
আকাশ যেন ভেঙে পড়েছিল সাও পাওলোতে। অঝোর বর্ষণে ভিজে জবজবে মেসিরা। এর মধ্যে যদি অশ্রুবর্ষণ হয়, সেটা আলাদা করে বোঝা অসম্ভব। সার্জিও রোমেরোর চোখ দিয়ে দুফোঁটা হলেও পানি কি ঝরেছিল? বৃষ্টি হয়তো সেটা মুছে দিতে পেরেছে, কিন্তু তার সঙ্গে লেপ্টে থাকা সংকল্প-প্রত্যয় মুছে যায়নি, যেন ঠিকরে বেরোচ্ছিল রোমেরোর মুখ থেকে।
২৪ বছরের দাহকালের শেষ হয়েছে রোমেরোর হাত ধরে। ‘হাত ধরে’ কথাটা আক্ষরিক অর্থেই বলা, দুর্দান্ত দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক তো ছিলেন ২৭ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকই। কিন্তু সংকল্প? প্রতিজ্ঞা? রোমেরোর কি কিছু প্রমাণ করার ছিল? গত বিশ্বকাপের আগে থেকেই তো দলের নিয়মিত মুখ, তাঁর দলে জায়গা নিয়ে নো প্রশ্নই ওঠার কথা নয়!
উঠেছিল এবং সেটাও বেশি দিন আগের কথা নয়, গত মার্চেই। রোমানিয়ার সঙ্গে প্রীতি ম্যাচের ঠিক আগে। বিশ্বকাপের দল ঘোষণার আগে ওটাই ছিল আর্জেন্টিনার শেষ প্রীতি ম্যাচ। শেষ ম্যাচে শেষপ্রহরী কে হবেন? আলেসান্দ্রো সাবেলার কপালে চিন্তার খানিকটা ভাঁজ। রোমেরো বরাবরই তাঁর এক নম্বর পছন্দ। কিন্তু গত মৌসুমে তো বলতে গেলে বেঞ্চে বসেই কাটাতে হয়েছে। সাম্পদোরিয়া থেকে ধারে খেলতে এসেছিলেন মোনাকোতে। খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র তিনটি ম্যাচে। আর সেই রোমেরোই কিনা সাবেলার প্রথম একাদশে! আর্জেন্টাইন দৈনিক লা ন্যাসিওন ‘নড়বড়ে গোলপোস্ট’ শিরোনাম তো এমনি এমনি করেনি।
রোমেরো জবাবটা দিলেন মাঠেই। রোমানিয়ার সঙ্গে ম্যাচের পর দলে জায়গা নিয়েও প্রশ্ন রইল না। কিন্তু তার পরও পোস্টের নিচে জায়গাটাকেই মনে করা হচ্ছিল ‘অ্যাকিলিস হিল’। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকল সাবেলার সংশয়ের মেঘ। মেসির ওই দুর্দান্ত গোলে খানিকটা আড়ালে চলে গেছেন, নইলে ইরানের সঙ্গে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে রোমেরোই তো বাঁচিয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। আর নকআউট পর্বে ওঠার পরে তো টানা তিন ম্যাচে জালে বল ঢুকতে দিলেন না। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ভাবাটা দুষ্করই ছিল বটে!
কিন্তু পেনাল্টিতে রোমেরোর অমন অতিমানব হয়ে ওঠার রহস্য কী? রন ভ্লালের প্রথম কিকটা না হয় অত কঠিন ছিল না, কিন্তু স্নাইডারেরটাকে কী বলবেন? একরকম উড়ে গিয়েই সেটি ঠেকিয়ে দিয়েছেন! পরে রোমেরোর সরল স্বীকারোক্তি, ‘পেনাল্টি হচ্ছে ভাগ্যের খেলা। আপনি ডাইভ দিলে আটকাতে পারেন । আবার নাও পারেন। তবে আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল। ঈশ্বরের আশীর্বাদে সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে।’
আবেগ-রোমাঞ্চের তুঙ্গস্পর্শী অমন একটা ম্যাচের পর অবশ্য রোমেরো এসব নিয়ে কথা বাড়াতে চাইলেন না, ‘এখন শুধু উপভোগের সময়। কাল থেকে আমরা ফাইনালের প্রস্তুতি শুরু করব। আমি ভীষণ খুশি। এই জয়টা সেসব সমর্থকের জন্য যারা মাঠে এসে আমাদের সমর্থন দিয়েছে। আমি আর্জেন্টিনায় থাকা আমার বাবা-মাকে এটা উৎসর্গ করছি।’ এএফপি, রয়টার্স, ইয়াহু স্পোর্টস, গোলডটকম অবলম্বনে।