এবার পাকিস্তান কিংবদন্তি জাভেদ মিয়াঁদাদও কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নিজের দীর্ঘদিনের সতীর্থ ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। ইমরান খানকে সৎ মানুষ দাবি করে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান এবং তাঁর মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী মিয়াঁদাদ।
সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ইমরানের অধিনায়কত্বেই ১৯৯২ বিশ্বকাপ জিতেছিল পাকিস্তান। সেই ইমরান দুর্নীতির মামলায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী।
গত ২৪ আগস্ট তাঁর চিকিৎসা ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশে একযোগে চিঠি লেখেন ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও এক্সে করা পোস্টে ইমরানের পাশে দাঁড়ান। জাভেদ মিয়াঁদাদ ইমরানকে নিয়ে কথা বলেছেন পাকিস্তানের সাংবাদিকদের প্ল্যাটফর্ম ‘ন্যারেটিভস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে।
মিয়াঁদাদ অনেকের বিচারেই পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান। ইউনিস খান টপকে যাওয়ার আগপর্যন্ত দীর্ঘদিন পাকিস্তানের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি তাঁর দখলেই ছিল। ইমরানের সতীর্থ হিসেবে পাকিস্তান দলের হয়ে ৭৮টি টেস্ট খেলেছেন। পাকিস্তানের আর কোনো সতীর্থ-জুটি তাঁদের মতো দেশের এত বেশি টেস্ট খেলতে পারেননি।
আমরা অনেক সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি এবং একসঙ্গে খেলেছি। আমি ইমরানকে খুব ভালোভাবে চিনি। সে একজন সৎ মানুষ।জাভেদ মিয়াঁদাদ, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক
ইমরানকে নিয়ে ‘ন্যারেটিভস’কে মিয়াঁদাদ বলেন, ‘কেউ আমাকে এটা বুঝিয়ে বলুন। সে কি পাকিস্তানকে খেয়ে ফেলবে? আমরা সবাই পাকিস্তানি। একসঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধান করা উচিত। সমস্যা যা-ই হোক, পাকিস্তানের এখন সেটিই প্রয়োজন। পরিস্থিতিকে অযথা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে, এটা ঠিক নয়।’
খেলোয়াড়ি জীবনে ইমরান খানের সঙ্গে মিয়াঁদাদের কি কোনো বিরোধ বা শত্রুতা ছিল? এমন ধারণা নাকচ করে দেন ৬৯ বছর বয়সী মিয়াঁদাদ, ‘কোনো শত্রুতা ছিল না। আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়াও হয়নি।’
ইমরানের সঙ্গে ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার স্মৃতিচারণা করে মিয়াঁদাদ বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেটও খেলেছি। ইংল্যান্ডে ছয় মাস একসঙ্গে ছিলাম। পরে পাকিস্তান দলে আমি তাকে অধিনায়কত্বও দিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল এবং আমরা একসঙ্গে ক্রিকেটের একটি দারুণ সময় কাটিয়েছি।’
মিয়াঁদাদ যোগ করেন, ‘সেও কারও সন্তান। প্রায়ই আমার মনে হয়—বেচারা কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি, সময় কাটিয়েছি এবং একে অপরকে খুব ভালোভাবে বুঝতাম। একসঙ্গে আমরা পাকিস্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলাম।’
অবসর-পরবর্তী সময়ে ইমরান খানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) পরিচালনা নিয়ে মিয়াঁদাদ অতীতে কঠোর সমালোচনা করেছেন। ক্রিকেটজীবনের উষ্ণ সম্পর্কও পরবর্তী সময়ে কিছুটা তিক্ত হয়ে উঠেছিল। তবে গতকালের সাক্ষাৎকারে মিয়াঁদাদ বলেন, তার আগের মন্তব্যগুলোও হৃদয় থেকে এসেছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানের জন্য ইমরানের অবদান যেন ভুলে যাওয়া না হয়, সেই আহ্বান জানান কিংবদন্তি।
মিয়াঁদাদ বলেন, ‘যা ভুল, তা ভুলই। অবশ্যই সে একজন জাতীয় বীর। আমি প্রার্থনা করি, এই সমস্যার সমাধান হোক। আমি পাকিস্তান সরকারের কাছেও আবেদন জানাচ্ছি। হয়তো অনেক কিছু বলার অবস্থানে আমি নেই, তবে এটুকু বলতে পারি—সে আমার সহকর্মী। আমরা অনেক সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি এবং একসঙ্গে খেলেছি। আমি ইমরানকে খুব ভালোভাবে চিনি। সে একজন সৎ মানুষ।’
এরপর সাবেক সতীর্থের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মিয়াঁদাদ। অশ্রুভেজা চোখে মিয়াঁদাদ বলেন, ‘আমার প্রার্থনা হলো, যা সঠিক, তা যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর বেশি আর কী বলতে পারি? আপনারা আমার চোখে পানি এনে দিয়েছেন। আমি যা বলছি, হৃদয় থেকেই বলছি।’
মিয়াঁদাদ যোগ করেন, ‘আমি যদি কিছু করতে পারি, অবশ্যই করব। আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমরা সবাই পাকিস্তানের পতাকা বহন করেছি। অন্য সব মতপার্থক্যের অবসান হওয়া উচিত। দেশপ্রেমের দিক থেকে সে কারও চেয়ে কম নয়। আমরা ক্রিকেট মাঠে লড়েছি। কার জন্য লড়েছি? পাকিস্তানের জন্য, যা হওয়ার হয়েছে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। এখন এটাকে শেষ করুন।’
ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথাও তুলে ধরেন মিয়াঁদাদ, ‘সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেশের সেবা করেছে। তার বিরুদ্ধে চুরির কোনো অভিযোগ নেই, কিংবা সে ধরনের কোনো অভিযোগও নেই।’
ইমরানের কিছু হলে পাকিস্তানে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিয়াঁদাদ, ‘আল্লাহ না করুন, তার কিছু হলে কী ঘটবে দেশে, তা কি কল্পনা করতে পারেন? পুরো পাকিস্তান কাঁদবে।’
ইমরান খান ও জাভেদ মিয়াঁদাদের ক্রিকেটীয় বন্ধুত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ১৯৯২ বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে তৃতীয় উইকেটে দুজন মিলে গড়েছিলেন ১৩৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। সেই জুটি পাকিস্তানের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পর খেলা ছেড়ে ইমরান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর দুর্নীতি ও অন্যান্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে রয়েছেন। ইমরান তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলাগুলোতে কোনো ধরনের অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন এবং মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।