বাবার পথে দুই ভাই

এক হকি পরিবারের গল্প

একই ফ্রেমে দুই ভাই—রাসেল মাহমুদ জিমি (বাঁয়ে) ও খালেদ মাহমুদ রাকিন l সৌজন্য ছবি
একই ফ্রেমে দুই ভাই—রাসেল মাহমুদ জিমি (বাঁয়ে) ও খালেদ মাহমুদ রাকিন l সৌজন্য ছবি

দুজনের কণ্ঠস্বর একই রকম। চেহারায়ও মিল। দুজনই বিকেএসপির ছাত্র।
কিন্তু স্বভাবে দুজন দুই মেরুতে। রাসেল মাহমুদ জিমি চঞ্চল ও প্রতিবাদী। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে প্রতিবাদ করেন। প্রতিবাদের ধরনটা যে সবাই পছন্দ করেন, এমন নয়। গত প্রিমিয়ার হকি লিগে স্টিকের ঝলকানির সঙ্গে মেজাজের ঝলকানিও কম দেখাননি। নিজেই তখন বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন বাসা থেকে বের হই একটা প্রতিজ্ঞা করে। কোনোভাবেই মেজাজ গরম করব না মাঠে। কিন্তু “অন্যায়” দেখলে মাথা আর ঠিক থাকে না!’
কিন্তু খালেদ মাহমুদ রাকিন ঠিক উল্টো। অনেকে বলেন, ভাইয়ের তেমন কিছুই পাননি তিনি। দুই ভাইয়ের এই বিপরীত স্বভাবের একটা কারণ হতে পারে মাঠে দুজনের খেলার ধরন। স্ট্রাইকার জিমি আক্রমণাত্মক। রাকিন শান্ত থাকতে পছন্দ করেন বলেই কিনা ডিফেন্ডার!
দুই ভাইয়ের টক্করও হয়েছে হকি মাঠে। জিমি তাতে জয়ী। গত লিগে অ্যাজাক্সের রক্ষণে থাকা রাকিনের বিপক্ষে দুই গোল আছে বড় ভাইয়ের। রাকিনসহ বিকেএসপির ছাত্রদের নিয়ে গড়া আজাদের রক্ষণকে ঘোল খাইয়ে হ্যাটট্রিকও করেছেন জিমি। রাকিন ঊষায় খেলেও টের পেয়েছেন ভাইয়ের স্টিকের দাপট।
ভাইয়ের বিপক্ষে গোল করতে কেমন লাগে? জিমি হাসেন, ‘সামনে ভাই পড়ুক আর অন্য কেউ, স্ট্রাইকার হিসেবে গোল করাই আমার কাজ। কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে কথা-কাটাকাটি বা অন্য কিছু হয়ে গেলে? জিমি প্রশ্নটা লুফে নিলেন, ‘কথা-কাটাকাটি কী করবে, ও তো কথাই তেমন বলে না। মাঠের বাইরে যেমন, মাঠেও তেমন।’
জিমি মজা করে বলেন, ‘ও কখনো মাঠে আমাকে মারলে আমি কিন্তু চুপ থাকি।’ বড় হওয়ার এটাই আসলে ‘জ্বালা’। রাকিন স্বভাবগতভাবে ভাইকে অনুসরণের চেষ্টাও করেন না। নিজের সম্পর্কে নিজে অকপট, ‘ভাই তাঁর মতো থাকেন, আমি আমার মতো। আমি রাগারাগি করি না। চুপচাপই থাকি মাঠে,মাঠের বাইরে।’
দুজনের বয়সের ব্যবধান ৯ বছর। শীর্ষ হকিতে জিমি পেরিয়েছেন ১০ বছরেরও বেশি সময়। হয়েছেন দেশের সেরা হকি তারকা। রাকিনের পথচলা শুরু সবে, গত বছরই বিকেএসপি থেকে বেরিয়েছেন। এরই মধ্যে খেলেছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২১ ও অনূর্ধ্ব-১৮ দলে। স্বপ্ন দেখেন ভাইয়ের সঙ্গে জাতীয় দলে খেলবেন, একই ড্রেসিংরুমে থাকবেন।
দুই ভাইয়ের লড়াইয়ের উত্তাপ কিছুটা অবশ্য এরই মধ্যে ঘরে পড়েছে। জিমি হেসে বলছিলেন, ‘আমাদের দুজনের খেলা থাকলে বাসার সবাই ওর পক্ষে।’ রাকিনও বিষয়টা উপভোগ করেন, ‘বাসার সাপোর্ট পেয়ে উজ্জীবিত হই। দেখা গেল, ভাই বল নিয়ে এসেছে বক্সে, তাকে ট্যাকল করতে আমার অনেক ভালো লাগে। ভাই আমার সামনে এলে ভয়ও পায় (হা হা)!’ জিমি-রাকিনদের তিন বোন আছে, দুজন জিমির বড়। বোনেরা মাঝেমধ্যে জিমির পক্ষে থাকেন, তবে বড় বিপদ তাঁদের মা মেহের নিগারের। তিনি বলছেন, ‘জিমি খেলোয়াড় হিসেবে অনেক ভালো। তাই ওর জয় নিয়ে সংশয় থাকে না আমাদের। এ কারণে ছোট ছেলের দিকে সবাই একটু ঝুঁকে যায় বাসায়।’
জিমিদের বাবা আবদুর রাজ্জাক পূর্ব পাকিস্তান হকি দলে খেলেছেন। স্বাধীনতার আগে শুরু করে আশির মাঝামাঝি আবাহনীসহ ঢাকার বড় দলগুলোয় দাপিয়ে খেলেছেন ফরোয়ার্ড হিসেবে। হকি অঙ্গনের সবারই অভিন্ন মত, বাবার যোগ্য উত্তরাধিকারী জিমি। সেটা দেখে তৃপ্ত আবদুর রাজ্জাক। অনেক দিন ধরেই অসুস্থ, পুরান ঢাকার লালবাগের বাসা থেকে বাইরেই আর পা পড়ে না তাঁর। কথা বলতে পারেন না, টুকটাক বললেও জড়িয়ে যায়।
মেহের নিগার এসব বলতে বলতে স্মৃতিতে ডুব দেন। তাঁর মনে পড়ে সেসব দিন, যখন চার বছর বয়সেই জিমি হকি মাঠে গেছেন বাবার হাত ধরে। যখন বিকেএসপিতে পড়েন জিমি, ছোট ছেলে রাকিনকে সঙ্গে নিয়ে মা বিকেএসপিতে দেখতে যেতেন। বড় ভাইয়ের হাতে স্টিক-বল দেখে ছোট্ট রাকিনের মনে হকির বীজ বপন। ব্যস, বাবা-ভাইয়ের হাত ধরে তিনিও হয়ে গেলেন হকি ভুবনের একজন।
বাড়ির কর্ত্রীর বুকটা তাই আনন্দে ভরে যায়। পেছনে তাকিয়ে স্বামীর হকিপ্রেম নিয়ে বলেন, ‘সাতাত্তরে আমাদের যখন বিয়ে হয়, জিমির বাবা বউভাতের দিনও খেলতে গেলেন, আবাহনীর হয়ে মোহামেডানের বিপক্ষে। হকির প্রতি তাঁর ছিল অসম্ভব ভালোবাসা, দুই ছেলেও সেটা পেয়েছে।’
মেহের নিগারের পরিবারটা খাঁটি এক হকি পরিবার। স্বামী বড় হকি খেলোয়াড় ছিলেন, দুই ছেলেও হকিতে স্বনামখ্যাত। কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছে তাঁর প্রাপ্তির পাত্র।