বিশ্বকাপকে আফ্রিকান ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে যেসব দেশ

>ফুটবল বিশ্বকাপে সব সময়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে আফ্রিকান দলগুলো। যুগে যুগে নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, ঘানা, সেনেগাল, আফ্রিকা, তিউনিসিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মরক্কোর মতো আফ্রিকান দলগুলো ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে উঁচুতে থাকা দলগুলোর পরীক্ষা নিয়েছে বারবার। বড় দলগুলোকে হারিয়ে তারা ঘটিয়েছে অঘটনও। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অদম্য সেই আফ্রিকানদের নিয়েই আজকের আয়োজন।
রজার মিলার মতো আফ্রিকানরা বিশ্বকাপে খেলতে এসে মুগ্ধ করেছেন বিশ্ববাসীকে (ছবি:ফিফা)
রজার মিলার মতো আফ্রিকানরা বিশ্বকাপে খেলতে এসে মুগ্ধ করেছেন বিশ্ববাসীকে (ছবি:ফিফা)

‘ফুটবল বিশ্বকাপ’ এই বাক্যাংশ তখনই সার্থক হয়, যখন বিশ্বের প্রতিটা প্রান্ত, প্রতিটি মহাদেশ থেকে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাত, গোত্রের খেলোয়াড়েরা অংশ নেন। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই টুর্নামেন্ট ‘বিশ্বকাপ’—নামের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছে প্রতিবারই। সাতটি মহাদেশ থেকেই প্রতিবারই বিভিন্ন দেশ অংশ নিয়ে থাকে। আফ্রিকা থেকেও বিভিন্ন দল যায় বিশ্বকাপ খেলতে।
এই মহাদেশ থেকে এখনো কেউ বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও দলগুলো এমন কিছু স্মৃতি, এমন কিছু মুহূর্তের সাক্ষী করে যায় ফুটবলপ্রেমীদের, যেসব মুহূর্ত বা স্মৃতি রোমন্থন করে বিশ্বকাপ ফুটবলের ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্য অনুভব করা যায় বছরের পর বছর। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আফ্রিকান দলগুলোর কীর্তি সম্পর্কে পড়ে নিই আজকে, আসুন!

ক্যামেরুন
তুলনামূলকভাবে বিশ্বকাপে আফ্রিকার সবচেয়ে সফল দল বলা যায় এই ক্যামেরুনকেই। রজার মিলা, স্যামুয়েল ইতোর মত কিংবদন্তির এই দল এই পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল আসরে খেলতে পেরেছে সাতবার। এর মধ্যে তারা সত্যিকার অর্থেই বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপে। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচেই তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা ক্যামেরুন গিওর্গি হ্যাজির রোমানিয়াকেও হারিয়ে উঠে যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানে কলম্বিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে গ্যারি লিনেকারের পেনাল্টিতে ৩-২ গলে হেরে স্বপ্নযাত্রা থেমে যায় ক্যামেরুনের। ক্যামেরুনের ৩৮ বছর বয়সী তারকা রজার মিলা সেবার চারটা গোল করে বুড়ো বয়সে এসে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে চেনান। তাঁর বৈচিত্র্যময় গোল উদ্‌যাপনের কথাও এখন ফেরে ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে। ক্যামেরুন অবশ্য এরপর আর কখনই প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। আর এবার তো বিশ্বকাপে তারা সুযোগই পায়নি।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে চমকে দিয়েছিল নাইজেরিয়া। ফাইল ছবি

নাইজেরিয়া
ক্যামেরুনের পর বিশ্বকাপের সফল আফ্রিকান দল কেউ থেকে থাকলে সেটা ‘সুপার ইগল’ খ্যাত নাইজেরিয়া। ১৯৯৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপে খেলার স্বাদ পাওয়া নাইজেরিয়া এরপর একে একে খেলেছে ১৯৯৮, ২০০২, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপ; খেলবে এবারের বিশ্বকাপেও। বিশ্বকাপে তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য ১৯৯৪ আর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা। ’৯৪–তে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা নাইজেরিয়া পরে হেরে যায় ইতালির কাছে। আর ’৯–তে স্পেনকে হারিয়ে অঘটন ঘটানো নাইজেরিয়া দ্বিতীয় রাউন্ডে বাদ পরে যায় ডেনমার্কের কাছে হেরে।

১৯৮২ বিশ্বকাপে সুন্দর ফুটবলের জন্য প্রশংসিত হয়েছে আলজেরিয়া। ফাইল ছবি

আলজেরিয়া
১৯৮২ সালে সুন্দর ফুটবল খেলে আলোচনায় আসা আলজেরিয়া সেবার পরের রাউন্ডে উঠতে পারেনি পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ন্যক্কারজনক কৌশলের জন্য। অস্ট্রিয়া বনাম পশ্চিম জার্মানির গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সমীকরণ ছিল এক গোলের ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানি জিতলে এই দুই দলই পরের রাউন্ডে উঠতে পারবে, বাদ পড়বে আরেক গ্রুপসঙ্গী আলজেরিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে এই দুই দল হীন কৌশল (পশ্চিম জার্মানি ১-০ অস্ট্রিয়া) অবলম্বন করায় সেবার আলজেরিয়াকেই বাদ পড়তে হয়।

এরপর আরও তিনটা বিশ্বকাপ খেলা আলজেরিয়ানদের সেরা সাফল্য ধরা দিয়েছিল গতবার, দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে জার্মানিকে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিল তারা, যদি ম্যানুয়েল নয়্যার অতিমানব হয়ে গোলবারের সামনে দাঁড়িয়ে না যেতেন! দুর্ভাগ্যবশত এবার রিয়াদ মাহরেজ, ইসলাম স্লিমানিদের আলজেরিয়ার খেলা দেখা যাবে না বিশ্বকাপে।

ঘানা
ঘানার নাম এলেই সবার আগে মনে পড়ে ২০১০ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই কোয়ার্টার ফাইনালের কথা, যেবার টাইব্রেকারে হেরে চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছিল আসামোয়াহ জিয়ানদের। কী হয়নি সেই ম্যাচে? মূল ৯০ মিনিটে ১-১ গোলে শেষ হওয়া ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে ঘানার ন্যায্য একটা গোল হাত দিয়ে গোললাইনের ওপর থেকে সরিয়ে জয়বঞ্চিত করেন লুইস সুয়ারেজ। পরে পেনাল্টি পেলেও সেই পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি আসামোয়াহ জিয়ান। পরে টাইব্রেকারে ঘানা আর উরুগুয়ের অভিজ্ঞতার সাথে পেরে ওঠেনি। এবার উদ্যমী ঘানাকেও দেখা যাবে না বিশ্বকাপের মঞ্চে।

২০১০ বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়েছে ঘানা। ফাইল ছবি

আইভরি কোস্ট
দিদিয়ের দ্রগবা, ইয়া ইয়া তোরের কাঁধে চড়ে ২০০৬ সাল থেকে টানা তিন বিশ্বকাপ খেললেও এবার বিশ্বকাপে আসতে পারেনি আইভরি কোস্ট। এই সময়ে দলে দ্রগবা, সলোমন কালু, উইলফ্রিয়েড বনি, উইলফ্রিয়েড জাহা, সার্হে অরিয়ের, ইয়া ইয়া তোরে, কোলো তোরে, জার্ভিনহোর মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকলেও বিশ্বকাপের গ্রুপিং তাদের জন্য কখনোই সদয় হয়নি। ২০০৬ সালে গ্রুপসঙ্গী হিসেবে আর্জেন্টিনা আর হল্যান্ডের পরে ২০১০ সালে গ্রুপ পর্বে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় ব্রাজিল ও পর্তুগালকে। ফলে, তাদের খেলায় সেই প্রতিভার ঝলকটা দেখা গেলেও পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন ঘটেনি।

সেনেগাল
তর্কযোগ্যভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন এই সেনেগালই ঘটিয়েছিল, ২০০২ সালে, তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে দিয়ে। সেবার দ্বিতীয় রাউন্ডে ‘গোল্ডেন গোল’-এ সুইডেনকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সেনেগাল পরে নিজেরাই শিকার হয় গোল্ডেন গোলের, তুরস্কের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। এবার সাদিও মানে, চেইখু কুয়াটে, কেইটা বালদের মতো প্রতিভারা ঝলসে উঠলে সে রকম অঘটনের দেখা আবারও মিলতে পারে।

তিউনিসিয়া
এ পর্যন্ত চারবার বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে অংশ নিয়ে কোনোবারই প্রথম রাউন্ড পেরোতে পারেনি তিউনিসিয়া। এবারও বিশ্বকাপ খেলতে আসছে তারা।

মরক্কো
১৯৮৬ সালের চমক ছিল মরক্কো। সেবার ইংল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করে আর পর্তুগিজদের হারিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা মরক্কো হেরে যায় পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে। এবার হাকিম জিয়েচ, মেধি বেনাশিয়া, আমিন হারিত ও ইউনেস বেলহান্দাদের মতো প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়দের ওপর ভর করে সেরকম আরেকটা অঘটনের আশা করতেই পারে তারা!

মিসর
বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান দল ছিল এই মিসর। ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে সেবার প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ে তারা। তারপর আরেকবার মাত্র বিশ্বকাপে আসতে পেরেছিল তারা, সেই ১৯৯০ সালে। এবার মোহাম্মদ সালাহর মতো বিশ্ব কাঁপানো তারকা আছে তাদের সঙ্গে। নিজেদের ইতিহাস তারা নতুন করে লিখতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে!

দক্ষিণ আফ্রিকা
২০১০ বিশ্বকাপের আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকা সেবার ছাড়াও খেলেছিল ১৯৯৮ আর ২০০২ বিশ্বকাপ দুটিতে। কোনোবারই দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা হয়নি তাদের।

অ্যাঙ্গোলা, টোগো, জায়ারে
১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলতে এসেছিল জায়ারে (বর্তমানে কঙ্গো)। আর ২০০৬ সালে এসেছিল আঙ্গোলা আর টোগো। সবার নিয়তিই একই ছিল। প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ে তারা!