ইতিহাসের পাতায় ২০২০ সাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে করোনার বছর হিসেবে। তার মধ্যেও নতুন স্বাভাবিকতায় মাঠে খেলা ছিল। ছিল মাঠ ও মাঠের বাইরে আনন্দ–বেদনার কাব্য। সেসব নিয়েই ফিরে দেখা ২০২০

করোনায় থমকে গিয়েছিল সব। স্কুল–কলেজ, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—তালা পড়ে সবখানে। মহামারির দুঃসময়ে খেলাই–বা আর মাঠে থাকে কী করে! স্টেডিয়াম, ক্লাব, মাঠ সর্বত্র শ্মশানের নীরবতা। খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, এমনকি সাংবাদিকেরাও চেনা মাঠের পথ ভুলতে বসেছিলেন। তবে বছরের শেষ দিকে ক্রীড়াঙ্গন খুঁজে নিয়েছে নতুন পথ।
আগস্টে সরকার খেলাধুলার অনুমতি দিলে ফিরে আসে স্বস্তি। ৩ সেপ্টেম্বর আন্তজেলা তায়কোয়ান্দো দিয়ে খেলা ফেরে মাঠে। এরপর মাঠে গড়াতে থাকে অন্য খেলাও। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি—করোনাকালের নিয়ম মেনে এখন তো প্রায় সব খেলার খেলোয়াড়েরাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তবু এ বছরটা মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবে মাঝের খেলাহীন দুঃসহ সময়টার জন্যই। মাঠে খেলা না থাকার কারণে টান পড়েছে খেলোয়াড়দের আয়ে। ছোট খেলার অনেক খেলোয়াড়ের পরিবারে জ্বলেনি চুলা।
তারকা খেলোয়াড়দের সময়ও কেটেছে ঘরেই। মালয়েশিয়ায় মার্চের শুরুতে খেলে আসা সিদ্দিকুর রহমান তো বলতে গেলে বসেই ছিলেন। দেশসেরা গলফারের জীবন থেকে ব্যস্ততা কেড়ে নিয়েছে ২০২০। তবে অনলাইন উপযোগী খেলাগুলোর খেলোয়াড়েরা এর মধ্যেও ব্যস্ত ছিলেন। দাবাড়ুরা অনলাইনে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলেন। ভারোত্তোলন, তায়কোয়ান্দো, শুটিংও হয়েছে অনলাইনে।
অথচ খেলাধুলা ঘরে ঢুকে যাওয়া এই বছরেই হতে পারত মাঠে–ময়দানে জমজমাট এক বছর। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে নানা ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক আয়োজন হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। প্রায় সব ফেডারশেনই নিয়েছিল আন্তর্জাতিক আয়োজনের উদ্যোগ। টোকিও অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল আর্চারি, শুটিং। অলিম্পিকে খেলার কত স্বপ্ন রোমান সানার! করোনা এসে সেটি করে দিল দীর্ঘায়িত। এপ্রিলে বাংলাদেশ গেমস, জুনে এশিয়ান জুনিয়র হকি সবই পিছিয়ে চলে গেছে ২০২১ সালে।
সাফ ফুটবলও গেছে এক বছর পিছিয়ে। সাফের বয়সভিত্তিক ৫-৬টি টুর্নামেন্টের কোনোটিই হতে পারেনি করোনার বাধায়। বাফুফের নিয়মিত অনেক আয়োজন চলে গেছে হিমাগারে। তবে এই সময়ে অন্য কাজ হয়েছে বেশি। যেমন রেকর্ড ১৩টি কোচিং কোর্স হয়েছে এ বছর। সারা দেশের ফুটবল একাডেমিগুলোকে আনা হয়েছে বাফুফের ছাতার নিচে। জেএএফ কাপ, স্কুল ফুটবল হয়েছে। মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ৬ বছর পর হয়েছে নারী লিগও।
গত জানুয়ারিতে ফেডারেশন কাপ ফুটবলের ফাইনালটা এসেছিল ভিন্ন আমেজ নিয়ে। বসুন্ধরা কিংসের প্রতিপক্ষ পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ! চমক দিয়ে মৌসুম শুরু, কিন্তু শেষটা হতাশায় মোড়া। মাত্র ৬ রাউন্ড হওয়ার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় প্রিমিয়ার লিগসহ সব ধরনের খেলা। এরপর মে মাসে লিগটাই পরিত্যক্ত ঘোষণা হয়ে যায়। ২২ ডিসেম্বর ফেডারেশন কাপ দিয়ে ঘরোয়া ফুটবল আবার মাঠে ফেরাটা বড় স্বস্তির।
জানুয়ারিতে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে ফিলিস্তিনের কাছে ২-০ গোলে হার দিয়ে জাতীয় দলের শুরু। শ্রীলঙ্কাকে ৩-০ গোল উড়িয়ে সেমিফাইনালে বুরুন্ডির সামনে ৩-০ গোলে হার। আগষ্টে ২ বছরের নতুন চুক্তি হয় কোচ জেমি ডের সঙ্গে। তাঁর চাহিদামতো জাতীয় দলের কোচিং স্টাফে যোগ হয় রেকর্ড ৬ জন বিদেশি। কিন্তু ফলাফল সন্তোষজনক হয়নি। নভেম্বরে ঢাকায় নেপালের সঙ্গে প্রথমটি প্রথম প্রীতি ম্যাচে ২-০ জয় এলেও পরেরটি গোলশূন্য ড্র। ৪ ডিসেম্বর দোহায় কাতারের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৫-০ গোলে হার। সেই একই জায়গায় যেন ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবল।
ছেলেরা তবু কিছু ম্যাচ খেলেছে। মেয়েদের কপালে সেটিও জোটেনি। ২০১৯ সালের মার্চে সাফ ফুটবলের পর দেড় বছর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই। তারই অনিবার্য পরিণতি মেয়েদের ফিফা র্যাঙ্কিং থেকে বাদ পড়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। মেয়েদের সর্বশেষ র্যাঙ্কিং ছিল ১৩৪। ১৮৭ নিয়ে বছর শুরু করা ছেলেদের র্যাঙ্কিং বছর শেষে সেই একই জায়গায় (১৮৬)।
কিছু নতুনত্ব এলেও ফুটবলের নেতৃত্বে সেই পুরোনো মুখই। ৩ অক্টোবর বাফুফের নির্বাচনে টানা চতুর্থবারের মতো সভাপতি হয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন। সভাপতি পদে হুমকির মুখে সালাউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী বাদল রায়ের সরে যাওয়া, ব্যালটে বাদলের নাম থাকা... কত নাটকই হয়েছে নির্বাচন নিয়ে।
করোনার কাছে আত্মসমর্পণ করে এ বছর অন্যলোকে পাড়ি দিয়েছেন বেশ কয়েকজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। সেপ্টেম্বরে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য নওশেরুজ্জামান, জুনে জাতীয় দলের সাবেক মিডফিল্ডার নুরুল হক, নভেম্বরে ভলিবল কোচ গোলাম রসুলের মৃত্যু নাড়িয়ে গেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। মে মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যান জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। একই মাসে কারাতে কোচ হুমায়ন কবিরের চলে যাওয়াও ব্যথিত করেছে সবাইকে।
নানা রোগভোগের পর মে মাসে জীবনাবসান হয় সাবেক তারকা ফুটবলার গোলাম রাব্বানি হেলালের। ২২ নভেম্বর ফুটবলের লড়াকু সৈনিক বাদল রায়ের অনন্তলোকে পাড়ি জমানো শোকে ভাসিয়েছে ক্রীড়াঙ্গনকে। সেপ্টেম্বরে সাবেক ক্রিকেটার এ এস এম ফারুক, জুনে রামচাঁদ গোয়ালার মৃত্যুও নামায় শোকের ছায়া। আগস্টে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক হকি খেলোয়াড় এহতেশাম সুলতানের মৃত্যই বা ভুলবে কী করে ক্রীড়াঙ্গন!