৯৯ রানে অপরাজিত থেকে প্রথম দিন শেষে মাঠ ছেড়েছেন সাদমান ইসলাম
৯৯ রানে অপরাজিত থেকে প্রথম দিন শেষে মাঠ ছেড়েছেন সাদমান ইসলাম

আলোর নাটকে শেষ প্রথম দিন, সাদমানের এক রাতের অপেক্ষা

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৭৪ ওভারে ২১৩/৩ (সাদমান ৯৯*, লিটন ১০*)।

বেলা ৩টা ১৫ মিনিট। হুট করেই আঁধার নেমে এলো মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে! সেটা যতটা না মাঠের আবহে, তার চেয়ে বেশি সম্ভবত আম্পায়ারদের লাইট মিটারে। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে বন্ধ হয়ে গেল খেলা। অথচ দিনের তখনও ২০ ওভার বাকি, তার চেয়েও বড় কথা—টেস্টে নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরি থেকে নিঃশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে সাদমান ইসলাম, অপরাজিত ৯৬ রানে।

একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল দিনের খেলা আর শুরুই হবে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে পড়ল বিকেলের রোদ। আলোকস্বল্পতায় ৫৩ মিনিট বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হলো খেলা। সবার মধ্যে স্বস্তি—সাদমান তাহলে আজই সেঞ্চুরিটা করে ফেলার সুযোগ পেলেন!

কিন্তু ক্রিকেট তো অনিশ্চয়তার খেলা, তার চেয়েও যেন অনিশ্চিত হয়ে উঠল মিরপুরের আকাশের আলো! ৪ ওভার খেলা হওয়ার পর আবারও আলোকস্বল্পতা, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এবার দিনের খেলাই শেষ। টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে উঠল বিষণ্ণ হাসিতে সাদমানের চেহারা। তখনও যে সেঞ্চুরি থেকে ১ রান দূরে সাদমান, অপরাজিত ৯৯ রানে!

বাংলাদেশ–ওয়েস্ট ইন্ডিজ মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনে যা একটু নাটক এই আলো নিয়েই হলো। নইলে ঘটনাহীন দিনে টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের উইকেট পড়েছে মাত্র ৩টি, রান হয়েছে ২১৩। সেশন ধরে ধরে হিসাব করলে প্রথম সেশনে ২ উইকেট হারিয়ে ৯৬ রান, দ্বিতীয় সেশনে ১ উইকেট হারিয়ে ৮১ এবং পুরোপুরি হতে না পারা শেষ সেশনে ৩৬ রান।

শেষ সেশনে বাংলাদেশ কোনো উইকেট না হারালেও পায়ের মাংসপেশিতে টান পড়ায় স্ট্রেচারে চড়ে মাঠ ছেড়ে গেছেন ৪২ রান করা তাওহিদ হৃদয়। তবে দিন শেষে আজ সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন।

সব মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুরে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশেরই বলতে হবে। প্রথম দিনের তুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা উইকেট থেকে ভালো টার্ন পেয়েছেন, সকালে পেসারদের বলেও মুভমেন্ট দেখা গেছে।

অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের ইনিংসটা লম্বা হয়নি। আউট হয়েছেন ১৯ রান করে

দিন শেষে সালাহউদ্দীন তো এমনও বলেছেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে উইকেটে বোলারদের জন্য কিছু আছে।’ তবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে কোনো ক্যারিবীয় বোলারই আজ বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেননি। আর ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাব বলতে ছিল দুপুরের পর আকাশ একটু কালো হয়ে ওঠা, পরের দিকে সেটাই হয়েছে প্রথম দিনের খেলা আগে শেষ হয়ে যাওয়ার কারণ।

সাদমানের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির সামনেও সেটাই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আরও এক রাতের অপেক্ষা। গত বছরের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে সেঞ্চুরি করেছিলেন। এরপর আজকের আগে ১৭ ইনিংসে চারটি ফিফটি করলেও কোনোটিকেই তিন অঙ্কে নিতে পারেননি বাংলাদেশ দলের এই ওপেনার। আজ সেই বাধা ডিঙানোর একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছিলেন তিনি। খেলা যখন বন্ধ হয়, ২১৯ বলে সাদমান অপরাজিত ৯৯ রানে।

সাদমান সেঞ্চুরির সুবাস নিয়ে দিন শেষ করলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটসম্যান। চোটে পড়ায় তৃতীয় উইকেটে সাদমানের ৮৮ রানের জুটির সঙ্গী হৃদয় তো ইনিংস শেষই করতে পারলেন না। মুমিনুল হক আর অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের সম্ভাবনা ছিল। দুজনই উইকেটে থিতু হয়েছিলেন, খেলতে পারতেন বড় ইনিংস।

অবশ্য মুমিনুলের ইনিংস মানেই যেন এখন উইকেটে থিতু হয়েও আউট হয়ে যাওয়া। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন। এরপর ১৬ ইনিংসে ৯টি ফিফটি করেছেন, ৮০-র ওপরে তিনটি ও ৯০-এর ওপরে খেলেছেন একটি ইনিংস। তবু পাননি তিন অঙ্কের দেখা।

রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে ফিরে যাওয়ার আগে ৪২ রান করেন তাওহিদ হৃদয়

ফিফটি না পেলেও থিতু হয়ে আউট হওয়ার ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রাখলেন আজও। ব্যক্তিগত ২৮ রানে জোমেল ওয়ারিকানের বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া বলের ফাঁদে পড়ে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মারতে গেলেন। ব্যাটে-বলে ঠিকমতো না হওয়ায় ক্যাচ চলে যায় মিড অফে শামার জোসেফের হাতে। শট খেলার ওই লোভে না পড়লেও বড় ইনিংস হতে পারত মুমিনুলেরটাও।

নাজমুল ফিরেছেন লাঞ্চের পর সপ্তম ওভারে। ওয়ারিক্যানকেই সুইপ করতে গিয়ে বল লাগে তাঁর প্যাডে। আম্পায়ার প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আবেদনে সাড়া না দিলেও রিভিউতে বদলে যায় সিদ্ধান্ত। ৪২ বল খেলে নাজমুল তখন ১৯ রানে।

এর আগে বাংলাদেশ দিনের প্রথম উইকেট হারায় ইনিংসের সপ্তম ওভারে। নতুন বলে সকালের কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই পেসারই দারুণ বোলিং করছিলেন। তানজিদের উইকেট সেটারই ফসল। ৭ রান করে জেইডেন সিলসের বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাটের বাইরের কানা লাগিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়েছেন এই ওপেনার।

৯৯ রানের পথে ১০টি চার মেরেছেন সাদমান

বাংলাদেশের দিনটাই অবশ্য আজ শুরু হয়েছিল দুঃসংবাদ দিয়ে। দল ঘোষণার পর দেখা গেল একাদশে মুশফিকুর রহিম নেই! আগের দিন নেটে ব্যাটিং করার সময় চোট পেয়েছিলেন ডান হাতের তর্জনিতে। তবে এক্স-রে রিপোর্টে গুরুতর কিছু না আসায় তাঁর খেলারই কথা ছিল এই টেস্টে।

কিন্তু সকালে ম্যাচের আগে জানা গেল, মুশফিকের থেতলানো আঙুলের অবস্থার উন্নতি হয়নি। মিরপুর টেস্টে তিনি খেলছেন না। তবে ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সিলেট টেস্টে খেলতে পারবেন। ২০২৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর এই প্রথম ঘটল এ রকম ঘটনা—বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে, আর মুশফিক দলে নেই। সেবারও চোটের কারণেই দলে ছিলেন না তিনি।