কূটনীতি

ছিটমহল এখন অতীত

স্থলসীমা চুক্তিটি ভারতের পার্লামেন্টে পাস হয় সর্বসম্মতভাবে
স্থলসীমা চুক্তিটি ভারতের পার্লামেন্টে পাস হয় সর্বসম্মতভাবে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ২০১৫ সাল ছিল গুরুত্বপূর্ণ বছর। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক স্থলসীমা চুক্তিটি সুদীর্ঘ ৪১ বছর পর ভারতীয় পার্লামেন্টের অনুসমর্থন পায় এবং ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। স্থলসীমা নির্ধারণ সম্পন্ন করা, অপদখলীয় ভূমি হস্তান্তর ও ছিটমহল বিনিময়ের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার সে বছরই চুক্তিটি জাতীয় সংসদে অনুসমর্থন করে এবং তা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু সেই অনুসমর্থনের কাজটি করতে ভারত সরকার ব্যয় করল ৪১ বছর। স্থলসীমা চুক্তি অনুসমর্থনের এই কাজটি না হওয়ার কারণেই মূলত ছিটমহল বিনিময় এত বছর আটকে ছিল। ছিটমহলে অবরুদ্ধ মানুষদের মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশে গড়ে ওঠা জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত ছিটমহল বিনিময়কে সামনে রেখেই স্থলসীমা চুক্তি ভারতীয় পার্লামেন্টে অনুসমর্থিত হয়। ৫৫ হাজার মানুষকে নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এই শান্তিপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আয়োজন অবশ্যই বিশ্বের শান্তিকামী মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
১৯৪৭ সালে সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ যখন ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে, তখন মালিকানা বিবেচনায় বিচ্ছিন্ন ছিটমহল নামক ভূখণ্ডগুলোতে বসবাসকারী মানুষেরা উল্টো অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার সীমান্ত এলাকা এবং ভারতের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছিটমহলগুলো হয়ে পড়ে একেকটি স্থলবেষ্টিত দ্বীপ। এর অধিবাসীরা পরিণত হয় রাষ্ট্র ও নাগরিকত্বহীন মানুষে।
স্থলসীমা চুক্তিটি অবশেষে ২০১৫ সালের ৬ মে ভারতের রাজ্যসভায় এবং ৭ মে লোকসভায় সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। ভারতীয় সংবিধানের এই শততম সংশোধনীটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। লোকসভায় যাঁরা এই বিলের মৃদু বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, ‘আমরা যে রাজনীতির ঊর্ধ্বেও উঠতে পারি, তা গোটা পৃথিবীকে দেখানো দরকার।’ গোটা পৃথিবী সত্যি ছিটমহল-সংকটের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানবিক সমাধান দেখল।
২০১৫ সালের ৬ জুন ঢাকা শীর্ষ বৈঠকে ১৯৭৪ সালের স্থলসীমা চুক্তি ভারতের পার্লামেন্টে অনুসমর্থনের দলিল ‘লেটার অব র্যা টিফিকেশন’ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ২০১১ সালের প্রটোকল বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়। সে অনুযায়ী ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। এর মধ্য দিয়ে ৫৫ হাজার ‘ছিটের লোক’-এর জীবন থেকে অবরুদ্ধ ৬৮ বছরের অন্ধকারের অবসান ঘটে।
ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে কোনো দেশেরই হারানোর কিছু ছিল না। এই বিনিময়ের মাধ্যমে কার্যত যা ঘটেছে, তা কেবলই কাগজে-কলমে মালিকানা পরিবর্তন। এর মধ্য দিয়ে বরং উভয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত হয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ের ধারাবাহিকতায় ভারত সরকার তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মরুকরণ ঠেকাতে এ দেশের মানুষের পাশে থাকবে, সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধ হবে—সেটাই নতুন বছরের প্রত্যাশা।
মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়