
ক্রিকেট মাঠে রাজা অনেক দেখেছি আমরা। কেউ ব্যাট হাতে রাজত্ব করেন, কেউ বল হাতে। কেউ আবার অধিনায়কত্বের সিংহাসনে বসে থাকেন বছরের পর বছর। তবে অ্যান্টিগায় গতকাল এক অদ্ভুত রাজদর্শন হয়ে গেল। একজন সত্যিকারের রাজা, অন্যজন ব্যাটিংয়ের রাজা। একজনের নাম চার্লস, অন্যজন স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস। দুজনের দেখা হলো এমন এক মাঠে, যে মাঠের নামও আবার ভিভ রিচার্ডসের নামে! কিং ভিভের সঙ্গে দেখা হলো ব্রিটেনের কিং চার্লসের!
অ্যান্টিগার জাতীয় স্টেডিয়ামে গতকাল উপস্থিত ছিলেন রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা। কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলন (সিএইচওজিএম) সামনে রেখে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে তাঁদের এই সফর। আর সেখানে রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের চার কিংবদন্তি। স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস, স্যার কার্টলি অ্যামব্রোস, স্যার অ্যান্ডি রবার্টস ও স্যার রিচি রিচার্ডসন।
চারজনই ক্রিকেটের রাজদরবারের মানুষ। তবে রিচার্ডসের ব্যাপারটা আলাদা। ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রিচার্ডসের ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোনো টেস্ট সিরিজ হারেনি। ব্যাট হাতে এমন দাপট দেখিয়েছেন যে প্রতিপক্ষ বোলারদের অনেক সময় মনে হতো, তাঁরা বুঝি ভুল পেশায় চলে এসেছেন! রাজা চার্লস অবশ্য পুরোনো বন্ধুর মতোই অভিবাদন জানিয়েছেন ভিভকে। বলেছেন, ‘আবার তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে।’
রাজা আর কিং ভিভের সম্পর্কটা যে শুধু সৌজন্যের নয়, সেটাও বোঝা গেল পরের ঘটনায়। রাজা চার্লসের সাসটেইনেবল মার্কেটস ইনিশিয়েটিভের (এসএমআই) শুভেচ্ছাদূত হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন ভিভ। ২০২০ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস থাকাকালে এই উদ্যোগের শুরু চার্লসের। পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি, টেকসই বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহিত করাই এর লক্ষ্য।
চার্লসের সঙ্গে দেখা করে কার্টলি অ্যামব্রোসও বেশ খুশি। ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এই সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ফাস্ট বোলার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা পেসার। তাঁর আগ্রাসী বোলিং একসময় ব্যাটসম্যানদের রাতের ঘুম হারাম করে দিত। রাজাকে দেখে অবশ্য অ্যামব্রোসের বেশ বিনয়ী চেহারা। মজা করে বলেন, ‘বাস্তবে আপনাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে।’
রাজকীয় সফরের সঙ্গে ক্রিকেটও যে জড়িয়ে থাকবে, সেটি আর আশ্চর্য কী! চার্লসের সঙ্গে দেখা হয়েছে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোরও। তিনি ওয়াইডার কমনওয়েলথ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। গায়ানার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইরফান আলীও ছিলেন। তিনি ক্যারিবীয় কমনওয়েলথ দলের অধিনায়ক।
এরপর দুই দলের পাঁচ ওভারের ম্যাচের আগে রাজা টস করেন একটি স্মারক মুদ্রা দিয়ে। এক দলে সরকারপ্রধানেরা, অন্য দলে ক্যারিবীয় নেতারা। তাঁদের ম্যাচের পর হয়েছে আরও একটি ১০ ওভারের ম্যাচ। কমনওয়েলথের ভবিষ্যৎ তারকাদের অনূর্ধ্ব-২৩ দল খেলেছে সেই ম্যাচে।
এদিকে রাজাকে ঘিরে অ্যান্টিগায় গতকাল আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। দেশটির স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বার্ষিক কুচকাওয়াজে যোগ দিয়েছিলেন চার্লস ও ক্যামিলা। প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকের সামনে সামরিক বাহিনী ও পুলিশের সদস্যেরা প্রদর্শন করেন আনুষ্ঠানিক কসরত। ছিল মার্চপাস্ট, ব্যান্ডের পরিবেশনা, জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনবার জয়ধ্বনি এবং feu-de-joie নামে পরিচিত আনুষ্ঠানিক বন্দুকের গুলিবর্ষণ।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু রাজা-রানি স্টেডিয়ামে পৌঁছে যখন অভ্যর্থনা মঞ্চে উঠেছেন, ঠিক তখনই শুরু হলো বৃষ্টি। অঝোর ধারায় ভিজতে শুরু করলেন দুজন। সহকারীরা ছাতা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রানির ছাতা আগে পাওয়া গেল। রাজার ছাতার খোঁজ নেই! অপেক্ষা করতে করতে চার্লসের মেজাজও কিছুটা বিগড়ে গেল। ছাতা ধরার ভঙ্গি করে হাত নেড়ে বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘ছাতাটা কোথায়?’
শেষ পর্যন্ত ছাতা এল। তবে ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। রানি আশ্রয় নিলেন গভর্নর জেনারেল ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে একটি ছাউনির নিচে। আর চার্লস বৃষ্টির মধ্যেই সেনাসদস্যদের পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়লেন। রাতে অবশ্য নিজের ভেজা পোশাক নিয়ে রসিকতাও করেন রাজা। বলেন, ‘আমার প্যান্টে মনে হচ্ছে জলজ উদ্ভিদ জন্মাতে শুরু করেছে!’
রাজা হয়েছেন বলে কি রসিকতা করা যাবে না!