‘বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ: গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে নীতি ও বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীর
‘বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ: গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে নীতি ও বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীর

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ: নীতি ও বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার

‘বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ: গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে নীতি ও বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৬ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে। আয়োজক: অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্টের থ্রাইভ প্রোগ্রাম ও প্রথম আলো।

অংশগ্রহণকারী:

মনজুর আহমেদ

চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক।

শ্যামল কুমার রায়

সহকারী পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব), জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান।

জেনা দেরাখশানি হামাদানি

ইমেরিটাস বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি

ফাহমিদা তোফায়েল

বিজ্ঞানী, মাতৃ ও শিশু পুষ্টি, আইসিডিডিআরবি

মো. ইকবাল হোসেন

এডুকেশন ম্যানেজার, ইউনিসেফ

এষা হুসাইন

কান্ট্রি ডিরেক্টর, সিনারগস বাংলাদেশ

সৈয়দা সাজিয়া জামান

প্রধান, প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ বিভাগ, ব্র্যাক আইইডি

মোহাম্মদ আজিজ খান

নিউট্রিশন ও ইসিডি অফিসার, ইউনিসেফ

আনিকা রহমান

সিনিয়র সোশ্যাল প্রোটেকশন ইকোনমিস্ট, বিশ্বব্যাংক

জান্নাতুন নাহার

ম্যানেজার, আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, সেভ দ্য চিলড্রেন

শাহানা বেগম

সিনিয়র ম্যানেজার, ফুলকি

তারেক হোসেন

কান্ট্রি রিসার্চ ম্যানেজার, থ্রাইভ প্রোগ্রাম, অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্ট

সঞ্চালনা:

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

মনজুর আহমেদ

চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক

প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে (ইসিডি) সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। শিশুর বিকাশ চাইলে আগে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, আর শিশুকে ভালো রাখতে হলে মাকেও ভালো রাখতে হবে। এ জায়গায় আমরা কিছুটা এগিয়ে ছিলাম—ইপিআই কর্মসূচি ভালো চলছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আমরা কিছুটা হতাশ হয়েছি; এখন শিশু মারা যাচ্ছে। ২০০৪ সাল থেকে আমরা, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বেন) এসব কথা বলে আসছি। আমাদের চেষ্টা ও সরকারের আন্তরিকতার ফলেই ২০১৩ সালে একটি নীতি হয়েছে, যেখানে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের মূল নীতিগুলো রয়েছে। পরে আন্তর্জাতিকভাবে সেগুলো আরও জোরদার হয়েছে। আমরা দেখেছি, নতুন নীতির প্রয়োজন নেই; বিদ্যমান নীতিই যথেষ্ট, বাস্তবায়নটাই মূল চ্যালেঞ্জ।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ১৫টি মন্ত্রণালয় বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। এগুলো বাস্তবায়নে আমরা সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে এক হয়ে কিছুটা এগোতে পেরেছি। কিন্তু নীতিগুলো পুরোপুরি কার্যকর করতে দরকার শক্ত নেতৃত্ব ও অঙ্গীকার, যা নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেই আসতে হবে।

প্রকল্পভিত্তিক কাজ থেকে বেরিয়ে জাতীয় কর্মসূচিতে যেতে হবে, স্থায়ী বাজেটের মধ্যে ধাপে ধাপে সব শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি বহু খাতভিত্তিক উদ্যোগ, তাই সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করতে হবে। আমাদের দেশে বহু প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সদিচ্ছা ও সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কার্যক্রম না থাকলে প্রশিক্ষণ কাজে লাগে না। তাই স্পষ্ট কর্মসূচি, নেতৃত্ব ও জবাবদিহির বিকল্প নেই। প্রয়োজনীয় শিশু অধিদপ্তর গঠন, জাতীয় কারিগরি ও সমন্বয় কমিটির নিয়মিত বৈঠক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের নীতি, পরিকল্পনা ও কাঠামো আছে; এগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। প্রকল্প থেকে জাতীয় কর্মসূচিতে যাওয়া, শিশু বাজেট বরাদ্দ, সমন্বয় ও মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রাখব। এটিকে জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য।

শ্যামল কুমার রায়

সহকারী পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব), জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান

মায়ের গর্ভ থেকে শিশুর জন্ম-পরবর্তী এক হাজার দিনকে বলা হয় ‘গোল্ডেন ডেজ’ (সোনালি দিন)। এ সময়ে পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষার মাধ্যমে শিশুর বিকাশ হয়। প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা নিতে আসা মায়েদের এ সময় প্রয়োজনীয় খাদ্য, সেবা ও নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা আগে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে কাজ করতাম, এখন সেটি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতায় এসেছে। এই ক্লিনিকগুলো গ্রামাঞ্চলে প্রতি ছয় হাজার মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। মাঝখানে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবার চালু হয়েছে।

নীতির দিক থেকে আমাদের অনেক কিছুই আছে, সংবিধানেও স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন নীতির চেয়ে আমাদের উচিত এখন থেকেই বিদ্যমান নীতিগুলো সমন্বয় ও কার্যকর করা।

পুষ্টি খাতে কাজ করতে গিয়ে দেখি, প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব আছে। অনেকেই মনে করেন, এই সেবা তাদের জন্য নয়। তাদের জানাতে হবে—এটি তাদের অধিকার। মাতৃসেবার শুরু প্রসব-পূর্ব সেবা (এএনসি) চেকআপ থেকে—সেখানে পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, টিকা, শারীরিক পরিবর্তন, শিশু বিকাশ—সব বিষয়ে কাউন্সেলিং দেওয়া সম্ভব। এরপর নিরাপদ প্রসব, পোস্টনেটাল চেকআপ এবং শিশুর টিকাদান—সবই ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর জন্মের পর প্রথম আট বছর তার বিকাশে সঠিক পুষ্টি ও যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা অনেক সময় ভুল খাদ্যাভ্যাস তৈরি করি—ছোট শিশুকে অস্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে পরিচিত করি। এসব বিষয়ে পরিবারকে সচেতন করতে হবে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় খুবই জরুরি। সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা ধারাবাহিকভাবে সামনে এগোতে পারব। আমরা প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করলে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

জেনা দেরাখশানি হামাদানি

ইমেরিটাস বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি

প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের প্রয়োজনীয়তা অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের মধ্যে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের গুরুত্ব কী এবং কোন কোন বিষয় শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—এই তথ্যগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ—কাজেই একটি টেকসই সমাজ গড়তে হলে আমাদের শুরুটা করতে হবে শিশুদের থেকেই। তাদের যথাযথ বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া পরিবারের পাশাপাশি সবার দায়িত্ব। শিশুদের মধ্যে ভাগাভাগি, যত্ন ও সহমর্মিতার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।

গর্ভধারণের আগে ও পরে মা-বাবার মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা-বাবার করণীয়, শিশুর যত্ন, পুষ্টি ও বিকাশের বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা যায়, তাহলে মানুষ নিজে থেকেই শিখবে এবং অন্যদেরও জানাবে। বিশেষ করে শিশু বিকাশে বাবাদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের দেশ আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে অনেক বড়। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হলে শুধু প্রচলিত ব্যবস্থা নয়, এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিদিন টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিজ্ঞাপনগুলো দেখি, তার অনেকগুলোই শিশুদের জন্য ক্ষতিকর বার্তা দেয়। যেমন লুকিয়ে খাবার খাওয়া, নিজের জন্য সব রেখে দেওয়া। এ বিজ্ঞাপনগুলো শিশুদের মধ্যে ভাগাভাগি বা যত্নশীলতার মানসিকতার পরিবর্তে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করছে। এমনকি ভাই-বোনের সম্পর্কেও প্রতিযোগিতা ও লুকোচুরির মানসিকতা তুলে ধরা হচ্ছে, যা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আমরা চাইলে গণমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে পারি। টেলিভিশন, প্রিন্ট মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গায় প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর বিস্তৃতি দেশের প্রতিটি প্রান্তে রয়েছে, কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগ ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের গণমাধ্যমকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।

মো. ইকবাল হোসেন

এডুকেশন ম্যানেজার, ইউনিসেফ

আমি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফোকাস করতে চাই—নীতি, তার বাস্তবায়ন এবং অগ্রাধিকার। ২০১৩ সালে দেশে একটি সমন্বিত ইসিডি নীতি অনুমোদিত হয়েছে। আজ ১৩ বছর পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। এই নীতিতে ১৫টি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নির্ধারিত। জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয় কাঠামো আছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জবাবদিহির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। এরপরও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

আমার মতে, বড় সমস্যা হলো আমরা প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে একটি প্রোগ্রাম হিসেবে দেখি, নীতি হিসেবে নয়। স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ দায় থাকে, শিক্ষানীতির ক্ষেত্রেও তেমন। কিন্তু প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে কে নেতৃত্ব দেবে, কে সমন্বয় করবে—এই বোঝাপড়াটাই এখন পর্যন্ত দুর্বল। অথচ এটি একটি বহু খাতভিত্তিক নীতি, যেখানে সমন্বয়কারী সংস্থা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা জরুরি। এই সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গত ১৩ বছরে অনেক ঘাটতি দেখা গেছে।

আমরা অনেক সময় খাতভিত্তিক মানসিকতায় কাজ করি—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি আলাদা করে দেখি। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় না করে নতুন করে সমান্তরাল কর্মসূচি নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা নীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরেকটি বড় ঘাটতি হলো সামগ্রিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরতে না পারা। স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় আলাদা অগ্রগতি থাকলেও প্রারম্ভিক শিশু বিকাশে আমরা কোথায়—এই চিত্র নেই। অথচ এই নীতিতে জাতীয় প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ স্ট্যাটাস রিপোর্ট করার কথা আছে, যা নিয়মিত হলে আমাদের অবস্থান, ঘাটতি ও করণীয় স্পষ্ট হতো এবং মন্ত্রণালয়গুলোও সে অনুযায়ী পরিকল্পনা নিতে পারত।

জাতীয় সমন্বয় ও কারিগরি কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হবে, নিয়মিত করতে হবে। পাশাপাশি একটি জাতীয় স্ট্যাটাস রিপোর্ট জরুরি, যা ভিত্তি তৈরি করবে পরবর্তী পরিকল্পনার জন্য। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর বাজেট, সেবার পরিধি ও মানোন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

ফাহমিদা তোফায়েল

বিজ্ঞানী, মাতৃ ও শিশু পুষ্টি বিভাগ, আইসিডিডিআরবি

আমার দৃষ্টিতে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ একটি বহুমাত্রিক বিষয়। একক কোনো উপাদান দিয়ে এটিকে ব্যাখ্যা বা সমাধান করা যায় না। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ পাঁচটি উপাদান দিয়ে বিষয়টি ধরার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাস্তবে আমাদের অনেক কর্মসূচি এই সবগুলো উপাদান পূরণ করতে পারে না। অর্থায়ন ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এখানে কাজ করে।

গর্ভকালীন সময়ের ওপর আমাদের বেশি জোর দিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভধারণের শুরু থেকেই মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং জন্মের পর তিন বছর পর্যন্ত প্রতি সেকেন্ডে বিপুল সংযোগ তৈরি হয়। এখানে মায়ের প্রস্তুতির পাশাপাশি পুরো পরিবারের প্রস্তুতিও জরুরি। বিশেষ করে মাতৃকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা গবেষণায় গুরুত্বসহকারে দেখেছি। আমার মনে হয়, এটি প্রসব-পূর্ব সেবার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব, যা বাস্তবায়নের দিক থেকেও কার্যকর হতে পারে।

আলাদা নতুন কর্মসূচি নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামো—যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক, পুষ্টি কর্মসূচি বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—এসবের মধ্য দিয়েই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা বেশি বাস্তবসম্মত। তবে এর জন্য কর্মসূচিগুলোকে সহজ, প্রশিক্ষণযোগ্য এবং বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।

আরেকটি বড় ঘাটতি হলো মূল্যায়ন। আমাদের দেশে অনেক কর্মসূচি চালু হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে তার ফলাফল মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে আমরা বুঝতে পারি না, আসলে কতটা উপকার হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘমেয়াদি অনুসরণও প্রায় অনুপস্থিত। শিশুর সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশ এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন জরুরি।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। তাই মানুষের কাছে এর গুরুত্ব বোঝানো কঠিন। এ ক্ষেত্রে এমন বার্তা দরকার, যা সহজে মানুষের মনে পৌঁছায়। অভিভাবক ও পরিবারকে সম্পৃক্ত করতে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজটিতে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এষা হুসাইন

কান্ট্রি ডিরেক্টর, সিনারগোস বাংলাদেশ

সিনারগোস বাংলাদেশ ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের অর্থায়নে দেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ ও শিশু ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করছে এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। দেশে প্রতিদিন পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ৩০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যা একসময় অজানা ছিল এবং অনেকে বিশ্বাসও করতেন না যে এটি প্রতিরোধযোগ্য। সেই জায়গা থেকে আমরা প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের সঙ্গে এই বিষয়টিকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছি।

শিশুর বেঁচে থাকাই প্রথম শর্ত—তারপরই বিকাশ। তাই আমরা এখন শুধু প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ নয়, শিশুর প্রারম্ভিক বয়সে তার যত্ন ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশ নিশ্চিত করার কথা বলছি। যত্নের জায়গাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নজরদারি বাড়ানো গেলে অনেক শিশু ডুবে মৃত্যু বা অন্যান্য দুর্ঘটনা—যেমন সড়ক দুর্ঘটনা, সাপের কামড় বা আগুনে পুড়ে মৃত্যু—এসব প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের পরিসর অনেক বিস্তৃত; এটি যেমন সম্ভাবনার ক্ষেত্র, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও।

আমরা নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ‘আইসিবিসি—সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান’ প্রকল্পে কাজ করছি, যা মাঠপর্যায়ে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কার্যক্রম বাস্তবায়নের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। ১৬টি জেলায় ৪৫টি উপজেলায় প্রায় ৮ হাজারের বেশি শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে ২ লাখের বেশি শিশু সেবা পেয়েছে। আইসিবিসির প্রথম ধাপ ২০২৫ সালে সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপের জন্য প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ১৬ জেলা থেকে ৩০ জেলায় এবং ৪৫ উপজেলা থেকে আরও বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।

আমরা ‘ব্রিজিং লিডারশিপ’ প্রশিক্ষণ চালু করেছি, যেখানে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে এবং কাজের গতি বাড়বে। সহযোগিতা ও সমন্বয়ের শক্তিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে সমালোচনা নয়, উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে আইসিবিসির মতো কার্যকর উদ্যোগগুলো টিকে থাকে ও বিস্তৃত হয়।

সৈয়দা সাজিয়া জামান

প্রধান, প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ বিভাগ, ব্র্যাক আইইডি

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশে আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ এখানে পৌঁছেছি। নব্বইয়ের দশক থেকে ব্যক্তি, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অগ্রগতি এসেছে।

২০০৮ সালের কার্যকরী কাঠামো ও ২০১৩ সালের নীতি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের কাজ এবং ব্র্যাক আইইডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে পেশাজীবীদের জন্য মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু এই যাত্রার অংশ। প্রাক্-প্রাথমিক কর্মসূচিকে পাইলট থেকে স্কেলে নেওয়া এবং দেশে ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ একটি বড় অর্জন, যা দীর্ঘদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একদম পাইলট উদ্যোগ থেকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের অগ্রগতি হলেও সেই সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে মান নিশ্চিত করা এখনো কঠিন। এত দীর্ঘ সময় পরও মানসম্মত সেবা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ‘ফোর প্লাস’ কর্মসূচি পাইলট পর্যায়ে এগোলেও সেটির পূর্ণ সম্প্রসারণ এখনো বাকি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে। আমরা জানি, শূন্য থেকে আট বছর—বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের সময়টি শিশু বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই বয়সভিত্তিক সেবায় আমাদের প্রচার-প্রচারণা যথেষ্ট নয়। দেশের অনেক এলাকায় আমরা এখনো এসব কার্যক্রম শুরু করতে পারিনি, ফলে অনেক শিশুই কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাস্তবায়ন নীতিতে জাতীয় কারিগরি কমিটি ও সমন্বয় কমিটি থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিতভাবে দেখা যায় না। সরকার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় কার্যক্রম আবার শুরুতে ফিরে যায়, ফলে ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কোনো একক সংস্থা বা খাতের কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের কাজ। শিশু বিকাশ ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, একসঙ্গে কণ্ঠ তুলতে হবে।

মোহাম্মদ আজিজ খান

নিউট্রিশন ও ইসিডি অফিসার, ইউনিসেফ

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ–সংক্রান্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রায় সব সূচকেই নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলি, সংবেদনশীল যত্নের হার ২০১৯ সালে ৬৩ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৩৫ শতাংশে। এতে বোঝা যায়, শক্তিশালী নীতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন, জবাবদিহি ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বড় দুর্বলতা আছে। একইভাবে শিশুদের অনুপযুক্ত তত্ত্বাবধানের হার ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশ হয়েছে, আর প্রারম্ভিক বিকাশ-সংশ্লিষ্ট সেবার প্রসার মাত্র ১৭ শতাংশ। ফলে উন্নয়নগতভাবে সঠিক পথে থাকা শিশুর হার ৭৫ শতাংশ থেকে কমে ৭১ শতাংশে নেমেছে। এই চিত্র আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।

প্রতিবছর অনেক কিশোরী অল্প বয়সেই গর্ভধারণ করছে। তারা কোনো প্রস্তুতি বা জ্ঞান ছাড়াই মাতৃত্বে প্রবেশ করছে, অথচ দেশে কার্যকর প্যারেন্টিং সাপোর্ট প্রোগ্রাম নেই। আমার মনে হয়, ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো একটি কাঠামোবদ্ধ প্যারেন্টিং প্রোগ্রাম আমাদের বিবেচনা করা উচিত।

‘পাইলট টু স্কেল’ প্রসঙ্গে বলি, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআরবি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা জিরো-টু-থ্রি বয়সের জন্য প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি, যেখানে খুব ভালো ফল পাওয়া গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এটি স্কেলআপ করা গেলে ৭০ শতাংশের বেশি মা ও শিশুর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপত্তা, প্রারম্ভিক শিক্ষা এবং সংবেদনশীল যত্ন—এই পাঁচটি উপাদান নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে এখনো শিশু বিকাশের জন্য আলাদা কোনো অধিদপ্তর নেই। জাতীয় ইসিডি সমন্বয় কমিটিও কার্যকরভাবে কাজ করছে না। এটিকে কার্যকর করা গেলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহি বাড়তে পারে। এখনই সময় সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার।

আনিকা রহমান

সিনিয়র সোশ্যাল প্রোটেকশন ইকোনমিস্ট, বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশ একটি জনতাত্ত্বিক সুযোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। তবে এই সুযোগের জানালা চিরস্থায়ী নয়—ধীরে ধীরে এটি বন্ধ হয়ে আসছে। বর্তমানে আমাদের একটি বড় তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং আগামী ২০ বছরে প্রতিবছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। এই জনগোষ্ঠীই দেশের অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হবে।

এই প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি, প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ একটি স্বীকৃত বিষয়, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে। শিশু বিকাশকে একটি আলাদা সামাজিক খাত হিসেবে দেখলে হবে না। এটি আসলে শুধু শিশু বা পরিবারের বিষয় না, একটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি। আজকের একটি শিশুর সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করা মানে আগামী দিনের দক্ষ কর্মশক্তি তৈরি করা।

আমরা যদি সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত দেশে যেতে চাই, তাহলে আমাদের শুরুটা করতে হবে একদম প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ থেকে। কারণ, এখানেই মানুষের মস্তিষ্কের ভিত্তি তৈরি হয়, এখানেই শেখার ক্ষমতা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে। চাকরির এজেন্ডার দিকে তাকালে আমরা দেখি, একটি ভালো চাকরির পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে—অবকাঠামো, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং মানবসম্পদ। এই মানবসম্পদই দেশের আয়ের একটি বড় অংশ নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশ এখনো স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং যুবকদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ—এই তিন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে। যুবকদের কর্মসংস্থানের সমস্যাও স্পষ্ট। এই জায়গা থেকেই ইসিডির যৌক্তিকতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটি শুধু শিশুর যত্ন বা কল্যাণের বিষয় নয়; এটি শিশুর ভবিষ্যৎ, দেশের ভবিষ্যৎ এবং জাতি গঠন ও উন্নতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমাদের বিষয়টিকে তুলে ধরা উচিত।

জান্নাতুন নাহার

ম্যানেজার, আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, সেভ দ্য চিলড্রেন

সেভ দ্য চিলড্রেন ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন পাইলট উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। কিছু উদ্যোগ সফলভাবে করা হয়েছে, আবার কিছু ব্যর্থ হয়েছে, যা প্রকল্পভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে ফাইভ-প্লাস প্রোগ্রাম একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফল, যা এখন ৬৫ হাজার স্কুলে সম্প্রসারিত হয়েছে। এটি একটি বড় অর্জন। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা পরিমাণগত দিক থেকে এগোলেও গুণগত মানের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। এই বয়সী শিশুদের উন্নয়ন মূল্যায়নের জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। ফলে বার্ষিক প্রতিবেদনে আমরা কেবল অংশগ্রহণের সংখ্যা দেখি, কিন্তু শিশুদের শিখনের আশানুরূপ ফলাফল পাই না। নীতিনির্ধারণের সময় মাঠপর্যায়ে কাজ করা অনেক সংস্থার মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয় না, এটিও একটি সমস্যা। অথচ এই বিলম্বের ফলে শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে যাচ্ছে।

অসমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শহরের ধনী পরিবারের শিশুরা বেশি হারে ইসিডি সেবায় অংশ নিচ্ছে, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অংশগ্রহণ অনেক কম। এতে একটি বড় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একটি গুরুতর বিষয় হলো প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ। দেশে অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তিন বছরের নিচে শিশুদের স্ক্রিনিং কার্যত নেই; চার বছর বয়সের পর থেকে এটি শুরু হয়। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে।

অর্থায়ন নিয়েও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জিডিপির তুলনায় ইসিডিতে বিনিয়োগ খুবই কম। সম্মিলিতভাবে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। সরকার, দাতা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আজকের মতো উদ্যোগগুলো আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যাতে শিশুদের জন্য বিনিয়োগ ও কার্যক্রম আরও জোরদার হয়।

শাহানা বেগম

সিনিয়র ম্যানেজার, ফুলকি

ফুলকি ১৯৯১ সাল থেকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে কেয়ার নিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের শিশুদের জন্য এই সেবা দিয়ে আসছে। আমরা কারখানাভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করি, পাশাপাশি যেসব এলাকায় পোশাককর্মীরা বসবাস করেন, সেখানে কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্রও পরিচালনা করে আসছি এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছি। এ কাজের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। উদ্যোগগুলো প্রকল্পভিত্তিক হওয়ার ফলে প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় আমরা নিজেদের উদ্যোগে তিনটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র টেকসইভাবে চালু রাখতে পেরেছি এবং এখনো পরিচালনা করছি।

নীতিগত দিক থেকে আমি দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। প্রথমত, মনিটরিং। আমার মনে হয়, একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা ছাড়া মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে শুধু সরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে নয়; বরং কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী, সিভিল সোসাইটি এবং যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন, তাঁদের সম্পৃক্ত করে একটি মনিটরিং বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। এতে করে মাননিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে দেখা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন)। আমাদের দেশে এখনো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোর জন্য কার্যকর কোনো নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অথচ অনেক জায়গায় অসংখ্য দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে; কিন্তু সেগুলোর মান কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা আমরা জানি না। একটি সুনির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে এই কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা, কার্যক্রম ও মান—সবকিছুই একটি কাঠামোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে করে জবাবদিহি বাড়বে এবং সেবার মানও উন্নত হবে।

মো. তারেক হোসেন

কান্ট্রি রিসার্চ ম্যানেজার, থ্রাইভ প্রোগ্রাম, অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্ট।

আমরা বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ নিয়ে কথা বলছি। শূন্য থেকে আট বছর বয়সের মধ্যে শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে। এ সময়ে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ সরকার এই খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি ২০১৩ নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, প্যারেন্টিং ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।

আমি চারটি প্রধান প্রতিবন্ধকতার কথা বলব। প্রথমত, সমন্বয় ও পরিচালনার ব্যবস্থা। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ সেবাগুলো বহু খাতভিত্তিক হওয়ায় প্রায় ১৫টি মন্ত্রণালয় যুক্ত; কিন্তু জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, কর্মী সক্ষমতা ও তদারকি। সেবাগুলো মূলত মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল, যারা অতিরিক্ত কাজের চাপের মধ্যে থাকেন। তাঁদের জন্য বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত প্রণোদনা, সহায়ক তদারকি ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় ঘাটতি আছে। তৃতীয়ত, সেবার মান নিশ্চিতকরণ। বিভিন্ন সেবা থাকলেও মানের প্রশ্ন রয়ে যায়; মনিটরিং, রেফারেল ও সেবার মানদণ্ড জোরদার করা দরকার। চতুর্থত, অর্থায়ন ও পরিকল্পনা। বাজেট বরাদ্দ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও পরিকল্পনায় আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আমাদের অনেক সফল মডেল রয়েছে; কিন্তু সেগুলো জাতীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হচ্ছে না। কোনো উদ্যোগ সফল প্রমাণিত হওয়ার পর সেটিকে কীভাবে দ্রুত সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।। অনেক সময় আমরা প্রকল্পের ডিজাইনের দিকে বেশি মনোযোগ দিই, কিন্তু সেই উদ্যোগ বিদ্যমান সেবাকাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহি ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি দেখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই প্রারম্ভিক শিশু বিকাশসংক্রান্ত কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্প বা ডেভেলপমেন্ট বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। ধীরে ধীরে এই সেবাগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব বাজেটের আওতায় সরকারি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করা গেলে, সেগুলোর টেকসই বাস্তবায়নের সুযোগ অনেক বেশি তৈরি হবে। নতুন কিছু যুক্ত করার সময় বাস্তবসম্মতভাবে ভাবা প্রয়োজন—বিদ্যমান দায়িত্ব ও সেবাকাঠামোর মধ্যেই প্রারম্ভিক শিশু বিকাশের সেবাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমরা প্যারেন্টিং সাপোর্ট, প্রাথমিক উদ্দীপনা বা শিশু বিকাশসংক্রান্ত বার্তাগুলো বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা বা কমিউনিটি পর্যায়ের সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তা আলাদা কোনো নতুন কাঠামো তৈরি না করেই অনেক বেশি কার্যকরভাবে এবং বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে। গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নীতিনির্ধারণ—এই তিন দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করবে।

সুপারিশ:

  • প্রারম্ভিক শিশু বিকাশকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে; মায়ের সুস্থতা, শিশুর বেঁচে থাকা ও বিকাশ

  • একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

  • শিশুদের সার্বিক বিকাশ তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পূর্ণ সক্ষমতাসম্পন্ন শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর স্থাপন করতে হবে।

  • গর্ভকালীন ও জন্ম-পরবর্তী প্রথম ১,০০০ দিনে পুষ্টি, সেবা ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।

  • জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

  • রাজস্ব বাজেটের আওতায় ধাপে ধাপে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।

  • প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

  • প্যারেন্টিং সাপোর্ট কার্যক্রম চালু করে মা–বাবাকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

  • সেবার মান নিশ্চিত করতে শক্তিশালী মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা ও মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।