
কারাবন্দী পাকিস্তানের কিংবদন্তি অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই উদ্বেগ এখন সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে গেছে ক্রিকেট বিশ্বে। বিশ্বের ১৪ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক কয়েক দিন আগে সরাসরি চিঠি লিখেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে। তাঁদের অনুরোধ—ইমরানকে যেন ‘ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা ও সুচিকিৎসা’ দেওয়া হয়।চিঠিটির খসড়া করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল। এতে স্বাক্ষর করেন ইয়ান চ্যাপেল, সুনীল গাভাস্কার, মাইক ব্রিয়ারলি, ক্লাইভ লয়েড, গ্রেগ চ্যাপেল, কপিল দেব, অ্যালান বোর্ডার, ডেভিড গাওয়ার, মাইকেল আথারটন, নাসের হুসেইন, স্টিভ ওয়াহ, জন রাইট, কিম হিউজ ও বেলিন্ডা ক্লার্ক।কেন এই চিঠি লিখলেন তাঁরা? এ নিয়ে ক্রিকইনফোতে একটি কলাম লিখেছেন গ্রেগ চ্যাপেল। কলামটির বাংলা ভাষান্তর প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য—
ঝড়ের রাতে বাতিঘরের প্রহরী শুধু ঢেউ দেখে সময় কাটান না, আলোটাও জ্বালিয়ে রাখেন। কারণ, সেই আলোই ক্লান্ত পথিকের জন্য আশার একমাত্র দিশা। বাতিঘরের সেই প্রহরীরা জানেন, তাঁদের এই সতর্কতা শুধু বর্তমানের জন্য নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার এক দায়বদ্ধতাও।
ঠিক সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আজ আমি কলম ধরতে বাধ্য হয়েছি। আমার পুরোনো বন্ধু এবং মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমরান খানের বর্তমান কঠিন পরিস্থিতির খবর যখন কানে এল, বুঝলাম, শুধু একটি প্রদীপ যথেষ্ট নয়। ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রকে ঘিরে যে অন্ধকার জমছে, তা ভেদ করতে হলে প্রয়োজন বহু কণ্ঠের সমবেত উচ্চারণ। এমন একদল অধিনায়ক, যাঁদের যৌথ ইতিহাস রাজনৈতিক উদাসীনতায় উপেক্ষা করা যাবে না।
ইমরানকে আমি চিনি বহু দশক ধরে। আমাদের সম্পর্কটা শুধু বাউন্ডারি দড়ির ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল গভীর পারস্পরিক শ্রদ্ধার। আমরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম ঠিকই, তবে টেস্ট ক্রিকেটের সেই লড়াইয়েই আমাদের চরিত্রের দৃঢ়তা তৈরি হয়েছে। আমার চোখে ইমরান এক বিশাল ব্যক্তিত্বের নাম, যাঁর ইচ্ছাশক্তি পাহাড়সম। তিনি শুধু দলকে নেতৃত্ব দেননি, একটা পুরো জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ১৯৯২ সালের সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি ট্রফি নিয়ে সারা দেশ ঘুরেছিলেন। নিজের মহিমা প্রচারের জন্য নয়, বরং মানুষকে এটা বোঝাতে যে—তুমিও বড় কিছু করার ক্ষমতা রাখো। সেই যাত্রায় সাধারণ মানুষের ভালোবাসা তাঁর মনে রাজনীতির বীজ বুনে দিয়েছিল।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষেও আমাদের দেখা হয়েছে অনেকবার। ২০০৪ সালে লাহোরের ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমিতে কোচিং করানোর সময় একটা ডিনারের কথা আমার আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। তিনি যখন রাজনীতিতে নামার কথা বললেন, আমি কিছুটা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম—কেন এমন অস্থিতিশীল পথে পা বাড়াচ্ছেন?
ইমরান শান্ত গলায় বলেছিলেন, তিনি তাঁর দেশকে সেই উচ্চতায় দেখতে চান, যেখানে যাওয়ার যোগ্যতা পাকিস্তানের আছে। তিনি সাত বছরের চক্রে বিশ্বাস করতেন। বলেছিলেন, এক চক্রে সফল না হলে পরেরটির জন্য অপেক্ষা করবেন। বিশ্বাস করতেন, তিনটা চক্র পেরিয়ে ক্ষমতায় আসবেন। আশ্চর্যভাবে সেটাই ঘটেছিল। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ আসনে বসেছিলেন।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, পৃথিবী বদলে যাওয়ার আগে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। তখন তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। আমি ব্যবসায়িক কাজে পাকিস্তানে গিয়েছিলাম। স্যার ভিভ রিচার্ডস ও শেন ওয়াটসনকে নিয়ে তাঁর ইসলামাবাদ দপ্তরে গেলাম। ১৫ মিনিটের সৌজন্য সাক্ষাতের কথা থাকলেও আড্ডা চলল ৪৫ মিনিট। তাঁর চিফ অব স্টাফ পাঁচবার এসে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন যে বাইরে সৌদি ও মার্কিন কর্মকর্তারা অপেক্ষা করছেন। ইমরান হাসিমুখে আমাদের বললেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই অফিসে এত আনন্দের সময় তাঁর আর কাটেনি। সেদিনও তিনি চাপের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, পরিস্থিতি সামনে আরও উত্তপ্ত হতে পারে। সবুজ উইকেটে নতুন বলের সামনে যেমন অবিচল থাকতেন, তেমনই স্থিরতা নিয়ে সব সামলাচ্ছিলেন।
সেই প্রাণবন্ত, ক্যারিশম্যাটিক নেতা আজ যেখানে বন্দী, শোনা যাচ্ছে, সেটি অনেকটা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সেলের মতো। ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাগারে, ১৮৬টি মামলার মুখোমুখি। বয়সের হিসাবে সাজাটা কার্যত আজীবন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তাঁর স্বাস্থ্য। ডান চোখের দৃষ্টি প্রায় হারিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাঁকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নির্যাতনের সঙ্গে তুলনা করেছে। একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের আইকনের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এই তীব্র অবিচারের অনুভূতিই আমাকে আমার মতো অন্য অধিনায়কদের কাছে যেতে বাধ্য করেছে। সাগরের বুকে একটা একক কণ্ঠস্বর অনেক সময় মিলিয়ে যায়, কিন্তু সমবেত গর্জন উপেক্ষা করা কঠিন। আমি ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কেউ কেউ রাজনীতির মারপ্যাঁচ এড়াতে চাইলেও ১৩ জন বন্ধু চোখের পলকে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। অ্যালান বোর্ডার, মাইকেল আথারটন থেকে শুরু করে ক্লাইভ লয়েডরা যুক্ত হতে সময় নেননি। সবচেয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া আসে সুনীল গাভাস্কার আর কপিল দেবের কাছ থেকে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের চাপ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এক সেকেন্ড দ্বিধা করেননি। তাঁরা তাঁদের বন্ধুকে মনে রেখেছেন, মনে রেখেছেন সেই ধ্রুপদি লড়াইয়ের দিনগুলোকে।
আমরা যে ১৪ জন অধিনায়ক একজোট হয়েছি, এটি কোনো রাজনৈতিক বিবৃতি নয়। আমরা সুশাসনের মারপ্যাঁচ বা সরকারি পলিসি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমরা মানবাধিকারের কথা বলছি, যে ‘ফেয়ার প্লে’ বা পরিচ্ছন্ন খেলার শিক্ষা ক্রিকেট আমাদের দিয়েছে, তার কথা বলছি। আমরা পাকিস্তান সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, ইমরানকে যেন তাঁর পছন্দমতো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে সুচিকিৎসা করানো হয়, তাঁকে যেন পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় যেন স্বচ্ছতা থাকে। এগুলো কোনো বৈপ্লবিক দাবি নয়, একটা সভ্য সমাজের মৌলিক চাহিদা।
ক্রিকেট সব সময় দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করে গেছে। কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও এই খেলাটা আমাদের জন্য অভিন্ন এক ভাষা। আমাদের আবেদনে থাকা নামগুলোর একটা জাদুকরি আবেদন আর কর্তৃত্ব আছে, যা খেলা ছাড়ার বহু বছর পরেও অম্লান। আমরা এক উত্তরাধিকারের প্রহরী। শিল্পী-ইতিহাসবিদরা যেমন যুদ্ধের সময় অমূল্য সব শিল্পকর্ম রক্ষা করেন, আমরাও তেমনি আমাদের এই উত্তরাধিকারকে রক্ষা করতে চাই। যদি আমাদের নিজেদের একজন মানুষকে এভাবে হারিয়ে যেতে দিই বা তাঁর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ মুখ বুজে সহ্য করি, তবে আমরা খেলাটার আত্মার প্রতি অবিচার করব।
আমাদের এই আবেদন এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। বিশ্ব হয়তো ইমরানের বন্দিত্বকে খবরের কাগজের নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছিল। আমরা সেই ধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছি। মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছি, ইমরান খান কে। তিনি সেই মানুষ, যিনি জানতেন এই পথে ঝুঁকি আছে, কিন্তু সেই ঝুঁকি নিয়েছেন সাহসের সঙ্গে। আমাকে একবার বলেছিলেন, দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে যদি তাঁর আয়ু কমেও যায়, তবে সেটা ঈশ্বরের ইচ্ছা। মাঠের মতো রাজনীতির পিচেও তিনি শেষ বল পর্যন্ত লড়ে যাচ্ছেন।
বয়স বাড়ছে, নির্দিষ্ট কোনো ম্যাচের স্মৃতি হয়তো কিছুটা ধূসর হয়ে আসছে, কিন্তু আমাদের একের অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা আজও অমলিন। যখন একজন বন্ধু বা সতীর্থ এমন অন্যায়ের শিকার হন, তখন চুপ থাকা সম্ভব নয়। আমরা আওয়াজ তুলবই। কারণ, ক্রিকেট মানে কেবল রান আর উইকেট নয়; ক্রিকেট মানে যাঁরা খেলছেন তাঁদের চরিত্র এবং খেলা শেষে টিকে থাকা গভীর সম্মান।
আমরা সেই মশালচি, যারা ন্যায়বিচারের আলোটা নিভতে দেব না। ইমরান খান আজীবন যে ফেয়ার প্লের জয়গান গেয়েছেন, আজ তাঁর সেই অধিকার পাওনা। আমরা আশা করি, শুভবুদ্ধির উদয় হবে। নির্জন সেলের অন্ধকারে তিনি যেন নিজেকে একা না ভাবেন, আমাদের সমবেত কণ্ঠস্বর তাঁর কানে পৌঁছাবেই।
ক্রিকেট এর চেয়ে কম কিছু দাবি করে না।