসব সুপারিশে নাগরিকদের ভূমিকা খুবই সীমিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’ বা ‘নাগরিক অন্তর্ভুক্তি’-র কথা বলা হলেও তা ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও প্রক্রিয়াহীন। বিস্ময়করভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতা (নাগরিকেরা যেখানে প্রতিনিধিদের সরাসরি এবং নিয়মিত দায়বদ্ধ করতে পারেন) শব্দটি একবারও উল্লেখ করা হয়নি। আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নাগরিক অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার বিদ্যমান পদ্ধতি হলো ‘উন্মুক্ত বাজেট সভা’। এ বিষয়ের কোনো উল্লেখ কমিশনের রিপোর্টে নেই। বাজেট প্রক্রিয়ায় জনগণ কীভাবে অংশ নেবেন, সে বিষয়েও কোনো আলোচনা নেই। কিছু জায়গায় স্থায়ী কমিটি পুনরায় কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। তবে সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ (আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায়) কীভাবে হবে, সেটার কোনো আইনগত ভিত্তি বা প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি ‘এলিটমুখী’ অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। তারা ধরে নিয়েছে যে গরিব, নিরক্ষর মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন নন এবং তাঁরা গণতন্ত্রের অনুপযুক্ত। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ওয়ার্ড সভায় অংশগ্রহণ করতে সুযোগ পেলে এই গরিব মানুষেরাই সবচেয়ে সক্রিয় হন। তাঁদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং নিজের স্বার্থ বোঝার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একপ্রকার শ্রেণিভিত্তিক বিদ্বেষ প্রকাশ করে।
কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক বর্তমানের প্রেসিডেন্সিয়াল কাঠামো থেকে সংসদীয় কাঠামোতে গেলে আমরা শাসন কাঠামোতে নতুন এলিট পাব। এতে জনগণের কাছে জবাবদিহি কীভাবে বাড়বে আর ভালো সরকার কীভাবে পাওয়া যাবে, সেটা পরিষ্কার নয়। আর আমরা জানি এই নতুন ও পুরোনো এলিটদের গোষ্ঠীতন্ত্র উদ্ভব হতে বেশি দিন লাগবে না, যদি না একই সঙ্গে খুব কার্যকর, সমষ্টিগত ও সরাসরি নাগরিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়। অন্যদিকে, মেম্বার থেকে চেয়ারম্যান হওয়ার সম্ভাবনার কথা ভেবে অতি ধনী এলিটরা মেম্বার হওয়ার নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নামবেন, যা বর্তমানে গ্রামীণ মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক ছিল। এতে সামগ্রিক নির্বাচনী খরচ আকাশচুম্বী হবে এবং নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রায় নির্বাসিত হবে। প্রস্তাবিত সংসদীয় কাঠামোতে যাঁরা চেয়ারম্যান হতে চাইবেন, তাঁদের রাজনৈতিক খরচ, নির্বাচন-উত্তর পর্যায়ে অনেক বেড়ে যাবে। কারণ, তাঁরা তখন অন্যান্য মেম্বারদের ভোট কিনতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেন। প্রস্তাবিত নির্বাহী গ্রুপ তৈরির বিষয়টিও টাকার খেলায় পর্যবসিত হবে। সংসদীয় পদ্ধতিতে আগেকার প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা (২০১৬–এর আগে) চেয়ারম্যান ভোটারদের কাছে যে সরাসরি নির্বাচনী জবাবদিহির সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন, সেটি আর থাকবে না।
আমরা স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছি। বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য একটি বড় বাধা হচ্ছে প্রাসঙ্গিক আইনের অভাব। আমরা কমিশনের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত, ‘এতে এমন কোনো আইন নেই, যার মাধ্যমে জনগণের সুপারিশ, মতামত বা বক্তব্যকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করে জনপ্রতিনিধিদের অনুসরণে বাধ্য করা যাবে। তেমনি এমন কোনো আইনও নেই, যার ভিত্তিতে জনসাধারণকে এই সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করা হবে।’ গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি জনগণের সার্বভৌমত্ব, যা বাস্তবায়িত হয় বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে: পরোক্ষ নির্বাচন, প্রত্যক্ষ নির্বাচন, আলোচনাপ্রসূত গণতন্ত্র এবং সামগ্রিক নাগরিকদের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র। স্থানীয় পর্যায়ে এসবই থাকতে পারে, তবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনসাধারণের জন্য শেষ দুটি পদ্ধতি অধিক কার্যকর হবে বলে আমরা মনে করি। এর মানে হলো আমরা নাগরিক-প্রতিনিধিকে নাগরিকদের প্রতিনিধির চেয়ে অধিকতর গুরুত্ব দিতে চাই। আমাদের প্রস্তাবনায়, সামষ্টিক নাগরিকেরা রাষ্ট্রের বাইরে ও ভেতরে—উভয় জায়গাতেই অবস্থান করবেন এবং শুধু জবাবদিহি আদায় করবেন না বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও জড়িত থাকবেন।
বর্তমানে নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে নাগরিকগণ অতিমাত্রায় উপেক্ষিত হয়ে আছে। যেমন স্থায়ী কমিটিগুলোতে নাগরিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং তাদের ভূমিকা অনেকটা প্রতীকী। এগুলো মূলত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে। আমরা মনে করি নাগরিক প্রতিনিধিদের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার ভেতরে রাখতে হবে। আমাদের বিবেচনায় ওয়ার্ড সভা এবং উন্মুক্ত বাজেট সভায় বর্তমানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অংশগ্রহণ পদ্ধতির বদলে সামগ্রিক পদ্ধতির কথা ভাবতে হবে। এগুলোকে কার্যকর করতে হলে নিচ থেকে (সামষ্টিক নাগরিক দ্বারা) এবং ওপর থেকে (স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন, স্থানীয় পরিষদের ওপরের স্তরে সামষ্টিক নাগরিক ফোরাম ও স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা) নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ওয়ার্ড সভাকে কোনোভাবেই উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না, যেমনটা কমিশন সুপারিশ করেছে। একে ওয়ার্ড পর্যায়েই রাখতে হবে। দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষের জবাবদিহি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে একে যদি শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে ব্যক্তি পরিচিতিভিত্তিক স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে এর অবস্থান থাকা জরুরি—কোনো দূরবর্তী ও নৈর্ব্যক্তিক বৃহত্তর সমাজে নয়। এতে স্থানীয় প্রতিনিধিরা পরিচিত নাগরিকদের কাছে আরও বেশি করে দায়বদ্ধ হতে বাধ্য হবেন।
সামষ্টিক রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল একটি ধারণা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা তখনই কার্যকর হবে, যখন নাগরিকেরা কেবল ভোটার নন, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, তদারককারী ও উন্নয়নের অংশীদার হবেন। একটি দায়বদ্ধ গণতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক অ্যাসেম্বলি, তথ্যের স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও নাগরিক শিক্ষা অপরিহার্য। নাগরিকদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করে কোনো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে না। তাই এখনই সময় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস ও নাগরিককেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কারের।
মাহীন সুলতান
সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস, জেন্ডার অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন, বিআইজিডি;
সদস্য, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন
গত জুলাইয়ের পর থেকেই একটা বড় চিন্তা হচ্ছে যে এ রকম একটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষ কোথায়? আন্দোলন কিন্তু জনগণের অংশগ্রহণে হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে যে পুরো রিফর্ম প্রসেসে সেখানে জনগণকে কেন্দ্রে রাখা প্রয়োজন, যা বিভিন্ন কারণে হচ্ছে না। কিন্তু নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব থেকে আমরা এই জিনিসটাকে বারবার নিয়ে আসতে চাচ্ছি।
আমাদের মনে হয়, স্থানীয় সরকার কিন্তু একটা মোক্ষম জায়গা, যেখানে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ আছে, সম্ভাবনা আছে। যেহেতু এটা একদম ঘরের কাছে এবং চেনা মানুষ আছে, তাই নারীর অংশগ্রহণের সুবিধা আছে। আইনে নারীর অংশগ্রহণের অনেক পদ্ধতিও রয়েছে, কিন্তু সব সময় এগুলো কার্যকর হচ্ছে না। ওয়ার্ড সভা হোক আর বাজেট মিটিং হোক, এগুলোকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। বিকেন্দ্রীকরণ ঠিকমতো হলে নারীদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ, তাঁদের দাবিগুলো তুলে ধরার সুযোগ, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা ও বাজেটিং করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আমরা দেখেছি, আগে পৌরসভা পর্যায়ে বা অন্যান্য স্থানীয় সরকারের লেভেলে অনেক প্রজেক্ট সাপোর্ট ছিল। এসব প্রজেক্টে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে যদি বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকে, তাহলে কিন্তু নারীদের ওখানে সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণ করা সম্ভব। এ–ও মনে রাখতে হবে, এই অংশগ্রহণ যাতে শুধু প্রতীকী না হয়।
এর সঙ্গে একটা ইস্যু খুবই জড়িত হচ্ছে, তা হচ্ছে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপার। যাঁরা নির্বাচনে অংশ নেবেন আর যাঁরা ভোট দেবেন, সেখানে অংশগ্রহণের পরিবেশটা যেন থাকে। আমি যখন যাব, আমার কথাটা সম্মানজনকভাবে শুনবে। আর আমি কোনো রকমের হ্যারাসমেন্টের শিকার হব না। তাহলে অবশ্যই অংশগ্রহণটাও কিন্তু আরও জোরদার করা যায়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার অরাজনৈতিক হওয়া জরুরি, তাতে নারীদের অংশগ্রহণেরও সুযোগটা অনেক বাড়বে।
আমি যদি এখন নির্বাচনের কথায় আসি। এখানে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন একটু ভিন্নভাবে মতামত দিয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য এক। নারীদের সরাসরি ভোটে আসতে হবে এবং তাঁদের নিজস্ব একটা কনস্টিটিয়েন্সি থাকতে হবে।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব যে সিটগুলো দ্বিগুণ করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন সাধারণ প্রতিনিধি থাকবেন এবং একজন নারী প্রতিনিধি থাকবেন। তাঁদের দায়িত্বগুলো এমনভাবে ভাগ করে দেওয়া যায়, যাতে দ্বন্দ্ব না হয়। মূলকথা হচ্ছে যে তাঁদের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে আসতে হবে এবং নিজস্ব কনস্টিটিয়েন্সি বিল্ডিংটা যাতে করতে পারেন। আমাদের আগের অভিজ্ঞতা বলছে যে নারীরা ওই পর্যায়ে কিন্তু নেতৃত্ব দিতে পারছেন। তাঁদের ইচ্ছা আছে এবং অভিজ্ঞতাটাও তৈরি হয়েছে।
ইলিরা দেওয়ান
মানবাধিকারকর্মী, সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন
নির্বাচন শুধু একটি সময়সীমায় ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। একজন নাগরিক পাঁচ বছরের শাসনকালজুড়েই তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে জবাবদিহি চাইতে পারেন—এটিই গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ। আমরা চেষ্টা করেছি, নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো যদি সংসদীয় পদ্ধতিতে হতো, তাহলে দলীয় প্রভাব কমত এবং চিন্তাশীল, প্রগতিশীল মানুষেরা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী হতেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে আমি গভীরভাবে কাজ করেছি। এখানে জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, বাজার ফান্ড, ঐতিহ্যবাহী কারবারি ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে একটি জটিল প্রশাসনিক কাঠামো কাজ করে। ১৯৮৯ সালে একবার জেলা পরিষদ নির্বাচন হলেও এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে দলীয় সমর্থকদের মনোনয়ন দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। নাগরিকেরা তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধি পাচ্ছেন না, ফলে কারও কাছে তাঁরা জবাবদিহিও চাইতে পারছেন না।
আমরা সুপারিশ করেছি, এই কাঠামোতে অন্তত একটি পরীক্ষামূলক নির্বাচন হোক, যেখানে স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা তৈরি ও জাতিসত্তাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট করা যায়। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াও খুব জটিল। একজন ভোটারকে এক দিনে ৩৩ জন সদস্য বেছে নিতে হয়, প্রতিটি পদের জন্য তিনজন বা তার বেশি প্রার্থী থাকলে সেটি একটি অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষিত একজন নাগরিকের পক্ষেও এই সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে, একজন নিরক্ষর গ্রামীণ মানুষ কীভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে?
আমরা তাই একটি সুপারিশ দিয়েছি—প্রতিটি জাতিসত্তার জন্য প্রতিনিধিত্ব সহজ করতে ব্যালট–পদ্ধতি পুনর্বিন্যাস করা দরকার। এটিকে সমাধান বলা যাবে না, তবে সরকারের জন্য এটি একটি গ্রহণযোগ্য ভিত্তি হতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, তিন মাসে এমন একটি ব্যাপক কাঠামোকে গুছিয়ে বিশ্লেষণ করা ও সুপারিশ তৈরি করা সহজ কাজ ছিল না। তার পরও আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি এমন কিছু ধারণা তুলে ধরতে, যা ভবিষ্যতে সত্যিকারের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পথে সহায়ক হবে।
শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
আসলেই কি আমরা বিশ্বাস করি যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা দরকার আছে আমাদের দেশ শাসনে? বা স্থানীয় সরকারে? আমরা দেখেছি, যেকোনো সরকার আজ পর্যন্ত ডিসেন্ট্রালাইজেশনের কোনো কমিটমেন্ট দেখায়নি। এই ডিসেন্ট্রালাইজেশনের সুপারিশ আজকের নয়, অনেক দিনের। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের আইন অনেকবার অনেকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নাগরিক সমাজ সেই পরিবর্তনে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। এই সুপারিশগুলো যদি মানা হতো, আমি মনে করি কিছুটা অংশে যদি এগুলো বাস্তবায়ন হতো, তাহলে জনগণের কিছুটা সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু সেটা কোনো দিন হয়নি।
কেন? কারণ, পেট্রন ক্লায়েন্ট একটা রিলেশনশিপ আমাদের রাজনীতিতে থেকেই গেছে। এটা সেন্ট্রাল লেভেল থেকে স্থানীয় পর্যায়ে আবার স্থানীয় সরকারের মধ্যে যে পেট্রন ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ আছে সেটাও কিন্তু সব সময় কাজ করে, করেই যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকারে নারীর সম্পৃক্ততা অংশগ্রহণ আজকে প্রায় ২০ বছর ২৫ বছর আগে আইন করা হলো। এত দিনের তো নারীর পলিটিক্যাল এম্পাওয়ারমেন্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন হয়নি?
সোশাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি একটা খুবই একটা ভালো উপায় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার জন্য। আমরা যেটা কাজ করেছিলাম, এটা হলো সেবামূলক যে সংগঠনগুলো আছে, সেখানে জনগণের দাবি তুলে দেওয়া এবং যাঁরা সেবাদান করছেন, তাঁদের একটা জবাবদিহির ব্যবস্থা করে দেওয়া। ছোট ছোট জায়গায় আমরা খুব এক্সেলেন্ট কিন্তু এটার রেজাল্ট পেয়েছি। কিন্তু আমাদের সত্যি দুর্ভাগ্য যে এইটা এনে একটা ন্যাশনাল লেভেলে একটা পলিসি করা হলো না।
আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখেই ওপরের থেকে কমিটমেন্ট না থাকায় ভালো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। সরকারি কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভালো কাজ করেন, আবার কেউ কেউ করেন না, সেখানে তাঁর ইনস্টিটিউশন যে তাঁকে তাঁর কাজের জন্য জবাবদিহি করবে, সেই সংস্কৃতিটা একেবারেই অনুপস্থিত। এই ব্যাপারটা নাগরিক সম্পৃক্ততার জন্য একটা বড় ব্যাঘাত তৈরি করে। আমাদের যত ‘গ্রিভিন্স রিড্রেসেল রয়েছে, কোনোটাই কাজ করে না। আমাদের দেশে কোনো ইনস্টিটিউশনের অভাব নেই, কিন্তু সবই অকেজো। আমরা নারী নির্যাতন বন্ধ করার কাজ কয়েক যুগ ধরে করছি। কত রকমের সুপারিশ এসেছে। উত্তরে বলা হয়েছে এক্সিস্টিং ইনস্টিটিউশন কাজ করবে। কিন্তু ওগুলো যে করছে না, সে ক্ষেত্রে কেউ তো সেগুলোকে জবাবদিহি করছে না।
সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন
সমন্বয়কারী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন
বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামোটা আসলে কী রকম? প্রধানমন্ত্রী সব ক্ষমতার কেন্দ্রই শুধু নয়, প্রধানমন্ত্রীই সব ক্ষমতা। আর কারও কাছে কোনো ক্ষমতা আছে বলে আমাদের মনে হয় না। তাঁর ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি তো চানই না স্থানীয় সরকারের কাছে কোনো ক্ষমতা দিতে। সুতরাং এখানে এক্সট্রিমলি ডিসরাপটিভ চিন্তা ছাড়া আমরা আসলে কিছু করতে পারব না। আমাদেরকে ঝুঁকি নিতে হবে।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশে জেলায় জেলায় সরকার হওয়া দরকার। সে ক্ষেত্রে আপনি মানুষের ক্ষমতায়ন করতে পারবেন। কম্পোনেন্ট কী? প্রথম কম্পোনেন্ট হচ্ছে এটার বাজেটারি এলোকেশন। বাজেটারি এলোকেশন যদি ঠিকমতো করি, তাহলে ডিসেন্ট্রালাইজেশন সম্ভব হবে। মানে, জেলা তখন কেন্দ্রের ব্যাপারে আগ্রহী হবে না। সে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। ওখানে যারা রাজনৈতিক শক্তি হবে, তারা কি মনে করে যে প্রধানমন্ত্রী কি চাইল না চাইল তাতে কি, এটাই তো আমার জায়গা।
দ্বিতীয় যে উপাদান হচ্ছে, সেবা প্রদান কীভাবে হবে? আমরা যদি এখন যাই আমাদের স্থানীয় সরকারে, আমরা দেখি যে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি আমাদের ইউএনওকে স্যার বলে। পাওয়ার ডায়নামিকসে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনেক ওপরে। আমরা এই জায়গায় বিশ্বাস করি যে জেলায় জেলায় আলাদা ক্যাডার হতে হবে।
জেলায় জেলায় সরকার হলে আমার কাছে মনে হয় এই দেশের মানুষের যে আসল ইচ্ছা, তার বাড়ির কাছাকাছি থাকা। সেটা সম্ভব হবে। প্রতি ঈদে দেড় কোটি মানুষ বাড়ি চলে যায়। এটা কী অদ্ভুত ব্যাপার! সে তো আর বেড়াতে যায় না। আসলে ওখানেই থাকে, এখানে হচ্ছে তার টেম্পোরারি। সুতরাং জেলায় জেলায় সরকার হওয়ার লজিক সোশিওলজিক্যালি আছে, পলিটিক্যালি আছে, ইকোনোমিক্যালি আছে।
তৃতীয় যে উপাদান, সেটা হচ্ছে যে আমরা এই ডিস্ট্রিবিউশনটা করি কেন? আসলে আমদের প্রশ্নটা হচ্ছে, আমরা রাষ্ট্র করি কেন? আমরা রাষ্ট্র করি কিছু সেবা পাওয়ার জন্য, আর কিচ্ছু না। এখানে আমার জনগণকে নেতৃত্ব দিয়ে একটা দিগন্তের আলোর জায়গায় নিয়ে যাবে, আমরা সে রকম রাষ্ট্র চাই না ভাই। আমরা চাই, আমরা কিছু ট্যাক্স দিই, তুমি শান্তিশৃঙ্খলা রাখো এবং কিছু সেবা দাও। তার মানে হচ্ছে, স্থানীয় সরকারকে পার্টিকুলার সলিড কিছু সেবার জন্য সোললি রেসপনসিবল করতে হবে। বিশেষ করে সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এগুলো আসলে জেলা সরকারের হাতে দিয়ে দেওয়া যায়।
আসিফ মোহাম্মদ শাহান
অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমরা দেখেছি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বেশ কয়েকটি কমিশন গঠিত হয়েছে। প্রধানত ছয়টি কমিশন, পরে আরও বেড়ে ১১ বা ১৩টির মতো কমিশন গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্থানীয় সরকার, যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ সরকারের, রাষ্ট্রের সেটার ওপরে জোর আমরা কিছুটা কম দেখেছি। এখন ঐকমত্য কমিশনে স্থানীয় সরকার কমিশনের যে প্রস্তাবগুলো ছিল, সেগুলো নিয়ে কোনো আলাপ-আলোচনা আমরা দেখছি না। এবং আমরা নিশ্চিত নই যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আসলে কোনো ধরনের পরিবর্তন আমরা পরবর্তী বাস্তবতায় দেখতে পারব কি না। স্থানীয় সরকারে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কোনোভাবেই অর্থবহ হবে না এবং এখন পর্যন্ত, এই বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো গুণগত পরিবর্তন আনার চেষ্টাও আমাদের চোখে পড়েনি। এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন এবং সেই আলোচনাটিও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আমরা যদি কমিশনের রিপোর্টটা দেখি, সেখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে। এবং সেই নির্দেশনাগুলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার, তার বিভিন্ন জায়গাগুলো যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলোকে আইডেনটিফাই করে, সেগুলোকে অ্যাড্রেস করার মেকানিজম সেগুলোকে নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে নাগরিক বা জনসম্পৃক্ততার বিষয়ে কমিশন তেমন কোনো গুরুত্বারোপ করেনি, যা আমাদের এ আলোচনার বিষয়।
যেকোনো রিপোর্ট বা যেকোনো কমিশনকে আমরা একটা ডিফারেন্ট লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি আর তা হলো সেই কমিশনের সুপারিশগুলো জনগণের অংশগ্রহণের কতখানি অপরচুনিটি বা সুযোগ তৈরি করেছে। সেটা নীতিনির্ধারণে হোক, সেটা সার্ভিস ডেলিভারিতে হোক, সেটা যেকোনো জায়গায় হোক। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, আমরা দেখছি যে আমরা যখন পুরো সংস্কারের আলোচনাটা করছি বা আমরা যখন শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক কালচারের পরিবর্তনের কথা বলছি, এই পুরো আলোচনায় খুবই বিস্ময়করভাবে জনগণের সম্পৃক্ততার যে জায়গাটা, সে বিষয়টা নিয়ে কথা হচ্ছে না। আমরা জনগণের জন্য সংবিধানের কথা বলছি, স্থানীয় সরকারের কথা বলছি, কিন্তু এই পুরো ঐকমত্য আনার প্রক্রিয়ায় আমরা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দেখছি না। পুরোটাই একটা এলিট-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে জন্যই হয়তো জনগণের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। তো আমরা সেটার ওপরেই ফোকাস করছি।
নুরুল হুদা সাকিব
অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের গণতন্ত্রব্যবস্থায় নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে বহু আলোচনা হলেও বাস্তবে এ অংশগ্রহণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষত স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততা আশানুরূপ নয়। কমিশনের রিপোর্ট ঘেঁটে দেখা যায়, অংশগ্রহণের মেকানিজম স্পষ্টভাবে দুর্বল। অংশগ্রহণের জন্য আইনি ভিত্তি অনুপস্থিত বা দুর্বলভাবে উপস্থিত। আইনের সংস্কারের কথা বললেও যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে, তা ভেদ করা কঠিন।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্লায়েন্ট রাজনীতির সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত। এ সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া না গেলে কেবল আইন বা পদ্ধতি সংস্কার করে লাভ হবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটি পরিবারের সদস্যরাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকেন। ফলে রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রিক চরিত্রে পরিবর্তন আসে না, কেবল মুখগুলো বদলায়। এভাবে একটি শ্রেণি সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্রেই রয়ে যায়, নাগরিক সমাজের বা সাধারণ জনগণের প্রবেশের সুযোগ সীমিতই থেকে যায়।
সিস্টেম পরিবর্তন এ সমস্যার সমাধান নয়। মূল সমস্যা সামাজিক ও রাজনৈতিক মাইন্ডসেটে। নাগরিকেরা সচেতন না হলে, তাঁরা কী ধরনের প্রতিনিধি চান—সে বিষয়ে যদি স্পষ্ট ধারণা না থাকে, তাহলে যে পদ্ধতিই আসুক না কেন, তা সফল হবে না।
পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিকদের মানসিক গঠন, আইন মানার প্রবণতা, অংশগ্রহণমূলক মনোভাব ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। এটা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যার ফল তৎক্ষণাৎ পাওয়া যাবে না, কিন্তু ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভিত্তি এ শিক্ষার ওপরই নির্ভরশীল।
ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক তথ্য, দক্ষতা ও চাহিদা সংরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে স্থানীয় যুবক-যুবতীরা ডিজিটাল ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পাবেন। এতে তাঁরা কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারবেন, স্বাবলম্বী হবেন এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অধিকতর সচেতন হয়ে উঠবেন। তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ যত বাড়বে, ততই তাঁরা সমাজে সক্রিয় হবেন, দায়িত্বশীল হবেন।
কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ একত্র হয়ে অর্গানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে, যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে। এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত জনসম্পৃক্ততাকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমপাওয়ার করা দরকার। শাসন যদি এ অর্গানিক উদ্যোগগুলোকে সমর্থন দেয়, তাহলে তৃণমূলের নেতৃত্ব, দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় এই মডেল ফলপ্রসূ হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে জনগণের ভেতর থেকে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো আবারও এ জায়গাগুলোতে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। তবু জনগণের ভেতরে যে সচেতনতা ও অংশগ্রহণের ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে, সেটিকে কাজে লাগাতে হবে।
সুপারিশ
১. সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
২. নির্বাচনী গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রত্যক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রবর্তন করতে হবে। নাগরিকদের প্রতিনিধির (representavive of citizens) ওপর নির্ভর না করে বরং নাগরিক প্রতিনিধিরা (citizen representatives) স্থানীয় সরকারে শুধু জবাবদিহি আদায় করবেন না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও জড়িত থাকবেন।
৩. প্রচলিত ওয়ার্ড সভা এবং উন্মুক্ত বাজেটের মতো ফোরামগুলোকে নিয়মিত এবং কার্যকর করতে হবে।
৪. ওয়ার্ড সভা এবং উন্মুক্ত বাজেট সভায় বর্তমানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অংশগ্রহণ পদ্ধতির পাশাপাশি সামষ্টিক পদ্ধতিতে অংশগ্রহণের প্রচলন করতে হবে।
৫. স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রবর্তনের আইনগত ভিত্তি দরকার। জনগণের সুপারিশ, মতামত বা বক্তব্যকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করে জনপ্রতিনিধিদের অনুসরণে বাধ্য করা যাবে, সে জন্য প্রয়োজনীয় আইনের সংস্কার দরকার।
৬. স্থানীয় সরকারের ওয়ার্ড সভা এবং উন্মুক্ত বাজেট সভার মতো ফোরামগুলোর যোগাযোগ এবং জবাবদিহি থাকবে স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশনের কাছে।