হায়, স্পেশাল ওয়ান!

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দর্শকদের করতালি দিলেন মরিনহো। ছবি: এএফপি
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দর্শকদের করতালি দিলেন মরিনহো। ছবি: এএফপি

পাথুরে মুখ। ভাবলেশহীন। অথচ ভেতরে বয়ে যাচ্ছে ঝড়। রক্তক্ষরণ! শেষের বাঁশি বেজে গেছে। শুধুই কি ম্যাচের, নাকি তাঁরও? ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের গ্যালারি তখন প্রায় ফাঁকা। ৮৪ মিনিটে দল ৩-০–তে পিছিয়ে পড়লে সিটে বসে থাকার চেয়ে বেরিয়ে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ঠ্যাসাঠেসি–ভিড় থেকে বাঁচা যায়। তবু যারা বসে থাকে সিটে, কেন থাকে, কিসের আশায়? হোসে মরিনহো সেই প্রায়–শূন্য গ্যালারির উদ্দেশে করতালি দিলেন। দিতেই থাকলেন। দিতেই থাকলেন। বেশ কিছুক্ষণ! এ কি কৃতজ্ঞতা স্বীকার, নাকি অন্য কিছু?

কাল নিজেদের মাঠে টটেনহাম হটস্পারের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের পর হোসে মরিনহোর এই ছবিটা দেখলে আপনার মায়া হতে বাধ্য। সে আপনি মরিনহোর ফ্যান হোন কিংবা নিন্দুক। একে একে নিভেছে দেউটি। হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর জাদুর স্পর্শ। কোথায় সেই মরিনহো? কোথায় সেই স্পেশাল ওয়ান? কালকের ৩-০ জয় কোচ হিসেবেই নিজের মাঠে মরিনহোর সবচেয়ে বড় পরাজয়। লিগের প্রথম তিন ম্যাচের দুটিতেই হেরেছেন, এটিও তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে আগে কখনো ঘটেনি। মরিনহো ডুবছেন। সঙ্গে ডুবছে তাঁকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও।

উদ্ধত মরিনহো তবু একটা জায়গায় হারবেন না। ১৪ বছর আগে চেলসির কোচ হয়ে প্রথম ইংলিশ মিডিয়ার সামনে হাজির হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি স্পেশাল ওয়ান।’ কালকের অমন পরাজয়ের পর অদ্ভুতুড়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে এক সাংবাদিকের দিকে আঙুল তুলে হিসাব করে দেখিয়ে দিয়েছেন, ‘প্রিমিয়ার লিগে বাকি ১৯ কোচ যতবার এই ট্রফি জিতেছে, তাদের চেয়ে আমি একাই বেশিবার জিতেছি। ওরা সবাই মিলে দুবার, আমি তিনবার। সম্মান দেখান, সম্মান, সম্মান!’

তা সম্মান তো তাঁকে দেখাতে হবেই। চেলসির কোচ হিসেবে দ্বিতীয় দফায় ফিরে ২০১৫ সালে ক্লাবটিকে প্রিমিয়ার লিগ জিতিয়েছেন, যা তাঁর স্পেশাল অর্জনকে আরও স্পেশাল করেছে। ইতালি আর স্পেনে গিয়েও লিগ জিতে আসা কোচ তিনি। ভিন্ন দুটি ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার বিরল কীর্তির মালিক। বড় আশা করে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউনাইটেড। ২০১৬ সালে কোচ হলেন। যে ইউনাইটেড টানা দুই যুগেরও বেশি এক কোচের অধীনে থাকার পর গত ৫ বছরে চার কোচের অধীনে থেকেও স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে না। মরিনহো আবার সুদিন ফেরাবেন কথা দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের কমিউনিটি শিল্ড দিয়ে শুভ উদ্বোধন ঘোষণাও করলেন। গত বছর জিতিয়েছেন ইউরোপা লিগও। মাঝে জিতেছেন লিগ কাপ। কিন্তু যথেষ্ট নয়, মরিনহো নিজেও জানেন। লিগ ট্রফি নেই, চ্যাম্পিয়নস লিগ নেই...সমর্থকদের তৃপ্ত করা কঠিন।

আমি তিনটা প্রিমিয়ার লিগ জিতেছি, সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দিলেন মরিনহো। ছবি ভিডিও থেকে

এবার লিগের শুরুতেই ৬ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়ে আবার ফিরে আসা কঠিন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ লা লিগা নয় অবশ্য। দীর্ঘ মৌসুমে রং অনেকবারই বদলাবে। কিন্তু শুধু পয়েন্ট হারিয়েছে বলে নয়, ইউনাইটের খেলায় কোথায় যেন সুরটা কেটে গেছে। খেলোয়াড়েরাও যেন আর আস্থা পাচ্ছেন না কোচের ওপর। কালই দল বরং তুলনামূলক ভালো খেলেছে। অন্তত হোসে মরিনহোর মতে। কিন্তু কালকেই নিজেদের মাঠে এমন হার! ৫০ মিনিটে কর্নার থেকে হ্যারি কেইনের হেডে গোলের খাতা খুলল। দুই মিনিটের মধ্যে লুকাস ২-০ করে ফেললেন। এই লুকাসের সৌজন্যেই ৩-০।

ততক্ষণে গ্যালারি ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সাংবাদিকদের চোখে যা ছিল ম্যাচ বয়কট করা। তবে মরিনহোর চোখে তা নয়, ‌‘দল ৩-০–তে হারতে থাকলে আমিও তা-ই করতাম। ম্যানচেস্টার শহরের কেন্দ্রে যেতে এখান থেকে দুই ঘণ্টা লাগে। আমার বাসা যদি সেখানে হতো, ম্যাচ শেষে দুই ঘণ্টা লাগত যেতে, আমিও আগেভাগে বের হয়ে যেতাম। এখানেই এই মাঠে আমরা সেভিয়ার কাছে হেরেছিলাম, তখন সমর্থকেরা দুয়ো দিয়েছিল। সেটা আমাদের পাওনা ছিল। আমরা ভালো খেলিনি। কিন্তু আজ খেলোয়াড়েরা মাঠ ছেড়েছে দর্শকদের করতালিতে। কারণ, এটি তাদের পাওনা ছিল।’

এ কারণেই কি মরিনহোও কৃতজ্ঞতায় পাল্টা করতালি দিলেন এতক্ষণ? এই ক্লাবে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ দেখছেন না তো! মরিনহো স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াইয়ে নিজে থেকে হার মানার লোক তিনি নন। বলেছেন, দলটাকে সময় দিতে হবে। সাংবাদিকদের কড়া মেজাজে বলেছেন, ‘আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। চেষ্টা করেই যেতে হবে। শেষ কথাটা বলছি, আপনি জানেন ফলাফল কী? ৩-০। ৩-০ মানে কী (তিনটা আঙুল উঁচিয়ে)? ৩-০ মানে তিনটা প্রিমিয়ার লিগ। আমি একাই যতগুলো প্রিমিয়ার লিগ জিতেছি, বাকি ১৯ কোচ মিলেও তা জেতেনি।’

তারপর সটান করে উঠে গেলেন আসন থেকে। গটগট করে বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে। তা সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনোকালেই রোমান্টিক ছিল না। কিন্তু খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, পল পগবার মতো তারকার ক্লাব ছাড়ার আভাস, দলবদলে নাখোশ হয়ে ক্লাবকর্তাদের তুলোধোনা করা...সব মিলে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে একটা সংকট চলছে। মরিনহোর বেরিয়ে যাওয়ার ছবিটা হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রতীকীই!