নাহিদ রানা
নাহিদ রানা

নাহিদ রানার দীর্ঘশ্বাস কতটা লম্বা হবে

মাশরাফি বিন মুর্তজা, তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেন—বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে গতির স্বপ্ন দেখিয়েছেন তাঁরাও। টেস্টে জোরে বল করতে পারেন, বাউন্সারে ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়ার সামর্থ্য আছে—এমন পেসাররাই কার্যকরী হন বেশ।

কিন্তু চোটের কারণে মাশরাফির টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার অনেক আগেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন ২০২০ সাল পর্যন্ত, আর শেষ টেস্ট ২০০৯ সালে। তবে এখনো মাশরাফিই টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। তাসকিন, ইবাদত চোট–আঘাতের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন এখনো।

তাসকিন এখনো তিন সংস্করণে খেললেও খেলেন বেছে বেছে। এসিএলের চোটে পড়া ইবাদত প্রায় দেড় বছর দৌড়াতেই পারেননি, লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করতেন। ফেরার পর ইবাদতের গতি কমে গেছে, কমেছে বোলিংয়ের ধারও। এদিকে আবার নাহিদ রানার উত্থান; সব মিলিয়ে টেস্ট দলে এখন আর ইবাদতের জায়গা পাকা নয়।

দীর্ঘদেহী নাহিদ রানার উচ্চতা ৬ ফুট ২ ইঞ্চি, বলে গতি তুলতে পারেন দেড় শ কিমির আশপাশে। বাউন্সার মারতে পারেন, রিভার্স সুইংটাও শিখে গেছেন অল্প সময়ের মধ্যেই।

নাহিদ রানা ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন

টেস্ট দলে নাহিদ রানার প্রভাব কতটা, সেটি আরও স্পষ্ট হবে ছোট্ট একটা পরিসংখ্যান দিলেই। মাত্র দুই বছরের ক্যারিয়ারে ১২টি টেস্ট খেলেই নাহিদ রানা এখন একটি তালিকার এক নম্বরে। বাংলাদেশ জিতেছে এমন টেস্টে পেসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬টি উইকেট তাঁর।

বলে গতির ঝড় তুলে সাম্প্রতিক সিরিজগুলোতে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছেন নাহিদ রানা। সেই হইচই অবশ্য এখন দীর্ঘশ্বাসে বদলে গেছে। ২৩ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে টেস্ট খেলতে। কিন্তু চোট নাহিদকে ছিটকে দিয়েছে স্বপ্নের এই সিরিজ থেকে।

বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়ায় যাবে, অথচ দলের সেরা পেসারই যাচ্ছেন না সেই সফরে! কয়েক দিন ধরে ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট সবার কথায়ই তাই ঘুরেফিরে আসছে নাহিদের জন্য আফসোস। তাঁর না থাকা মানে তো দলে সবচেয়ে বড় বোলিং অস্ত্রটারই না থাকা! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলে তো এ–ও দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ দলে নাহিদ নেই বলে আফসোস করছেন অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকেরাও।

অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকদের আফসোসটা মূলত ভালো একজন পেসারের গতির ঝড় দেখা হবে না বলেই। আর বাংলাদেশের আফসোস দলের ‘এক্স ফ্যাক্টর’কেই হারিয়ে ফেলার। যেটা বাংলাদেশকে ভোগাতে পারে ম্যাচেও। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টেও যেমন বিশ্রামে থাকা নাহিদ রানার অভাব বোধ করেছে বাংলাদেশ। হারারেতে স্বাগতিকদের জমে যাওয়া জুটি ভেঙে দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই অভাবটা আরও বেশি বোধ করতে পারে বাংলাদেশ। তাসকিন–হাসান মাহমুদ যদি শুরুতে ধাক্কা দেনও, বড় জুটি জমে গেলে নাহিদকেই হয়তো সবার আগে মনে পড়বে অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের। যার একটা ‘ম্যাজিক মোমেন্টে’ই বাংলাদেশ ফিরতে পারে ম্যাচে।

গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করা বাংলাদেশের পেস বোলিং বিভাগের জন্য অস্ট্রেলিয়ার এই সফর স্বপ্নের মতোই। আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিলেন নাহিদ। গত কয়েক দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের আধিপত্যে কাবু হয়ে আছে সব দল। সেখানকার উইকেট, কন্ডিশন—সবকিছুই পেসারদের নিজেদের প্রমাণ করার জন্য আদর্শ জায়গা।

গতির কারণে খ্যা্তি কুড়িয়েছেন নাহিদ রানা

চোটে পড়ার আগ পর্যন্ত নাহিদ যে রকম ফর্মে ছিলেন; তাঁর জন্য আদর্শ একটা সিরিজই হতো এটা। ডারউইন–ম্যাকাইয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান আরও জোরালোভাবে দিতে পারতেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে পারবেন না বলে নাহিদ রানার দীর্ঘশ্বাসটা অন্য কারণেও বড় হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ প্রথম ও সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ খেলেছে ২০০৩ সালে। সেখানে টেস্ট খেলতে এরপর আবার যাচ্ছে এবারই। মাঝে চলে গেছে ২৩টি বছর, চলে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটা প্রজন্মই।

এবারের পরও যদি বাংলাদেশ দলের অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে টেস্ট খেলায় ও রকমই লম্বা বিরতি পড়ে, নাহিদ কি তাঁর ক্যারিয়ারে পাবেন আরেকটি অস্ট্রেলিয়া সিরিজ? বা আগামী বছর নতুন ভবিষ্যৎ সফর পরিকল্পনায় যদি বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ থাকেও, তিনি কি থাকবেন এখনকার মতো ফর্মে?

এসব প্রশ্নই এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরের দলের নাহিদের অনুপস্থিতি আক্ষেপটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইয়ান বিশপ তো আর এমনি এমনি বলেননি, ‘অন্য অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর মতো, আমিও নাহিদ রানাকে অস্ট্রেলিয়ায় বোলিং করতে দেখতে মুখিয়ে ছিলাম!’