মেসি কী অবশেষে পিএসজিতে নিজের ভূমিকা খুঁজে পেলেন?
মেসি কী অবশেষে পিএসজিতে নিজের ভূমিকা খুঁজে পেলেন?

কৌশলের কাটাছেঁড়া

মেসিকে খেলানোর পথ বের করে ফেললেন পচেত্তিনো?

প্রথম লেগ শুরুর আগে আলোচনার টেবিল গরম রেখেছিলেন নেইমার ও করিম বেনজেমা।


বেনজেমা রিয়াল মাদ্রিদ আক্রমণের প্রাণভোমরা, ওদিকে লিওনেল মেসি কিলিয়ান এমবাপ্পে থাকলেও পিএসজির আক্রমণভাগে নেইমারের গুরুত্ব উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দুজনেই চোট থেকে ফেরায় সন্দেহ ছিল ম্যাচের শুরু থেকে দুজনকে দেখা যাবে কি না। কারণ, নেইমার দলে থাকলে পিএসজি একভাবে খেলবে, না থাকলে কৌশল পাল্টে যায়। একই কথা খাটে বেনজেমার ক্ষেত্রেও।

ম্যাচে নজর কেড়েছে মরিসিও পচেত্তিনোর কৌশল

এমবাপ্পে, মেসি, দি মারিয়ার মতো তারকা থাকায় পিএসজি কোচ মরিসিও পচেত্তিনো চোট থেকে ফেরা নেইমারকে শুরু থেকে নামাননি। ওদিকে চোট থেকে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া বেনজেমা খেলেছেন ৮৭ মিনিট। হয়তো কার্লো আনচেলত্তির আক্রমণভাগে বেনজেমার বিকল্প ছিল না, তাই!


পিএসজির শক্তি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। নেইমার না খেললেও ছিলেন মেসি, এমবাপ্পে, দি মারিয়া, ভেরাত্তি, দোন্নারুম্মা, হাকিমি, মার্কিনিওস, মেন্দেস, পারেদেসের মতো তারকারা। ফর্ম থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলার সামর্থ্য আছে ফরাসি ক্লাবটির। তবে এই মৌসুমে মেসি আসার পর পিএসজির খেলা দেখে থাকলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, কাগজে-কলমে একটা দলের শক্তি থাকা আর মাঠে সে শক্তির প্রয়োগ করতে পারা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। যে কারণে মেসি আসার পর পিএসজি খুব ভালো ফুটবল খেলছে, বলা যাবে না। খেলার মধ্যে ছন্নছাড়া ভাব প্রবল।

কার কী দায়িত্ব, সেটা পচেত্তিনো এখনো ঠিকঠাক বের করতে পারেননি। কে আক্রমণে থাকবেন, কাকে আক্রমণের পাশাপাশি চাপ ধরে রাখতে হবে, নিচে নেমে আসতে হবে এবং সেটা কখন করতে হবে, মাঝমাঠ থেকে কাকে ওপরে উঠতে হবে, কোন ফুলব্যাক কখন কীভাবে ওঠানামা করবেন—পিএসজির খেলায় গত কয়েক মাসে এসব নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। তবে পিএসজির এসব দুর্বলতাই ছিল রিয়ালের আশার বাতিঘর। পিএসজির দুর্বলতাগুলোর ফায়দা নিতে পারলে প্রথম লেগেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব—এটাই ছিল রিয়ালের পরিকল্পনা।


কিছুই হয়নি। নিজেদের পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারেনি রিয়াল। পিএসজির ‘ছিদ্র’গুলোও কাজেও লাগানো যায়নি। বরং পচেত্তিনো যেভাবে পিএসজিকে খেলালেন, তা দেখে মনে হতেই পারে, একাদশে মেসিকে কীভাবে খেলাতে হবে, কীভাবে মেসি-নেইমার-এমবাপ্পে কিংবা মেসি-দি মারিয়া-এমবাপ্পে রসায়নের পুরো ফায়দা নেওয়া যায়—সেসব সমীকরণের সমাধান করে ফেলেছেন এই আর্জেন্টাইন কোচ।

এই শটেই গোল করেছেন এমবাপ্পে

পচেত্তিনোর সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় ছিল পিএসজি আক্রমণভাগের ‘প্রেসিং’। নেইমার শুরু থেকে ছিলেন না, ছিলেন মেসি-দি মারিয়া-এমবাপ্পে ত্রয়ী। ৭৩ মিনিটে দি মারিয়ার জায়গায় নেইমার নামেন। তবে যে–ই থাকুন না কেন, আক্রমণে প্রত্যেকে অসাধারণ হলেও কেউ–ই তেমন ‘প্রেস’ করা বা নিচে নেমে সতীর্থদের রক্ষণকাজে সাহায্য করতে অভ্যস্ত নন। এ ম্যাচ সে ধারণা বদলে দিয়েছে। গোটা ম্যাচে এমবাপ্পে-দি মারিয়ারা যেভাবে রিয়ালের রক্ষণকে প্রেস করে গেলেন, তা যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার।

পিএসজি নেমেছিল ৪-৩-৩ ছকে, গোলকিপার জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার সামনে দুই সেন্টারব্যাক মার্কিনিওস ও প্রেসনেল কিমপেম্বের জুটি, রক্ষণের ডান ও বাঁ দিকে যথাক্রমে দুই গতিশীল ফুলব্যাক আশরাফ হাকিমি ও নুনো মেন্দেজ। মাঝমাঠে পর্তুগিজ মিডফিল্ডার দানিলো পেরেইরার সঙ্গে ছিলেন ইতালির মার্কো ভেরাত্তি আর আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। সামনে মেসিকে মাঝে রেখে দুপাশে দি মারিয়া ও এমবাপ্পে।

কাগজে-কলমে পিএসজির একাদশ ও ৪-৩-৩ ছকে খেলোয়াড়দের অবস্থান

এ মৌসুমে মেসিকে বেশ কয়েক ম্যাচেই মেসিকে ‘ফলস নাইন’ বা ছদ্ম স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলিয়েছেন পচেত্তিনো। নামে স্ট্রাইকার হলেও তাঁর কাজটা একটু নিচে নেমে আক্রমণ গড়ে দেওয়া। কাল একটু নয়, ঢের নিচে নেমে খেলেছেন মেসি। বলতে গেলে গোটা ম্যাচেই স্বদেশি পারেদেসের পাশে থেকে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, সামনে এমবাপ্পে আর দি মারিয়াকে সমানে বলের যোগান দিয়ে গেছেন। মেসিকে জায়গা করে দিতে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার দানিলো পুরোপুরি ডিফেন্ডার হয়ে গিয়েছিলেন।

পারেদেসের সঙ্গে মাঝমাঠে নেমে এসেছেন মেসি, লক্ষ্য সামনে থাকা এমবাপ্পেকে বলের জোগান দেওয়া
মেসির কাছ থেকে বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে এমবাপ্পে, মেসির এই পাস থেকে গোলের সুযোগ এসেছিল

মার্কিনিওস আর কিমপেম্বের পাশে তৃতীয় সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলেছেন দানিলো। রক্ষণে দানিলো নেমে যাওয়ায় দুই ফুলব্যাক হাকিমি ও মেন্দেজ ওপরে উঠে আক্রমণের সুযোগ পেয়েছেন—এটা তাঁদের খেলার ধরণের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।

সামনে এমবাপ্পে আর দি মারিয়া স্ট্রাইক-জুটি হিসেবে খেলছিলেন, ওদিকে মিডফিল্ডার হিসেবে নেমে যাওয়া মেসি ছবিতেই নেই!

মেসি-দানিলোর নেমে যাওয়া, হাকিমি-মেন্দেজ ওপরে থাকায় ছকটা ৪-৩-৩ থেকে বদলে ৩-৩-৪ বা ৩-২-৫ হয়ে যাচ্ছিল। মেসির ফেলে আসা জায়গায় দু প্রান্ত থেকে ঢুকে যাচ্ছিলেন এমবাপ্পে ও দি মারিয়া—ফলে উইঙ্গার নয়, অনেকটা স্ট্রাইকার হিসেবে জুটি বেঁধে খেলেছেন দুজন।

বল পায়ে পিএসজির ৪-৩-৩ ছক বদলে যাচ্ছিল ৩-২-৫ ছকে

ভেরাত্তি ওপরে খেলেছেন বেশির ভাগ সময়। যে কারণে এমবাপ্পে ও দি মারিয়ার সঙ্গে ওপরে প্রেস করতে পেরেছেন। মেসি নিচে নেমে যাওয়ায় তাঁকে ওই ‘যন্ত্রণা’ থেকে রেহাই দেন এই ইতালিয়ান মিডফিল্ডার। ওপরে এমবাপ্পে, দি মারিয়া, ভেরাত্তির পাশাপাশি দুই ফুলব্যাক হাকিমি ও মেন্দেজ থাকায় মাঝমাঠের ওপাশ থেকেই চাপ বিস্তারের অনেক সুযোগ পেয়েছে পিএসজি। একদম রিয়ালের খেলোয়াড় ধরে ধরে ‘প্রেস’ করেছে পিএসজি (ম্যান মার্কিং)।

এভাবেই রিয়ালের প্রায় প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদাভাবে প্রেস করছিলেন পিএসজির খেলোয়াড়েরা

প্রতিপক্ষের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের পেছনে নিজেদের খেলোয়াড়কে লাগিয়ে দিয়ে ‘গুরু’ মার্সেলো বিয়েলসাকে যেন মনে করিয়ে দিয়েছেন পচেত্তিনো। পচেত্তিনোর কোচ হওয়ার পেছনে বিয়েলসার অবদানের কথা নতুন নয়। এ ম্যাচে গুরুর কৌশলের প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রকারান্তরে বিয়েলসাকেই যেন গুরুদক্ষিণা দিলেন পচেত্তিনো!

মার্সেলো বিয়েলসার লিডস ইউনাইটেডও এভাবেই 'ম্যান মার্কিং' করে থাকে। পচেত্তিনো হয়তো সেখান থেকেই দীক্ষা নিলেন!
মার্কিনিওসের পাশে সেন্টারব্যাক হিসেবে নেমে গিয়েছেন দানিলো, সামনে 'মিডফিল্ডার' মেসি ও পারেদেস

পিএসজির খেলোয়াড়দের এভাবে খেলোয়াড় ধরে ধরে প্রেস করার কারণে রিয়াল নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়তে পারেনি। থিবো কোর্তোয়া গোলকিপার হিসেবে অসাধারণ হলেও লিভারপুলের আলিসন, বায়ার্নের নয়্যার কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির সিটির এদেরসনের মতো বল পায়ে তেমন দক্ষ না। মাঝেমধ্যেই সমস্যায় পড়েছেন। প্রায়ই পিএসজির প্রেসিংয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন, নিচ থেকে কখনও ভিনিসিয়ুস, বা কখনো আসেনসিওর দিকে লক্ষ্য করে উড়িয়ে বল মারছিলেন বারবার।

রক্ষণে মার্কিনিওস ও কিমপেম্বের সঙ্গে 'ত্রয়ী' গঠন করেছেন দানিলো। যে কারণে দুই ফুলব্যাক হাকিমি ও মেন্দেজ উঠে গেছেন মাঠের অনেক ওপরে

কিন্তু রিয়ালের এই দুই উইঙ্গারকে ‘মার্ক’ করছিলেন দানিলো আর কিমপেম্বে, হাকিমি ও মেন্দেজ ওপরে ওঠায় ততক্ষণে তাঁরা অনেকটা ফুলব্যাকের মতো যথাক্রমে ডানে ও বাঁয়ে চলে যান। ফলে বলের দখল যথারীতি পিএসজির কাছেই যাচ্ছিল। রিয়ালও তেমন প্রেস করার মতো দল নয়, ফলে মদরিচ-বেনজেমাদের মতো বয়সী ও চোট থেকে ফেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে আনচেলত্তি কীভাবে পিএসজির অভিনব প্রেসিং সামাল দেবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না।

বাঁদিকে এভাবেই এমবাপ্পেকে বারবার সাহায্য করে যাচ্ছিলেন ভেরাত্তি

ওপরে বাঁদিকে এমবাপ্পে, মেন্দেজদের সঙ্গে নিয়মিত ‘ওয়ান-টু’ পাস খেলছিলেন ভেরাত্তি, ফলে এমবাপ্পে রিয়ালের রাইটব্যাক কারভাহাল ও ডানদিকের সেন্টারব্যাক এদের মিলিতাওয়ের মাঝে ফাঁকা জায়গায় (হাফস্পেস) নিয়মিত ঝড় তুলেছেন গতি দিয়ে। এমবাপ্পের গতির সঙ্গে পেরে ওঠা কারভাহালের কম্মো ছিল না।

মাঝমাঠ থেকে মেসি এভাবেই বলের যোগান দিয়ে গেছেন মেসিকে

৬১ মিনিটে পিএসজির পেনাল্টিও এভাবেই আসে। এমবাপ্পের গতির সঙ্গে না পেরে বক্সের মধ্যে ভুলে ফাউল করে বসেন কারভাহাল, পেনাল্টি পেয়ে যায় পিএসজি। ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে এমবাপ্পেকে ঠেকিয়ে রাখার সাধ্য বর্তমান বিশ্বে যে তেমন কারও নেই—ফরাসি ফরোয়ার্ডকে রুখতে কখনো কারভাহাল, কখনো ভাসকেজ, কখনো মিলিতাও বা কখনো মেন্দির হাঁসফাঁস অবস্থা সেটাই প্রমাণ করেছে।

মেসির কাছ থেকে যোগান পেয়েই বাঁ পাশের হাফস্পেসে ঝড় তুলেছেন এমবাপ্পে। এভাবেই পেনাল্টিটা আসে
‘ফলস নাইন’ বা ছদ্ম স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলা মেসির জন্য নতুন কিছু নয়। অর্থাৎ নামে স্ট্রাইকার হলেও যিনি একটু নিচে নেমে আক্রমণ গড়ে দিতে পারেন। কাল একটু নয়, ঢের নিচে নেমে খেলেছেন মেসি। বলতে গেলে গোটা ম্যাচেই স্বদেশি পারেদেসের পাশে থেকে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, সামনে এমবাপ্পে আর দি মারিয়াকে সমানে বলের যোগান দিয়ে গেছেন

রিয়ালের পরিকল্পনা ছিল দাঁতে দাঁত চেপে রক্ষণভাগে এমবাপ্পে-মেসির তোপ সামলে যাওয়া, পরে সুযোগ পেলে দ্রুত প্রতি আক্রমণে গোল করা। যে কারণে কাগজে-কলমে ৪-৩-৩ ছকে নামলেও ওপরে শুধু বেনজেমাকে রেখে প্রায় সময়েই ৪-১-৪-১ ছকে রক্ষণ করে যাচ্ছিল তারা।

৪-১-৪-১ ছকে রিয়ালের রক্ষণ। সামনে শুধুই বেনজেমা

বেনজেমা পুরোপুরি ফিট না থাকায় এবং বল পায়ে পিএসজি তারকাদের নৈপুণ্যের জন্য পরিকল্পনাটা ভেস্তে যায়। রিয়াল সেভাবে প্রেস করেনি, রক্ষণই বেশি সামলেছে। প্রত্যেক খেলোয়াড়ই মাঝমাঠকেন্দ্রিক খেলছিলেন, একে অন্যের কাছাকাছি থেকে রক্ষণ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছিলেন।

মাঝমাঠে খেলোয়াড়দের জটলা

এ ব্যাপারটাও মেসি-ভেরাত্তিকে সাহায্য করেছে। বক্সের সামনে রিয়াল খেলোয়াড়দের জটলার মধ্যেই এমবাপ্পে, দি মারিয়া, মেসি, ভেরাত্তি ওয়ান-টু পাস খেলে যাচ্ছিলেন, যে রসায়ন থেকেও বেশ কয়েকটা গোলের সুযোগ পেয়েছে পিএসজি। এটা সম্ভব হয়েছে রিয়াল সঠিকভাবে প্রেসিং না করতে পারার কারণেই।


সব মিলিয়ে ম্যাচে যোগ্যতর দল হিসেবেই পিএসজি জিতেছে। ফিরতি লেগে রিয়াল কীভাবে ফিরে আসে, দেখার বিষয় সেটাই।