মাতসুশিমা সুমাইয়া
মাতসুশিমা সুমাইয়া

ঠোঁটে আঘাত, প্লাস্টিক সার্জারি, ফুটবলার থেকে ফুটসালেও চ্যাম্পিয়ন সুমাইয়া

ক্রিকেটার হতে চেয়ে হয়েছেন ফুটবলার, জিতেছেন সাফের শিরোপা। কিন্তু ফুটবলের আলোঝলমলে দিনটা স্থায়ী হয়নি। অবশ্য স্বপ্ন দেখা থামাননি। ফুটসালে নাম লিখিয়েই জিতেছেন আরেকটি ট্রফি। সাফ ফুটসাল জিতে দেশে ফেরার পর মাতসুশিমা সুমাইয়া কাল জহির উদ্দিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন নিজের ছোট্ট ক্যারিয়ারের বাঁকবদলের গল্প—

প্রশ্ন

প্রথমবার অংশ নিয়ে সাফ ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন হতে পেরে কেমন লাগছে?

মাতসুশিমা সুমাইয়া: সত্যি অনেক ভালো লাগছে। যেহেতু আমাদের জন্য এটা প্রথম টুর্নামেন্ট ছিল, অভিজ্ঞতার দিক থেকে আমরা অনেক দলের চেয়ে পিছিয়ে ছিলাম। ভারতের মতো দল এএফসি কোয়ালিফায়ার খেলে এসেছে, আমরা খেলিনি। তারপরও সিনিয়র–জুনিয়র, অভিজ্ঞ–নতুন মিলিয়ে আমাদের একটা ভালো ভারসাম্য ছিল। সবাই চেষ্টা করেছে ভালো খেলতে। শেষ পর্যন্ত আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি। সবাই খুব খুশি।

নারী ফুটবলার মাতসুশিমা সুমাইয়া
প্রশ্ন

ফুটবলার থেকে ফুটসাল খেলোয়াড়, কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়?  

সুমাইয়া: দুটিই অনেক পরিশ্রমের। তবে ফুটসালে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, প্রতিটা মুহূর্তে খেলায় মনোযোগ রাখতে হয়। ফুটবলে ১১ জন মিলে একটু সময় নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু ফুটসালে সবকিছু ততক্ষণাৎ।

প্রশ্ন

২০২৪ সালে সাফ ফুটবল জিতেছেন। এবার জিতলেন ফুটসাল। কোন ট্রফিটা এগিয়ে রাখবেন?  

‎‎সুমাইয়া: দুটিই আমার কাছে খুব স্মরণীয়। দুটি অর্জনই আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া।

প্রশ্ন

‎সাফের জন্য ফুটসাল দল গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা আপনি। দল গড়ায় আপনার ভূমিকাটা কেমন ছিল?

সুমাইয়া: আমি শুধু প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে ছেলেদের মতো মেয়েদের ফুটসাল দলও হওয়া উচিত এবং আমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য লড়তে পারি। এরপর ফেডারেশন বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। ইমরান স্যার (ফুটসাল চেয়ারম্যান) আর তাবিথ স্যার (বাফুফে সভাপতি) অনেক পরিশ্রম করেন। এ জন্য সব কৃতিত্ব আমি তাঁদের দেব।

প্রশ্ন

কেউ কেউ বলেন, জাতীয় ফুটবল দল থেকে বাদ পড়ায় ফুটসালে খেলছেন। এটাকে কীভাবে দেখেন?

সুমাইয়া: আমি এমনটা মনে করি না। ফুটসাল দলও জাতীয় দল। ফুটবলের চেয়ে এটা কোনো অংশেই কম নয়। সারা বিশ্বেই ফুটসাল এখন জনপ্রিয় হচ্ছে। এটাকে ছোট ভাবার কিছু নেই। বরং আমি মনে করি, ফুটসাল বাংলাদেশের জন্য একটা সম্ভাবনাময় খেলা।

প্রশ্ন

আপনার শুরুটা কি ফুটবল দিয়েই?

সুমাইয়া: না, শুরুতে ক্রিকেট খেলতাম। ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু একবার ব্যাটের আঘাতে ঠোঁট মারাত্মকভাবে কেটে যায়, প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয়। এরপর বাবা ক্রিকেট বন্ধ করে দিয়ে ফুটবল ধরিয়ে দেন।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাপানের নাগোয়া শহরে হলেও মাতসুশিমা সুমাইয়া এখন পুরোদস্তুর বাংলাদেশি
প্রশ্ন

ফুটবলে আসাটা কীভাবে?

সুমাইয়া: বাবা সব সময় বলতেন মাঠে থাকতে, খেলাধুলা করতে। ২০০৯ সালে আমরা যখন দেশে আসি, বারিধারা ডিওএইচএসে থাকতাম। ওখানে পার্কে এক নাইজেরিয়ান কোচের অধীনে অনুশীলন করতাম। সেখান থেকেই শুরু।

প্রশ্ন

শুরুটা তো ছোট মাঠ, পার্ক থেকে—এর মানে ফুটসালটা আপনার পূর্বপরিচিত?

সুমাইয়া: অনেকটা তাই। আমরা পার্কে খেলতাম, মাটির মাঠে। তখন নাম জানতাম ফুটবল, কিন্তু আসলে ছিল ফাইভ-এ-সাইড বা সিক্স-এ-সাইড মানে ফুটসালই।

প্রশ্ন

পরে কীভাবে পেশাদার পর্যায়ে এলেন?

সুমাইয়া: ২০১১ সালে বসুন্ধরা কিংস থেকে ডাক পাই। তিন বছর সেখানে ছিলাম। এরপর ফুটসাল লিগে খেলার জন্য মালদ্বীপে সুযোগ পাই। প্রথম মৌসুমে সেমিফাইনালে উঠি, পরে চ্যাম্পিয়ন হই।

অনুশীলনে মাতসুশিমা সুমাইয়া
প্রশ্ন

জাতীয় ফুটবল দলে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

সুমাইয়া: জাতীয় দলে দুই বছর ছিলাম। ১০টা ম্যাচ খেলেছি, একটা গোল করেছি, একটা সাফ জিতেছি। এটা আমার জীবনের বড় অর্জন।

প্রশ্ন

ফুটবলে আবার ফিরতে চান?

সুমাইয়া: একজন খেলোয়াড়ের কাজ হলো নিয়মিত খেলা। সেটা যেখানেই সুযোগ আসে, সমস্যা নেই। খেলতে পারলেই হলো।

প্রশ্ন

‎আপনি তো জাপানে জন্মেছেন। জাপানের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল না?

সুমাইয়া: আমার দুটি পাসপোর্ট আছে। তবে ফুটবলটা যেহেতু বাংলাদেশে শিখেছি, আমার একটাই স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের হয়ে খেলা। কখনো অন্য কিছু ভাবিনি।

প্রশ্ন

বাবার প্রেরণায় খেলোয়াড় হলেন, এখন আপনাকে এ পর্যায়ে দেখে বাবা কতটা খুশি?

সুমাইয়া: বাবা সব সময় আমাকে দিয়ে গর্ব করেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি নবাবগঞ্জ। গ্রামের সবাই তাঁকে অভিনন্দন জানায়। এটা তাঁর জন্য অনেক আনন্দের।

ফুটসাল মাঠে মাতসুশিমা সুমাইয়া
প্রশ্ন

‎বাংলাদেশের ফুটসালের উন্নয়নে কী কী করা দরকার বলে মনে করেন?

সুমাইয়া: সারা বছর ক্যাম্প, খেলোয়াড়দের বেতনকাঠামো, ভালো কোচিং, মাঠ—এগুলো খুব দরকার। সুযোগ-সুবিধা পেলে আমরাও একদিন এশিয়ান কাপে খেলব।

প্রশ্ন

খেলাধুলার বাইরে অবসর সময় কীভাবে কাটে?

সুমাইয়া: আমি শৃঙ্খলাার মধ্যে থাকতে পছন্দ করি। সকালে জিম, বিকেলে অনুশীলন। অবসরে বাসায় থাকি, বিশ্রাম নিই, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাই, সিনেমা দেখি।

প্রশ্ন

‎জীবনে কোনো আক্ষেপ আছে?

‎সুমাইয়া: না, তেমন কোনো আক্ষেপ নেই। ফুটবলে আমার একটা পদক আছে। ফুটসালেও একটা পদক আছে। চেষ্টা করব দেশের জন্য আরও ভালো কিছু করার।

প্রশ্ন

ফুটসাল নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন?

সুমাইয়া: সামনে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। যাতে সবাই মিলে ফুটসালকে এশিয়ান পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি। এটাই এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।