‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ১১ জানুয়ারি ২০২৬ চট্টগ্রাম
‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ১১ জানুয়ারি ২০২৬ চট্টগ্রাম

গোলটেবিল বৈঠক

চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য চাই নগর সরকার

আবুল খায়ের গ্রুপ, টি কে গ্রুপ ও জিপিএইচ ইস্পাতের সহযোগিতায় এবং প্রথম আলোর আয়োজনে ‘চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১১ জানুয়ারি ২০২৬ চট্টগ্রামের একটি হোটেলে।

আলোচনা

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

ঢাকা রাজধানী হওয়ায় সবকিছু ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে চলে গেছে। ঢাকায় না যাওয়ার জন্য কী কী করতে হবে, সে তালিকা করা গেলে দ্রুত সমাধান আসবে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোতে প্রায় সব কাজ অনলাইনে হয়। কিন্তু এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সশরীর যেতে হয়।

সবাই  ক্ষমতার কাছে থাকতে চান। যাঁরা চট্টগ্রামেও বড় বড় ব্যবসায়ী, তাঁরা চট্টগ্রামে থেকে তাঁদের ব্যবসা প্রসার বা সম্প্রসারণ করতে চান, তার জন্য ঢাকায় থাকাটা প্রয়োজন। কারণ, সিদ্ধান্তগুলো সব ঢাকায় হয়। যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, অর্থনীতির ক্ষমতা আস্তে আস্তে ওই জায়গায় চলে যায়।

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে কার্যকর করতে হলে আমাদের ক্ষেত্রবিশেষে ডিরেগুলেট (অতিনিয়ন্ত্রণমুক্ত) করতে হবে। ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করলে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। এতে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কমবে, দেশের মানুষ বেশি ক্ষমতায় থাকবে। অর্থাৎ সরকারের ক্ষমতা কমিয়ে দেশের মানুষের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অনেক জায়গায় বন্দর করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের সম্পদ ও অর্থ নষ্ট হয়েছে। আর কিছু হয়নি। চট্টগ্রামকে হাব করা হলে ভারতের উত্তর-পূর্ব ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশে নগর সরকার খুব প্রয়োজন। মেয়রের অধীনে পুরো অবকাঠামো থেকে শুরু করে যতগুলো সংস্থা আছে, তাতে মেয়র সমন্বয় করবেন। এটার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক সিটি করতে হলে এখানে বহুস্তরের যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; রেলপথ, নদীপথ ও সড়কপথের সমন্বয়ে।

শাহাদাত হোসেন

মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন

যতক্ষণ রাষ্ট্র চট্টগ্রামকে ধারণ করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে না। কাল যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে। এ জন্য সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

২০০৩ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন। সেখানে কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী যে সরকারগুলো এসেছে, তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়নি।

আমি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সামনে স্পষ্ট করে বলেছি, নগর সরকার ছাড়া কোনো শহরকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা যায় না। ভৌগোলিক গুরুত্ব ও মূল্যের কারণেই পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা ব্যবসা করার জন্য চট্টগ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন। আমার মনে হয়, আমরা যেন সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য।

২০১৭ সালে খাল সংস্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) হাতে দেওয়া হয়, যা ছিল নৈতিকতাবিরোধী সিদ্ধান্ত। ৬ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর চাপানো হয়েছে। এখন ৩৫টি খাল রক্ষণাবেক্ষণ করতে হচ্ছে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া।

কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও সীতাকুণ্ড—এই অঞ্চলগুলো মিলিয়ে চট্টগ্রাম একটি পর্যটন হাব হতে পারে। কিন্তু অবকাঠামো ও পরিকল্পনার অভাবে আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় বা আট লেনে উন্নীত করা ছাড়া বিকল্প নেই।

আমিরুল হক

চেয়ারম্যান, সীকম গ্রুপ; সভাপতি, সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছে—এটা কাগজে-কলমে আছে। যাঁরা এই ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভালো। আগের সময়েও স্টক এক্সচেঞ্জ, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মতো ধারণা এসেছে, কিছু কাজও হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এসব এখনো আন্ডার ইউটিলাইজড। আমি পরিষ্কারভাবে বলি, জোর করে কোনো ব্যাংক, বিমা কোম্পানি বা এয়ারলাইনসকে এখানে আনা যাবে না, সাবসিডি দিয়েও না। আমাদের পথটা অন্যভাবে ভাবতে হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো কানেকটিভিটি। ঢাকা–চট্টগ্রাম যাতায়াত আড়াই ঘণ্টায় নামিয়ে আনা কি অসম্ভব? ২৬০ কিলোমিটারের বদলে যদি আমরা ২১০ কিলোমিটারের একটি ডেডিকেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতে পারি, তাহলে তা সম্ভব। রেলকেও বাইপাস দিয়ে ডাবল লাইন বা করিডর করতে হবে, যাতে ট্রেনে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় যাওয়া যায়। তখন কেউ ঢাকায় থেকে যেতে চাইবে না। কাজ সেরে মানুষ ফিরে আসবে চট্টগ্রামে। বিশ্বে এর বহু উদাহরণ আছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নদীপথ। যতক্ষণ আমরা নদীবন্দর ও নৌপথ পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারব, ততক্ষণ পরিবেশ বাঁচবে না, খরচও কমবে না। ট্রাক দিয়ে কখনোই কার্যকর লজিস্টিকস হয় না। নদীপথে খরচ দশ ভাগের এক ভাগ, দূষণও অনেক কম। ৩ হাজার টনের জাহাজ যেখানে চলে, সেখানে ৫ হাজার টনও সম্ভব। সোনাদিয়া থেকে সরাসরি ঢাকায় জাহাজ চলতে পারলে চট্টগ্রামের ওপর অযথা চাপ পড়বে না।

আরেকটি দুঃখের কথা না বললেই নয়—শিপিং, বিনিয়োগ, বন্দর সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলো একে একে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এসবের বাস্তব কাজ চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। বাণিজ্যিক রাজধানী শুধু নাম দিয়ে হয় না; ভাইব্রেন্ট কানেকটিভিটি, সঠিক নীতি আর বিকেন্দ্রীকরণ লাগবে।

মোহাম্মদ আলমাস শিমুল

অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জিপিএইচ ইস্পাত

বাণিজ্যিক রাজধানী যদি চট্টগ্রামে হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও অবশ্যই চট্টগ্রামে হওয়া উচিত। চট্টগ্রামের উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয় আমাদের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন। সমন্বয় করা গেলে চট্টগ্রামকে সাজানোর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রামের গুরুত্ব বাড়াতে পারলে সব দিক থেকে আমরা লাভবান হব। এ জন্য কানেকটিভিটি বাড়াতে হবে। একসময় চট্টগ্রাম টু চিয়াংমাই টু ব্যাংককের যে ফ্লাইটটি ছিল, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম– সিঙ্গাপুরে যে ফ্লাইট ছিল, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে।

এসব ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি যে আমাদের বায়ার আছেন কিংবা আমরা যাঁদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করি, চট্টগ্রামে এসে তাঁরা এক দিনে ফিরে যেতে পারবেন। আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেখুন, আগামী দুই-চার-পাঁচ বছরের মধ্যে কলাপস হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দ্রুত করণীয় হলো নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো। চট্টগ্রাম থেকে উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে আমাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নির্ভর করতে হয়। সড়কে এক ট্রাকে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করা যায় না। অথচ সীতাকুণ্ডে আমরা যদি একটা অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর চালু করি, চট্টগ্রাম থেকে ভোলার দূরত্ব হবে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম থেকে বরিশালের দূরত্ব দাঁড়াবে মাত্র ৮২ কিলোমিটার। একটি জাহাজে করে ন্যূনতম ১ হাজার ৫০০ টন থেকে ৩ হাজার টন পর্যন্ত আমরা পাঠাতে পারি। সড়কে ৩০০ ট্রাকের পণ্য ছোট এক জাহাজে পাঠানো সম্ভব হবে। খরচও চার ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে।

আরেকটা কথা বলি, চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী কেন ব্যর্থ হয়েছেন, তা তদন্ত করা দরকার। তাঁদের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, সরকারের নীতিগত কোনো ভুল ছিল কি না বা অপব্যবহার করেছে কি না, তা যদি যথাযথভাবে তদন্ত করা যায় তাহলে আসল তথ্য উদ্ঘাটন করা যাবে। যারা পরিস্থিতির কারণে রুগ্ণ অবস্থায় আছে, তাদের ফিরে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার

গ্রুপ পরিচালক, টি কে গ্রুপ

চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী না হওয়ার পেছনে দুটো কারণ আছে। প্রথমত, আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বাজার ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে ঢাকাকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলেছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রশাসনিক সুবিধার কারণে প্রায় সব সরকারি দপ্তর ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। রিজিওনাল কানেকটিভিটির কথা বিবেচনায় সময় এসেছে চট্টগ্রামকে আবার ফোকাসে আনার। আজ ঢাকা তিন কোটির বেশি মানুষের শহর। সময়ের প্রয়োজনে ঢাকার ওপর চাপ কমানো এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি বাধ্যবাধকতা। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোর দিকে যদি আমরা তাকাই, দেখব এই লবণাক্ত ও নিম্নাঞ্চলগুলোতে তেমন কৃষিকাজ হয় না। কিন্তু এগুলো শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মিরসরাই ইকোনমিক জোনের কথা বলতে পারি, এটি একটি বড় সাফল্যের গল্প। যেখানে আগে কেবল কাদা আর জোয়ার-ভাটার পানি ছিল, আজ সেখানে শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

মহেশখালী থেকে নোয়াখালী, চাঁদপুর হয়ে ভোলা পর্যন্ত একটি ‘কোস্টাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর’ গড়ে তোলা সম্ভব। এর কয়েকটি বড় সুবিধা আছে, এতে আমরা ধানি ও উর্বর কৃষিজমি দখল করছি না; বরং কম ব্যবহার হওয়া জমিকে কাজে লাগাতে পারছি। আজ আমরা সমুদ্রের ভাসমান টার্মিনাল থেকে ঢাকায় গ্যাস আনতে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার নতুন পাইপলাইনের পরিকল্পনা করছি। কিন্তু যদি শিল্প কোস্টাল লাইনের কাছাকাছি থাকে, তাহলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি লাইনের খরচ অনেক কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে শহরের ভেতরের সড়কজট, বাসযোগ্য জমির ওপর চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও কমবে।

শেখ শাবাব আহমেদ

হেড অব করপোরেট অ্যান্ড লিগ্যাল, আবুল খায়ের গ্রুপ

আমরা শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামকে ভাবতে পারি না। চট্টগ্রামের একটি গ্লোবাল ন্যারেটিভ আছে। এটি একটি রিজিওনাল হাব হতে পারে। চীন, ভারত, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল সবাইকে যুক্ত করে চট্টগ্রামকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের রেল যোগাযোগব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার হয়নি। ৬ থেকে ১০ লেনের রাস্তা তৈরি তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যাত্রী চলাচল ও কনটেইনার পরিবহনে ট্রেন ব্যবহার করলে সময় ও খরচ দুটোই কমানো সম্ভব।

ঢাকা এরই মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষ বসবাস করছে। এ ছাড়া এটি বসবাসযোগ্য তালিকায় ১৭১তম। কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা চট্টগ্রামকে দেখি, তাহলে এখনো আমাদের এখানে সাজানোর, উন্নয়নের অনেক সুযোগ আছে। চট্টগ্রাম প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশবান্ধব একটি শহর। এটি আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও স্বীকার করছে, আমরা আমাদের কারখানাগুলোকে পরিবেশবান্ধব করার জন্য কাজ করেছি। সরকার যখন নগর-পরিকল্পনা করছে, তখন আমাদের সুযোগ রয়েছে চট্টগ্রামকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিকভাবে গড়ে তোলার। বিকেন্দ্রীকরণ দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। কিন্তু স্বল্প মেয়াদে আমরা কী করতে পারি? আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে ভাবা দরকার। ঢাকাকেন্দ্রিক সেবা যে আমাদের জন্য সময়সাপেক্ষ, তার সমাধান হিসেবে একটি ওয়ান–স্টপ সলিউশন সেন্টার চট্টগ্রামে তৈরি করা যেতে পারে। এটা বিভিন্ন বিভাগভিত্তিক হতে পারে। যেখানে ব্যবসায়ী, নাগরিক বা শিক্ষার্থী বারবার ঢাকামুখী না হয়ে সমস্যার সমাধান পাবেন।

আমাদের শহরের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বাড়ানো দরকার; কারণ, বর্তমানে অনেক মেধাবী ছাত্র ঢাকামুখী হচ্ছে। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে ১০-১৫ বছর সময় লাগতে পারে, কিন্তু বিদ্যমানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।

জেরিনা হোসেন

সাধারণ সম্পাদক, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম

চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক একটা কেন্দ্র ছিল বহু যুগ আগে থেকে। তাহলে এই প্রসারটা আমরা কেন করতে পারছি না কিংবা কোথায় আমরা থেমে গেছি? এখন এটাকে আমরা একটা প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক সংজ্ঞা দিয়ে এটাকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলছি।

বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে একটা নগর করতে হবে। একটা নগর বানাতে হলে কত শ্রমিক লাগবে, কত পেশাজীবী লাগবে, তা জানতে হবে। এখন তাঁরা এখানে থাকতে চাইবেন কি না, যদি নগর ভালো মানের বাসযোগ্য না হয় এবং এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড না থাকে, এই সব জিনিস মিলে যদি একটা নগর না বানাতে পারেন, তাহলে তো হবে না।

আমাদের এখানে মহাপরিকল্পনা হয় কয়েক বছর পরপর। এই যে বাণিজ্যিক রাজধানীর কথা বলছেন, এটার কথা তো ১৯৯৫–এর মহাপরিকল্পনায় একদম স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের ইকোনমিক ও ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারগুলো উন্নত করা দরকার।

সবাই ব্যস্ত মেগা প্রকল্প নিয়ে। কিন্তু প্রকল্পগুলো নিয়ে কি কোনো গণশুনানি হয়েছে? প্রকল্প হওয়ার আগে তা জনগণের সামনে আনতে হবে। কিন্তু আনা হয়নি।

এখানে নদীপথ আছে, রেলপথ আছে। কিন্তু তা পরিপূর্ণ

ব্যবহার হচ্ছে না। সেদিকেও কেউ যাচ্ছেন না। নগরের ভেতরে বিক্ষিপ্তভাবে পাহাড় কেটে, দখল করে, বন্যা প্রবাহ এলাকাতে উন্নয়ন করা হচ্ছে, এটা উন্নয়ন নয়। এটা অপূর্ণ। এটার জন্য বন্যায় পরিবেশগত সমস্যায় ভুগছি।

মো. রাশিদুল হাসান

ডিন, স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদ, চুয়েট  

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫৯২টি নগরকেন্দ্র থাকলেও দেশের মোট নগর জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ মাত্র চারটি নগরে কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে ঢাকায় বসবাস করেন প্রায় ৩৮–৪০ শতাংশ মানুষ, আর চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ১২ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে ঢাকার পরেই চট্টগ্রামের অবস্থান। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা নিয়ে আমাদের পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা রয়েছে। আদমশুমারিতে যেখানে জনসংখ্যা ৩৪ লাখ বলা হচ্ছে, সেখানে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন নথিতে ৭০–৮০ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ দেখা যায়।

প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক দিক থেকেও চট্টগ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি—সবই এখানে আছে। পূর্বমুখী নীতির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে রেল যোগাযোগের সম্ভাবনা আরও বড় সুযোগ তৈরি করছে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণ হলেও দেশের সঙ্গে সংযোগ আরও শক্ত হবে।

বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তুলতে জায়গার অভাব নেই। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় প্রায় ১১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা, কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল—সবই প্রস্তুত।

এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা—সবার দায়িত্ব বাণিজ্যবান্ধব নাগরিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা।

সেলিম রহমান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কেডিএস গ্রুপ ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বিজিএমইএ

আমরা সব সময় আমাদের একটা কথাই বলে এসেছি—চট্টগ্রামে ক্রেতারা আসে না। কেন আসে না? বলা হতো, ভালো হোটেল নেই। কিন্তু এখন তো ভালো হোটেল আছে। এই হোটেলে আমরা বসে আছি। তাহলে সমস্যা কোথায়? আমরা আমদানিনির্ভর দেশ। আমার দেশের রাজস্ব আসে মূলত বন্দর দিয়ে, এটাই সরকারের বড় আয়ের জায়গা। কিন্তু আমাদের স্থানীয় ব্যবসার ক্ষেত্রে, আমার শহরকে ঘিরে একটা ‘নেগেটিভ কনোটেশন’ তৈরি হয়েছে। এটা খুব কষ্ট দেয়।

আমরা সব সময় বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীকরণও দরকার। বিশেষ করে শিপিংয়ের মতো খাত। দ্বিতীয় বড় বিষয় হলো, ‘এয়ারপোর্ট কানেকটিভিটি।’ আপনি যদি কানেকটিভিটিগুলো বাড়ান, তাহলে আমরা আবার এগোতে পারব।

আমি যেটা খেয়াল করেছি, আমাদের এসএমইগুলো সবচেয়ে বেশি ভূগছে। তারা পিছিয়ে পড়ছে। আপনি যখন অর্থনৈতিক অঞ্চল করেন, তখন বড় গ্রুপগুলো যাবে। কিন্তু ছোট কারখানাগুলো সেখানে যেতে পারে না। আমরা এমন অর্থনৈতিক অঞ্চল চাই, যেখানে ছোট ছোট কারখানাগুলো থাকবে। আমাদের দরকার ছিল ছোট কারখানাগুলোর জন্য জায়গা, যেখানে বিদ্যুৎ–জ্বালানি থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থাকবে। তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ

 আমরা যদি ২০২৬ সালের বর্তমান অবস্থান থেকে ভাবি এবং ২০ বছরের দৃষ্টিকোণ থেকে চট্টগ্রামকে কোথায় দেখতে চাই, সেটি আমাদের পরিকল্পনাকে নির্ধারণ করবে। আগামী ২০ বছরের ভিশন ঠিক করা জরুরি, কারণ এর ভিত্তিতে আমাদের পরিকল্পনা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড—সবকিছু একসঙ্গে সমন্বয় করবে। 

ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রামের বিকল্প নেই। যখন চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব করা হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবেও কাজ করবে। কারণ, পণ্য রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানি করতে হবে এবং রূপান্তর যতটা সম্ভব বন্দরের কাছে করতে হবে।

লজিস্টিক হাবের আশপাশে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব তৈরি করতে হবে। চট্টগ্রামে যদি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব করা হয়, তখন এনার্জি ও ইউটিলিটি রিকোয়ারমেন্টের মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ আছে। সমস্যা হচ্ছে, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির কানেকশন ঠিকমতো নেই। বিশেষ করে ইকোনমিক জোনে, পানিভিত্তিক শিল্প পরিচালনা করা কঠিন।

ম্যানুফ্যাকচারিং হাব সফল করতে হলে স্ট্যান্ডার্ড এডুকেশনাল প্রতিষ্ঠান তৈরি করা জরুরি। আমাদের দরকার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং, যা মানসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করবে।

জাফর আলম

বন্দর বোর্ডের সাবেক সদস্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কেন চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হবে, এই প্রশ্নে বারবার বন্দরের কথাই সামনে চলে আসে। বন্দর কেমন ছিল, বন্দর কেমন আছে, এই আলোচনাই ফিরে ফিরে আসে।

এই বন্দরের ইতিহাস দুই থেকে আড়াই হাজার বছরের। এখান থেকেই বুদ্ধগুপ্ত মালয় গিয়েছিলেন। এরপর পর্তুগিজরা এসেছে, ইউরোপিয়ানরা এসেছে, ডাচ এসেছে, ইংরেজ এসেছে। অনেক যুদ্ধ হয়েছে। শেষে আমরা এটি জিতে নিয়েছি, আমাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই বন্দরের মূল বিষয় হচ্ছে কানেকটিভিটি। ঢাকা বলেন, চট্টগ্রাম বলেন, সবকিছু সিরিঞ্জের সুচের মতো এক জায়গায় এসে জ্যাম হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অবশ্যই দরকার। এগুলো হবেই। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘ফ্রেইট করিডর।’

চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করেই বাণিজ্যিক রাজধানীর চিন্তা ঘোরাফেরা করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বন্দর ভুল জায়গায় আছে। আপনি যদি মন্ত্রণালয়ে যান, দেখবেন বন্দর রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বন্দরের কাজ মূলত ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। এটি যদি পরিকল্পনা এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে না আসে, তাহলে সমন্বয় হবে না। আমরা কাস্টমসের সঙ্গে কাজ করি। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে বসার জন্য কোনো ক্লিয়ার অফিশিয়াল অর্ডার নেই। ফোন করে বলা হয়, একটু বসি।

চট্টগ্রাম বন্দর যদি ঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে উঠবে না। এখন যে অবস্থায় আছে, আমরা বলতে পারি, বন্দরটা আসলে একটা পোস্ট অফিসের মতো কাজ করছে। এখান থেকে শুধু পাঠিয়ে দিচ্ছে।

তুনাজ্জিনা সুলতানা

অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রাম কবে বাণিজ্যিক রাজধানী হবে, এটা খুব সংক্ষিপ্ত করে বললে বলতে হয়, যেদিন নীতিনির্ধারকেরা, প্রশাসনে যাঁরা আছেন, সরকারে যাঁরা আছেন বা থাকবেন, যেদিন তাঁরা চাইবেন, সেদিনই হবে। তার আগে হবে না।

এখন প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো আমরা কীভাবে সমাধান করব? সমাধান করতে হলে যাদের স্টেক আছে, সবাইকে অবশ্যই এক জায়গায় বসে সমাধান বের করতে হবে। কিন্তু যদি সল্যুশন শুধু আগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়, তাহলে সঠিক সল্যুশন আসবে না। আমাদের একেবারে ডিপ লেভেলে গিয়ে রিসার্চ করতে হবে। সেই রিসার্চ থেকে যে ডেটা ও ইনফরমেশন আসবে, তার ভিত্তিতেই আমরা ব্রাইট সল্যুশনের দিকে যেতে পারব।

আমরা বারবার ডিসেন্ট্রালাইজেশনের দিকেই যাচ্ছি, মনে হচ্ছে এটাই একমাত্র সমস্যা। অথচ আমি চট্টগ্রামে বসে যেসব সমস্যা সমাধান করতে পারি, সেদিকেও আমরা তেমনভাবে যাচ্ছি না। এই জায়গাটাতেও আমাদের নজর দেওয়ার প্রয়োজন আছে। এই জায়গাটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার বলছি, আমি যেহেতু মার্কেটিংয়ের অধ্যাপক, আমি বলব, চট্টগ্রামকে আমাদের ব্র্যান্ডিং করতে হবে।

আমার মনে হয়, যে জায়গাগুলো আমরা দ্রুত করতে পারি, সেগুলো আগে ফোকাস করা উচিত। আর যেগুলোর জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।

অনুপম দাশ গুপ্ত

অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা সবাই বলছি ঢাকামুখী চাপ কমাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো একটি ব্যাংকঋণের সিদ্ধান্তের জন্য আমাকে ঢাকায় যেতে হয়। কাগজপত্র আমি এখানে জমা দিই, সিদ্ধান্ত আসে ঢাকা থেকে। তাহলে কেন এখানে ওয়ান–স্টপ সার্ভিস হবে না? অনলাইনের যুগে প্রয়োজনীয় মিটিং অনলাইনে হতে পারে, সিদ্ধান্ত এখান থেকেই পাওয়া গেলে ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি বন্ধ হবে। এটাই প্রকৃত ডিসেন্ট্রালাইজেশন।

অর্থনীতি বড় করতে হলে শুধু অভ্যন্তরীণ লেনদেন যথেষ্ট নয়। আমাদের অর্থনীতি এখনো ইমপোর্ট ডমিনেটেড। এক্সপোর্ট বাড়াতে হলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব পণ্য দেশে তৈরি করা সম্ভব বা বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সেগুলো রপ্তানির দিকে মনোযোগ না দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে না।

শুধু সড়কের ওপর নির্ভর করে বাণিজ্যিক রাজধানী হয় না। সফল নগরগুলো এয়ার, ওয়াটার, রেল ও রোড—সবকিছুই সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো সেবা পাওয়া এবং শহরকে বাসযোগ্য করা। ব্যবসায়ীরা যদি প্রয়োজনীয় সুবিধা ঠিক সময়ে পান, তাহলে তাঁরা বাণিজ্যের সুফল দেবেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে, গবেষণামুখী হতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ স্থানীয়ভাবেই তৈরি হয়। এই সমন্বয় হলেই চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক রাজধানী হওয়ার পথ সুগম হবে।

মতিউর রহমান

সম্পাদক, প্রথম আলো

গত বছরের নভেম্বরে আমি চট্টগ্রামে এসেছিলাম। প্রথম আলোর উদ্যোগে তখন একটি বড় মুক্ত আলোচনা হয়েছিল। সেখানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জোরালোভাবে প্রশ্ন তুলেছিলেন—চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ কী, দ্বিতীয় বা বাণিজ্যিক রাজধানীর বিষয়টি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ব্যবসায়ীরা তখনও চট্টগ্রামকে দ্বিতীয় রাজধানী করার উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আজকের আয়োজন, যা মূলত ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবির প্রতিফলন।

১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। পরে ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়টি অনুমোদন পায়। কিন্তু এরপর দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন খুব একটা এগোয়নি। এই সময়ের মধ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হয়েছে—বন্দর আধুনিকায়ন, নিউমুরিং টার্মিনাল, কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন। একই সঙ্গে আমরা দেখেছি, বহু বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানির সদর দপ্তর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরে গেছে। কারখানা চট্টগ্রামে থাকলেও সিদ্ধান্তকেন্দ্র ঢাকায় চলে গেছে।

আজকের আলোচনায় যাঁরা আছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি, আগামী দিনগুলোতে গণমাধ্যম ও দেশ—দুটোই ভালো থাকবে। আপনারা সবাই এসেছেন—এ জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সুপারিশ:

  • ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা, ক্ষেত্রবিশেষে অতিনিয়ন্ত্রণমুক্ত করা।

  • চট্টগ্রাম বন্দর ও উপকূলকে কেন্দ্র করে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা।

  • চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে রিজিয়নাল হাব তৈরি করা।

  • নগর সরকার চালু করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

  • উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

  • মহেশখালী থেকে নোয়াখালী, চাঁদপুর হয়ে ভোলা পর্যন্ত একটি ‘কোস্টাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর’ গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেওয়া।

অংশগ্রহণকারী:

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

শাহাদাত হোসেন, মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

আমিরুল হক, চেয়ারম্যান, সীকম গ্রুপ; সভাপতি, সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি।

মোহাম্মদ আলমাস শিমুল, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জিপিএইচ গ্রুপ।

মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার, গ্রুপ পরিচালক, টি কে গ্রুপ।

শেখ শাবাব আহমেদ, হেড অব করপোরেট অ্যান্ড লিগ্যাল, আবুল খায়ের গ্রুপ।

জেরিনা হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম।

মো. রাশিদুল হাসান, ডিন, স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদ, চুয়েট।

সেলিম রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কেডিএস গ্রুপ ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বিজিএমইএ।

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ।

জাফর আলম, বন্দর বোর্ডের সাবেক সদস্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তুনাজ্জিনা সুলতানা, অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুপম দাশ গুপ্ত, অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মতিউর রহমান, সম্পাদক, প্রথম আলো। সঞ্চালনা: বিশ্বজিৎ চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো