টিম হোটেলে শরীফুল ইসলাম। আজ ম্যাকাইয়ে
টিম হোটেলে শরীফুল ইসলাম। আজ ম্যাকাইয়ে

শরীফুলের ‘সেরা’ বলের সঙ্গে আর কী নিয়ে ফিরবে বাংলাদেশ

খেলা দুই দিনে শেষ, তাই বলে ম্যাকাই সহজে ছাড়ছে না বাংলাদেশ দলকে! একই অবস্থা বাংলাদেশ থেকে সিরিজ কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের। সবার বিমান টিকিটই খেলা পাঁচ দিন হবে ধরে নিয়ে করা। এখানকার ডমেস্টিক ফ্লাইটের স্বল্পতা এবং ব্যস্ত সূচির কারণে চাইলেই এগিয়ে আনা যাচ্ছে না টিকিট।

কাজেই খেলা না থাকলেও ম্যাকাইয়ে থাকতে হচ্ছে সফরকেন্দ্রিক বেশির ভাগ মানুষকেই। কয়েকজন ক্রিকেটার অবশ্য পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ারই অন্য শহরে ঘুরতে যাচ্ছেন। অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার ছোট্ট এ শহরেই এই কয়টা দিন যাঁরা থাকবেন, তাঁদেরও সময়টা খারাপ কাটবে বলে মনে হয় না। ডারউইন টেস্ট জিতে অর্জিত সম্মান এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্ট সিরিজ ড্র করতে পারার সামর্থ্য অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে তুলে দিয়েছে বেশ উঁচুতে।

দলের সঙ্গে থাকার সুবাদে ডারউইন থেকেই এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী হচ্ছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। ডারউইনে এবং এখানেও বেশ কয়েকবারই তিনি বলেছেন অস্ট্রেলিয়ানদের সামনে কতটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ দলের।

ম্যাকাইয়ের টিম হোটেলে আজ সকালে আরও একবার তিনি বললেন সেই প্রসঙ্গে, ‘অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর থেকে যে জিনিসটা আমাকে বেশি অভিভূত করেছে, শুধু সাবেক ক্রিকেটাররা নয়, সাধারণ মানুষও যেভাবে আমাদের ক্রিকেটারদের প্রশংসা করেছে এবং অভিনন্দন জানিয়েছে...অসাধারণ! ডারউইন থেকে শুরু করে সবখানে, আমরা যখন রেস্টুরেন্টে গিয়েছি বা বাইরে গিয়েছি, সবাই এসে অভিনন্দন জানিয়েছে। তাদের মন খারাপ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া হেরেছে বলে, তবে একইভাবে আমাদের প্রশংসাও করেছে।’

অস্ট্রেলিয়া সফরে দলের সঙ্গে আছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। আজ ম্যাকাইয়ে তোলা ছবি

হাবিবুলের বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়া দলও এখন থেকে বাংলাদেশকে অন্য চোখে দেখবে, ‘অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা অবশ্যই বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এখন অন্য চোখে দেখছে। তারা জানে বাংলাদেশ ক্রিকেট সবাইকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন।’

বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়া আসার আগে কেউ হয়তো কল্পনাও করেননি, একটা টেস্ট জিতে এখান থেকে সিরিজ ড্র করে ফেরা যাবে। এখন সেটাই হচ্ছে, শুধু তা–ই নয়, প্রথম টেস্ট জেতায় সিরিজ জয়েরও সম্ভাবনা ছিল বাংলাদেশ দলের। হাবিবুল জানিয়েছেন, সে রকম আশা তাঁদেরও ছিল, ‘প্রত্যাশা অবশ্যই ছিল। সিরিজ জেতার একটা সুযোগ আমরা তৈরি করেছিলাম। তবে আমরা জানতাম অস্ট্রেলিয়া টেস্টের এক নম্বর দল। তারা তাদের সব শক্তি নিয়ে এই ম্যাচটা খেলবে। তাদের ২-০–তে হারানোটা একটু কঠিনই ছিল।’

সিডনির উদ্দেশে ম্যাকাই ছেড়েছেন নাজমুল হোসেন

ম্যাকাইয়ে ভালো ক্রিকেট খেলতে না পারার হতাশাও কাজ করছে জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়কের মধ্যে। তবে অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের মতো তিনিও মনে করেন, টস হারাটাই বেশি বিপদে ফেলেছে দলকে, ‘আমরা আরও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতাম। তবে আমার মনে হয়, আমরা সবাই দেখেছি, টসটা আসলে একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। টসের ওপর তো কারও হাত নেই, আপনি হারতেও পারেন জিততেও পারেন।’

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার পেস সহায়ক উইকেটে ব্যাটিং করাটা কষ্ট হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার জন্যও, সেটি মনে করিয়ে দিয়ে হাবিবুল বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ানদেরও ব্যাটিং করতে কষ্ট হয়েছে। আমরা যদি আগে বোলিং করতাম, তাহলে ভিন্ন কিছু হলেও হতে পারত। কারণ, অস্ট্রেলিয়া একটা সুযোগ নিয়েছিল। তারা যে ধরনের উইকেট দিয়েছে এই টেস্ট ম্যাচে, এটা যে কারও ম্যাচ হতে পারত। আমরা যেমন স্পিনিং ট্র্যাক বানাই, ওরা ও রকমই ফাস্ট ট্র্যাক বানিয়েছে। এ ধরনের কন্ডিশনে আমরা ব্যাটিং করে অভ্যস্ত নই।’

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন তাসকিন আহমেদ

ম্যাকাই টেস্টে দুই দিনে হারার দিন বাংলাদেশ পেয়েছে একটা সুখবরও। টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবারের মতো ৬ নম্বরে উঠে এসেছে তারা। দুই দিনে হারের জ্বালা সেটা কিছুটা হলেও কমাচ্ছে হাবিবুলের। তবে এখানে বাস্তবতার মাটিতেই পা রাখতে চাইছেন তিনি, ‘আমি এখনই বলব না যে টেস্ট দল হিসেবে আমরা খুব ভালো হয়ে গিয়েছি। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। তবে হ্যাঁ, আমরা এখন নিজেদের একটা বার্তা দিতে পেরেছি। শুধু অস্ট্রেলিয়া টেস্ট নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে বা তার আগেরগুলোও খেয়াল করলে দেখবেন, আমরা টেস্ট এখন নিয়মিত জিতছি। গত ২ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে বলতেই হবে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট অনেক দূর এগিয়ে গেছে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও আমরা এখন খুব ভালো অবস্থায় আছি।’

অস্ট্রেলিয়ায় ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ দলের

হাবিবুল বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫টি টেস্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া সম্মান এবং অভিজ্ঞতা এই টেস্টগুলোয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পেসারর যেভাবে সাফল্য তুলে নিয়েছেন, এটি বাংলাদেশের পেস বোলিংয়েরই নতুন বিজ্ঞাপন এখন। ম্যাকাইয়ে ৭ উইকেট নেওয়া শরীফুল ইসলাম তো নাকি আগেই হাবিবুলকে বলেছিলেন এই টেস্টে তিনি ৫ উইকেট নেবেন, ‘ও আমাকে এর আগে বলেছিল যে টেস্ট ক্রিকেটে সে কখনো ৫ উইকেট পায়নি। সে এখানে ৫ উইকেট পেতে চাইছিল। ওর একটা স্বপ্ন ছিল যে টেস্ট ক্রিকেটে ৫ উইকেটের অর্জনটা পেতে চায়। সেটাই বলেছিল।’

গত কয়েক বছরে শরীফুলের মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখতে পাচ্ছেন হাবিবুল, ‘তিন বছর আগে, ২০২১-২২–এর দিকে যখন শরিফুল ভালো করছিল, তখনো সে লাল বলের ক্রিকেট নিয়ে অতটা উৎসাহ দেখাত না। সাদা বলের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ বেশি ছিল। তবে গত এক বছর ধরে দেখছি শরীফুল লাল বলের ক্রিকেট নিয়েও অনেক আগ্রহ দেখাচ্ছে।’

ম্যাকাই টেস্টে ৭ উইকেট নিয়েছেন শরীফুল ইসলাম

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওয়ানডে আর টি–টুয়েন্টিরও গুরুত্ব আছে। আইসিসির বড় বড় টুর্নামেন্টগুলো হয়তো এই দুটি সংস্করণেই। তবে হাবিবুলের চোখে ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে লাল বলের ক্রিকেটের বিকল্প নেই। তাঁর কথা, ‘সাদা বলের ক্রিকেটও গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিশ্বমানে যেতে হলে লাল বলে পারফর্ম করতে হবে। দেখে ভালো লাগছে যে শরীফুল সেটা করতে চাইছে। সে দারুণ একজন বোলার। ম্যাকাই টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ১০টা আর আমাদের ২০টা মিলিয়ে ৩০টা উইকেট পড়েছে। কিছু অসাধারণ ডেলিভারি ছিল, তবে শরিফুল যেভাবে ক্যামেরন গ্রিনকে আউট করেছে, সেটা এই টেস্ট ম্যাচের সেরা বল ছিল।’