চিত্রনাট্য সাজানো ছিল। আলোকসজ্জাও ছিল ঠিকঠাক। গোধূলিবেলায় সূর্য যাই যাই করছে। সন্ধ্যার বৈশাখী হাওয়া এসে লাগছে গায়ে। ক্যামেরার লেন্স তৈরি। প্রস্তুত মঞ্চও। কিন্তু তা রাঙাবেন কে!
নাহিদ রানাকে নিয়ে আগ্রহ আছে, রোমাঞ্চও—কিন্তু তিনি শেষ ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র হতে পারবেন তো? নাহিদ এলেন, বল হাতে নিলেন, শুরু করলেন দৌড়...বলটা করার পরই শোনা গেল একটা জোরালো চিৎকার, ‘হাউজদ্যাট?’ সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি হলো মুহূর্তটা—শাহিন শাহ আফ্রিদি আউট!
ক্যামেরায় তখন খটখট শব্দ—গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস, মাঠে ম্যাচ জেতার চিৎকার বন্দী করে রাখার তাড়াহুড়ো। এমন একটা মুহূর্তের অপেক্ষা যে ২৬ বছরের! হ্যাঁ, ভুল শোনেননি। ২৬ বছর আর ১৫৭ ম্যাচ পর এই প্রথম টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো পেসার পেলেন ৫ উইকেট।
সময়ের হিসাব পিছিয়ে দেওয়া যাক আরেকটু। বাংলাদেশ পুরো ম্যাচই খেলেছে একজন পেসার নিয়ে, এই স্মৃতি দূরের নয় খুব। পেসাররা ৫ উইকেট পাবেন, স্বপ্ন হয়ে গেছে তা–ও। পথহারা গতির বোলিংয়ে বৃথা গেছে বাকি সবার পরিশ্রম। এখনকার দলে এসবের সাক্ষী সবচেয়ে বেশি হয়েছেন যে কজন, তাঁদের একজন মুশফিকুর রহিমকে কোলে তুলে নিলেন নাহিদ রানা—মনে মনে কেউ কি তখন বলেননি ‘কে লেখে এই চিত্রনাট্য!’
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কি তাহলে নাহিদ রানা? উত্তর ‘না’। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এসেই নাকচ করে দিয়ে গেছেন তা, ‘নাহিদের কথা বলার আগে আমি একটু তাসকিনের কথা বলব। আসলে তাসকিন যেভাবে চা–বিরতির পর শুরু করেছিল…।’ পেসারদের স্তুতির ভিড়ে মনে করিয়ে দেন এটাও, স্পিনাররা ওই তিনটা উইকেট না নিলে বিপদই হয়ে যেত দলের।
সেই অধিনায়কই আবার একটু পর বলেন, ‘আমরা জানি নাহিদ কত স্পেশাল, কত জোরে বল করে। প্রতিপক্ষ যেভাবে ভয় পাচ্ছিল ওর বিরুদ্ধে, (তা দেখে) ভালো লাগে অবশ্যই।’
ভয়? তাহলে আরেকটা দৃশ্যের কথা বলা যাক। নাহিদের বলটা ছেড়েই দিয়েছিলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। রিভার্স সুইংয়ে সেই বল ভেঙে ফেলেছে তাঁর স্টাম্প। পর্দায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে উঠল গতির হিসাব—ঘণ্টায় ১৪৭.২ কিলোমিটার। সত্যি করে বলুন, কল্পনার সীমানায় এমন কিছু কি ছিল কয়েক বছর আগেও!
টেস্ট জেতার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আগে হয়েছে আরও ২৫ বার, মাউন্ট মঙ্গানুইতে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর ঘটনা আছে, এই পাকিস্তানকেই দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশ হারিয়েছে পরপর দুবার। তবু এই জয়টা বিশেষ। কেন? কারণ, প্রতিপক্ষ অধিনায়কও এসে ম্যাচ শেষে বলে যান, সত্যি বলতে উইকেটটা পঞ্চম দিনেও ভালোই ছিল। এমন উইকেটে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ যেভাবে হারিয়েছে, তা সহজ কথায় ‘বলে কয়ে’।
তাইজুল আবদুল্লাহ ফজলকে আউট করে ব্রেক থ্রু এনে দেন কখনো, তাসকিন কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজ এসে চেপে ধরেন আবার, নাহিদ রানা সুন্দর করেন শেষটা। স্লিপে দাঁড়িয়ে নাজমুল যখন তাঁর রাজশাহীর সতীর্থকে আঞ্চলিক সারল্য রেখে বলেন, ‘মামুর বেটা একটা উইকেট এনে দে…’, নাহিদ ঠিকই তা এনে দেন।
কিছু কি শিখিয়ে দিতে হয় তাঁকে? নাজমুল হাসেন, ‘দু-একবার (যাই পরামর্শ দিতে)। খুব কম যাই। আগে হয়তো একটু বেশি প্রয়োজন হতো। এখন আস্তে আস্তে শিখছে, আস্তে আস্তে করছে। কখনো কখনো নিজে থেকেই যাই না। নিজের বোঝাপড়া থেকে করলে ভবিষ্যতে কাজে দেবে।’
নাহিদের সামনে ভবিষ্যৎ পড়ে আছে পুরোটাই। বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের পথচলায়ও আছে উন্নতির ছাপ। বন্ধুর পথ সেখানে থাকবে, হয়তো কখনো কখনো থমকে যাওয়াও। কিন্তু নাজমুলের বিশ্বাস, পুরো পৃথিবীতে শিগগিরই পৌঁছে যাবে একটা বার্তা, ‘বাংলাদেশ টেস্টটা এখন ভালোই খেলে…’
এমন কিছুর জন্য এ রকম আরও অনেক ছবি দরকার হবে। অপেক্ষাটাও দীর্ঘ হওয়া যাবে না আড়াই দশক। ওই পথে তুলে দিয়ে যাবেন ইবাদত হোসেন, দৌড় শুরু করবেন তাসকিন আহমেদ, রিলে রেসের পতাকাটা হাতে যাবে ভয় ধরিয়ে দেওয়া নাহিদের কাছেও। সেখানে বাংলাদেশ দ্বিতীয় হবে কখনো, কখনো তৃতীয় কিংবা কে জানে, হয়তো প্রথমও। সবে তো শুরু!