
যাওয়ার পথে একটু থমকে দাঁড়ালেন মুশফিকুর রহিম। ‘আপনাকে এভাবে আরও পেলে ভালো লাগবে’ কথাটা শুনে তিনি হাসলেনও। সেই হাসিতে আবার প্রাণ খুলে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন কি না, কে জানে!
বহুদিন ধরেই মুশফিক সাংবাদিকদের মুখোমুখি খুব একটা হতে চান না। একসময় জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিন সংস্করণে, ম্যাচ কিংবা সিরিজ–সেরাও তো কম হননি—সংবাদ সম্মেলনের পথটা তাই তাঁর ভালোই চেনা।
কিন্তু সেই পথে এখনকার অনাগ্রহ মুশফিককে আরও বেশি কাঙ্ক্ষিত করেছে। আর তাঁর কথা শোনার লোভ কেইবা সামলাতে পারে? গতকালের কথাই ধরুন, তিনি সংবাদ সম্মেলনকক্ষে ঢুকতেই শুরু হয়ে গেল ফিসফাস, ‘এই, মুশফিক এসেছে!’
সিলেট টেস্টের আগের দিন তিনি এসেছিলেন দলের প্রতিনিধি হয়ে। কিন্তু সেখানে ম্যাচ বা এ–সংক্রান্ত আলাপ একরকম গৌণই হয়ে গেল যেন। তাঁর কাছে যেসব প্রশ্ন—প্রায় সব কটিতেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ছবিটা জানার কৌতূহল। দুই দশক একই রকম নিবেদন নিয়ে খেলে যাওয়া মুশফিকের চেয়ে ভালো আর তা কার আয়নায় দেখা যাবে!
১০২তম টেস্ট খেলার আগেও তাই মুশফিক প্রায় দম না ফেলে বলে যান, ‘খেলাটা এমন জিনিস, যেটা আপনার রুটিরুজি—এটার সঙ্গে তো আপনি বেইমানি করতে পারবেন না। একদিন মন ভালো লাগল সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করলেন, আরেক দিন মন ভালো লাগল না আপনি সারা দিন ঘুমালেন—ইটস নট লাইক দ্যাট।’
উত্থান–পতনের সাক্ষী হয়েছেন অনেক—কথাটা এখন এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে তা হালকাই হয়ে গেছে এত দিনে। কিন্তু মুশফিকুর রহিমের ক্যারিয়ার আর অভিজ্ঞতা বোঝাতে এর চেয়ে ভালো আর হয় না কিছুই। দিনের পর দিন টেস্ট হেরেছে দল, কখনো শুধুই ক্রিকেটার, কখনো অধিনায়ক হিসেবে সেগুলোর সাক্ষী হয়েছেন নিয়মিত। কালও তিনি করলেন সেই পুরোনো আক্ষেপ, ‘২০ উইকেট নেওয়া বোলারই তো ছিল না...।’
ওই চিত্র বদলে গেছে অনেক দিন ধরে। এখন পেসাররাও চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট নেন, জেতান ম্যাচও। সর্বশেষ ৯ টেস্টেই বাংলাদেশের আছে ৫ জয় আর ১ ড্র।
মুশফিকের চোখেও বাংলাদেশের গত ২৬ বছরে সেরা দলটাই খেলছে এখন, ‘আগেও অনেক দারুণ ব্যক্তিগত পারফরমার ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে আপনি যদি বলেন, ধারাবাহিকতার দিক থেকে অবশ্যই এখন যে টেস্ট দলটা খেলছে, সব সময়ের চেয়ে বেশি ধারাবাহিক।’
কিন্তু এখানেই তো আর শেষ না, অন্তত মুশফিকের কাছে তো নয়ই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তাই আরও উন্নতির তাগিদ। শুধু ঘাসের উইকেট বানিয়ে নয়, বরং ভিন্ন ভেন্যুতে ভিন্ন উইকেটে দলটাকে খেলানোর পরীক্ষায় ফেলার পরামর্শ তাঁর।
মুশফিকের জীবনজুড়ে এখন আছে শুধু এই দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটই। বাকি দুই সংস্করণকে বিদায় বলে দিয়েছেন বছর কয়েক হলো। তা এখন জীবন কেমন কাটছে? আগের দেড় দশকে দিতে না পারা সময়টা এখন পরিবারকে দিতে পেরে মুশফিক খুশি।
পাশাপাশি শুধু টেস্ট খেলার জন্য অপেক্ষা করার যে কষ্ট, সেটাও ফুটে উঠল তাঁর কথায়, ‘বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে এত দূর আসার পেছনে আমি মনে করি দুজন ব্যক্তি অনেক বড় অবদান রেখেছেন—মুমিনুল আর তাইজুল। দু–তিন বছর শুধু একটা সংস্করণ খেলে আমি তাদের কষ্টটা টের পেয়েছি। ওরা তা ১০–১২ বছর ধরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই করে যাচ্ছে।’
পরে তিনি বলেন আরও, ‘ওই দুজনের দিকে তাকিয়ে আমার কাছে আরও বেশি ভালো লাগে যে আমি অবদান রাখতে পারলে ওদের হাসি বা ওই খুশিটা আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়।’
ক্যারিয়ার সায়াহ্নে চলে আসা মুশফিকের এখন আর কোনো ‘গোল’ নেই। কোথায় থামবেন, তা নিয়েও তিনি ভাবেন না, ‘কাল বাঁচব কি না, তা–ই তো বলতে পারি না...’ বলে সবার সঙ্গে হাসেন তিনিও। টেস্ট ক্রিকেটের রোমাঞ্চটুকুই শুধু আপাতত তিনি রাখতে চান নিজের কাছে।
এই আগস্টেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ দুটি টেস্ট খেলতে যাচ্ছে—এত লম্বা ক্যারিয়ারেও কখনো সেখানে দ্বিপক্ষীয় সিরিজই খেলেননি। স্বপ্নপূরণের ওই আনন্দের সঙ্গে তাই মুশফিক রোমাঞ্চিতও, ‘এত বছর ডাকেনি, এখন ডাকছে। এটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ, আমি মনে করি সহজ হবে না। কিন্তু একটা সুযোগ তো আছে, কিছু ভালো ফল আমরা গত তিন–চার বছর করেছি, আমরা যে ভালো দল, তা দেখানোর সুযোগ এটা।’
অস্ট্রেলিয়ায় তাঁরা পারবেন কি না, ওই উত্তর সময়ের হাতেই তোলা। কিন্তু মুশফিক যে ‘ভালোর’ উদাহরণ হয়ে গেছেন এত দিনে, তা বোধ হয় বলার আর দরকার নেই!