চেলসিতে প্রথম মেয়াদে যখন ছিলেন রোমেলু লুকাকু
চেলসিতে প্রথম মেয়াদে যখন ছিলেন রোমেলু লুকাকু

৯ নম্বরের ‘অভিশাপ’ ঘোচানোর অপেক্ষায় চেলসি-মিলান

যেকোনো স্ট্রাইকারের কাছেই ৯ নম্বর জার্সি পরম আরাধ্য। ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোল, আর যে খেলোয়াড় গোল করায় সবচেয়ে বেশি দক্ষ, সাধারণত তাঁকেই ৯ নম্বর জার্সি দেওয়া হয়। যুগ যুগ ধরে এমনটিই হয়ে এসেছে।

রোনালদো নাজারিও, রোমারিও থেকে শুরু করে গার্ড মুলার, মার্কো ফন বাস্তেন, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ফার্নান্দো তোরেস, অ্যালান শিয়ারার কিংবা হালের রবার্ট লেভানডফস্কি, হ্যারি কেইন—প্রত্যেকেই ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় ৯ নম্বর জার্সি পরেছেন গোল করায় নিজেদের দক্ষতার কারণেই।

কোনো ক্লাব যখন নতুন কাউকে কিনে তাঁকে ৯ নম্বর জার্সি পরতে বলে, এর অর্থ, সেই ক্লাব ওই খেলোয়াড়ের কাছে মৌসুমজুড়ে গোল চায়।

এসি মিলান ও চেলসি—এ দুটি বিখ্যাত ক্লাবও এ নিয়মের বাইরে নয়। বছরের পর বছর ধরে তারাও এমন খেলোয়াড়কেই এই জার্সি দিয়েছে, যাঁদের কাছে তারা গোল চায়। কিন্তু দুই ক্লাবেরই ‘চাওয়া আর পাওয়া’র মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। এই ব্যবধানটা যেন ফি বছর বাড়ছেই। এই দুই ক্লাব যাঁকেই এ জার্সি দেয়, তিনিই যেন গোল করতে ভুলে যান। সেটি ফর্মহীনতার কারণেই হোক, কিংবা জার্সির ভার বইতে না পেরেই হোক।

বছরের পর বছর ধরে চেলসি আর এসি মিলানের ৯ নম্বর জার্সিধারীদের গোল করার এই ব্যর্থতা দেখে এই দুই ক্লাবের সমর্থকদের মনে ভয় ঢুকেছে। জেগেছে শঙ্কা। তাহলে কি জার্সিটাই অপয়া? না হলে এমন হবে কেন!

নিজের ইনস্টাগ্রামে এসি মিলানের জার্সি হাতে এ ছবিটি পোস্ট করেন জিরু

এ মৌসুমে ৯ নম্বর জার্সি নিয়ে আবারও আশায় বুক বাঁধছে এসি মিলান ও চেলসি। সেটি বোঝা যায় দুই ক্লাবের নতুন দুজন ৯ নম্বর জার্সিধারীর নাম দেখলেই। চেলসি এবার প্রায় ১০ কোটি পাউন্ড খরচ করে কিনেছে বেলজিয়ান তারকা রোমেলু লুকাকুকে। এসি মিলান চেলসি থেকেই নিয়েছে ফরাসি স্ট্রাইকার অলিভিয়ের জিরুকে। দুজনের কাছেই গোল চায় দুই ক্লাব। এবার তাঁরা কি পারবেন অভিশাপ ঘোচাতে?

৯ নম্বরের সঙ্গে চেলসির আড়িটা অনেক পুরোনো

৯ নম্বর জার্সির সঙ্গে চেলসি খেলোয়াড়দের ‘আড়ি’ সেই প্রিমিয়ার লিগের সূচনালগ্ন থেকেই। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম মৌসুমে চেলসি যাঁকে ৯ নম্বর জার্সি দিয়েছিল, তিনি ইংলিশ স্ট্রাইকার টনি কাসকারিনো। মিলওয়াল, গিলিংহাম, অ্যাস্টন ভিলা ও সেল্টিকের হয়ে ধারাবাহিক গোল করা এই স্ট্রাইকার যখন চেলসিতে এলেন, তাঁর বয়স তত দিনে তিরিশের ওপর।

দুই মৌসুম খেলেছিলেন চেলসিতে, লিগে ৪০টা ম্যাচ খেলে গোল করেছিলেন মোটে আটটি। অর্থাৎ প্রতি পাঁচ ম্যাচে একটি গোল। ৯ নম্বর জার্সি পরা কেউ যদি এত কম গোল করেন, তাহলে কীভাবে চলে! চেলসিও দুই মৌসুম রেখে কাসকারিনোকে বিক্রি করে দিয়েছিল। চেলসির হয়ে কাসকারিনোর এই অবস্থা দেখে পরে তাঁকে আর কোনো ইংলিশ ক্লাবও নিতে চায়নি। পরে মার্শেই আর ন্যান্সির হয়ে গোল করার অভ্যাসটা ফিরে পান।

ইংলিশ স্ট্রাইকার টনি কাসকারিনো ৯ নম্বর জার্সি পরে খেলেছেন চেলসিতে

জোসে মরিনিওর কল্যাণে ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ চেলসি–ভক্তদের কাছে বেশ চেনা। কিন্তু মরিনিও আসার বহু আগে কিন্তু চেলসিতে ‘দ্য গোল্ডেন ওয়ান’ তকমার একজন খেলে গিয়েছিলেন। চেলসির হয়ে আহামরি কিছু করেননি, যে কারণে তাঁকে মনে রাখতে হবে। মার্ক স্টাইন নামের সেই তারকা কাসকারিনোর কাছ থেকে ৯ নম্বর জার্সি পেয়েছিলেন।

স্টোক সিটির হয়ে তখন গোলের পর গোল করে যাচ্ছেন এই আফ্রিকান-ইংলিশ স্ট্রাইকার। স্টোককে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে তুলে ভক্তদের কাছে দ্য গোল্ডেন ওয়ান তকমা আদায় করে নিয়েছিলেন স্টাইন। ১৫ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে চেলসি যখন তাঁকে দলে নিল, বড় প্রত্যাশার চাপ তাঁর ওপর।

প্রত্যাশার চাপ তিনি সেভাবে মেটাতে পারেননি, বলা যাবে না। লিগে টানা সাত ম্যাচে গোল করেছিলেন। কিন্তু এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে স্টাইন-দ্যুতি। সব মিলিয়ে লিগে ৫০ ম্যাচে ২১ গোল করেছিলেন। নিয়মিত সুযোগ পেলে হয়তো গোলসংখ্যা বাড়ত আরও, কিন্তু তত দিনে দলে চলে এসেছেন মার্ক হিউজ, জিয়ানলুকা ভিয়াল্লি ও জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলার মতো তারকারা।

নতুন কোচ রুদ খুলিত তত দিনে চেলসিতে ‘বিপ্লব’ শুরু করে দিয়েছেন। সে বিপ্লবের অংশ হিসেবে দলে আনা হলো জুভেন্টাসের চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী স্ট্রাইকার জিয়ানলুকা ভিয়াল্লিকে। চেলসিতে আসতে আসতে ভিয়াল্লির বয়স তেত্রিশ ছুঁয়েছিল, তাই বছর দুয়েক মোটামুটি ফর্মে (৫৮ লিগ ম্যাচে ২১ গোল) থাকলেও তাঁকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাটা করতে পারেনি চেলসি। খুলিতের পর তাঁর ঘাড়ে উল্টো পড়ে কোচিংয়ের ভার। আর ৯ নম্বর জার্সির দায়িত্ব পড়ে ক্রিস সাটনের ওপর।

চেলসিতে ৯ নম্বর জার্সি পেয়েছেন ক্রিস সাটন

সাটনের ক্যারিয়ারকে অনায়াসেই স্যান্ডউইচের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেখানে নরউইচ, ব্ল্যাকবার্ন কিংবা সেল্টিকের হয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া বছরগুলোর মাঝে সামান্য মাংসের মতো চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে আছে চেলসি-অধ্যায়টা। ইংলিশ লিগে তখন অন্যতম সফল স্ট্রাইকার মানা হতো তাঁকে, সেই সাটনই চেলসিতে এসে গোল করা ভুলে গেলেন। ২৮ লিগ ম্যাচে গোল করলেন মাত্র একটি! এক কোটি পাউন্ডের বিনিময়ে দলে টানা স্ট্রাইকারের এমন ফর্ম অবশ্যই দেখতে চায়নি ব্লুজরা!

৯ নম্বর জার্সি গায়ে দিলেই চেলসি তারকারা গোল করতে ভুলে যান, এটি অস্বীকার করার মতো মানুষ কেউ থেকে থাকলে তিনি ডাচ স্ট্রাইকার জিমি ফ্লয়েড হ্যাসলব্যাংক। ৯ নম্বর জার্সি গায়ে চেলসির সফলতম স্ট্রাইকার বলা যায় তাঁকে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত চার বছর এই জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন, ১৩৬ লিগ ম্যাচে গোল করেছেন ৬৯টি। হ্যাসলব্যাংকের জন্য আতলেতিকোকে দেওয়া দেড় কোটি পাউন্ড পানিতে পড়েনি, এটা দাবি করতেই পারে চেলসি!

নেদারল্যান্ডসের স্ট্রাইকার হ্যাসলব্যাংকের সাফল্য দেখেই কি না, সে দেশের লিগের স্ট্রাইকারদের আনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখা গেল চেলসির মধ্যে। তখন অবশ্য আরেক ডাচ স্ট্রাইকার চেলসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন—রুদ ফন নিস্তলরয়। ডাচ লিগে আলো ছড়ানো পিএসভি আইন্দহফেনের সার্বিয়ান স্ট্রাইকার মাতেজা কেজমানকে নিয়ে এল চেলসি, দাম পড়ল ৫৩ লাখ পাউন্ড। বড় সাধ করে তাঁর হাতে হ্যাসলব্যাংকের ৯ নম্বর জার্সিটা তুলে দিল ব্লুজরা।

লাভ হলো না। কোনোমতে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে এক মৌসুম টিকলেন কেজমান, ২৫ লিগ ম্যাচে করলেন সাকল্যে চার গোল। একই দামে পরের মৌসুমেই জোসে মরিনিও তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন আতলেতিকো মাদ্রিদে।

৯ নম্বর জার্সিতে চেলসিতে ভালো করেছিলেন জিমি ফ্লয়েড হ্যাসলব্যাংক

তত দিনে চেলসির নতুন মালিক রোমান আব্রামোভিচের মাথায় স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে ‘তারকাপুঞ্জ’ গড়ার আশা। যে কারণে লাৎসিও, ইন্টার মিলানের হয়ে নিয়মিত গোল করা আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপোর দিকে নজর পড়ল ক্লাবটার। যেই ভাবা, সেই কাজ। ১ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে ২০০৩ সালে ক্রেসপো চেলসিতে এলেও ৯ নম্বর জার্সির দখল পেলেন কেজমান যাওয়ার পরেই।

মরিনিও নিজে ক্রেসপোকে খেলোয়াড় হিসেবে অতটা পছন্দ করতেন না, তাঁর মূল পছন্দের স্ট্রাইকার ছিলেন দিদিয়ের দ্রগবা। দ্রগবার কারণে ক্রেসপোকে দুবার ধারে পাঠানো হয়েছিল অন্য ক্লাবে।

কোচের অবহেলা, পরিবারের ইংল্যান্ডে থাকার অনিচ্ছা সব মিলিয়ে ক্রেসপোর চেলসি–অধ্যায়টা উজ্জ্বল নয় তেমন। তাও ৪৯ লিগ ম্যাচ খেলে করেছেন ২০ গোল।

ক্রেসপো যাওয়ার পর ৯ নম্বর জার্সির প্রতি কেমন যেন এক বিরক্তি চলে এল চেলসির কর্তাদের মধ্যে। তত দিনে ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত, এই জার্সি যার কপালে জোটে, চেলসির হয়ে তেমন কিছুই করতে পারেন না তিনি। এই ভয় থেকেই কি না, এরপর এমন দুজনকে এই জার্সি দেওয়া হলো, যারা স্ট্রাইকারই নন!

ডাচ ডিফেন্ডার খালিদ বোলারুজ কিংবা ইংলিশ মিডফিল্ডার স্টিভ সিডওয়েল—তাঁদের কাজ আর যাই হোক না কেন, গোল করা ছিল না। তবে ৯ নম্বর জার্সির ‘প্রভাব’ তাঁদের ওপরেও পড়েছিল, তা না হলে তাঁরা ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডার হিসেবে চেলসিতে নিজেদের জায়গা পাকা করতে পারবেন না কেন!

চেলসিতে বেশিদিন থাকতে পারেননি ক্রেসপো

ফ্রাঙ্কো দি সান্তো অবশ্য ডিফেন্ডার বা মিডফিল্ডার ছিলেন না। আর্জেন্টাইন এই স্ট্রাইকারের কপাল খারাপ ছিল অন্য কারণে— অনভিজ্ঞতা। দ্রগবা, নিকোলাস আনেলকার কারণে অনভিজ্ঞ দি সান্তো তেমন সুযোগই পাননি, যতই তাঁকে ৯ নম্বর জার্সি দেওয়া হোক না কেন। মেরেকেটে আটটা লিগ ম্যাচ খেলে করতে পেরেছেন মাত্র একটি গোল। শেষমেশ উইগানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাঁকে।

ইংলিশ ফুটবলে দলবদল ফির রেকর্ড গড়ে এরপর লিভারপুল থেকে স্প্যানিশ স্ট্রাইকার ফার্নান্দো তোরেসকে নিয়ে আসে চেলসি। আশা, পাঁচ কোটি পাউন্ডের এই স্ট্রাইকার লিভারপুলে যেমন পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, এখানেও সেটিও করবেন। কিন্তু ভাগ্যের এমনই খেলা, চেলসির হয়ে জঘন্যতম ‘নাম্বার নাইন’–এর কথা উঠলে সবার আগে এই তোরেসের নাম আসে এখন। লিভারপুল ছাড়ার পর সেই যে ফর্ম হারিয়েছেন, আর সেই দুর্ধর্ষ ফর্মের তোরেসকে দেখা যায়নি কখনোই।

তোরেস যাওয়ার পর চেলসি যাকে ৯ নম্বর জার্সি দেয়, তাঁর ক্যারিয়ারও তত দিনে অস্তাচলে। কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার রাদামেল ফালকাও আতলেতিকো মাদ্রিদ, পোর্তো বা মোনাকোর হয়ে যা দেখিয়েছেন, চেলসির হয়ে তার কিছুই দেখাতে পারেননি। অবশ্য লিগামেন্টে চোটের কারণে তত দিনে তাঁর কার্যকারিতাও কমে গেছে অনেকটাই।

১৩ নম্বরকে এমনিতেই অপয়া মানা হয়, সঙ্গে ৯ নম্বর জার্সির অভিশাপ যোগ হলে একজন স্ট্রাইকারের ভাগ্য কতটা খারাপ হতে পারে? ঠিক এটাই ঘটেছিল আলভারো মোরাতার সঙ্গে। স্প্যানিশ এই স্ট্রাইকারকে বড় আশা করে আনা হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ থেকে। ৯ নম্বর জার্সির চাপ সহ্য করতে পারেননি তিনিও। ৩১ লিগ ম্যাচে মাত্র ১১ গোল করেছিলেন। এই জার্সির ভার এতটাই মনে হয়েছিল, পরের মৌসুমে ৯ ছেড়ে ২৯ পরেছিলেন মোরাতা। তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি অবশ্য।

চেলসিতে আলভারো মোরাতাও ৯ নম্বর জার্সির চাপ সহ্য করতে পারেননি

চেলসির কোচ তখন মরিজিও সারি। নাপোলিতে যে গঞ্জালো হিগুয়েইনকে নিয়ে আক্রমণ সাজাতেন, মোরাতার পর সেই হিগুয়েইনের দিকে হাত বাড়ান এই ইতালিয়ান কোচ। লাভ হয়নি। হিগুয়েইনের সেই বয়স বা ফর্ম, কোনোটাই ছিল না তখন। ছয় মাসের ধারে এসে না পেরেছিলেন কোচকে সন্তুষ্ট করতে, না পেরেছেন ৯ নম্বর জার্সির ‘অভিশাপ’ কাটাতে।

সে তুলনায় সাম্প্রতিককালে চেলসিতে ট্যামি আব্রাহামের শুরুটা বেশ আশাজাগানিয়া ছিল। তালিকার অন্য স্ট্রাইকারদের মতো তাঁকে অন্য কোনো ক্লাব থেকে কেনেনি চেলসি, তাঁদেরই ঘরের ছেলে আব্রাহাম। ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের অধীনে নিজের প্রতিভার বিকাশ মোটামুটি করতে পারলেও আব্রাহামের কপাল পোড়ে তখনই, যখন ল্যাম্পার্ড চাকরি হারান। নতুন কোচের পরিকল্পনায় যে তিনি নেই, শুরু থেকেই টমাস টুখেল জানিয়ে দেন তাঁকে।

আর এখন তো লুকাকু এসে তাঁর খেলার সম্ভাবনা আরও কমিয়ে দিয়েছেন। আব্রাহাম এখন পাড়ি জমাচ্ছেন ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমার হয়ে খেলতে, সাবেক কোচ মরিনিওর অধীনে আলো ছড়াতে। ওদিকে লুকাকুকে দিয়ে যাচ্ছেন ৯ নম্বর জার্সির গুরুভার।

অপেক্ষা এখন লুকাকুর জন্য। তিনি কি আদৌ এই ‘অভিশাপ’ কাটাতে পারবেন?

এসি মিলান ৯ নম্বরে পেল না বাস্তেন–ইনজাঘির মতো কাউকে। মিলানের ভাগ্যও যে খুব বেশি প্রসন্ন, তেমন না। এই ব্যাপারে চেলসির দুঃখ কোনো ক্লাব যদি বুঝতে পারে, সেটা এসি মিলানই হবে। যে জার্সিতে এককালে খেলে আলো ছড়িয়ে গেছেন মার্কো ফন বাস্তেন, জর্জ উইয়াহ কিংবা ফিলিপ্পো ইনজাঘির মতো তারকারা, ইনজাঘি যাওয়ার পর এই ৯ নম্বর জার্সির কাছ থেকে গোল পেতেই গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছে মিলানের।

মিলানের ৯ নম্বর জার্সি পরে সাফল্যময় ৯ বছর কাটানোর পর ব্রাজিলিয়ান তারকা আলেক্সান্দ্রে পাতোর হাতে জার্সির দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে অবসরে চলে যান ইনজাঘি। ব্যস, সেখান থেকেই মিলানে ৯ নম্বর জার্সির পতন শুরু।

চোটে জর্জরিত মৌসুমে সাকল্যে সাত ম্যাচ খেলে দুই গোল করতে পারেন পাতো। পরের বছরেই মিলান তাঁকে বিক্রি করে দেয় করিন্থিয়ানসের কাছে। পরের মৌসুমে ৯ নম্বর জার্সিটাই আর কাউকে পরতে দেয়নি মিলান। ২০১৫ সালে রোমা থেকে ধারে খেলতে এসে ১৫ ম্যাচ খেলে মাত্র তিনটি লিগ গোল করেছিলেন ইতালিয়ান স্ট্রাইকার মাত্তিয়া দেস্ত্রো। বলাবাহুল্য, এই ৯ নম্বর জার্সিই পরেছিলেন।

এসি মিলানে ৯ নম্বর জার্সি পেয়েছেন আলেক্সান্দ্রে পাতো

দেস্ত্রোর খেলা দেখে তাঁকে আর পাকাপাকিভাবে কেনার সাহস হয়নি মিলানের। চেলসির হয়ে ধারে খেলতে আসা ফার্নান্দো তোরেসেরও একই অবস্থা। প্রিয় ৯ নম্বর জার্সি পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আগের সেই ফর্ম ফিরে পাননি। দশ ম্যাচ খেলে করেছেন মাত্র এক গোল।

তত দিনে চ্যাম্পিয়নস লিগে বেশ আলো ছড়ানো শুরু করেছেন ইউক্রেনিয়ান ক্লাব শাখতার দোনেৎস্কের ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার লুইজ আদ্রিয়ানো। চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বে ৯ গোল করে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন। এই ফর্ম দেখে চোখ বড় হয়ে গেল মিলানের। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো খরচ করে ৯ নম্বর জার্সির দায়িত্ব দেওয়া হলো আদ্রিয়ানোকে। ফলাফল? ৩৩ লিগ ম্যাচে মাত্র চার গোল।

এরপর আরেক ইতালিয়ান স্ট্রাইকার জিয়ানলুকা লাপাদুলার পালা। সম্প্রতি কোপা আমেরিকায় পেরুর হয়ে আলো ছড়ানো এই স্ট্রাইকারও আছেন মিলানের হয়ে ব্যর্থ নাম্বার নাইনের তালিকায়। মিলানের হয়ে ২৭ ম্যাচে আট গোল করে তিনিও মিলান সমর্থকদের কম হতাশ করেননি।

পর্তুগিজ স্ট্রাইকার আন্দ্রে সিলভার রেকর্ডটা আবার আরও ম্যাড়মেড়ে। জাতীয় দলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সতীর্থ এই স্ট্রাইকার মিলানে এসে ২৫ লিগ ম্যাচে গোল করেছেন মাত্র দুটি। তিন কোটি ৮০ লাখ ইউরোর বিনিময়ে সিলভাকে দলে টেনে মিলান হতাশা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। মাঝে গঞ্জালো হিগুয়েইনও একবার এসে খেলে গেছেন মিলানে। ১৫ লিগ ম্যাচে ছয় গোল করে আশা জাগালেও তাঁকে পাকাপাকিভাবে কেনার সাহস করেনি মিলান।

এসি মিলানে প্রত্যাশার চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি গঞ্জালো হিগুয়েইন

তোরেস আর হিগুয়েইনের কষ্টটা অবশ্য এই তালিকায় থাকা যে কারও চেয়ে বেশি। আর হবে না-ই বা কেন? চেলসি আর মিলান, দুই ক্লাবেই ৯ নম্বর জার্সি পেয়েছেন, কোনো ক্লাবের ‘অভিশাপ’ই ঘোচাতে পারেননি!

পোলিশ স্ট্রাইকার ক্রিস্তফ পিওন্তেক অবশ্য আশা জাগিয়েছিলেন। ১১ গোল করে যেবার দলের সর্বোচ্চ লিগ গোলদাতা হলেন, সেবার অবশ্য ১৯ নম্বর জার্সি পরেছিলেন। পরেরবার যেই ৯ নম্বর জার্সি পরলেন, ব্যস। শুরু হলো গোলখরা। মাত্র চার গোল করলেন ছয় মাসে, মিলানও অবস্থা বেগতিক দেখে এই স্ট্রাইকারকে বিক্রি করে দিল হার্থা বার্লিনের কাছে।

এবার ৯ নম্বর জার্সির গর্ব পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব জিরুর ওপর। দেখা যাক, বিশ্বকাপজয়ী এই স্ট্রাইকার সেটি পারেন কি না!