‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড: নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা।  ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে
‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড: নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা।  ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড: নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়

আকিজবশির কেব্‌লসের সহযোগিতায় ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড: নিরাপদ ভবন নির্মাণে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

আলোচনা

 মো. ছালেহ উদ্দিন

উপপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

নিরাপদ ভবন নির্মাণকে আমি সব সময় একটি টিমওয়ার্কের সঙ্গে তুলনা করি। ভবনের নিরাপত্তা কোনো একক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল নয়। কেবল উন্নতমানের কেব্‌ল, সুইচ বা সার্কিট ব্যবহার করলেই হবে না; যিনি এগুলো স্থাপন করবেন, তাঁর দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলেই বিপদ সেখান দিয়েই আসে।

ভবন নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাঁরা যুক্ত—স্থপতি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, কারিগর ও ভবনমালিক; সবারই দায়িত্ব আইন ও বিধিমালা মেনে কাজ করা। বিএনবিসিসহ প্রচলিত নীতিমালা মানলে ভবন নিরাপদ রাখা সম্ভব। ভবন তৈরির সময় আমার মাথায় রাখতে হবে, এটি যেন ভবিষ্যতে আমার সন্তানদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়।

ভূমিকম্প হলে তার দ্বিতীয় প্রভাব হিসেবে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। অথচ আমাদের দেশে ভূমিকম্প ছাড়াই ভবন ধসে পড়ার নজির আছে—রানা প্লাজা বা তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স ভবনের মতো। তাই ভবনের নিরাপত্তা বলতে আমি সামগ্রিক নিরাপত্তাকেই বুঝি—কাঠামোগত শক্তি, অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সব একসঙ্গে। বৈদ্যুতিক গোলযোগকে শুধু ‘শর্টসার্কিট’ বলে দায় সারা যাবে না। আর্থিং, গ্রাউন্ডিংসহ নানা কারিগরি বিষয়ের সমন্বয়েই ঝুঁকি তৈরি হয়।

নিরাপদ ভবনের জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যান অত্যন্ত জরুরি। সাবস্টেশন কোথায় হবে, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার ও সুইচগিয়ারের মধ্যে কীভাবে সেপারেশন থাকবে—সবকিছু পরিকল্পনায় নির্ধারিত থাকতে হবে। এসব প্যাসিভ ফায়ার সেফটি–ব্যবস্থার মাধ্যমে আগুন প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ভেন্টিলেশন ও স্বয়ংক্রিয় সাপ্রেশন সিস্টেম থাকতে হবে, যাতে আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে; কিন্তু আগুন নেভানোর চেয়ে আগুন না লাগানোই সবচেয়ে বড় সাফল্য। সে জন্যই আমি মনে করি, ভবন নিরাপত্তায় প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ রাষ্ট্রীয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতেই হবে।

মো. নাজমুস সাকিব জামালী

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বৈদ্যুতিক), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে আমাদের বড় দুর্বলতা হচ্ছে সচেতনতার অভাব। এমনকি ভবনের লোড ও নিরাপত্তা বিবেচনা না করে অনেক সময় আন্ডার সাইজের কেব্‌ল ব্যবহার করা হচ্ছে। শর্টসার্কিট হলে সৃষ্ট কারেন্ট নিরাপদে গ্রাউন্ডে পৌঁছানোর জন্য ন্যূনতম কোন সাইজের কেব্‌ল দরকার, এসব বিষয়ে আলোচনা ও বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারে নকল কেব্‌ল, সার্কিট ব্রেকার ও নিম্নমানের মাল্টিপ্লাগ।

একটি শিশু বহুতল ভবনে লিফটে আটকে গেলে কী করবে, সে প্রশিক্ষণও জরুরি। অনেক ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রয়েছে, যা ব্যবহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ছাড়া ভবনে স্ট্যান্ড পাইপ সিস্টেম বা ফায়ার হাইড্রেন্ট সিস্টেম আছে, যা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না, এমনকি বাসিন্দারাও জানেন না এসব ব্যবস্থা ভবনে রয়েছে। আমরা ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে টাইলস, ফিটিংস বা ফিনিশিং নিয়ে ভাবি, কিন্তু ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম সচল আছে কি না, সেটির জন্য ভবনে আলাদা বিনিয়োগ করার মানসিকতা এখনো সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বাসাবাড়ির ভেতরেও ঝুঁকি ছড়িয়ে আছে; জেনারেটর, আইপিএস, ব্যাটারি, গিজার, এসি, ফ্রিজ—সবকিছুরই নিয়মিত মেইনটেন্যান্স দরকার। যতটুকু সম্ভব এক্সটেনশন কর্ড বা মাল্টিপ্লাগের ব্যবহার পরিহার করা উচিত। এসব ক্ষেত্রে অবহেলা থেকেই বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

ভবনের নকশা প্রণয়নেও সমস্যা আছে। বিএনবিসি অনুযায়ী সাবস্টেশন বা জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে গেলে অনেক সময় তা ভবন ব্যবহারকারীদের চাপে সঠিকভাবে রাখা হয় না। ফলে সিঁড়ির নিচে মিটার রুম বা পাম্প মোটর বসানো হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের কেয়ারটেকার, গার্ড, গৃহকর্মী যাঁরা অফিস চলাকালে বাসায় অবস্থান করেন, তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি প্রশিক্ষণ দরকার। শুধু নকশা নয়, যথাযথ প্রকৌশলীর মাধ্যমে তদারকি, ইলেকট্রিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ ও ভবনমালিকদের সচেতনতা—সবকিছু মিলিয়েই বৈদ্যুতিকভাবে নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।

সাবিনা ইয়াসমিন

পরিচালক, প্রশিক্ষণ বিভাগ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

অনিরাপদ ভবনের ভেতরেই নিরাপত্তা খুঁজে ফিরছি আমরা। জীবন ও জীবিকা—দুটিই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ, আর এই দুইয়ের সঙ্গেই আগুন ও বিদ্যুৎ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। সকালবেলা এক কাপ চা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান—সবখানেই আমরা আগুন ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আমাদের জীবন সহজ করেছে, আবার একই সঙ্গে অনেক ঝুঁকিও তৈরি করেছে—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। শহরে বস্তি ও পুরোনো ভবনের পাশে নতুন আধুনিক ভবন—সবখানেই পরিকল্পনা ছাড়া নির্মাণ চলছে, অথচ প্রকৌশলীদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। আমরা নিরাপত্তা চাই, কিন্তু সস্তার দিকে ছুটি—এই দ্বৈত মানসিকতা আমাদের বড় সমস্যা।

নিরাপদ ভবনের জন্য প্রয়োজন যথাযথ নকশা, যোগ্য স্থপতি ও প্রকৌশলী, মানসম্মত তার ও সরঞ্জাম এবং কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে আমরা সৌন্দর্য, ইন্টেরিয়র ও আধুনিকায়নের পেছনে ছুটি; নিরাপত্তাকে পেছনে ফেলে দিই। ৫০ বছরের পুরোনো ভবন নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী ছাড়া, শুধু মিস্ত্রি দিয়ে—এটাই বাস্তবতা।

সচেতনতা শুরু হতে হবে একদম গোড়া থেকে। স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করাতে গিয়ে আমরা আধুনিকতা দেখি, কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। একেবারে তো আমাদের সব সমাধান হয়ে যাবে না। আমাদের জরুরি সাড়াদান ও অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।

অল্প সরঞ্জাম ব্যবহার করেও কীভাবে ধোঁয়ার মধ্যে টিকে থাকা যায়, কীভাবে আক্রান্তকে উদ্ধার করা যায়—সবাইকে এসব শেখানো এখন জরুরি। জীবন বাঁচাতে হলে জীবন সুরক্ষার ন্যূনতম প্রস্তুতি আমাদের সবারই থাকা উচিত।

মো. জহুরুল ইসলাম

অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

ফায়ার বা ফায়ার সেফটি সিস্টেমের দুটি মূল কম্পোনেন্ট থাকে—প্রিভেনশন ও প্রটেকশন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড বৈদ্যুতিক সূত্রে ঘটে। সুতরাং একমাত্র উৎস নিয়ন্ত্রণ করলেই সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ইলেকট্রিক্যাল ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে তিনটি স্তম্ভ অপরিহার্য—ডিজাইন, ইনস্টলেশন ও ইন্সপেকশন বা রক্ষণাবেক্ষণ। প্রথমত, ভবনের বৈদ্যুতিক নকশা অবশ্যই দক্ষ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে করতে হবে, যেখানে বিএনবিসি এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। দ্বিতীয়ত, ইনস্টলেশন হবে তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ও যোগ্য টেকনোলজিস্ট বা টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে, অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত পণ্য ব্যবহার করে, যেমন কেব্‌ল, সার্কিট ব্রেকার, প্যানেল বোর্ড, ফিটিংস বা ফিক্সচার ও আর্ক ফল্ট সার্কিট ইন্টারাপ্টার। বাজারে নকল বা নিম্ন মানের পণ্য থাকায় এই দিক বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তৃতীয়ত, ইনস্টলেশনের পর নিয়মিত দখল–পূর্ব পরিদর্শন, ইন্সপেকশন ও পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স বাধ্যতামূলক, বিশেষ করে উচ্চ ভবন, বাণিজ্যিক ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ অকুপেন্সির ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টর ইতিমধ্যেই ফায়ার সেফটি উন্নয়নে উদাহরণ স্থাপন করেছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ, নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ও বাইরের আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে কাজ করা হয়েছে। অন্যান্য উচ্চ ও মিশ্র ব্যবহারভিত্তিক ভবনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।

একটি সমন্বিত ইলেকট্রিক্যাল ফায়ার সেফটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে দক্ষ নকশা, তালিকাভুক্ত পণ্য, সঠিক ইনস্টলেশন, নিয়মিত পরিদর্শন ও শক্তিশালী এনফোর্সমেন্ট একত্রে কাজ করবে। এ ছাড়া টেস্টিং ফ্যাসিলিটি ও রেগুলেটরি বডির মাধ্যমে নিয়মিত ইন্সপেকশন নিশ্চিত করা হবে। এই ইকোসিস্টেমের বাস্তবায়নই বিদ্যুৎজনিত অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।

আবু সাঈদ আহমদ

সভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট

নকশা শুধু ইটপাথরের বিষয় নয়, এটি ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল এবং প্লাম্বিং—সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। নিরাপদ ভবন নির্মাণে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো প্রপার ডিজাইনার, উপযুক্ত মেটেরিয়াল ও দক্ষ লোক। কিন্তু পুরো বাংলাদেশে এই তিনটিতেই ঘাটতি। বিএনবিসি নিয়ম বললেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পাওয়া কঠিন; স্থপতির সংখ্যা সীমিত। ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাও দেশজুড়ে যথাযথ দক্ষতা তৈরি করছে না। ফলে ডিজাইন, ইনস্টলেশন ও তদারকিতে সমস্যা থেকে যায়।

এদিকে, ভবনের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল অংশে ব্যয় সিভিল স্ট্রাকচারের সমান হলেও তৃতীয় অংশ—ইন্টেরিয়র, যেখানে ইলেকট্রিক্যাল লাইন চলে—নিয়ন্ত্রণহীন থাকে। ফলস সিলিং, অপ্রয়োজনীয় লাইটিং ও সঠিক নিয়ম না থাকা কেবল শর্টসার্কিটকে উসকে দেয়। তাই প্রতিটি ফিনিশিং ম্যাটেরিয়ালের ওপর নজর দেওয়া, প্রপার ডিজাইনার নিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ নকশায় নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

নিরাপদ ব্যবস্থায় প্রিভেনশন ও প্রটেকশন দু–ই থাকতে হবে। মেইন সুইচের অবস্থান, ফায়ার স্টেয়ার ও পরিকল্পনায় ইলেকট্রিক্যাল ব্যবস্থার নির্দেশনা থাকা জরুরি। বাজারে অনুমোদিত পণ্য, তালিকাভুক্ত সার্কিট ব্রেকার ও আর্ক ফল্ট সার্কিট ইন্টারাপ্টার ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ ভবন ও বাণিজ্যিক ভবনে বিশেষ নজর দিতে হবে।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে দেশি প্রফেশনাল তৈরি করা, মিড-লেভেল ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা এবং ইনস্টলেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিত তদারকি চালানো হলে বৈদ্যুতিক কারণে অগ্নিকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সচেতনতা, সঠিক নকশা ও কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণই নিরাপদ ভবন নির্মাণের মূল চাবিকাঠি।

আকতার মাহমুদ

অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শহরে অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় কারণ হলো বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। নগর-পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ নগরী তৈরিতে প্রস্তুতির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। জনবহুল শহরগুলোয় ঘনবসতি, গায়ে গায়ে লাগানো ভবন এবং নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ভবন ও মার্কেটগুলোয় ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। কারণ, নির্মাণ ও ব্যবহারপ্রক্রিয়া প্রায়ই অনুমোদিত পরিকল্পনার বিপরীতে হয়। করিডরে মালামাল রাখা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, অনুমোদিত আবাসিক জায়গায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম, এমনকি কেমিক্যালের সংরক্ষণ—এসবই ঝুঁকি বাড়ায়।

ঝুঁকি হ্রাসের জন্য করণীয় হলো, প্রথমে উন্নতমানের তার ব্যবহার নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে মানসম্মত সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করা, যা ভবনের লোড সামাল দিতে সক্ষম। প্রতিরক্ষামূলক ডিভাইস এবং সার্কিট প্রটেকশন নিশ্চিত করা। ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। কারণ, শেষমেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাঁরা।

সচেতনতা তৈরি করতে ফায়ার সার্ভিস এবং এক্সপার্টদের প্রচারণা ও প্রশিক্ষণ চালানো প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তদারকির ক্ষেত্রে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা পর্যাপ্ত জনবল এবং স্বাধীন তদারকি সেল তৈরি করলে নিয়মিত মনিটরিং সম্ভব হবে।

নিরাপদ ভবন ও ঝুঁকিমুক্ত নগর নির্মাণের জন্য প্রয়োজন প্রপার ডিজাইন, মানসম্মত উপকরণ, ব্যবহারকারীর সচেতনতা, কার্যকর আইনের প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে এই ব্যবস্থা অপরিহার্য, যা শহরের মানুষের জীবন, সম্পদ ও সামাজিক পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

দিলারা জাহিদ

সহযোগী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভলনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গত ১০ বছরে ফায়ার সার্ভিসের রেকর্ড অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যার আর্থিক ক্ষতি কয়েক শ কোটি টাকা এবং প্রাণহানিও দেড় হাজারের বেশি। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে ঘটেছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। এটি স্পষ্ট করে যে নিরাপদ ভবন নির্মাণে বৈদ্যুতিক ঝুঁকি হ্রাস কতটা জরুরি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রথম ধাপ হলো মিটিগেশন বা ঝুঁকি হ্রাস। এ জন্য স্ট্রাকচারাল ও ননস্ট্রাকচারাল উপাদান—কেব্‌ল, সার্কিট, কম্বাস্টেবল বস্তু, সার্কিট ব্রেকার—সঠিকভাবে ডিজাইন ও ইনস্টল করতে হবে। বিএনবিসি, ফায়ার আইন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নীতি অনুসরণ করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দ্বিতীয় ধাপ হলো প্রস্তুতি বা প্রিপেয়ার্ডনেস। ভবনের ধরন, ব্যবহার, বসবাসকারীর সংখ্যা ও কার্যক্রম অনুযায়ী ইভাকুয়েশন রুট, জরুরি নির্গমন এবং মক ড্রিল প্রয়োজন। ফায়ার ডিটেক্টর, এক্সটিংগুইশার ও অন্যান্য নিরাপত্তাযন্ত্রের ব্যবহার এবং ব্যবহারকারীর সচেতনতা অপরিহার্য।

রেসপন্স পর্যায়ে অগ্নিদুর্ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, ফায়ার সার্ভিস বা পুলিশ স্টেশনে সংযোগ রাখা এবং অ্যালার্ম ও অ্যালার্ট সিস্টেম কার্যকর করা জরুরি। পুনর্গঠন বা রিকভারি পর্যায়ে আর্থিক ক্ষতি হ্রাস করতে ইনস্যুরেন্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য নিরাপদ উপকরণ, মানসম্মত নির্মাণ, সচেতন ব্যবহার, নিয়মিত তদারকি, প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা, দ্রুত রেসপন্স ও আর্থিক সুরক্ষা—এসবের সমন্বয় অপরিহার্য।

শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান

সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স

গত কয়েক মাসে দেশে সচিবালয়, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, গুলশান-বনানীর ভবন, গার্মেন্টস, রাসায়নিক গুদাম, মার্কেট ও রেস্তোরাঁয় আগুন লেগেছে। পত্রপত্রিকা অনুযায়ী বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটকে প্রায় সব ঘটনায় দায়ভার হিসেবে ধরা হয়। ঢাকার ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনের মধ্যে অনুমোদনহীন ৮২ শতাংশ, বাকিগুলোতেও নকশা ভঙ্গ করেছে। অর্থাৎ নগরের ৯০–৯২ শতাংশ ভবন নিরাপদ নয়। এ অবস্থায় দায় একমাত্র পরিকল্পনাবিদের নয়; রাষ্ট্রযন্ত্র, পেশাজীবী ও ব্যবহারকারীরও দায় আছে।

নিরাপদ নগর ও ভবন নির্মাণে প্রথম পদক্ষেপ হলো মিটিগেশন। স্থাপত্য, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল নকশা, অগ্নিনিরোধী উপকরণ, সার্কিট ব্রেকার ও কম্বাস্টেবল বস্তু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর প্রস্তুতি বা প্রিপেয়ার্ডনেসের পর্যায়ে ভবনের ব্যবহার, বসবাসকারী ও যানবাহনের চাপ অনুযায়ী ইভাকুয়েশন রুট, ফায়ার ডিটেক্টর, এক্সটিংগুইশার ও সচেতনতা প্রয়োজন।

রেসপন্সে দ্রুত ব্যবস্থা, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ, অ্যালার্ম সিস্টেম কার্যকর করতে হবে। পুনর্গঠন বা রিকভারি পর্যায়ে আর্থিক ক্ষতি হ্রাসে ইনস্যুরেন্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভবন নির্মাণ চক্রে পরিকল্পনা প্রণয়ন, ভূমির ব্যবহার, নকশা, অনুমোদন, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি ধাপে নিয়মিত নিরীক্ষা অপরিহার্য। গলদ থাকলে তা সংশোধন করে আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

মিনারুল ইসলাম

সহযোগী অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা যদি ধরেও নিই যে আমাদের ডিজাইন, ব্যবহৃত উপকরণ, সার্কিট—সবকিছুই পারফেক্ট। তবুও কি রেসিডেনসিয়াল বা কমার্শিয়াল ভবনগুলো সুরক্ষিত? এখানে মূল সমস্যা হলো মনিটরিং ও ব্যবহারকারীর সচেতনতা। একটি বিল্ডিং পারফেক্ট ডিজাইন হলেও ১০ বছর পর ব্যবহারের ধরন বদলে যায়। বাড়ির মালিক অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন, যা মূল সার্কিটের ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফিউজবার আউট হলে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি নিজে যুক্ত করতে গেলে শর্টসার্কিটের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এই ঝুঁকি কমাতে করণীয় হলো প্রথমে উপযুক্ত ও মানসম্মত তার ও সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করা, যা লোড সামাল দিতে সক্ষম। প্রতিরক্ষামূলক ডিভাইস স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহারকারীর সচেতনতা জরুরি, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে তাঁরা ঝুঁকি বুঝবেন। ফায়ার সার্ভিস ও এক্সপার্টদের মাধ্যমে অ্যাওয়ারনেস বৃদ্ধি করতে হবে।

নিয়মিত শর্টসার্কিটের কারণে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তাই শুধু ডিজাইন বা উপকরণ যথেষ্ট নয়, সচেতন ব্যবহার, কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি—এসবের সমন্বয় জরুরি। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে এ ব্যবস্থাগুলো মেনে চললে নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।

সাঈদা আক্তার

প্রধান স্থপতি, মাত্রিক এবং সম্পাদক, সেমিনার ও কনভেনশন, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট

অগ্নিকাণ্ড এবং নিরাপদ ভবন নির্মাণ আমাদের সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। গত ১০ থেকে ১৫ বছরে আমরা বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভবন, মার্কেট, রেস্তোরাঁ এবং আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেখেছি। স্থপতি হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে, যেকোনো আগুন প্রতিরোধের শুরু করতে হবে পরিকল্পনা, ডিজাইন এবং ব্যবহার পর্যায় থেকে।

ভবন ডিজাইনের সময় আর্কিটেক্ট, স্ট্রাকচারাল ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ডিজাইন অবশ্যই ভবনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী হতে হবে, যাতে বৈদ্যুতিক লোড, ফ্লেমেবল মেটেরিয়াল, ইন্টেরিয়র ফিটিং এবং ব্যবহারকারীর আচরণ সবই বিবেচনায় নেওয়া হয়। ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিং, ইনসুলেশন, সার্টিফাইড যন্ত্রপাতি, ফায়ার রেজিস্ট্যান্ট উপকরণ এবং ফায়ার স্টেয়ার নিয়মিত তদারকি অপরিহার্য। বাড়ির মালিক বা ব্যবহারকারী সচেতন না হলে, সেফ ডিজাইনও কার্যকর হয় না। নিরাপদ ভবনে আগুন লাগলে দ্রুত রেসপন্স, ইভাক্যুয়েশন ও ফায়ার সেফটি ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন রক্ষা করা যায়। সচেতনতা, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং ব্যবহারকারীর প্রশিক্ষণ প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ।

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট প্রতিরোধের পাশাপাশি, নিরাপদ ভবনের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ডিজাইন, ইন্টিগ্রেটেড ইঞ্জিনিয়ারিং, তদারকি, ব্যবহারকারীর সচেতনতা এবং সঠিক সার্টিফিকেশন।

আল এমরান হোসাইন

চেয়ারপারসন, আশরাই (বাংলাদেশ চ্যাপ্টার)

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও নিরাপদ ভবন নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একজন সার্টিফায়েড ফায়ার ইনভেস্টিগেটর হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে, দেশের অনেক বড় অগ্নিকাণ্ডে দেখা গেছে কেব্‌ল ও অন্যান্য উপকরণ মানসম্মত নয়। আমাদের টেস্ট অনুযায়ী প্রায় ৬৫–৮০ শতাংশ কেব্‌ল বিএস স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে যথাযথ ইনসুলেশন ক্যাপাসিটি রাখে না। নন-সার্টিফায়েড বা নন-এক্সপার্ট দ্বারা ডিজাইন ও ইনস্টলেশনের ফলে ভবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।

শর্টসার্কিটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে কেব্‌ল, সার্কিট ব্রেকার, আর্থিং বা গ্রাউন্ডিং ফ্লোটিং উল্লেখযোগ্য। তবে বাস্তবে সমস্যা হয় ব্যবহারের সময় আর্থ ফ্লোটিং, অতিরিক্ত লোড, অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কন্ট্রোলহীন ইনস্টলেশনের কারণে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা সিটিতে ওয়াটার লেভেল কমার ফলে প্রায় সব ভবনে আর্থিং প্রভাবিত হয়, যা শর্টসার্কিটের ঝুঁকি বাড়ায়। নিরাপদ ভবনের জন্য প্রয়োজন স্ট্যান্ডার্ড–বেজড ডিজাইন, সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান দ্বারা ইনস্টলেশন এবং নিয়মিত পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স। উদাহরণস্বরূপ, বিএনবিসি অনুযায়ী থার্মোগ্রাফিক চেক প্রতি চার থেকে ছয় মাস অন্তর করা উচিত। এয়ার কন্ডিশনার বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক কেব্‌ল ও সিস্টেম লোড ভেটিং অপরিহার্য।

রাজউক বা অন্য কর্তৃপক্ষ শুধু আর্কিটেকচারাল ও স্ট্রাকচারাল প্ল্যান অনুমোদন দিয়ে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল বা মেপ সিস্টেম ভেটিং করছে না। ফলে ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী প্রোডাক্ট সরবরাহ হয়, কিন্তু পর্যাপ্ত মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণ নেই। নিরাপদ ভবন নিশ্চিত করতে স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ, সার্টিফায়েড ইনস্টলেশন এবং নিয়মিত তদারকি ছাড়া কার্যকর সমাধান অসম্ভব।

পারভেজ মাহমুদ

তড়িৎ প্রকৌশলী; পরিচালক, আইসিইএল প্রাইভেট লিমিটেড

নিরাপদ ভবন নির্মাণে বৈদ্যুতিক ফায়ারের ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নকশা, নির্মাণ ও নিয়মিত তদারকি। বৈদ্যুতিক আগুন সাধারণত হাই লোড এলাকা, যেমন ফ্যাক্টরি, হাইরাইজড কমার্শিয়াল ভবন, সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং, এলিভেটর বা হ্যাজার্ডাস এনভায়রনমেন্টে বেশি ঘটে। এখানে কেব্‌ল, সুইচগিয়ার, সার্কিট ব্রেকার এবং সকেট-প্লাগের সঠিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আগুনের জন্য প্রয়োজন হিট সোর্স, ফুয়েল ও অক্সিজেন। ইলেকট্রিক্যাল লোড অনুযায়ী সঠিক কেব্‌ল সিলেকশন অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, ৫ অ্যাম্পিয়ারের জন্য ছোট কেব্‌ল, ২০ অ্যাম্পিয়ারের জন্য বড় কেব্‌ল ব্যবহার করতে হবে। আন্ডারসাইজড কেব্‌ল ওভারহিট হয়ে ইনসুলেশন//// গলে স্পার্ক তৈরি করে। হ্যাজার্ডাস পরিবেশে ফ্লেম রিটার্ডেন্ট কেব্‌ল এবং প্রটেকশন কনভেই ব্যবহার অপরিহার্য।

কাউন্টারফিট কেব্‌ল বড় সমস্যা। মানসম্মত কেব্‌ল নিলেও বাজারে প্রায়ই নিম্নমানের বা ভুয়া কেব্‌ল পাওয়া যায়, যা শর্টসার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। তাই কেব্‌ল সিলেকশন, ইনস্টলার ও ডিজাইনার সবার সচেতনতা জরুরি।

ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী নকশা ও নির্মাণ হওয়া উচিত। পাশাপাশি, পিরিয়ডিক ইনস্পেকশন এবং ব্যবহারের সময় লোড অনুযায়ী নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক। নিরাপদ ভবনের জন্য শুধু ডিজাইন যথেষ্ট নয়; সঠিক উপকরণ, মানসম্মত ইনস্টলেশন, সচেতন ব্যবহার ও নিয়মিত তদারকি সমানভাবে জরুরি।

মো. জোবায়েদ আলী

প্রধান কনসালট্যান্ট, ডিওয়াইএন১১ ইঞ্জিরিয়ারিং

ইলেকট্রিক্যাল ডিজাইনে আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ারের সমন্বিত কাজ অপরিহার্য। আর্কিটেক্ট ডিজাইন প্রণয়ন করেন, তবে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের লাইসেন্স, দক্ষতা ও যথাযথ সুপারভিশন না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। গ্র্যাজুয়েট হওয়া মানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজাইন দক্ষতা নয়; প্রকল্পে যে ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করা হচ্ছে, তার অবশ্যই যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স থাকতে হবে।

ইনস্টলেশনের সময় সঠিক কেব্‌ল সিলেকশন, ব্রেকার ও সুইচগিয়ারের ব্যবহার অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ কিচেন বা রেস্টুরেন্টের লোড অনুযায়ী মেইন ব্রেকার নির্ধারণ না করলে ওভারলোড ও হিটিং থেকে আগুনের ঝুঁকি থাকে। হ্যাজার্ডাস এনভায়রনমেন্টে ফ্লেম রিটার্ডেন্ট কেব্‌ল ও প্রটেকশন কনভেই ব্যবহার জরুরি। নকল বা কাউন্টারফিট কেব্‌ল ও উপকরণ ব্যবহারে অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। দেশে ইলেকট্রিক্যাল টেকনিশিয়ানদের সংখ্যা সীমিত, সঠিক লাইসেন্স এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ অনেক সময় নেই। রাজউকের রেজিস্ট্রেশন থাকলেও অনেক প্রকল্পে লাইসেন্সবিহীন বা দক্ষতাহীন ব্যক্তি ডিজাইন ও ইনস্টলেশন পরিচালনা করেন। এ কারণে পর্যায়ক্রমিক তদারকি এবং জনসচেতনতা অপরিহার্য।

বৈদ্যুতিক ফায়ার প্রতিরোধে স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ডিজাইন, সার্টিফাইড ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান, সঠিক কেব্‌ল ও ব্রেকার ব্যবহার এবং নিয়মিত সুপারভিশন অপরিহার্য। হ্যাজার্ডাস পরিবেশ, নকল উপকরণ ও লোডের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই নিরাপদ ভবনের মূল শর্ত।

মোহাম্মদ ওমর ফারুক

হেড অব বিজনেস, কেব্‌ল অপারেশনস, আকিজবশির এনার্জি লিমিটেড

বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সঠিক ডিজাইন, মানসম্মত কেব্‌ল এবং পর্যাপ্ত সুপারভিশন অপরিহার্য। বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ বাসাবাড়িতে কোনো ইলেকট্রিক্যাল ডিজাইন নেই, বাড়িওয়ালারা অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করালেও প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ার তদারকি কম হয়। তাই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ে।

৩৯ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড বৈদ্যুতিক কারণে ঘটে। নিম্নমানের কেব্‌ল, নকল সার্কিট ব্রেকার, নিম্নমানের সুইস-সকেট, মাল্টিপ্লাগ এবং পর্যাপ্ত তদারকিহীন প্রকল্প অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণ। সার্কিট ব্রেকার ঠিকভাবে কাজ না করলে অতিরিক্ত লোডের কারণে কেব্‌ল গরম হয়ে আগুন ধরে। কারখানায় বৈদ্যুতিক লোডের অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি স্থাপন, সঠিক লেইং, নিম্নমানের কেব্‌ল ব্যবহার কারখানায় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

আকিজবশির কেব্‌ল সম্প্রতি বাজারে নিয়ে এসেছে বেশ কিছু উন্নতমানের কেব্‌লস, যা দশমিক ৬ কেভি থেকে ৩৩ কেভি পর্যন্ত  সহনশীল। কেব্‌লগুলো তিন স্তরবিশিষ্ট যা ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ সহনশীল ও অধিক নিরাপদ। আকিজবশির কেব্‌ল তৈরিতে মানা হয় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় স্ট্যান্ডার্ড। আমাদের রয়েছে নিজস্ব আধুনিক পরীক্ষাগার, যার দ্বারা সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ হয়। আকিজবশির কেব্‌ল তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ৯৯.৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ কপার/অ্যালুমিনিয়াম এবং উন্নত মানের পিভিসি/এক্সএলপিই ইনসুলেশন। আকিজবশির বাংলাদেশে আধুনিক গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করে বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে উদ্যোগ নিচ্ছে।

সুপারিশ

  • অনুমোদিত, পরীক্ষিত ও উচ্চতাপ সহনশীল কেব্‌ল ব্যবহার নিশ্চিত করা।

  • ভবনের বৈদ্যুতিক নকশা দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা, বিএনবিসি ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করতে হবে।

  • তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ও সার্টিফাইড টেকনিশিয়ান দ্বারা কেব্‌ল, ব্রেকার ও সরঞ্জাম সঠিকভাবে স্থাপন করতে হবে।

  • রাজউক, বিএনবিসি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা দ্বারা স্ট্যান্ডার্ড এবং নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

  • দেশি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করে কেব্‌ল ও সরঞ্জামের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মান নিশ্চিত করতে হবে।

  • কেব্‌ল, সার্কিট, ডিভাইসের নিয়মিত পরিদর্শন ও মেইনটেন্যান্স নিশ্চিতে জোর দিতে হবে।

অংশগ্রহণকারী:

মো. ছালেহ উদ্দিন, উপপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স; মো. নাজমুস সাকিব জামালী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বৈদ্যুতিক), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক); সাবিনা ইয়াসমিন, পরিচালক, প্রশিক্ষণ বিভাগ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি; মো. জহুরুল ইসলাম, অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট; আবু সাঈদ আহমদ, সভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট; আকতার মাহমুদ, অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; দিলারা জাহিদ, সহযোগী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স; মিনারুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাঈদা আক্তার, প্রধান স্থপতি, মাত্রিক এবং সম্পাদক, সেমিনার ও কনভেনশন, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট; আল এমরান হোসাইন, চেয়ারপারসন, আশরাই বাংলাদেশ চ্যাপটার; পারভেজ মাহমুদ, তড়িৎ প্রকৌশলী ও পরিচালক, আইসিইএল প্রাইভেট লিমিটেড; মো. জোবায়েদ আলী, প্রধান কনসালট্যান্ট, ডিওয়াইএন১১ ইঞ্জিরিয়ারিং; মোহাম্মদ ওমর ফারুক, হেড অব বিজনেস, কেব্‌ল অপারেশনস, আকিজবশির এনার্জি লিমিটেড। সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।