জাতীয় ক্রিকেট লিগের এক ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ছেন ক্রিকেটাররা
জাতীয় ক্রিকেট লিগের এক ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ছেন ক্রিকেটাররা

কীভাবে বেতন পান বিসিবির প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা, ১৪ বছরে বাড়ল কতবার

জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বেতন নিয়ে কৌতূহল সবার। তবে বিসিবির কাছ থেকে বেতন পান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলা আরও এক শর বেশি ক্রিকেটার। বেতনের অঙ্কটা শুরুতে কম থাকলেও এখন তা বেড়ে একেবারে খারাপও নয়।

২০১২ সালে প্রথমবার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের সঙ্গে চুক্তি করে তাঁদের বেতনের আওতায় আনে বিসিবি। তখন তিন শ্রেণিতে বেতন দেওয়া হতো ১০০ ক্রিকেটারকে; বেতনের অঙ্ক ছিল ১৫, ২০ ও ২৫ হাজার টাকা করে। চার দফায় বেড়ে সেই বেতন এখন সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার টাকা। সর্বশেষ বেতন বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে গত বুধবার।

কতজন বেতন পান, কীভাবে পান

জাতীয় লিগ ও বিসিএলে খেলা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের বেতন দেওয়া হয় ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ এই তিন ক্যাটাগরিতে। এ বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের এই চুক্তিতে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে আছেন ১৬ জন, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ১১ জন ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে আছেন ৭৭ জন ক্রিকেটার। বেতনকাঠামো হওয়ার পর প্রথম দুই বছর ম্যাচ খেলার সংখ্যা বিবেচনায় কে কোন ক্যাটাগরিতে থাকবেন, তা ঠিক করা হতো। এখন ম্যাচসংখ্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে পারফরম্যান্সও।

প্রতিটি ম্যাচ খেলার জন্য ১ পয়েন্ট, ফিফটির জন্য ২ পয়েন্ট, সেঞ্চুরির জন্য ৪ পয়েন্ট এবং বল হাতে ৫ উইকেটের জন্য ৪ পয়েন্ট পান ক্রিকেটাররা। কোনো ক্রিকেটারের পয়েন্ট যখন দুই শর বেশি হয় তিনি তখন ‘এ’ ক্যাটাগরিতে জায়গা পান, ১০১ থেকে ১৯৯ পর্যন্ত পয়েন্ট হলে ‘বি’ ক্যাটাগরি আর ১০০–এর নিচে পয়েন্ট থাকা ক্রিকেটাররা থাকেন বেতনকাঠামোর ‘সি’ ক্যাটাগরিতে।

যে ভাবনা থেকে বেতন দেওয়া শুরু

ফ্র্যাঞ্চাইজি টি–টুয়েন্টি লিগ বিপিএল ও জাতীয় লিগের পর দেশের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের আসর বিসিএল চালু করা এবং বিসিবির গ্রাউন্ডসম্যানদের পে–রোলের আওতায় আনার মতো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের বেতনভুক্ত করার সিদ্ধান্তও সাবেক বিসিবি সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামালের সময়ে হয়েছে।

ফজলে মাহমুদ

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা বেতনের আওতায় আসেন ২০১২ সালে। ওই সময় বিসিবির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু হলে তৎকালীন টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান গাজী আশরাফ হোসেন বোর্ড সভায় প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। গতকাল তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বাইরেও যেন খেলোয়াড়দের নিয়মিত ভিত্তিতে ছোট আকারে হলেও আয় থাকে, সেটার জন্য এ উদ্যোগটা আমরা নিয়েছিলাম। তখন সবাই বাসে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত, আমরা তাই জীবনবিমা ও স্বাস্থ্যবিমাও চালু করেছিলাম।’

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হিসেবে এই চুক্তির শুরু থেকেই বেতনের আওতায় আছেন বরিশালের ক্রিকেটার ফজলে মাহমুদ। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ১৫ হাজার টাকা বেতনে শুরু হয়েছিল তাঁর। সেই স্মৃতি শোনাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে তখন ছয় মাসের বেতন দিত। জুন মাসে বৃষ্টির মৌসুম, তখন কোনো খেলা থাকত না, ওই সময়ে টাকাটা অ্যাকাউন্টে ঢুকত, ভালোই লাগত।’

কতবার বেতন বেড়েছে, এখন কত

২০১২ সালে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে যথাক্রমে ২৫ হাজার, ২০ হাজার ও ১৫ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হতো। চার বছর পর ২০১৬ সালে তা বাড়িয়ে তিন শ্রেণিতে ২৮ হাজার, ২২ হাজার ও ১৭ হাজার টাকা করা হয়। মাঝে ছয় বছর বেতন বাড়েনি, আবার বেতন বাড়ানো হয় ২০২৩ সালে। এই দফায় বাড়িয়ে ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের বেতন ৩৫ হাজার, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৩০ হাজার ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ২৫ হাজার টাকা করা হয়।

বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ বেতন ৫০ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল নাজমুল হাসান বোর্ড সভাপতি থাকার সময়ই। অন্য দুই ক্যাটাগরির বেতন বাড়ানোরও কথা ছিল। তামিম ইকবাল বিসিবির দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিতীয় বোর্ড সভায় তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেটি কার্যকর ধরা হবে এ বছরের জানুয়ারি থেকেই। তবে অঙ্কটা আরেকটু বেড়ে ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের বেতন হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা, ‘বি’ ক্যাটাগরির ৫০ হাজার ও ‘সি’ ক্যাটাগরির ৪০ হাজার টাকা।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০ হাজার রান করেছেন মার্শাল আইয়ুব

এই সময়ের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াতে সড়কের বদলে উড়াল পথ, এসি বাস এবং ম্যাচ ভেন্যুর ভালো হোটেলে আবাসনের ব্যবস্থাও হয় ক্রিকেটারদের। সমানতালে বাড়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি। ২০১২ সালে ম্যাচ ফি হিসেবে ক্রিকেটাররা যেখানে পেতেন ২০ হাজার টাকা, কয়েক দফায় তা বেড়ে সর্বশেষ ছিল ৭৫ হাজার টাকা। সর্বশেষ বোর্ড সভায় সেটি বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে।

নারী ক্রিকেটের কী অবস্থা

ছেলেদের মতো নারী ক্রিকেটারদের বেতন আর ম্যাচ ফি–ও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। দুই বছর আগে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের বাইরে ৩৫ নারী ক্রিকেটারকে চুক্তির আওতায় আনা। এবার তাঁদের বেতনও ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

তিন বছর আগেও নারী ক্রিকেটাররা ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ ফি হিসেবে পেতেন এক হাজার টাকা। পরে তা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার করা হয়েছিল। এখন ওয়ানডের জন্য ম্যাচ ফি ১৫ হাজার টাকা ও টি–টুয়েন্টির জন্য ১০ হাজার টাকা। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেট খেললে নারীরা পাবেন ২০ হাজার টাকা।

ক্রিকেটাররা কী বলেন

প্রায় দুই দশক ধরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলছেন মার্শাল আইয়ুব। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের বেতন ও সুযোগ–সুবিধা বাড়ানোর দাবিতেও সব সময় সরব ছিলেন তিনি। নতুনভাবে বেতন বাড়ানোর খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রথম আলোকে মার্শাল বলেছেন, ‘খুবই ভালো একটা উদ্যোগ। সুযোগ–সুবিধা না থাকলে খেলায় সিরিয়াসনেস থাকে না। এলাম, খেললাম, চলে গেলাম—এমন একটা ভাব থাকে। আমি কয়েকজন তরুণ ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলেছি, ওরা খুবই রোমাঞ্চিত।’