প্রিয় ফুটবলার আর্জেন্টিনার লাওতারো মার্তিনেজ, উইকেট পেয়ে উদ্‌যাপনটাও তাই তাঁর মতো কৃষাণ কালুগামাগের
প্রিয় ফুটবলার আর্জেন্টিনার লাওতারো মার্তিনেজ, উইকেট পেয়ে উদ্‌যাপনটাও তাই তাঁর মতো কৃষাণ কালুগামাগের

পিৎজার কারিগর থেকে বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম ম্যাচ জয়ের নায়ক

কৃষাণ কালুগামাগে খুব ভালো পিৎজা বানান। পিৎজা বানানোর পর অবসর সময়টাতে রোমের অ্যাস্ট্রোটার্ফে গিয়ে বল ঘোরান। ঠিক একই দক্ষতায়, যেভাবে তিনি পিৎজার খামির ঘোরাতে ঘোরাতে ছুড়ে মারেন শূন্যে। কেউ কালুগামাগের পিৎজা খেতে চাইলে যেতে পারেন ইতালির লুক্কায়। জায়গাটা ফ্লোরেন্সের রাজধানী এবং ছবির মতো সুন্দর তুসকান অঞ্চলে। সেখানকার পিৎজা পারলারে খুঁজে পাবেন কালুগামাগেকে।
অবশ্য ইতালিয়ানরা তো পিৎজার পাগল। হাজারো পিৎজা পারলার আছে সেখানে। তাই ইতালিতে গিয়ে তাঁকে খোঁজার ঝামেলা পোহাতে না চাইলে অন্য ব্যবস্থা আছে—টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ। টিভি কিংবা স্ট্রিমিংয়ে গতকাল নেপাল–ইতালির ম্যাচে নিশ্চয়ই দেখেছেন তাঁকে?
কালুগামাগের বোলিংয়ের সময় মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে কিছু সমর্থককে একটু বেশিই উল্লাস করতে দেখা গেল, তাঁরা সম্ভবত শ্রীলঙ্কান। অন্য কোনো দেশের নাগরিকও হতে পারেন। পারফরম্যান্সটা ভালো হলে তো ক্রিকেটার কি আর নির্দিষ্ট কোনো দেশের থাকেন! নেপালের বিপক্ষে ১৮ রানে ৩ উইকেট নেওয়া কালুগামাগেও হাঁটছেন সে পথে। তবে সেই পথে ওঠার যে কষ্ট, তা কবি দেবব্রত সিংহের ‘তেজ’ কবিতার লাইনগুলোর মতো—খাড়া পাহাড়ে উঠা যে কী জিনিস/ বহুত দম লাগে/ বহুত তেজ লাগে।’

কালুগামাগে যেন সেই তেজেরই মূর্ত প্রতিচ্ছবি। সেই ছবির ভেতরকার মানুষের ভালোবাসাটা আগে জেনে নিন—কালুগামাগে ক্ল্যাসিক লেগ স্পিনার। স্বচ্ছন্দ অ্যাকশন—ফ্লাইট আছে, বাঁকও। আর আছে খুব ভালো ভণিতার জাল, মানে গুগলি। সেই জালেই ফেঁসেছেন নেপালের রোহিত পৌডেল ও দীপেন্দ্র সিং ঐরী। আর গুলশানের উইকেটটি জোর করে মারার ফসল।

কালুগামাগের জন্ম শ্রীলঙ্কায়। ২০০৭ সালে বাবা–মা জীবিকার টানে ইতালিতে পাড়ি জমানোর সময় তিনি ১৬ বছরের এক টগবগে কিশোর। ‘ছুটি’ গল্পের সেই ফটিক চক্রবর্তীর মতোই ভিন জায়গায় পাড়ি জমানোয় তাঁর হৃদয়টা এঁফোড়–ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল। কারণ আর কী, সেই ক্রিকেটই!

ফসল তুলে নেওয়ার পর তাঁর কি পেছন ফেলে আসা বন্ধুর পথটা মনে পড়েছে? জীবিকা নির্বাহে দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে শাণ দিয়েছেন লেগ স্পিনে। মনের ভেতরে বপন করা ছিল একটা বিশ্বাসের বীজ—ক্রিকেট তাঁকে একদিন পায়ের তলায় মাটি এনে দেবে। দাঁড় করাবে এমন একটা জায়গায়, যেখান থেকে দেখবেন গোটা বিশ্বের মানুষ দেখছে তাঁকে! টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ তো তেমনই এক আসর।
বৈশ্বিক এই মঞ্চে পা রাখার আগেই ৩৪ বছর বয়সী এই মানুষটি টের পেয়েছেন স্বপ্নপূরণ কাকে বলে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে পূরণ হয়েছে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন। আর গতকাল পূরণ হলো বৈশ্বিক মঞ্চে উইকেট পেয়ে উদ্‌যাপনের স্বপ্ন। কালুগামাগের সেই স্বপ্নে তা দেওয়ার সময় কেমন লেগেছে, সেটা তাঁর মুখেই শুনুন, ‘বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়ার পর কেমন লেগেছে, সেটা বলে বোঝাতে পারব না। আমরা কয়েকজন কেঁদেছি, কারণ এই স্বপ্নটা দেখেছি। আমার ব্যাপারটা দ্বিগুণ আনন্দের। কারণ, বিশ্বকাপ হচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও ভারতে।’

উইকেট পাওয়ার পর কালুগামাগের উদ্‌যাপন

কালুগামাগের জন্ম শ্রীলঙ্কায়। ২০০৭ সালে বাবা–মা জীবিকার টানে ইতালিতে পাড়ি জমানোর সময় তিনি ১৬ বছরের এক টগবগে কিশোর। ‘ছুটি’ গল্পের সেই ফটিক চক্রবর্তীর মতোই ভিন জায়গায় পাড়ি জমানোয় তাঁর হৃদয়টা এঁফোড়–ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল। কারণ আর কী, সেই ক্রিকেটই! স্কুলে বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেলে এবং স্কুল শেষে ক্রিকেটে মত্ত একটা ছেলে অবসর সময়ে রেডিওতে দাদার সঙ্গে খেলার ধারাভাষ্য শুনে বড় হয়েছে। এমন জীবন ছেড়ে কে যায় মরতে ক্রিকেটে বেরসিক একটা দেশে!
ইতালিয়ান স্কুলে অবশ্য তাঁকে খুব একটা হতাশ হতে হয়নি। লঙ্কান বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতেন। ধীরে ধীরে লুক্কার ছোটখাটো ক্রিকেট ক্লাবেও সুযোগ মিলল। পেশাদার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথে তাঁর জন্য বড় দরজাটা খুলল ২০১৫–১৬ মৌসুমে—যখন ইতালির অন্যতম পুরোনো রোমা ক্রিকেট ক্লাব থেকে ডাক এল। কালুগামাগে তার পর থেকে এই ক্লাবেরই ‘ঘরের ছেলে’।

ইতালি ফুটবল–পাগল দেশ। এবার তাদের বিশ্বকাপ অভিষেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরি, আন্দ্রেয়া পিরলোর মতো কিংবদন্তিরা। কালুগামাগে নিজে ইন্টার মিলানের সমর্থক। ক্লাবটির আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ তাঁর সবচেয়ে পছন্দের খেলোয়াড়। মার্তিনেজের মতো উদ্‌যাপনও করেছেন উইকেট পাওয়ার পর।

হঠাৎ করে বেশ লম্বা হয়ে ওঠায় ভেবেছিলেন ফাস্ট বোলার হবেন। ইতালি ‘এ’ দলেও খেলেছেন ফাস্ট বোলার হিসেবে! ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি কাস্টমস ক্লাবেও ছিল একই পরিচয়। কিন্তু ক্রমাগত চোটের কারণে ২০২১ সাল থেকে কালুগামাগে হয়ে গেলেন লেগ স্পিনার। তাতে রোমা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাত একলিংগোদার অবদান কম নয়। পাকা জহুরির মতো তিনি চিনেছিলেন কালুগামাগের ভেতরের প্রতিভা। লেগ স্পিনই তাঁর ভবিষ্যৎ!

শৈশবে কালুগামাগের আদর্শ ছিলেন অরবিন্দ ডি সিলভা ও সনাৎ জয়াসুরিয়া। লেগ স্পিনার হওয়ার পর পাল্টালেন আদর্শ—শেন ওয়ার্ন, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ও রশিদ খানও। বিশ্বকাপের আগে কলম্বোয় এক মাস খেটেছেন শ্রীলঙ্কা দলের নেট বোলার হিসেবে। সেখানেই হাসারাঙ্গার কাছ থেকে দীক্ষা পান হাতে–কলমে। খেয়াল করে দেখবেন, হাসারাঙ্গা ও কালুগামাগের বোলিং অ্যাকশন প্রায় একই রকম। ওহ্‌ গুগলির কথা বলা হয়নি—গত বছর দুবাইয়ে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে হাতের কাছে পেয়েছিলেন রশিদকে। গুগলির টোটকাটা পেয়ে যান আফগান কিংবদন্তির কাছ থেকে।
এসব স্বপ্নপূরণের গল্পে সবচেয়ে কঠিন বিষয়টি শুনুন কালুগামাগের মুখেই, ‘ইতালিতে অনেক কাজ পেয়েছি, কিন্তু অনেক কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে শুধু ক্রিকেটের জন্য। কারণ, টুর্নামেন্টের সময় তারা আমাকে ছুটি দিতে পারত না।’
কালুগামাগের ঠিকানাটা বলা যাক। লুক্কার লা ভিটা পিৎজেরিয়াতে কাজ করেন সোমবার থেকে শনিবার। রোববার রোমে গিয়ে অনুশীলন করে ফেরেন রাতে। কিন্তু এভাবে আর কত দিন! কালুগামাগে এসব কাজ ছেড়েছুড়ে পূর্ণ মেয়াদে পেশাদার ক্রিকেটার হতে চান, ‘বিশ্বকাপের পর দেখা যাক কোথাও এ সুযোগ মেলে কি না।’
ইতালি ফুটবল–পাগল দেশ। এবার তাদের বিশ্বকাপ অভিষেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরি, আন্দ্রেয়া পিরলোর মতো কিংবদন্তিরা। কালুগামাগে নিজে ইন্টার মিলানের সমর্থক। ক্লাবটির আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ তাঁর সবচেয়ে পছন্দের খেলোয়াড়। মার্তিনেজের মতো উদ্‌যাপনও করেছেন উইকেট পাওয়ার পর। বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম জয়ের নায়ক হয়ে আরেকবার উদ্‌যাপন করেছেন পিৎজার কারিগর কালুগামাগে।