
বাতব্যাধির নানা প্রকারভেদ আছে। একজন কোন ধরনের বাতব্যাধিতে আক্রান্ত, তা নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ব্যথা কমাতে ইচ্ছেমতো ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া যাবে না। বাতব্যাধির একটি অবস্থা হচ্ছে লুপাস, যেটিতে গিরায় গিরায় প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও শুরুতে চিকিৎসাব্যবস্থা নিলে বাতব্যাধির জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বাতব্যাধির আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে দেশেই।
গতকাল রোববার ‘বাতব্যাধি ও লুপাস: চাই বিশ্বমানের চিকিৎসা’ শিরোনামে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।
ইন্টারন্যাশনাল লিগ অব অ্যাসোসিয়েশনস ফর রিউম্যাটোলজির (আইএলএআর) সহযোগিতায় যৌথভাবে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) রিউম্যাটোলজি বিভাগ ও প্রথম আলো। বক্তারা আরও বলেন, ইউরিক অ্যাসিড বেশি হওয়া মানেই গাউট নয়, গিরায় গিরায় ব্যথা মানেই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি নয়। তাই রোগ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। কী কারণে বাতব্যাধি ও লুপাসের মতো অসুস্থতা হয়, তা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।
বৈঠকে জানানো হয়, রোগ ব৵বস্থাপনায় সহায়তার লক্ষ্যে পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে (পঞ্চম এইচপিএনএসপি) এই প্রথমবারের মতো অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মধ্যে মাংসপেশি, হাড় ও গিরায় ব্যথাজনিত অসুস্থতা মাসকুলোস্কেলেটাল (এমএসকে) অবস্থা ও এ–সম্পর্কিত অন্য রোগগুলোকে (বাতব্যাধি) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিএসএমএমইউর উপাচার্য মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, রোগীদের স্বল্প মূল্যে ওষুধ কেনার ব্যবস্থা করা, ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাতব্যথাজনিত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া এবং স্বাস্থ্যের নির্দিষ্ট খাতে বাজেটের অব্যয়িত অর্থ ফেরত না দিয়ে তা অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত।
লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, দেশে মাত্র ৭৩ জন বাতব্যাধিবিশেষজ্ঞ আছেন, বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক। সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পর্যায়ক্রমে সব জেলা হাসপাতালে বাতব্যাধি চিকিৎসক ও নার্সের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ কর্মসূচির (এনসিডিসি) লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের রোগটির সরকারি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বাতব্যাধিকে পঞ্চম এইচপিএনএসপিতে যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে এনসিডিসি। প্রচলিত রিউম্যাটিক ফিভারের চিকিৎসার জন্য নির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে। এটা অনুসরণ করলে রোগের পেছনে ব্যক্তির খরচ কমে যাবে।
৩০ বছর বয়সী বাতব্যাধি আক্রান্ত এক ব্যক্তির উদাহরণ টেনে বৈঠকে এশিয়া প্যাসিফিক লিগ অব অ্যাসোসিয়েশনস ফর রিউম্যাটোলজির (আপলার) মহাসচিব অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ওই ব্যক্তি প্রচণ্ড ব্যথার সঙ্গে বসবাস করছিলেন। পরে তাঁর ডায়াবেটিস হয়। কারণ, রিউম্যাটোলজি অন্য রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়িয়ে দেয়। ব্যথায় কাজে অক্ষম হয়ে পড়ায় ওই ব্যক্তির চাকরিও চলে যায়। তিনি বলেন, রিউম্যাটোলজিতে মানুষ মরে যায় না, তবে জীবনের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিএসএমএমইউর রিউম্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট অধ্যাপক মিনহাজ রহিম চৌধুরী বলেন, বাতব্যাধির ৬৯৩ রকম অবস্থা আছে। কিন্তু অনেকে ব্যথা হলে গুরুত্ব দেন না, ধরে নেন একটু ব্যয়াম করলে ঠিক হয়ে যাবে। বাতব্যাধি নির্মূলযোগ্য না হলেও শুরুতে উন্নত চিকিৎসায় জটিলতাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বাতব্যাধি ও লুপাস নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এখন প্রযুক্তিগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক মানুষকেও সহজে সচেতন করা যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসরীন সুলতানা বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মোট খরচের প্রায় ৬৯ শতাংশ খরচ হচ্ছে ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে। বাতব্যাধির চিকিৎসা করতে গিয়ে কী পরিমাণ অর্থ মানুষের পকেট থেকে খরচ হচ্ছে, তা নিরূপণ করা দরকার। এ ব্যাধির চিকিৎসায় সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটির উপমহাসচিব অধ্যাপক আবু শাহিন বলেন, সঠিক সময়ে রোগনির্ণয় হলে ও সঠিক চিকিৎসা হলে বাতব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করা সম্ভব। বাতব্যথা হলে ক্যালসিয়াম কমে গেছে মনে করে অনেকে বছরজুড়ে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খান। এটা উল্টো ক্ষতির কারণ হয়।
অতিরিক্ত ওজনের স্কুলব্যাগ বহন, প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া ও শারীরিক কর্মকাণ্ড কম থাকায় অনেক শিশুর ঘাড়ে ব্যথা হয় বলে জানান বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটির নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক শাহানা আক্তার রহমান। তিনি বলেন, শিশুদের জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস (জেআইএ) হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুল রোগনির্ণয় হয়। অভিভাবকেরা ভাবেন রিউম্যাটিক ফিভার। অনেক শিশুর স্নায়বিক ব্যথার কারণে বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথা দেখা দেয় (গ্রোয়িং পেইন), সেটাকেও অনেক অভিভাবক রিউম্যাটিক ফিভার ভাবেন।
বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রওশন আরা স্বপ্না বলেন, অনেকে রোগনির্ণয় না করে ব্যথার ওষুধ কিনে খান। এটা খুব ক্ষতিকর। বাতরোগের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে দক্ষ জনবল নিয়োগ করলে এবং চিকিৎসাপদ্ধতির একটি নির্দেশনা তৈরি করলে এ রোগের চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে।
বৈঠকে একজন লুপাস রোগী সৈয়দা মারিয়া আফেন্দি বলেন, রোগ ব্যবস্থাপনা করতে মাসে তাঁর ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়। নিজেকে ‘যোদ্ধা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের রোগীদের জন্য পরিবারের সহায়তা থাকা খুব জরুরি।
লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ফারহানা ফেরদৌস বলেন, নারীদের বেশি লুপাস হয়। এ রোগে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অনেকে তা অব্যাহত রাখতে পারেন না।
গোলটেবিল বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, সাধারণ অনেক মানুষ জানেন না যে বাতব্যাধি ও লুপাস বড় ধরনের রোগ।
বৈঠকটির সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।