
দৃশ্য–১:
থ্রোয়ার দিয়ে বল ছুড়ছেন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। নেটের উল্টো দিকে ব্যাটসম্যান লিটন দাস।
লিটন: ভাই, শর্ট বল দেন। মাথার ওপর...একটু পেছনের দিকে দেন।
আশরাফুল পরের থ্রোটা ছুড়ে জানতে চাইলেন, ‘এভাবে...?’
লিটন: (পুল শট খেলে) হ্যাঁ, ঠিক আছে। আরেকটু লেগ সাইডে কটা বল ফেললে ভালো হতো, ওদিকে ঘাস বেশি আছে।
আশরাফুল: (হাসি) এরপর তো নেট...নেটের এত কাছে পারবি না খেলতে।
দৃশ্য–২:
ফিল্ডিং কোচ আশিক মজুমদার হাই ক্যাচের অনুশীলন করাচ্ছেন গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার মূল মাঠে। তবে এক জায়গায় থেকে নয়। খেলোয়াড়দের নিয়ে একবার মাঠের এ কোনায় যাচ্ছেন তো আরেকবার ওই কোনায়, কখনোবা মাঝমাঠে। ব্যাট দিয়ে আকাশে বল মারছেন, ফিল্ডাররা ক্যাচ নিচ্ছেন।
যেকোনো ফিল্ডিং অনুশীলনে এটা নিয়মিত দৃশ্য। তবে অস্ট্রেলিয়া, বিশেষ করে খেলাটা ম্যাকাইয়ে বলেই এর একটা বিশেষত্ব আছে। এই শহরে বাতাস অনেক। খুব কাছেই বিমানবন্দরের রানওয়ে বলে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার একটা দিক তো পুরোই খোলা! ম্যাকাইয়ের বাতাস তাই মাঠে আরও জোরালো ঝাপটা দেয়।
বাতাস আর সূর্যের আলোর সঙ্গে মিতালি করাটা তাই এখানে জরুরি। তাতে যদি ফিল্ডাররা কন্ডিশনের সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নিতে পারেন। ফিল্ডিং কোচের মাঠের এখানে-সেখানে ঘুরে ক্যাচ প্র্যাকটিস করানোর উদ্দেশ্য এটাই।
ম্যাকাইয়ে গত দুই দিন এভাবে অনুশীলন করিয়ে নাকি অন্তত অনুশীলনে ক্যাচ মিসের হারটা কমে এসেছে। প্রথম টেস্টের আগে ডারউইনের ডিএক্সসি অ্যারেনার প্রস্তুতি ম্যাচেও অনেক বাতাস ছিল। সব মিলিয়ে বাতাসে ভাসা বল ধরতে এখন প্রস্তুত ফিল্ডাররা। বাকিটা বোঝা যাবে খেলা শুরু হলে।
বাংলাদেশ দলের আজকের অনুশীলনের এই দুটি দৃশ্য থেকে কিছুটা বোঝা যাচ্ছে যে অনুশীলনে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কত রকম চেষ্টা হয়েছে। লিটনের মতো সব ব্যাটসম্যানই চেয়ে চেয়ে বাউন্সি বল খেলার চেষ্টা করেছেন। টেস্টের উইকেট সবুজ, ঘাস ছিল নেটের উইকেটেও। তবে লিটনের ওই নেটের উইকেটে লেগ সাইডে ঘাস বড় থাকায় তিনি চেয়েছিলেন ওখানে বল ফেলে খেলতে। কিন্তু নেটের অতটা গা ঘেঁষে তো আর ব্যাট করা যায় না! আর বাতাসে ক্যাচ অনুশীলনের উদ্দেশ্য তো বলাই হলো।
নেটের অনুশীলনে টেলএন্ডারদের লম্বা ব্যাটিংও দৃষ্টি কেড়েছে সবার। এটা যে ডারউইন–শিক্ষা থেকে নেওয়া, তা তো বলা বাহুল্য। ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে টেলএন্ডারদের ৫০ ওভারের বেশি ব্যাটিং করাটা বাংলাদেশের টেস্ট জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এখানেও পরিস্থিতি সে রকম হলে যেন লেজের দিকে প্রতিরোধ গড়া যায়, নেট প্রস্তুতিতে সেই চেষ্টা ছিল। তাসকিন, ইবাদত, হাসান, শরীফুলদের ব্যাটিংয়ের সময়ও তাই কোচ ফিল সিমন্সের সজাগ দৃষ্টি, টিপস দিচ্ছিলেন তাঁদের নাম ধরে ডেকে ডেকে।
পরীক্ষার ‘পূর্বরাত্রি’র প্রস্তুতি তো শেষ। বাকি রইল পরীক্ষা, যেটি আগামী পাঁচ দিন ধরে হবে বলে আশা। আর বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের আশা, সেশন ধরে ধরে এই পাঁচ দিনই ভালো ক্রিকেট খেলা।
ডারউইনে ৯ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ের পর বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার পারদ এখন উঁচুতে। একদিকে ম্যাকাইয়ের পেস-সহায়ক কন্ডিশন, আরেক দিকে ‘আহত বাঘ’ অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ হারের সঙ্গে ‘ঐতিহাসিক ধবলধোলাই’ এড়ানোর তাড়না—সবকিছুর পরও আগামীকাল থেকে শুরু দ্বিতীয় টেস্টে বড় কিছুর আশাই করছেন বাংলাদেশের মানুষ আর অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সমর্থকেরা।
তবে অধিনায়ক নাজমুল তাঁর আগের কথাতেই আছেন—ভালো ক্রিকেট খেলতে চান এবং সেটা ম্যাকাই টেস্টের পাঁচ দিনেই। কাল টেস্ট-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই, টেস্টের পাঁচ দিনই ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। প্রক্রিয়া ঠিকঠাক অনুসরণ করলে ফল এমনি এমনিই আসবে। ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে ভালো ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করব।’
ম্যাকাই টেস্টের দল কেমন হবে, কিছু কারণে টেস্টের আগের দিন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেটিও। কোচ ফিল সিমন্স জরুরি না হলে উইনিং কম্বিনেশন ভাঙার লোক নন। অধিনায়ক নাজমুলও দুই স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের ওপর আস্থা রাখছেন বলে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, ম্যাকাইয়ের উইকেট যেমনই হোক; একাদশে চতুর্থ পেসার আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই দুই অভিজ্ঞ স্পিনারই যেকোনো উইকেটে বল করতে পারেন। তাহলে উইনিং কম্বিনেশন ভেঙে চতুর্থ পেসার কেন—সংবাদ সম্মেলনে নাজমুলের চাহনিতে যেন মিশে ছিল পাল্টা প্রশ্নটা।
উইনিং কম্বিনেশন যদি ভাঙতেই হয়, সেটা বাংলাদেশ ভাঙবে আসলে তানজিদ হাসানকে শেষ পর্যন্ত দলে না পেলে। ঘাড়ের সমস্যার কারণে পরশু নেটে ব্যাট করতে পারেননি প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করা এই ওপেনার। কাল স্ক্যান করিয়ে এসে ব্যাট করলেও তাঁর খেলা না-খেলা নির্ভর করছে আগামীকাল সকালে কেমন বোধ করেন সেটির ওপর। শেষ পর্যন্ত তানজিদ না-ই খেলতে পারলে দলে আসতে পারেন সৌম্য সরকার।
আজকের অনুশীলনের ভাষাতেও লেখা ছিল সেই সম্ভাবনার কথা। নেটে লম্বা সময় ব্যাটিং করেছেন সৌম্য, করেছেন বোলিংও। বলা বাহুল্য, কোচ সিমন্স চোখ সরাননি তাঁর ওপর থেকেও।