বিসিবি কার্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল
বিসিবি কার্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল

রাজনীতির দুষ্টচক্রেই আটকে থাকল বাংলাদেশের ক্রিকেট

সরকার যায়, সরকার আসে। ‘নির্বাচিত সরকার’, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আবার নির্বাচিত সরকার। তবু রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারে না বাংলাদেশের ক্রিকেট।

এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) কর্তৃক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া এবং বিএনপির মন্ত্রী–সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের রেখে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা।

কমিটির প্রধান করা হয়েছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে, যিনি বিসিবির ৬ অক্টোবরের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও পরে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

অ্যাডহক কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে আছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজের স্ত্রী আইনজীবী রাশনা ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমদ ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের ছেলে ইসরাফিল খসরু।

কমিটির ১১ সদস্যের অন্যরা হলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খান, এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে থাকা তানজিল চৌধুরী, সালমান ইস্পাহানি, রফিকুল ইসলাম ও ফাহিম সিনহা।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী আসতে পারে, সেটি অনুমান করাই যাচ্ছিল। অতীতের দৃষ্টান্ত মেনে সরকার পরিবর্তনের পর আমিনুলের বোর্ডের বিদায় নেওয়াটা যেন ছিল সময়ের ব্যাপার, প্রয়োজন ছিল শুধু একটি প্রক্রিয়া। তদন্ত কমিটি গঠন সেটারই অংশ।

তাঁদের মধ্যে তানজিল চৌধুরী প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান, সালমান ইস্পাহানি ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান, রফিকুল ইসলাম দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইন্দিরা রোড ক্রীড়াচক্রের কর্মকর্তা ও ফাহিম সিনহা এক্‌মি ল্যাবরেটরিজের পরিচালক। ফাহিম সিনহা আওয়ামী লীগ আমলের সর্বশেষ বোর্ডে ছিলেন, ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ফারুক আহমেদের বোর্ডেও। অ্যাডহক কমিটিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিসিবির নির্বাচন আয়োজন করতে বলা হয়েছে। তবে এনএসসির সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিদায়ী সভাপতি আমিনুল ইসলাম দাবি করছেন, তিনিই এখনো বিসিবির বৈধ সভাপতি।

গত ৬ অক্টোবরের সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে বিসিবি সভাপতি হয়েছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম। সে নির্বাচন নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া নির্বাচনে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর মনোনয়নে হস্তক্ষেপ করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

নির্বাচনে বেশ তোড়জোড় করেই বোর্ড পরিচালক হতে মাঠে নেমেছিলেন তামিম। বোর্ড সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যের কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন পরিষ্কার। কিন্তু নির্বাচনী ‘কৌশলে’ ঠিক পেরে ওঠেননি। যে কারণে শেষ মূহূর্তে জোটবদ্ধভাবে সরে দাঁড়ান নির্বাচন থেকে। মনোনয়ন প্রত্যাহার করা ১৬ জনের মধ্যে তামিম ছাড়াও ছিলেন গতকাল গঠিত অ্যাডহক কমিটির সদস্য সাঈদ ইব্রাহিম আহমদ, ইসরাফিল খসরু, মির্জা ইয়াসির আব্বাস, রফিকুল ইসলাম ও ফাহিম সিনহা। তাঁদের সবাই বিএনপির অলিখিত সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন।

নির্বাচনী কৌশলে পেরে না ওঠায় এর আগে বোর্ড পরিচালক হতে পারেননি তামিম। গতকাল অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি পা রাখেন বিসিবি কার্যালয়ে

বিসিবির নির্বাচনের পর থেকেই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ জানাতে থাকে তামিমের পক্ষ। ঘরোয়া লিগে অংশ না নিয়ে আমিনুলের বোর্ডকে ধারাবাহিকভাবে অসহযোগিতাও করতে থাকে, যার শেষটা হয়েছে এনএসসির তদন্ত কমিটি গঠন করা দিয়ে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী আসতে পারে, সেটি অনুমান করাই যাচ্ছিল। অতীতের দৃষ্টান্ত মেনে সরকার পরিবর্তনের পর আমিনুলের বোর্ডের বিদায় নেওয়াটা যেন ছিল সময়ের ব্যাপার, প্রয়োজন ছিল শুধু একটি প্রক্রিয়া। তদন্ত কমিটি গঠন সেটারই অংশ। গতকাল এনএসসির সভাকক্ষে বোর্ড ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে এনএসসির পরিচালক (ক্রীড়া) আমিনুল এহসান জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি নাকি বিসিবির তিন ক্যাটাগরির নির্বাচনেই অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে।

সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ‘অযৌক্তিক’ হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়ার কথাও আছে তদন্ত প্রতিবেদনে। বিসিবির সদ্য সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং তার এপিএস সাইফুল ইসলামের সহায়তায় সমন্বিতভাবে ই-ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে দাবি তদন্ত কমিটির।

আমিনুল এহসান জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৮ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নীতিমালার ২১ ধারা অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, এনএসসি তাদের অধীন কোনো ক্রীড়া সংস্থায় অনিয়ম খুঁজে পেলে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।

এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান

তবে ক্রিকেট ও ফুটবল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ, এই দুটি খেলার বৈশ্বিক অভিভাবক সংস্থাই সদস্যদেশগুলোর বোর্ড বা ফেডারেশনে সরকারি হস্তক্ষেপ অনুমোদন করে না। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের সময়েই এ কারণে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা।

এনএসসির পরিচালক আমিনুল এহসান আশাবাদী, ক্রিকেটে এবারের ঘটনায় তেমন কিছু হবে না। ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করে সেটি আইসিসিকেও পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। এর আগে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও জানিয়েছিলেন, আমিনুল ইসলামের বোর্ডের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আইসিসিতে পাঠানো হবে।

অবশ্য বিভিন্ন সূত্রে এ–ও জানা গেছে, বোর্ড ভেঙে অ্যাডহক কমিটি হলে আইসিসি যেন তা অনুমোদন করে, সে ‘তদবির’ চালানো হয়েছে আগেই। গত রোববার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও কারও নাম উল্লেখ না করে এই অভিযোগ করে লিখেছেন, ‘অবৈধভাবে বোর্ড ভাঙার প্রক্রিয়ায় আইসিসি যেন কোন ব্যবস্থা না নেয়, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একজন স্বনামধন্য ক্রিকেটার লবিংয়ে ব্যস্ত। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি তিনি সাবেক বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে লন্ডনে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি আইসিসি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ পুত্র জয় শাহর সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিতে নাজমুল হাসান পাপনকে অনুরোধ জানান।’

এনএসসির তদন্তকে ‘এখতিয়ারবিহীন’ বলে মন্তব্য করে আমিনুল বলেন, ‘আইসিসির সংবিধান অনুযায়ী, সদস্য বোর্ডগুলোকে সরকারি হস্তক্ষেপমুক্তভাবে পরিচালিত হতে হয়। রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী আমিনুল হকের উদ্যোগে শুরু হওয়া এনএসসির এই তদন্ত একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিহিংসা, কোনো আইনগত প্রক্রিয়া নয়। এই প্রতিবেদন “quo non judicibus” (এখতিয়ার না থাকায় বাতিলযোগ্য)।’

অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হওয়ার পর গতকাল বিকেলেই বিসিবি কার্যালয়ে গিয়ে সভাপতির চেয়ারে বসেন তামিম ইকবাল। পরে কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। অ্যাডহক কমিটিতে থেকে বিসিবির আগামী নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানান। বলেছেন, দেশের ক্রিকেটের সুনাম ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর কমিটির প্রথম কাজ।

আমিনুলের দাবি, তিনিই সভাপতি

গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজেকে এখনো ‘বিসিবি সভাপতি’ দাবি করে আমিনুল ইসলাম তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘তথাকথিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন।

নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে আমিনুল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি যে ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দাখিল করা প্রতিবেদনটি ত্রুটিপূর্ণ, খামখেয়ালি ও আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য একটি দলিল, যা আইন বা বিসিবির সংবিধানের দৃষ্টিতে কোনো বৈধতা বহন করে না।’

বিসিবির বিদায়ী সভাপতি আমিনুল ইসলাম

এনএসসির তদন্তকে ‘এখতিয়ারবিহীন’ বলে মন্তব্য করে আমিনুল বলেন, ‘আইসিসির সংবিধান অনুযায়ী, সদস্য বোর্ডগুলোকে সরকারি হস্তক্ষেপমুক্তভাবে পরিচালিত হতে হয়। রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী আমিনুল হকের উদ্যোগে শুরু হওয়া এনএসসির এই তদন্ত একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিহিংসা, কোনো আইনগত প্রক্রিয়া নয়। এই প্রতিবেদন “quo non judicibus” (এখতিয়ার না থাকায় বাতিলযোগ্য)।’

নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা এবং তামিম ইকবালের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটি গঠন করাকে আমিনুল অভিহিত করেছেন ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ বলে, অ্যাডহক কমিটিকে বলেছেন ‘প্রহসনমূলক’। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। আমিনুলের দাবি, হাইকোর্ট ভিন্ন কোনো রায় না দেওয়া পর্যন্ত তিনিই বিসিবির একমাত্র বৈধ সভাপতি হিসেবে বহাল থাকবেন। জানা গেছে, আমিনুলের বোর্ডের কয়েকজন পরিচালক বিষয়টি নিয়ে আদালতের শরণাপন্নও হতে পারেন।

যার অর্থ পরিষ্কার—মাঠের খেলাকে গৌণ করে দিয়ে বিসিবির চেয়ার দখলের খেলাই চলতে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।