ইতালির ফাস্ট বোলার টমাস ড্রাকা। তাঁর মেন্টর ছিলেন ডেনিস লিলি
ইতালির ফাস্ট বোলার টমাস ড্রাকা। তাঁর মেন্টর ছিলেন ডেনিস লিলি

ডেনিস লিলির ‘ভাতিজা’ ইডেন গার্ডেনে শুনতে চান ‘ফোর্জা ইতালিয়া’ স্লোগান

টমাস ড্রাকা, বয়স ২৫ বছর। মা তাঁর ইতালিয়ান, বাবা সাবেক যুগোস্লাভিয়া বংশোদ্ভূত। ইতালি বা যুগোস্লাভ, দুটি দেশকে একবিন্দুতে মেলায় ফুটবল। ইতালি চারবারের ফিফা বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন। যুগোস্লাভিয়া কখনো বিশ্বকাপ না জিতলেও ফুটবল–ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সেদিক থেকে ড্রাকার রক্তে ফুটবলের ধারা, নাড়ির টানটাও ফুটবলেরই হওয়ার কথা। ২০০৬ সালে ড্রাকার বয়স যখন সবে ছয় বছর, ইতালি চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মেতেছে। অস্ট্রেলিয়ায় বসেও সেই আনন্দের নাচন নিজের হৃদয়ে টের পেয়েছেন। সেবারই যে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল দেখেছেন ড্রাকা। আর এখন তিনি নিজেই বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন। সেটা এমন খেলার বিশ্বকাপ, যেটা তাঁর ধমনিতে নেই, নেই নাড়ির সঙ্গে জড়িয়েও। ড্রাকার আজ অভিষেক হচ্ছে ক্রিকেট বিশ্বকাপে, সেটা ইতালির হয়েই। ইডেন গার্ডেনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আজ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অভিষেক হচ্ছে ফুটবলের দেশ ইতালিরও।
ক্রিকেটের বিশ্বকাপে অভিষেক হতে যাওয়া ইতালি দলের অন্যতম ভরসা ফাস্ট বোলার ড্রাকা, যিনি নিজেই যেন এক পৃথিবী—ইতালিয়ান মা, যুগোস্লাভ বাবা, শৈশব কেটেছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে, পড়াশোনা ও ক্রিকেটের নতুন অধ্যায় চলছে ইংল্যান্ডে, ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন কানাডায় গ্লোবাল টি–টুয়েন্টি লিগে। আর এখন স্বপ্নের মঞ্চে পারফর্ম করতে নামছেন ভারতে।

ইতালির আর পাঁচ–দশটা শিশুর মতোই ছোটবেলায় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নই দেখেছিলেন ড্রাকা। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সে চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া থেকে স্পেনে ফুটবল খেলতে গিয়ে বুঝতে পেরেছেন, তাঁর শরীর আর গঠন এ খেলাটির জন্য উপযুক্ত নয়। অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে ফুটবলের সঙ্গে ক্রিকেটটাও খেলতেন। যখনই বুঝতে পেরেছেন তিনি ফুটবলের লোক নন, তখনই আরও বেশি করে ক্রিকেটে ঝুঁকে পড়েন।
বাবা পাঁড় ফুটবল–ভক্ত, মায়ের অবশ্য ক্রিকেটের প্রতি কিছুটা টান আছে। কিন্তু দুজনের কেউই ছেলের খেলার পথ বাতলে দিতে চাননি। বরং সব সময়ই বলে গেছেন, তাঁর যেটা ভালো লাগে সেটাই বেছে নিতে। শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলোর কথা ড্রাকা মনে করলেন এভাবে, ‘আমি একটু দেরিতে পরিণত হয়েছি। শৈশবে ক্রিকেট আমার কাছে ছিল শখের খেলা। বাড়ির উঠানে খেলতাম। কখনো কখনো সপ্তাহান্তের জুনিয়র ম্যাচে। ধীরে ধীরে ক্রিকেটই আমার আসল ভালোবাসা হয়ে ওঠে।’ ড্রাকা থামেন না, তিনি বলে চলেন, ‘ফুটবল ছাড়ার সময় একটু কষ্টই লেগেছিল। ফুটবলের দেশের মানুষ হয়ে ফুটবল না খেলে ক্রিকেট খেলব, এটা ভেবে অনেক আত্মীয়ও কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু বাবা বা মা কখনোই আমার ওপর কিছু চাপিয়ে দেননি। তাঁরা বরং সব সময় বলে গেছেন, আমার যেটা ভালো লাগে, সেটাই যেন করি।’

টমাস ড্রাকা

বাবা ফুটবলের ভক্ত হলেও অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ড্রাকার বাবা ছিলেন ওয়াইনের বেশ সমঝদার, লিলিও তাই। এ জিনিসই দুজনকে মিলিয়েছিল একবিন্দুতে আর ড্রাকাকে সুযোগ করে দিয়েছিল কিংবদন্তির কাছাকাছি যেতে। বাবার সঙ্গে সখ্যের পথ ধরে লিলিকে ‘চাচা’ বলেই ডাকতেন ড্রাকা। ফাস্ট বোলিংয়ের দীক্ষাটা সেই চাচার কাছ থেকেই নিয়েছেন। ২১তম জন্মদিনে ড্রাকা চাচা লিলির কাছ থেকে একটি সোনার চেইন উপহার পান। সেই চেইনে খোদাই করা আছে লিলির টেস্ট ক্যাপ নম্বর আর অটোগ্রাফ।
এবারের বিশ্বকাপে লিলির দেওয়া সেই চেইন পরেই খেলবেন ড্রাকা, যেটি নাকি তাঁকে তুমুল গতিতে বল করার প্রেরণাও জোগাবে, ‘বিশ্বকাপে আমি চেইনটা পরব। ওটাই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কেন আমি এখনো জোরে বল করতে চাই।’

ডেনিস লিলি

চাচার কাছ থেকে ফাস্ট বোলিংয়ের দীক্ষা নিয়ে ২০২২ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান ড্রাকা। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করছেন। সেই পড়াশোনার পাশাপাশিই খেলছেন ব্রাম্পটন উলভসের হয়ে। এই দলের হয়ে খেলার মধ্যেই ডাক পান কানাডায় গ্লোবাল টি–টোয়েন্টি লিগে। সেখানে ১১ উইকেট নিয়ে হন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। বিশেষ করে পরিচিতি পান জোরে বল করার কারণে। ড্রাকা এখন ঘণ্টায় ৮৮ মাইলেও বল করেন। বিশ্বকাপে গতিটা আরও বাড়াতে চান। আর চান ইডেন গার্ডেনে আজ একটি স্লোগান শুনতে, যে স্লোগানটা ইতালি ফুটবল দলের জন্য দেন তাদের সমর্থকেরা—ফোর্জা ইতালিয়া! ফুটবলের দেশে জন্ম নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়ানো—ড্রাকার গল্পটা তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, ইতালিয়ান ক্রিকেটের নতুন যাত্রার প্রতীকও। ইডেন গার্ডেনে যদি সত্যিই ভেসে আসে ‘ফোর্জা ইতালিয়া’ ধ্বনি, সেটাই হয়তো হবে সেই যাত্রার সবচেয়ে জোরালো ঘোষণা।