ফুটবল যেভাবে তাঁদের জীবন বাঁচিয়েছিল

মাউথাউসেন বন্দীশালা। ছবি: এএফপি
মাউথাউসেন বন্দীশালা। ছবি: এএফপি

'ওখানে ওরা ১ লাখ ২০ হাজারের মতো মানুষ হত্যা করেছে। ফুটবল খেলা হতো। কিছু স্প্যানিশসহ অনেকেই ফুটবল খেলে জীবন বাঁচিয়েছিল।'

চার বছর আগে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম 'মার্কা'কে এ কথা বলেছিলেন সিগফ্রিড, ক্রিস্টোবাল ও হোসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অস্ট্রিয়ার মাউথাউসেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দী ছিলেন তারা। বেঁচে থাকলে আজ তাঁদের 'দ্বিতীয় জন্মে'র বয়স হতো ৭৫ বছর। মার্কিন সামরিক বাহিনী কুখ্যাত সে বন্দীখানা মুক্ত করেছিল ১৯৪৫ সালে বসন্তে, আজ এই দিনে।

সেদিন মুক্তি পেয়েছিলেন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন হোসে মারফিল, লুইস গিল, মারিয়ানা কনস্তান্তে, আলফানসো মায়োসো। তারা বলে গিয়েছেন সে ক্যাম্পে 'ফুটবল খেলে নিশ্চিত মৃত্যু এড়ানো'র গল্প।

অস্ট্রিয়ার লিৎজ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ছিল মাউথাউসেন ক্যাম্প। লিৎজে শৈশবের একটা অংশ কেটেছে জার্মানির নাৎসিবাদী নেতা এডলফ হিটলারের। ইউরোপের নানা জায়গা থেকে নির্বাসনে পাঠানো মানুষদের এখানে বন্দী করে রেখেছিল হিটলারের সামরিক বাহিনী। মাউথাউসেনের কয়েদি মারফিল জানান, 'আমি ভাগ্যবান। প্রথম দফায় ওরা আমাকে বেছে নেয়নি। বেছে নিয়ে সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছিল।'

ফুটবল ছিল সেই বন্দীশিবিরের কিছু বন্দীর বেঁচে থাকার প্রেরণা। 'ছেঁড়া ও পুরোনো কাপড় দিয়ে বল বানিয়েছিল এক স্প্যানিশ। বেশ বড় একটা প্রাঙ্গন ছিল। সেখানে তারা পাস দেওয়া-নেওয়া করে মন ভালো রাখার চেস্টা করত', স্মৃতি হাতড়ে বলেন সিগফ্রিড মেয়ার। জার্মান ও পোলিশ বন্দীরা খেলতে নিষেধ করেছিল। এসএস বাহিনী দেখলে মেরে ফেলবে। মৃত্যু ছাড়া সেখানে আর কোনো শাস্তির বিধান ছিল না বন্দীদের জন্য।

মাউথাউসেনের বন্দী লুইস গিল 'দ্য ব্লু ট্রায়াঙ্গল' বইতে জানান, প্রায় ছয় মাসের মতো সেখানে বন্দী থেকে সবার মানসিক শক্তি ক্ষয়ে গিয়েছিল। কিছু একটা নিয়ে বেঁচে থাকতে ফুটবলটা দরকার ছিল, 'মনোবল ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছয় মাসের মতো বন্দী থেকে মনোবল হারানোর পথে ছিল সবাই।'

মাউথাউসেন বন্দীশালায় কুখ্যাত `মৃত্যুর সিড়ি`। গ্রানাইটের পাথর বয়ে উঠতে হতো বন্দীদের। বাম পাশের ছবিটি বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তোলা। ছবি: টুইটার

নথিপত্র অনুযায়ী, মাউথাউসেনে স্প্যানিশ বন্দীদের বহর পৌঁছোয় ১৯৪০ সালের আগস্টে। লুইস গিলকেও সে বছরই নিয়ে আসা হয়েছিল সেখানে। তাহলে গিলের কথা অনুযায়ী, মাউথাউসেন বন্দীশালায় ফুটবল খেলা শুরু হয়েছিল ১৯৪০ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে। অকথ্য নির্যাতনের মধ্যে থেকেও ফুটবল খেলাকে নাৎসিদের বিপক্ষে মানসিক জয় ছিল বলেই মনে করেন গিল, 'খেলাটা এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। অন্তত খেলার মান থেকে। কিন্তু এসএসের বিপক্ষে এটা ছিল আমাদের প্রথম নৈতিক জয়। আমরা মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলাম।'
বন্দীদের খবরদারি করে এসএস রক্ষীদেরও একঘেয়েমি পেয়ে বসেছিল। কেউ কেউ ফুটবল পছন্দ করতেন। সিগফ্রিডের ভাষায়, 'নাৎসিরা মাঠে ঢুকত খুব কম। কিন্তু দেয়ালের ওপাশ থেকে সব দেখাশোনা ওরাই করত।' এক কর্মকর্তা একদিন বন্দীদের খেলতে দেখে নাভাজো নামে একজনকে ডেকে বললেন, 'তুমি তো বেশ ভালো খেল। এখানে ম্যাচ খেলতে পারো। আমরা বুট ও বল দেব।' এটা ছিল স্বীকৃতির সঙ্গে একরকম নির্দেশও। কারণ মাউথাউসেন কমান্ডার ফ্রাৎজ জিয়েরিস এবং তাঁর সহকারি জর্জ বাখমেয়ার ফুটবল পছন্দ করতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মাউথাউসেন বন্দীশালার এ মাঠে খেলা হতো ফুটবল। ছবি: হলোকাস্টলার্নিং ডট কম

সিগফ্রিড নাভাজো নামে যাঁর কথা বলেছেন তাঁর ভালো নাম স্যাচুরিনো। ত্রিশের দশকে আধা পেশাদার ফুটবলার ছিলেন। তখন মাদ্রিদের খ্যাতিমান ক্লাব দেপোর্তিভো ন্যাসিওনালে খেলতেন। বন্দীশালা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ফ্রান্সে গিয়ে গড়েছেন ক্যারিয়ার। বন্দীশালায় নাভাজোর ভূমিকা তুলে ধরলেন সিগফ্রিড, 'সে ছিল মিডফিল্ডার। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ম্যাচ আয়োজন করত। ফরাসি, হাঙ্গেরিয়ান, স্প্যানিশ...নানা জাতির মধ্যে খেলা হতো। সে জার্মানদের জন্যই এটা করত। তবে কোনো দুঃখ ছিল না। ফুটবল ভালোবাসত। এর মধ্যে ডুবে নরক ভুলে থাকত।'

নাভাজোর সঙ্গে সিগফ্রিডের পরিচয় মাউথাউসেনে আসার দিন থেকে। ১০ বছর বয়সে এ বন্দীশালায় আসেন সিডফ্রিড। এক নাৎসি রক্ষী তাঁকে তুলে দিয়েছিলেন স্প্যানিশ শিবিরে। নাভাজো সেদিন থেকে তাঁকে আগলে রাখেন সন্তানতুল্য করে। এমনকি ‍মুক্তির পরও তাঁকে ছেড়ে যাননি। দত্তক হিসেবে নিয়ে যান ফ্রান্সে।

হত্যার পর বন্দীদের দেহভষ্ম ফেলা হতো এখানে। ছবি: হলোকাস্টলার্নিং ডট কম

বিশ্রামের দিন রোববার ফুটবল খেলা হতো মাউথাউসেনে। বন্দীরা যে মাঠে রোজ সকালে জমায়েত হতো সেখানে। বুট, বল, কাঠের গোলপোস্ট সব নাৎসি রক্ষীরা সরবরাহ করত। সিগফ্রিডের স্মৃতিতে, 'রেফারির মতো একজন ছিল। সে রেফারি না হলে কোনো বন্দী। দুই দলের নানা সিদ্ধান্ত দিত।' কয়েকজন রক্ষী থাকতেন এসব ম্যাচের পাহারাদার। জার্সিগুলোর কথাও মনে আছে সিগফ্রিডের, 'খেলা নিয়ে মতের মিল না হলে দুই ঘণ্টার মতো উলঙ্গ করে রাখা হতো। মনে আছে স্প্যানিশ দল একবার লাল ও সাদা জার্সি পরেছিল। অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ যেমন পরে। আর জার্মানরা পরেছিল নীল জার্সি ও সাদা প্যান্ট।'

মাউথাউসেন থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে অধীনস্ত বন্দীশালা গুসেন। মাউথেনসেনে 'খেলার খবর পেয়ে সেখানেও স্প্যানিশ, জার্মান, পোলিশ, চেকরাও দল বানায়। ঠিক মনে করতে পারছি না তবে, ওখানে প্রথম ম্যাচে স্প্যানিশদের বিপক্ষে জার্মানরাই জিতেছিল।আমি দেখেছি। ক্যাল্প নামে ডিফেন্ডারটির খেলাও মনে থাকবে'-স্মৃতিচারণ করেন ক্রিস্টোবাল সোরিয়ানো। মাউথাউসেন থেকে তাঁকে গুসানে পাঠানো হয়েছিল।

প্রতিটি ম্যাচ ছিল বন্দীদের জন্য উৎসব। রোববার খেলোয়াড়দের বিশ্রাম ও উকুন পরিষ্কার করা হতো। খেলা হতো বিকালে। বন্দীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। মারফিলের ভাষায়, 'একদিন বেতের বাড়ি না খাওয়া ছিল সৌভাগ্য। ভোর পাঁচটায় উঠে কাজ শুরু করতে হতো। শরীর ভালো থাকুক আর না থাকুক। সব সময় সাবধান থাকতে হতো রক্ষীরা যেন চটে না যায়। নইলে মেরে ফেলবে।'

মার্কিন সেনাবাহিনী মাউথাউসেন বন্দীশালা মুক্ত করার পর বন্দীরা। ছবি: টুইটার

বেশিরভাগ বন্দীই ছিল চরম অপুষ্টির শিকার। খেলায় দৌড়াতে পারত না। মাঠেই পরে যেত। এসএস রক্ষীরা সিড়ি থেকে ধাক্কা মেরে, গ্যাস দিয়ে, চাবুক মেরে, ফাঁসি দিয়ে মারতে না পারলে অপুষ্টি ও পরিশ্রম ছিল মৃত্যুর আরেক পথ। এর মধ্যেই ফুটবল ছিল বন্দীদের মৃত্যু এড়িয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন। কেননা ফুটবলারদের যত্ম নিত এসএস রক্ষীরা। কর্মকর্তারা তাদের শক্ত-পোক্ত দেখতে চাইতেন যেন ভালো করে খেলতে পারে। এতে বেশ মনোরঞ্জন হতো তাদের।

বন্দীশালায় সবচেয়ে কষ্টের ছিল পাথরের চাঁই নিয়ে ওপরে ওঠা। এ কাজে জীবন দিতে হয়েছিল অনেককেই। ফুটবল খেলতে পারলে এখান থেকে মুক্তি মিলত। নাভাজো সেখান থেকে লোক সংগ্রহ করতেন। সিগফ্রিডের ভাষায়, 'সে ওদের জীবন বাঁচিয়েছে। নিশ্চিত মৃত্যুে এড়াতে পেরেছে তারা খেলার জন্য।' তবে ভালো খেলতে না পারলে অনেককে জীবনও দিতে হয়েছে।

সিগফ্রিড জানান,'অনেক সময় ফর্ম থাকত না। শারীরিক সমস্যা তো ছিলই। বড়রা শিশুদের মতো খেললে যেমন দেখায় খেলাটা ছিল তেমন। পরিস্থিতি অনেক কঠিন ছিল। নির্মমতার শিকার হতে হতো।'

বন্দীদের স্মৃতি অনুসারে, নাভাজোর মতো আরও এক ফুটবলার ছিলেন সেখানে। হোসে লুইস আলমোজারা। বার্সেলোনায় অভিবাসি হয়ে এসে দেপোর্তিভো সাপ্রিসায় খেলতেন। মাউথাউসেনে বন্দী হিসেবে তিনি খেলেছেন কি, না তা নথিপত্রে নেই। হার্থেইম দূর্গে গ্যাস চেম্বারে মারা হয় আলমোজারাকে।

এগুলো স্রেফ কয়েকটা নাম। ফুটবলকে অবলম্বন করে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছিলেন তারা।কেউ সে লক্ষ্যে 'গোল' করেছেন, কেউ পারেননি। তবে এমন ফুটবল খেলা নিশ্চিতভাবেই আর কেউ কখনো দেখতে চাইবে না।