দেশের অন্যতম টেস্ট ভেন্যু। এই মাঠেই বাংলাদেশের আছে একাধিক সুখস্মৃতি। অথচ অনাদর–অবহেলায় খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপ। এনএসসি বলছে, তহবিলের অভাবে এই স্টেডিয়ামের সংস্কার থমকে আছে।
গত দুই বছরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) প্রকৌশলী ঘুরে গেছেন চারবার। এনএসসির সচিব পরিদর্শনে এসেছেন তিনবার। বিসিবি থেকে এনএসসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিসিবির স্থানীয় পরিচালক শেখ সোহেলের চেষ্টা তো আছেই। আশ্বাস মিলেছে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকেও। তবু দুই বছর আগের ঝড়ে এখনো বিধ্বস্তই হয়ে আছে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের অবকাঠামো।
২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রবল কালবৈশাখী বয়ে যায় স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড ভবনে থাকা প্রেসিডেন্ট বক্স ও বেশ কয়েকটি করপোরেট বক্সের সামনের কাচ। বাঁকা-ত্যাড়া হয়ে বেরিয়ে আসে থাই অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেমের কঙ্কাল। বিধ্বস্ত হয় গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের সামনের সাইট স্ক্রিন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় অপর প্রান্তে থাকা প্রেসবক্সও। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, গত দুই বছরেও এনএসসি পারেনি এই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যুটিকে ঝড়ের ক্ষত থেকে সারিয়ে তুলতে। ব্যবহার–উপযোগী বলতে এখন আছে শুধু দুটি ড্রেসিংরুম এবং ম্যাচ রেফারির কক্ষ।
সামনের কাচ ভেঙে যাওয়ায় অনেকটা খোলাই পড়ে আছে ব্যয়বহুল প্রেসিডেন্ট বক্স আর করপোরেট বক্সগুলো। নষ্ট হয়ে গেছে এসব বক্সে লাগানো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, পাখাসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী। প্রেসিডেন্ট বক্সের দামি আসবাবপত্রও অযত্ন-অবহেলায় নষ্টের পথে। ভবনের জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ছে, মেঝে থেকে উঠে আসছে টাইলস, টয়লেটগুলোও ব্যবহার অনুপযোগী।
গ্যালারির দিকে তাকালেও মনে হবে, কোনো ধ্বংসস্তূপেই বুঝি এসে পড়েছেন। গ্যালারির চেয়ার তো অনেক আগে থেকেই নষ্ট হচ্ছে। বিবর্ণ প্লাস্টিকের চেয়ারগুলোর অবস্থা এখন এমন যে সেগুলো পাখপাখালির ঠোকরেও ভেঙে যায়। আশপাশের গাছে থাকা কাকের বাসা ভেঙে নাকি সেগুলোয় স্টেডিয়ামের নীল-সবুজ ভাঙা চেয়ারের টুকরো খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।
অথচ–অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকা এই স্টেডিয়াম সারা বছরই ব্যস্ত থাকে নানা খেলার আয়োজনে। জাতীয় লিগ, বিসিএল, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, মহিলা ক্রিকেট—কোনো খেলা হয় না শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে! বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির এক হিসাব বলছে, মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম বাদ দিলে ২০১৭ সালে বিকেএসপির পর খুলনার এ মাঠেই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হয়েছে। ভেন্যু হিসেবে বিকেএসপির এগিয়ে থাকার কারণ সেখানে খেলা হয় দুটি মাঠে। এক মাঠে বেশি ম্যাচের কথা বললে মিরপুরের পরেই থাকবে খুলনা। আর এসব ম্যাচ উপলক্ষে যাঁরা মাঠে আসেন, তাঁদের পড়তে হয় বিপত্তিতে। বিসিএলে বিসিবি উত্তরাঞ্চল ও প্রাইম ব্যাংক দক্ষিণাঞ্চলের ম্যাচ কাভার করতে এসে সাংবাদিকেরা যেমন খুঁজে পাচ্ছেন না বসার ভালো একটা জায়গাও। প্রচণ্ড গরম থেকেও বাঁচার কোনো উপায় নেই।
এই স্টেডিয়ামের আরেকটি দুঃখ, পাশের যশোর রোড থেকে এর মাঠ ১৮-২০ ইঞ্চি নিচুতে। প্রবল বৃষ্টিতে তাই পানি ঢুকে পড়ে মাঠে। স্থানীয় কর্মকর্তারা অবশ্য এই ভেবেই সান্ত্বনা খুঁজে পান যে পানি তো আর মাঠের ৩০ গজের ভেতরে ঢোকে না!
শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার কাজী আবদুস সাত্তার কচি জানালেন, কালবৈশাখী এই স্টেডিয়ামের জন্য অভিশাপের অপর নাম। স্টেডিয়ামের উত্তর-পশ্চিম কোনের মুজগুন্নিপাড়ার দিকটা বেশ ফাঁকা। গাছগাছালিতে ভরা এদিকটায় বহুতল ভবন নেই একটিও। কালবৈশাখীর ধেয়ে আসার পথও ওই উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়েই। ঝড় এলে সরাসরি সেটি আঘাত আনে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড ভবনে। কালবৈশাখীর আঘাত এর আগেও দু-একবার লন্ডভন্ড করেছে স্টেডিয়ামটিকে।
সে জন্য সংস্কারটাও হতে হবে ঝড় সহ্য করার মতো মজবুতভাবে। কিন্তু আগে তো সংস্কারের সিদ্ধান্ত হতে হবে! কাল বিষয়টি নিয়ে এনএসসির প্রকল্প প্রকৌশলী আওলাদ হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘স্টেডিয়ামের সংস্কারের জন্য আমি আরও আগেই ৮০-৯০ লাখ টাকার মতো খরচের একটা হিসাব দিয়েছি। কিন্তু ফান্ডের অভাবে ওপর থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। অর্থের সংস্থান হলে আমরা কাজটি করে দেব।’
আবারও আশ্বাস! আশ্বাসই যেন এখন একমাত্র ভরসা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের।