
নিউজিল্যান্ড: ২৪৭/৮। বাংলাদেশ: ২২১। ফল: নিউজিল্যান্ড ২৬ রানে জয়ী।
দৃষ্টিসীমার মধ্যে থেকেও কী অদ্ভুতভাবে মিলিয়ে গেল জয়ের সম্ভাবনা! ৪৩ ওভার শেষে রান ৫ উইকেটে ১৯২; হাতে থাকা ৫ উইকেট নিয়ে শেষ ৭ ওভারে দরকার ছিল মাত্র ৫৬ রান। সেখান থেকেই সম্ভাবনার আলো নিভতে নিভতে পুরোপুরি নিভে গেল ৪৯তম ওভারে। অনভিজ্ঞ নিউজিল্যান্ডের ২৪৭ রান তাড়া করতে গিয়ে ২৬ রানের হারে সিরিজ শুরু হলো বাংলাদেশের।
জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েও হার, তার আগে ক্লান্তিকর ‘হারানো দিনের’ ওয়ানডে এবং দিনের আলোর ম্যাচ সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম ম্যাচটি কেবল বিরক্তিরই উদ্রেক করেছে। সাইফ হাসান ও তাওহিদ হৃদয়ের ফিফটি কিংবা প্রায় দেড় বছর পর ওয়ানডেতে ফেরা পেসার শরীফুল ইসলামের ২৭ রানে ২ উইকেট নেওয়ার দারুণ বোলিং; উদ্যাপনের উপলক্ষ হতে পারেনি কিছুই।
দুই ইনিংস মিলিয়ে পুরো ১০০ ওভার খেলা হয়নি। তবু বেলা ১১টায় শুরু হয়ে ম্যাচ শেষ হয়েছে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর। অর্থাৎ ১০০ ওভার খেলা হলে যে সময়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তারও পাক্কা এক ঘণ্টা পর।
প্রচণ্ড গরমের জন্য নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে একটি অতিরিক্ত পানি পানের বিরতি আর চারটি রিভিউতে ব্যয় হওয়া সময়ের সঙ্গে যোগ হয়েছিল ছোটখাটো একটি চোট-বিরতিও। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসই তাই শেষ হয়েছে নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট পর। জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দিনের আলোয় খেলা হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ ইনিংসের বড় একটা অংশ হয়েছে ফ্লাডলাইটের নিচে।
খেলার সময় বেড়ে গেলেও দর্শকেরা আনন্দ পেতেন যদি ম্যাচে প্রাণ থাকত। কিন্তু সেটিও ছিল না। আধুনিক ওয়ানডে মানেই টি-টুয়েন্টির বর্ধিত সংস্করণ। চার-ছক্কার রোমাঞ্চ থাকবে, তিন শ-সাড়ে তিন শর ইনিংসকেও মনে হবে না নিরাপদ। কিন্তু এদিন ওয়ানডে ক্রিকেট যেন ফিরে গেল এক যুগ আগে, যখন ২৫০ রানও ছিল পাহাড়সম। ২৮০-২৯০ পার হলে তো জয় নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হতো।
ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল ‘আর্ট ফিল্মের’ আবহ। খেলা এগোয় তো এগোয় না। শুরুতে উইকেট হারানোর কোনো ধাক্কা ছিল না, তবু ৫ ওভারে নিউজিল্যান্ডের রান মাত্র ১৬। ১০ ওভার শেষে ১ উইকেটে ৩৮। দলের ২১ রানে শরীফুলের নিচু হয়ে আসা বলে ওপেনার নিক কেলি বোল্ড হন।
আরেক ওপেনার হেনরি নিকোলস আর উইল ইয়াংও নিলেন ধরে খেলার পুরোনো নীতি—রানের দরকার নেই, উইকেট হাতে রাখো। ২৪৭ রান করেও জয়ের পর এর কারণ জানিয়েছেন ৫৮ বলে ৫৯ রান করে ম্যাচসেরা হওয়া কিউই ব্যাটসম্যান ডিন ফক্সক্রফট। তাঁরা নাকি বুঝতে পেরেছিলেন, এই উইকেটে ২৪০-এর বেশি রান করলেই জয় সম্ভব।
শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সর্বশেষ পাকিস্তান সিরিজ হয়েছে স্পোর্টিং উইকেটে। বিসিবি তখন বলেছিল, এখন থেকে ঘরের মাঠে ‘ট্রু’ উইকেটে খেলবে বাংলাদেশ। কিন্তু এক সিরিজ পরই দেখা গেল সেই নীতি উধাও। উইকেটে বল আসছিল নিচু হয়ে, কিছুটা ধীরে। ব্যাটিং মোটেও সহজ ছিল না। হতে পারে সুষম বাউন্সের উইকেটে নিউজিল্যান্ড বেশি সুবিধা পেয়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই এমন উইকেট বানানো হয়েছে। কিন্তু তাতে লাভ হলো কী? স্বাগতিক বাংলাদেশই তো বুঝতে পারেনি ফর্মুলাটা!
উইকেটের ধরন বুঝে বড় শট খেলার তেমন চেষ্টাই করেনি নিউজিল্যান্ড। তাদের পুরো ইনিংসে ছক্কা নেই একটিও। মিরপুরে ওয়ানডের এক ইনিংসে ছক্কা না হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। দেশে-বিদেশে মিলিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে এমনটা ঘটল মাত্র তৃতীয়বার। তারপরও কিউইদের ব্যাটিংয়ে ভুলত্রুটি ছিল। এমন উইকেটেও রিভার্স সুইপ খেলার ঝুঁকি নিয়ে থিতু হয়েও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি হেনরি নিকোলস (৮৩ বলে ৬৮) ও উইল ইয়াং (৪২ বলে ৩০)।
অনেকটা একই রকম ব্যাটিং করা বাংলাদেশের ইনিংসে ছক্কা মাত্র তিনটি, প্রথমটি মেরেছেন ৭৬ বলে ৫৭ রান করা সাইফ, পরের দুটি ৬০ বলে ৫৫ রান করা হৃদয়। পাঁচে নেমে জয়ের তৃষ্ণাটা শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়া এই হৃদয়ই। কিন্তু রান–বলের প্রতিযোগিতায় জয়ের তাড়না দেখা যায়নি আর কারও ব্যাটেই। পরিণতি—মাঝে ৯০ বলে কোনো বাউন্ডারি না আসা। নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদান দিয়ে ফিফটি করেছেন ওপেনার সাইফ (৭৬ বলে ৫৭)। মাঝে লিটন দাসের ৪৬ রানের ইনিংসেও ছিল বড় কিছুর সম্ভাবনা। কিন্তু এমন উইকেটে রান তাড়া করে জিততে হলে যে অঙ্ক করে এগোতে হয়, বাংলাদেশ ব্যর্থ সেখানেই।
ব্যাটে শৃঙ্খল পরিয়ে রাখা মিরপুরের উইকেটে প্রতিযোগিতা ছিল আসলে ক্রিকেটীয় বোধের। অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকা দ্বিতীয় সারির নিউজিল্যান্ড সেই জায়গাতেই ছিল এগিয়ে। মিরপুরের উইকেটকে তারা যতটা বুঝেছে, ততটা বুঝতে পারেনি বাংলাদেশ।