সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা: চ্যালেঞ্জ নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯ আগস্ট ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা); ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়; জাহেদা ফিজ্জা কবীর, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সাজেদা ফাউন্ডেশন; হালিদা হানুম আখতার, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার, পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট; ডা. শাফকাত ওয়াহিদ, পরিচালক, পাবনা মানসিক হাসপাতাল; রুমানা আহমেদ, হেড অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স, সিটি ব্যাংক এনএ ফাউন্ডেশন; ডা. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; হাসিনা মমতাজ, ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (মেন্টাল হেলথ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ; ডা. জহিরুল ইসলাম, সিনিয়র স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি; মনিরা রহমান, নির্বাহী পরিচালক, ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশন; রূপা আক্তার, সেবাগ্রহণকারী, প্রশান্তি; ডা. মো. নিজামউদ্দিন, মহাসচিব, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ সাইকিয়াট্রিস্টস্; মোহা.কামরুজ্জামান, পরিচালক, প্রতিষ্ঠান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়; তামান্না ফেরদৌস, প্রোগ্রাম ডিরেক্টের, সাজেদা ফাউন্ডেশন; রুবিনা জাহান, টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট, সাজেদা ফাউন্ডেশন। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা)
মানসিক স্বাস্থ্যকে জীবনচক্র ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা দৃষ্টিতে দেখতে হবে। গর্ভকাল থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সমস্যাগুলো শুরুতেই শনাক্ত ও প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বদলে যাওয়া পারিবারিক ও সামাজিক চর্চাও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শুধু হাসপাতালভিত্তিক সেবা দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ছে। শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ২০২২ সালের কৌশলপত্রে কমিউনিটিভিত্তিক সেবার কথা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কারের কারণে সমস্যা শুরুতেই সামনে আসে না। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নিয়মিত স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধমূলক সেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের ১৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এ উদ্যোগ সফল করতে সরকার একা যথেষ্ট নয়। এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যমসহ সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাজেট ও সম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ
সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের বড় সমস্যা সচেতনতার ঘাটতি এবং এটিকে কম অগ্রাধিকার দেওয়া। দীর্ঘদিন মন খারাপ, সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারানোর মতো লক্ষণও আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না। ফলে চিকিৎসার সুযোগ কম থাকে আর প্রয়োজনের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কম।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা না দিলেও প্রতিবন্ধিতা ও সামাজিক সুরক্ষায় কাজ করছে। মানসিক স্বাস্থ্যেও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো দরকার। সরকার নীতি ও আইনি সহায়তা দেবে আর বেসরকারি খাত, এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীরা কাজ এগিয়ে নেবে।
সরকারি অবকাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের প্রযুক্তি, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ যুক্ত করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো সম্ভব। বিদ্যমান সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক সেবার অংশ করতে হবে। প্রাথমিক সেবায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জরুরি সহায়তা যুক্ত করা দরকার। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা মানসিক স্বাস্থ্যের বড় বাধা। অটিজম, ডাউন সিনড্রোম ও আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে তরুণদের যুক্ত করে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়ানো যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ বাধা দূর করা সম্ভব।
জাহেদা ফিজ্জা কবীর
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সাজেদা ফাউন্ডেশন
মানসিক স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু মনোরোগ চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী বাড়িয়ে এ ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়। কমিউনিটি পর্যায় থেকে বিভিন্ন স্তরে সহায়ক পেশাজীবী তৈরি করতে হবে। এ নিয়ে আমরা কিছু উদ্যোগ শুরু করেছি। সরকারের সমান্তরালে নয়; বরং সরকারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে। আমাদের উদ্যোগগুলোতেও ধাপে ধাপে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পেশাদারত্বের সঙ্গে সফল হতে হলে ধাপে ধাপে সেবাগ্রহীতাকে কতটা সময় সেবা দেওয়া হচ্ছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্যারা কাউন্সিলর হিসেবে পেশাদার দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে এলাকাভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর জন্য।
মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণীত হলেও এর বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি মনোবিজ্ঞানীদের পেশাগত মান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পর নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রয়োজন। এতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত হবে এবং এ পেশায় পেশাদারত্ব বাড়বে।
সামাজিক কল্যাণের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সারা দেশের অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি জটিলতা দূর করা জরুরি।
কোনো উদ্যোগ টেকসই করতে গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক কাজ জরুরি। অভিজ্ঞতা ও গবেষণার ফলাফল সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে পরবর্তী উদ্যোগ শূন্য থেকে শুরু না করে। সরকারি অবকাঠামো, বেসরকারি সক্ষমতা ও নতুন প্রজন্মের পেশাজীবীদের সমন্বয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় আরও এগোনো সম্ভব। প্রশান্তির মতো আবাসিক মডেলের অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।
হালিদা হানুম আখতার
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ
মানসিক স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অথচ মানসিক রোগ, অর্থাৎ মস্তিষ্কের অসুখের জন্য কোনো ব্যয় করতে চায় না। নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও খরচ করার সামর্থ্য না থাকায় মানসিক রোগীর মধ্যে নারীরা আরও বেশি ভুক্তভোগী হন। শিশু থেকে বয়স্ক—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এবং নারী-পুরুষের ভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবা পরিকল্পনা করা জরুরি।
মানসিক অসুস্থতা নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার বড় বাধা। সচেতনতা বাড়িয়ে রোগীকে অন্য রোগীর মতোই যত্ন, সম্মান ও প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হবে।
চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা তৈরি ও পরামর্শসেবার ব্যবস্থা করা দরকার। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে মানুষ যাতে সংকোচ বোধ না করে, সে জন্য সহজে গ্রহণযোগ্য সেবাব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
সরকারের নেতৃত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও ভালো কাজ করছে। সরকার তাদের সম্পৃক্ত করবে, প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে, মূল্যায়ন করবে এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে সক্ষমতা বাড়াবে—এমন মালিকানা ও নেতৃত্ব সরকারেরই থাকতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীজনকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে কাজ করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও বাস্তবায়নে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। আমরা যদি মানসিক স্বাস্থ্যকে সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ, সেবা ও সরকারি নেতৃত্ব—সব কটি জায়গাতেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার
পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি খাতে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনবলসংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পর অনেক অভিভাবক রোগীকে বাড়ি নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন রোগীকে হস্তান্তর করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। মানসিক রোগীদের ভর্তিপ্রক্রিয়া শারীরিক রোগের রোগীদের চেয়ে ভিন্নতর। যেহেতু মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে পারেন না, অনেক রোগী আত্মহত্যাপ্রবণ হন, অনেক রোগী আগ্রাসী আচরণ করে থাকেন, তাই তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ভর্তিরোগীর সঙ্গে একজন কেয়ারগিভার দরকার হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না।
ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে ২০১৯ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশ ও শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ও একযোগে কাজ করে যেতে হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে দীর্ঘ মেয়াদে রোগী রাখার সুযোগ নেই। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে আসেন, বেড অকুপেন্সি রেট প্রায় ১২০%। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্তি ও আচরণগত সমস্যার এবং ডিমেনশিয়া রোগীর হার অনেক বেড়েছে। উন্নত দেশগুলোর মতো অভিভাবকহীন, গৃহহারা মানসিক রোগীদের জন্য সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সরকারি বিভাগ অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে। মানসিক রোগীদের পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
ডা. শাফকাত ওয়াহিদ
পরিচালক, পাবনা মানসিক হাসপাতাল
মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মতো সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন। মাসে একবার বা দুই মাসে একবার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নিয়মিত ওষুধ সেবাই অনেক রোগীর জন্য যথেষ্ট। এতে পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালে মূলত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল অফিসার আছেন মাত্র তিনজন। তাই ডায়াবেটিস হাসপাতালের মডেলের মতো প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা দরকার। এমিট্রিপটাইলিন ও হ্যালোপেরিডলের মতো কম দামের ওষুধ নিয়মিত পাওয়া গেলে চিকিৎসা অনেকটা এগিয়ে যাবে।
চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। রোগী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের কথাবার্তা ও আচরণগত চাপ অনেক সময় তাকে সুস্থ হতে বাধাগ্রস্ত করে। একে ‘হাই এক্সপ্রেসড ইমোশন’ বলা হয়। ওষুধ ঠিকমতো খাওয়ার পরও এই চাপ রোগীর সুস্থতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ বিষয়ে সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা বা সাইকোথেরাপি। কিন্তু মানসিক হাসপাতাল, পাবনায় সাইকোলজিস্টের পদ নেই। বিভিন্ন হাসপাতালেও সাইকোলজিস্টের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
রুমানা আহমেদ
হেড অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স,সিটি ব্যাংক এনএ ফাউন্ডেশন
২০২৩ সাল থেকে সিটি ফাউন্ডেশনের ‘গ্লোবাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিবছর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে কাজ করা হয়। ২০২৪ সালে এর বিষয় ছিল গৃহহীনতা। সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রকল্পটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কারণ, এটি মানসিক স্বাস্থ্য ও গৃহহীনতা—দুটি সমস্যাকে একসঙ্গে মোকাবিলা করছে। মানসিক অসুস্থতার কারণে অনেক মানুষ পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েন।
আমরা এই অনুদানকে ‘ক্যাটালিটিক’ বলি। এর লক্ষ্য শুধু কিছু মানুষকে সহায়তা করা নয়, তাঁদের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনা। পাশাপাশি এমন একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা, যা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা যায় এবং আরও বেশি মানুষকে সেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়।
সিটি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের এনজিওগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো যাচাই করে সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়া হয়েছে। এর আগের বছর বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়েও আমরা কাজ করেছি।
আমাদের লক্ষ্য হলো, প্রতিবছর প্রয়োজনভিত্তিক নতুন নতুন বিষয় চিহ্নিত করা এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান তৈরি করা। মানসিক স্বাস্থ্য ও গৃহহীনতার মতো জটিল সমস্যায় এ ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীজনের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী
অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত বড় একটি জনগোষ্ঠী চিকিৎসার বাইরে। এ ঘাটতি কমাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করে প্রাথমিক সহায়তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
একজন ক্লিনিক্যাল বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট কিংবা মনোরোগবিশেষজ্ঞ তৈরি হতে সাত-আট বছর লাগে। তাই দ্রুত কয়েক হাজার বিশেষজ্ঞ তৈরি সম্ভব নয়; বরং কমিউনিটি পর্যায়ে সেবার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের ‘প্রশান্তি’র মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিটি উপজেলায় নেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কর্মীদের ‘ডু নো হার্ম’ নীতি মেনে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী পাঠানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
রোগীর পাশাপাশি পরিবারের যত্ন ও সরকারি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার ও স্কুলকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় যুক্ত করে শিশুদের মানসিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং শিক্ষকদের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অপচিকিৎসা রোধে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
হাসিনা মমতাজ
ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (মেন্টাল হেলথ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ
আমরা বর্তমানে বাংলাদেশের ১০টি জেলায় ‘স্পেশাল ইনিশিয়েটিভ ফর মেন্টাল হেলথ’ কর্মসূচির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি। মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের পরিমাণ খুবই কম—মাত্র ২ দশমিক ৪ টাকা। তাই সীমিত অর্থে বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে হলে বিষণ্নতা, সাইকোসিস ও এপিলেপসির মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পাশাপাশি কম খরচের প্রচার ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য বাজেটের ৬৭ শতাংশই ব্যয় হয় মানসিক হাসপাতালগুলোতে। কমিউনিটি পর্যায়ে, বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে বিনিয়োগ বাড়ানো হোক। এসব প্রতিষ্ঠানে অন্তত প্রয়োজনীয় তিনটি সাইকোট্রপিক ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় জনবল উন্নয়ন জরুরি। চিকিৎসকদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাইকোলজিস্ট, অ্যালাইড হেলথ প্রফেশনাল ও সমাজকর্মীদেরও যুক্ত করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য কারও একার কাজ নয়, এটি আন্তখাতীয় বিষয়। ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের যৌথ ঘোষণার আলোকে নিজ নিজ ভূমিকা নির্ধারণ করে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য যুক্ত করে রেফারেল ব্যবস্থা, কমিউনিটি পর্যায়ে বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে।
ডা. জহিরুল ইসলাম
সিনিয়র স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর মতামত ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসার পর তাঁকে স্বাভাবিক জীবন, পরিবার ও অর্থবহ কাজে ফিরিয়ে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য পরিবার ও সমাজকে প্রস্তুত করে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কলঙ্ক কমাতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় রেফারেল ও ব্যাক-রেফারেল ব্যবস্থা সুসংগঠিত করতে হবে। কমিউনিটি ও চিকিৎসাসেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জরুরি। সাজেদা ফাউন্ডেশনের মতো উদ্যোগের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করে তা বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানো যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও দৃশ্যমান করে যথাযথ আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাথমিক স্ক্রিনিং, ন্যূনতম সেবা ও প্রয়োজন অনুযায়ী রেফার করার প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কমিউনিটি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করলেই একটি কার্যকর সেবা-ধারাবাহিকতা তৈরি করা সম্ভব।
মনিরা রহমান
নির্বাহী পরিচালক, ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশন
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও পুনঃএকীভূতকরণেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ও ভ্যাটের চাপ এবং দাতানির্ভরতা তাদের কাজের পরিসর সীমিত করছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করতে এসব প্রতিষ্ঠানের কর অব্যাহতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রাথমিক সহায়তার জন্য ‘মেন্টাল হেলথ ফার্স্টএইড’ প্রশিক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত ৭৪ জন প্রশিক্ষক ও ৫ হাজার প্রশিক্ষিত সহায়তাকারী তৈরি হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বাড়ানো গেলে মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও রেফার করতে পারবে। পরিবার, স্কুল ও কর্মক্ষেত্রেও এ প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নীতি ও কর্মপদ্ধতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে যুক্ত করতে হবে। এ জন্য আন্তমন্ত্রণালয় ও আন্তখাতভিত্তিক উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনের যত্ন ও প্রমাণভিত্তিক সহজ চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
রূপা আক্তার
সেবা গ্রহণকারী, প্রশান্তি প্রকল্প
মানসিক রোগীদের কষ্ট, অবহেলা ও সামাজিক অসম্মানের অভিজ্ঞতা থেকে ‘মানসিক রোগী’ কবিতাটি লিখেছি। এতে মানসিক রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা, সম্মান এবং পরিবারের ভালোবাসা ও পাশে থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেছি।
সাজেদা ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া সেবার অভিজ্ঞতা নিয়েও আমি ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’ নামে আরেকটি কবিতা লিখেছি। এই প্রতিষ্ঠান আমাকে শুধু সেবা দেয়নি, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস ও সক্ষমতাও দিয়েছে। এখন আমি সেবা সেন্টারে কাজ করছি। নিজের এই পরিবর্তনে আমি গর্ববোধ করি।
মানসিক রোগীদের শুধু চিকিৎসা দিলেই হবে না, তাঁদের সম্মান দিতে হবে, সমাজে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। সাজেদা ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব ফুল থেকে ফল হয় না, কিন্তু কিছু ফুলের সুবাস কম নয়। আমিও চাই, আমার পাওয়া সেবা ও অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। যাতে মানসিক রোগীরা আর অবহেলিত না হন, তাঁরাও যেন সম্মান নিয়ে সমাজে বাঁচতে পারেন।
ডা. মো. নিজামউদ্দিন
মহাসচিব, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস
মানসিক স্বাস্থ্য শুধু অসুস্থতার বিষয় নয়; এটি প্রতিটি মানুষের সুস্থতার সঙ্গে জড়িত। ব্যক্তি ভালো থাকলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রও ভালো থাকবে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে এবং সুশাসন, আইনের শাসন, সততা ও দক্ষতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসাসেবায় দক্ষ জনবল, অবকাঠামো, বাজেট ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা—এসব বড় প্রতিবন্ধকতা। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে শুধু সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে সীমাবদ্ধ না থেকে চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে আন্তবিষয়ক আলোচনা করছি এবং জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ সেবায় সক্ষম, তাদেরও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সবাই মিলে কাজ করলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
মোহা.কামরুজ্জামান
পরিচালক, প্রতিষ্ঠান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যক্রমের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। আমরা প্রায় দুই কোটি পরিবারের সঙ্গে কাজ করছি। দারিদ্র্যের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকায় সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে এনজিওগুলোকে কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
আমরা বর্তমানে ৫৩৮টি হাসপাতালে সমাজসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি কর্নার বা ক্লিনিক্যাল সেবার সঙ্গে সমাজসেবা কার্যক্রমের যোগসূত্র তৈরি করা গেলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। এ জন্য স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন।
আমরা ৩৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮১২ জন প্রতিবন্ধী শনাক্ত করেছি। এর মধ্যে মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধী ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৭৬ জন। সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে প্রতিবন্ধী ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা দরকার।
পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে পারলে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
তামান্না ফেরদৌস
প্রোগ্রাম ডিরেক্টের, সাজেদা ফাউন্ডেশন
মানসিক রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসা শেষে পরিবার ও সমাজে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। তাই চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই রেফারেল, ডিসচার্জ ও ফলোআপের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
শুধু চিকিৎসা নয়, পুনর্বাসনে সামাজিক একীভূতকরণ, জীবিকার সুযোগ ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য দক্ষ জনবল, কারিগরি তদারকি ও কার্যকর নির্দেশিকা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, পরিবার ও কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আলাদা কোনো সমান্তরাল ব্যবস্থা না করে সরকারের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে টেকসই সমাধান তৈরি করা। প্রশান্তির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি কমিউনিটি পুনর্বাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে চিকিৎসার পর একজন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে মর্যাদাপূর্ণভাবে সমাজে ফিরে যেতে পারেন।
রুবিনা জাহান
টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট, সাজেদা ফাউন্ডেশন
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগলেও ৯২ শতাংশের বেশি চিকিৎসার আওতার বাইরে। জনবল, অবকাঠামো, বাজেট ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণে ঘাটতি রয়েছে।
আমরা সাজেদা ফাউন্ডেশনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রমোশন থেকে কমিউনিটি রিইন্টিগ্রেশন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে দেখি। সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক, ডিজিটাল ও বিশেষায়িত সেবার পাশাপাশি ‘প্রশান্তি’ কর্মসূচির মাধ্যমে গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়ক আবাসন ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিচ্ছি।
বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। পরিবার ও কমিউনিটির অনীহা, স্থানীয় সেবার ঘাটতি, দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা, অর্থায়নের সংকট ও আইনি জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মোকাবিলায় কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়, টেকসই অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার জরুরি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করতে হবে।
চিকিৎসক, নার্স, সাইকোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা দিয়ে সেবার পরিসর বাড়াতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা দূর করতে সচেতনতা বাড়াতে হবে।