
ছেলেমেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে পরিবারের কর্তা ছুটছেন মাঠে। খেলা দেখা চাই। এমন অনেক পরিবারকেই এখন দেখা যাচ্ছে জাকার্তার প্রাণকেন্দ্র গ্লোরা বুং কার্নো ক্রীড়া কমপ্লেক্স চত্বরে। ১৮তম এশিয়ান গেমসটা তাই মাঠের খেলার মতো মাঠের বাইরেও জমে উঠেছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানীতে।
বেশি ভিড় অবশ্যই ব্যাডমিন্টনে। এটি ইন্দোনেশিয়ার এক নম্বর খেলা। এখন যদিও চীন এসে পড়ায় ব্যাডমিন্টনে আগের মতো দাপট নেই ইন্দোনেশিয়ার, তবু গত রিও অলিম্পিকে মিশ্র দ্বৈতে সোনা জিতেছে এই দেশটি। ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিক থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাডমিন্টনে ৭টি অলিম্পিক সোনা জিতেছে ইন্দোনেশিয়া। ব্যাডমিন্টনে আছে দেশটির বিশাল ঐতিহ্য। যার পরম্পরা রক্ষা হচ্ছে যত্নের সঙ্গে। এককে অনেক ভালো ছিল আগে, এখন নয়। তারপরও এই এশিয়ান গেমসে লোকে প্রাণ ভরে উপভোগ করছে ঘরের ছেলেদের নৈপুণ্য।
স্থানীয় খেলোয়াড়দের প্রতিটি পয়েন্ট জয়ে আনন্দে ফেটে পড়ছে ব্যাডমিন্টন ইনডোর। জাতীয় পতাকার সাজে অনেকেই নিজেদের সাজিয়ে খেলা দেখতে আসেন। গত ১৮ আগস্ট শুরু হওয়া এশিয়ান গেমসের খেলা দেখতে গোটা ইনডোরে সুঁই পড়ার জায়গা নেই। এখানকার মানুষ খেলা খুব ভালোবাসেন। দর্শকদের জন্য সুন্দর আয়োজন রেখেছে গেমস কমিটিও। যেমন গ্লোরি বুং কার্নো ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ভেতর শাটল বাস আছে। এই বাসে শুধু মিডিয়াকর্মী বা অ্যাথলেটরাই নয়, উঠতে পারেন সাধারণ মানুষও। বিশাল চত্বরের এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে যায় বাসগুলো। সাধারণ মানুষ দল বেঁধে ছুটে চলেন ভেন্যুগুলোতে।
শাটল বাসে কথা হচ্ছিল আবু হামাদ নামে জাকার্তার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিন বছরের ছেলের সঙ্গে দেড় বছরের দুই যমজ কন্যা এবং স্ত্রীকে নিয়ে ব্যাডমিন্টন দেখতে এসেছেন। তাঁর খুশি যেন আর ধরে না, ‘ব্যাডমিন্টন খেলাটা আমার অনেক পছন্দ। খেলা দেখার জন্য আলাদা সময় বের করে নিয়েছি। বাচ্চাদেরও নিয়ে এসেছি খেলাধুলার সঙ্গে ওদের পরিচয় করিয়ে দিতে।’
শুধু এশিয়ান গেমসই টানছে মানুষকে, তা নয়। স্থানীয়রা বলছেন, ঘরোয়া খেলায়ও একই রকম ভিড় থাকে। ব্যাডমিন্টনে ফাঁকা যায় না একটি আসনও। এমনকি স্থানীয় লিগ বা টুর্নামেন্টের জন্য টিকিটের চড়া দামও দমাতে পারে না ব্যাডমিন্টনপ্রেমীদের। ভিআইপি টিকিট ১৪ লাখ ৪০ হাজার রুপি (১০০ মার্কিন ডলার)। তাতেও নাকি আসন ভরে যায় সব। সাধারণ দর্শকেরাও ৪-৫ লাখ রুপিতে টিকিট কেনেন। খেলা দেখাই ওদের আনন্দ। এত মানুষ ব্যাডমিন্টন দেখে ভাবাই যায় না। ঘরোয়া ফুটবল মাঠও থাকে দর্শকে ঠাসা।
এই দেশে বড় বড় পদ-পদবির মানুষও খেলার প্রেমে মজেছেন এখন। এটা যে শুধুই এশিয়ান গেমস ঘিরে তা নয়। অন্য সময়ও রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা খেলা দেখেন। ক্রীড়ামন্ত্রী ইমান নাহরাউই এখন একটু বেশি ব্যস্ত। প্রায় প্রতিদিনই এ মাঠ থেকে ও মাঠে ছুটছেন। আজ সোমবার গেছেন পূর্ব জাকার্তায় পালেমবাংয়ে, মার্শাল আর্ট দেখতে। ইন্দোনেশিয়া নাকি পদক জিতবে মার্শাল আর্টে, মন্ত্রী তাই ছুটেছেন সেদিকে। খোদ প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো মাঠে আসেন প্রায় প্রতিদিন। ব্যাডমিন্টন দেখেছেন দুই দিন। ছেলেদের দলীয় ইভেন্টে, চীনের বিপক্ষে ফাইনালে ছিলেন। দেখেছেন বাস্কেটবলসহ নানা খেলা। খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে যা যা করা দরকার, সবই করছেন। গেমস উদ্বোধন করতে মাঠে ঢুকেছেন নিজে মোটরসাইকেল চালিয়ে! ইন্দোনেশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট, সেনা প্রধান, পুলিশ প্রধান সবাই খেলা দেখেন। পুরস্কার দেন। সাধারণ থেকে শীর্ষ—সবাই খেলা দেখতে ভালোবাসেন।
আর বাংলাদেশে? বড় আয়োজনে হয়তো কিছু মানুষ গ্যালারিতে থাকেন। সারা বছর সে গ্যালারিগুলো থাকে শূন্য। দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিই হারিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বাদে অন্য খেলাগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাধারণ জনতা। মান নিয়ে প্রশ্ন, তাই মানুষের আগ্রহ নেই। অথচ অন্য দেশগুলোতে সব খেলাই বেড়ে উঠছে সমর্থকদের মাঠের উপস্থিতিকে পুঁজি করে। কোথায় যে পড়ে আছি আমরা!