ব্রাইডন কার্স আটক হওয়ার সময়ের ঘটনা, দূরে দেখা যাচ্ছে বেন স্টোকসকেও
ব্রাইডন কার্স আটক হওয়ার সময়ের ঘটনা, দূরে দেখা যাচ্ছে বেন স্টোকসকেও

‘নাইট ক্লাব–কাণ্ড’ই এখন ইংল্যান্ড দলের চেনা শিরোনাম

ফুটেজটা স্পষ্ট নয় খুব একটা। একটু ঝাপসা, কাঁপা কাঁপা। তবু দৃশ্যটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন ব্রাইডন কার্স। ইংলিশ পেসার। পেছনে অস্পষ্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে বেন স্টোকসকে, সদ্য সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক। গত শনিবার রাতে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে ডারহামের হয়ে জয় উদ্‌যাপন করতে নাইট ক্লাবে গিয়েছিলেন তাঁরা। সেখানে কিছু একটা ঝামেলার পর পুলিশ আটক করে কার্সকে। হেডিংলিতে প্রথম টেস্টে সুযোগ না পাওয়ায় তিনি ওই ম্যাচেই খেলেছিলেন।

এর পরের দিন ইংলিশ মিডিয়ায় আবার খবরের শিরোনামে ‘নাইট ক্লাব–কাণ্ড’। ৯ মাসে তৃতীয়বার যখন একটা দলকে নিয়ে এমন শিরোনাম হয়, সেটা যে ভালো লক্ষণ নয়, বুঝতে কোনো কিছুর বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।

ওয়েলিংটনে হ্যারি ব্রুক, জ্যাকব বেথেল ও জশ টাংয়ের পর চেলসিতে গাস অ্যাটকিনসন ও বেন স্টোকস। আর এবার ডার্বিতে ব্রাইডন কার্স। তার আগে গত বছরের শেষ দিকে অ্যাশেজের মাঝপথে অস্ট্রেলিয়ার নুসায় প্রতি রাতে মদ্যপান করে ইংলিশ ক্রিকেটারদের মাতাল হয়ে পড়ার গল্পগুলো পুরো ইংল্যান্ডকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। আসলেই কি একটা চক্রের মধ্যে পড়ে গেছে ইংল্যান্ড?

অথচ এই মৌসুমেই টেস্টে দারুণ দুটি দাপুটে জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড। জুনে লর্ডসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, কয়েক দিন আগে হেডিংলিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু সে জয় চাপা পড়ে গেছে মাঠের বাইরের বিতর্কে। যেন ‘নাইটক্লাব–কাণ্ড’ই এখন ইংল্যান্ড দলের জন্য সবচেয়ে মানানসই শিরোনাম!

কার্সের ঘটনাটা অবশ্য একটু আলাদা। হাতকড়া পরতে হলেও পরে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দিয়েছে বড় কোনো অভিযোগ না থাকায়। তবে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড আগেই জানিয়েছিল, ঘটনাটি তদন্ত করা হবে।

সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন

পরে সেটি পাঠানো হয় স্বাধীন ক্রিকেট রেগুলেটরের কাছে। রেগুলেটরও তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ফলে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে কার্সকে সরিয়ে হ্যাম্পশায়ারের পেসার সনি বেকারকে নেওয়া হয়েছে। এদিকে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন মনে করছেন, শুধু সমালোচনা নয়, এসব ঘটনার জন্য দরকার কঠোর শাস্তি।

বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে তিনি বলেছেন, ‘এমন একটা শাস্তি দরকার, যা পুরো ইংল্যান্ড দলকে কাঁপিয়ে দেবে। সবাই যেন বুঝতে পারে, যদি খারাপ আচরণ করো বা দলের সুনাম নষ্ট করো, তাহলে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে।’

কথাটা শুধু কার্সকে নিয়ে বলা নয়। ভন মনে করেন, পুরো ঘটনার দায় যদি একা কার্সের ঘাড়ে চাপানো হয়, তা কঠোর হয়ে যাবে। তাঁর কথা, ‘কার্স যদি একাই সব দায় নেয়, সেটা কঠিন হবে। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যাতে বোঝা যায়, এই আচরণ আর মেনে নেওয়া হবে না।’

কিন্তু দায়টা আসলে কার? মদ্যপান ও মাতলামির একাধিক ঘটনায় বেন স্টোকসের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কখনো সক্রিয়, কখনো নিষ্ক্রিয়। ৪-১ ব্যবধানে হারা অ্যাশেজের সময় খেলোয়াড়দের নেশাগ্রস্ত অবস্থার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর একরকম কারফিউ জারি করা হয়েছিল ইংল্যান্ড দলে। এরপর জুনে লন্ডনের একটি নাইটক্লাবে একই রকম ঘটনার পর কারফিউ ভাঙার দায়ে বেন স্টোকস ও গাস অ্যাটকিনসনকে লিখিত সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট থেকে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই সিরিজ চলাকালেই তৃতীয় টেস্টে হঠাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন স্টোকস। দুই সপ্তাহ পর লাল বলের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।

আমি সত্যি খুব বিরক্ত, ভীষণ হতাশ। আমরা একের পর এক কেন এমন সব ভুলভাল কাণ্ড করে চলেছি! এতে আমাদের মাঠের পারফরম্যান্স আর অর্জনের আলোটাই যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
একের পর এক নাইটক্লাব কাণ্ড নিয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট

এবারও কার্সের সঙ্গে সেই স্টোকস। অথচ দুই সপ্তাহও পেরোয়নি অ্যাশেজের ঘটনায় জারি করা সান্ধ্য আইন তুলে নেওয়া হয়েছে। নতুন অধিনায়ক জো রুট সেই সময় সতীর্থদের প্রতি আকুতি জানিয়েছিলেন, ‘একটু বড় হও, বড়দের মতো আচরণ করো।’ গতকাল কার্সের ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তাঁকে অসহায়ই মনে হলো, ‘আমি সত্যি খুব বিরক্ত, ভীষণ হতাশ। আমরা একের পর এক কেন এমন সব ভুলভাল কাণ্ড করে চলছি! এতে আমাদের মাঠের পারফরম্যান্স আর অর্জনের আলোটাই যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।’

স্টোকস যেহেতু সবচেয়ে আলোচনায়, তাঁকেও এ নিয়ে কথা বলতে হয়েছে। কয়েক দিন আগে ‘ফর দ্য লাভ অব ক্রিকেট’ পডকাস্টে এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্টোকস বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, ক্রিকেটে একটা মদ্যপানের সংস্কৃতি আছে আর সেটা এখনো বদলায়নি। আমরা এখন ২০২৬ সালে আছি। বছরের পর বছর ধরে খেলাটা আরও পেশাদার হয়েছে, কিন্তু একটা জিনিস ক্রিকেটের সঙ্গে ঠিক আগের মতোই থেকে গেছে, সেটা হলো মদের সঙ্গে সম্পর্ক। এটা ঠিক সেখানেই থেকে গেছে, খেলাটার সঙ্গে মিশে গেছে।’

স্টোকসের মূল বক্তব্য পরিষ্কার, খেলা পেশাদার হলেও পানের অভ্যাস পেশাদার হয়নি। ইংল্যান্ড দলকে আলাদা করে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সমস্যাটা আস্ত ক্রিকেটের ডিএনএতে। নইলে কি আর সিডনি থেকে লন্ডনের ফ্লাইটে ডেভিড বুনের কথিত ৫২ ক্যান বিয়ার খাওয়ার কীর্তিকে গর্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়! জেমস অ্যান্ডারসনের বিদায়ের দিনও মাঠে সমর্থকদের সামনে গিনেসের পাইন্ট হাতে দেখা গেছে তাঁকে।

আসল ব্যাপার বোধ হয়, নিজের সীমা বুঝতে পারা। কখন মদ্যপান করা উচিত, কখন উচিত নয়, মদ্যপানের পর কী করা যাবে, কী করা যাবে না—সেটা বুঝতে পারা। সবাই যে হঠাৎ মদ ছেড়ে দেবে—এমনটা আশা বোকামি। হ্যাঁ, মার্ক উডের মতো ব্যতিক্রম তো থাকবেন। স্টোকস নিজেও ২০২৫ অ্যাশেজের আগে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে সেরে ওঠার সময় মদ্যপান একেবারে ছেড়ে দিয়েছিলেন, টানা কয়েক মাস এক পেগও গলায় ঢালেননি। কিন্তু সবাই যে সেই পথ অনুসরণ করবেন—এমনটা ভাবা বোকামি।

তাহলে কি কঠিন পথই একমাত্র সমাধান? কারফিউ দিয়ে দেখা হয়েছে, কাজ হয়নি।
ভন কঠিন শাস্তির কথা বলছেন, সেটা তাই কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। শাস্তি তো আগেও কম হয়নি কারও কারও। শেষ পর্যন্ত হয়নি ইংলিশ অধিনায়ক জো রুটের কথাই সত্যি, ‘মাঠের বাইরেও সবাইকে পরিণত বয়স্ক হিসেবে আচরণ করতে হবে।’

নইলে কিছুদিন পরপর ‘নাইটক্লাব–কাণ্ড’ জাতীয় শিরোনাম হতেই থাকবে।