কানাডার বিপক্ষে চারটি করে ছক্কা-চারে ২৯ বলে ৫১ রান করেন শোয়াইব।
কানাডার বিপক্ষে  চারটি করে ছক্কা-চারে ২৯ বলে ৫১ রান করেন শোয়াইব।

‘স্টক মার্কেট’ থেকে বিশ্বকাপে ‘ধোনি’ হয়ে ওঠা জামিয়ার সেই শোয়াইব খান

দিল্লির বাতাস কি গতকাল শোয়াইব খানের কানে কানে পুরোনো কোনো বন্ধুত্বের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছিল? হবে হয়তো। চেনা শহর, চেনা মাঠ, অথচ গায়ে জড়িয়ে অন্য এক দেশের জার্সি। গ্রুপ ‘ডি’-তে টিকে থাকার লড়াইয়ে কানাডার বিপক্ষে যখন সংযুক্ত আরব আমিরাত খাদের কিনারায়, ফিরোজ শাহ কোটলার মাঠে ত্রাতা হয়ে এলেন এক ‘দিল্লিওয়ালা’। এ যেন এক পরিযায়ী পাখির ঘরে ফেরার গল্প।

শোয়াইব খানের ক্রিকেটে হাতেখড়ি এই দিল্লিতেই। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। উত্তর অঞ্চলের হয়ে টানা দুই মৌসুম খেলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটে। কিন্তু ভারতের ক্রিকেটে ভিড় ঠেলে এগোনো যে কত কঠিন, তা শোয়াইব বুঝেছিলেন দ্রুতই। ২০২০ সালে করোনাকালে যখন পৃথিবী থমকে গেল, তখনই তিনি পাড়ি জমান মরুশহর দুবাইয়ে। ‘প্রস্পেরো’ নামে এক স্টক মার্কেট কোম্পানিতে শুরু করেন চাকরি। একদিকে আর্থিক হিসাব-নিকাশ, অন্যদিকে উইকেটের দুই প্রান্তে দৌড়ানো—এই দুই সমান্তরাল জীবনই আজকের লড়াকু শোয়াইব খানকে গড়ে তুলেছে।

পঞ্চম উইকেটে ৪৩ বলে ৮৪ রানের জুটি গড়েন আর্যাংশ ও শোয়াইব

কানাডার দেওয়া ১৫১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে একসময় পথ হারিয়েছিল আরব আমিরাত। উইকেটে তখন থিতু হওয়া ব্যাটসম্যান আর্যাংশ শর্মা। দরকার ছিল একজন যোগ্য সঙ্গীর। শোয়াইব যখন নামলেন, ওভারপ্রতি ১২ রানের বেশি করে লাগে। কঠিন এই পরিস্থিতিতে কী ভাবছিলেন, জানাতে গিয়ে ম্যাচ শেষে শোয়াইব বলেছেন, ‘যখন ব্যাটিংয়ে নামলাম, মনে হচ্ছিল যেন সেই কোভিডের সময়ের অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে আছি। ২০২১ সালে বিয়ে করলাম, ঘরে স্ত্রী-সন্তান আর বৃদ্ধ মা-বাবা। এখানে (ভারতে) খুব বেশি সুযোগ পাচ্ছিলাম না। তাই ইউএই-তে চলে গিয়েছিলাম। সেই কঠিন সময়ে লড়াই ছাড়া উপায় ছিল না। ভাবলাম, আজই সেই দিন, নিজেকে প্রমাণ করার এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে!’

টেনিস বলে এমন পরিস্থিতিতে আমরা অভ্যস্ত। আমি জানতাম, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে ১০ বারের মধ্যে ৩-৪ বার ম্যাচ বের করে আনা সম্ভব।
শোয়াইব খান

শোয়াইব একা নন, তাঁর আদর্শ মহেন্দ্র সিং ধোনিও যেন সেই সময় তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। ম্যাচ শেষে শোয়াইব নিজেই বললেন, ‘স্ট্র্যাটেজি খুব সহজ ছিল। মাহি ভাই (এমএস ধোনি) যেমন বলেন, চাপে থাকলে নিজেকে শান্ত রাখো আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। আমি ঠিক সেটাই করেছি।’

আর্যাংশের সঙ্গে তাঁর ৮৪ রানের সেই বিধ্বংসী জুটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২৯ বলে ৫১ রানের এক টর্নেডো ইনিংস খেলে যখন ফিরছেন, ম্যাচ একেবারে আমিরাতের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। শেষ পর্যন্ত ২ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে জিতেছে আমিরাত।

দিল্লির ছেলে শোয়াইব কাল আমিরাতের হয়ে দিল্লি জয় করলেন।

পেশাদার ক্রিকেটে শোয়াইবের হাতেখড়ি বেশ দেরিতে, ২০১৪ সালে। তবে তাঁর আত্মবিশ্বাসের ভিত গড়ে দিয়েছে টেনিস বল ক্রিকেট। গলি ক্রিকেটের সেই ‘ডু অর ডাই’ পরিস্থিতিগুলোই তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাথা ঠান্ডা রাখতে শিখিয়েছে। সেই লাল টেনিস বলের টুর্নামেন্টে অসম্ভব সব সমীকরণ মেলানোর অভিজ্ঞতা কাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাজে লাগিয়েছেন তিনি, ‘টেনিস বলে এমন পরিস্থিতিতে আমরা অভ্যস্ত। আমি জানতাম, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে ১০ বারের মধ্যে ৩-৪ বার ম্যাচ বের করে আনা সম্ভব।’

ম্যাচ শেষে সবার আগে মাঠে দৌড়ে গিয়ে সতীর্থদের জড়িয়ে ধরেন শোয়াইব। কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্‌যাপনের মধ্যমণিও তিনি। হবেনই তো! যে কোটলার মাঠে একসময় দর্শক হয়ে খেলা দেখতেন, সেই মাঠে কাল যে তিনিই বিজয়ী বীর।
দিল্লির ছেলে আমিরাতের হয়ে দিল্লি জয় করলেন—গল্পটা এর চেয়ে নাটকীয় আর কী হতে পারত!