নিজের সময়ের সেরা ফুটবলারদের একজন। মিশেল প্লাতিনি এখন ফুটবল প্রশাসক হিসেবেও প্রভাবশালী—উয়েফার সভাপতি। ফিফার পরবর্তী সভাপতি হিসেবেও ফরাসি এই কিংবদন্তির নামটাই বেশি শোনা যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড সকার সাময়িকীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্লাতিনি কথা বলেছেন মাঠ ও মাঠের বাইরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে—

*বারবার স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর হাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি তুলে দিতে দিতে কি আপনি ক্লান্ত?
মিশেল প্লাতিনি: না, কারণ চ্যাম্পিয়নস লিগ খুব কঠিন টুর্নামেন্ট এবং কোনো দলই সেটা পরপর দুবার জিততে পারেনি। আগের কথা অবশ্য আলাদা। আয়াক্স, বায়ার্ন ও লিভারপুলের মতো ক্লাবগুলো পরপর জিতেছে। যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক, তাদের আমি শ্রদ্ধা করি। কারণ এখন মৌসুম খুবই কঠিন। আমি যখন খেলোয়াড় ছিলাম, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো শুরু হতো কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে দুটি ম্যাচ, সেমিফাইনালে দুটি আর ফাইনাল। এরপরই ট্রফি! কিন্তু এখন সেপ্টেম্বর থেকেই বড় ম্যাচ শুরু হয়ে যায়। বিশ্বাস করা যায়! সেপ্টেম্বর থেকেই আপনার সামনে বড় সব ম্যাচ, আর সেগুলো আপনাকে জিততে হবে! আমি তাই মনে করি, যোগ্যতম দলটির হাতেই সব সময় ট্রফি তুলে দিচ্ছি।
*গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগের কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?
প্লাতিনি: সভাপতি হিসেবে আমি এসব নিয়ে ভাবি না, কারণ সুন্দর খেলাটাই বড়। তবে জুভেন্টাসের সাবেক খেলোয়াড় মিশেল প্লাতিনি হিসেবে আমি খুশি হতাম কাপটা মিলান, ইন্টার কিংবা ইতালির ছোট কোনো ক্লাবকে দিতে পারলে। সেটা তো সম্ভব ছিল না। কারণ বার্সেলোনা খুবই ভালো খেলেছে।
*অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোর সেমিফাইনালে পর্তুগালের কাছে জার্মানিকে ৫-০ গোলে হারতে দেখে কি বিস্মিত আপনি?
প্লাতিনি: বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭-১ গোলে হারটাও তো বিস্ময়কর। আসলে ফুটবল সবকিছুই সম্ভব। এই অননুমেয় চরিত্রই ফুটবলের সৌন্দর্য। আপনি ভাবতেও পারবেন না যে তারা ব্রাজিলের বিপক্ষে ৭-১ গোলে জিতবে কিংবা পর্তুগালের কাছে ৫-০ গোলে হেরে যাবে। এ কারণেই আমরা খেলা দেখতে আসি। এ কারণেই আমরা পাতানো ম্যাচের বিরুদ্ধে লড়াই করি, যাতে সবাই নিশ্চিত থাকে যে ম্যাচটা পাতানো ছিল না। ফুটবল একমাত্র খেলা যেখানে কোন দলটা জিতবে, সেটা আপনি কখনোই আগে থেকে জানবেন না।
*পেপ গার্দিওলা আর লুইস এনরিকের বার্সেলোনার মধ্যে কতটুকু পার্থক্য দেখছেন?
প্লাতিনি: অবশ্যই অনেক পার্থক্য। পেপের দলে ফরোয়ার্ড কে ছিল? টোকিওতে যে ম্যাচটায় বার্সেলোনা সান্তোসকে ৪-০ গোলে হারাল (২০১১ ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল), ওই দলে তো কোনো ফরোয়ার্ডই ছিল না। মেসি ছিল, ফ্যাব্রিগাসও, কিন্তু কেউ ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলেনি। ওরা টোটাল ফুটবল খেলেছে। এখনকার দলটায় মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমার—তিনজন ফরোয়ার্ড। বার্সেলোনা সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগটা জিতল কীভাবে? প্রতি-আক্রমণে খেলে। কয়েক বছর আগেও ওরা এ রকম খেলেনি। এর মানে হচ্ছে, খেলোয়াড়দের কথা মাথায় রেখে আপনাকে দলের খেলার ধরন বদলাতে হবে। আপনার দলে মেসি-সুয়ারেজ-নেইমার থাকলে আপনি একরকম খেলবেন, অন্য খেলোয়াড় থাকলে অন্য রকম।
*আপনার কোনটি পছন্দ?
প্লাতিনি: আমি খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য দেখতে ভালোবাসি। পছন্দ-অপছন্দ তৈরি করা তো সাংবাদিকদের কাজ, আমার নয়। আমার কাজ স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ঠিক আছে কি না সেটা দেখা, রেফারি যাতে ভুল না করে সেটা দেখা। খেলোয়াড়েরা ভালো খেলছে দেখলে আমার ভালো লাগে।
*মেসি-নেইমার-সুয়ারেজকে নিয়ে বার্সেলোনার এই আক্রমণভাগই কি সময়ের সেরা?
প্লাতিনি: এই সময়ের সেরা অবশ্যই, কারণ ওরা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। আবার গত মৌসুমে সেরা ছিল রোনালদো-বেল-বেনজেমা। প্রতিটি ম্যাচেই ছবিটা বদলে যেতে পারে।
*গত ১০ বছরে ফুটবল কি আরও বেশি গতিময় হয়েছে?
প্লাতিনি: আপনি কি মনে করেন মেসি ১০ বছর আগের চেয়ে এখন বেশি দ্রুত? কিংবা রোনালদোর গতি ১০ বছর আগের চেয়ে এখন বেশি? আমি মনে করি না ১০-২০ বছর আগের চেয়ে খেলোয়াড়েরা এখন বেশি দ্রুত। সত্যিটা হচ্ছে, এখন খেলাটায় রেফারির নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি, ফলে বল মাঠে থাকছেও বেশি। গোলরক্ষকেরা ব্যাকপাস নিতে পারছেন। সবকিছু মিলে খেলায় গতি বেড়েছে। এটা খেলোয়াড়দের গতির বিষয় নয়। আমি মনে করি না, এখনকার খেলোয়াড়েরা ৩০ বছর আগের খেলোয়াড়দের চেয়ে দ্রুততর। বরং দলগুলোর খেলার ধরনের কারণেই ফুটবল গতিময় হয়েছে। তবে হ্যাঁ, শারীরিকভাবে হয়তো এখনকার খেলোয়াড়েরা ২০ বছর আগের খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু বল পাওয়াটাই সব সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার বাবা আমাকে সব সময় বলতেন, ‘মিশেল, বল সব সময় তোমার চেয়ে দ্রুত ছোটে।’
*রোনালদো-মেসি কীভাবে এত এত গোল করছেন?
প্লাতিনি: কারণ তারা অসাধারণ এবং তাদের পাশে একটা ভালো দলও আছে। ব্রাজিলের রোনালদোর বেলায়ও এটা সত্যি ছিল। অতীতের আরও অনেক খেলোয়াড়ের বেলায়ও সত্যি। একটা অসাধারণ দলে সব সময়ই একজন অসাধারণ খেলোয়াড় থাকে। আর একজন খেলোয়াড় তখনই অসাধারণ হয়ে ওঠে, যখন তার পাশে একটা অসাধারণ দল থাকে। এটা যেমন আয়াক্সের ক্ষেত্রে সত্যি, তেমনি ইয়োহান ক্রুইফের ক্ষেত্রেও। সে যেমন আয়াক্সের হয়ে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে, তেমনি তারও আয়াক্সকে দরকার ছিল সেটা করার জন্য। এটা দলগত খেলা।
*তাহলে অন্য খেলোয়াড়দের কেন আমরা রোনালদো-মেসির মতো এত বেশি গোল করতে দেখছি না?
প্লাতিনি: রিয়াল মাদ্রিদে ১৯৮০ সালের হুগো সানচেজকে উদাহরণ হিসেবে ধরুন না। নিজের সেরা মৌসুমে সানচেজ কয়টা গোল করেছে? ৩৮টি। কারণ ওর সময়ের দলটা এখনকার দলের মতো ছিল না। রিয়াল মাদ্রিদের তখনকার বাজেট তো আর এখনকার বাজেটের মতো ছিল না। এখন রিয়ালের রোনালদোর পাশাপাশি বেনজেমা, বেল আরও কত খেলোয়াড়। বার্সেলোনাতেও শুধু মেসি নয়, নেইমার-সুয়ারেজও আছে।
ফিফা কেলেঙ্কারি নিয়ে
*আপনার জন্য ফিফায় কি এটা খুব অস্বস্তিকর সময়?
প্লাতিনি: শুধু আমার জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য এটা বড় সমস্যা—আপনার আমার সবার। আমরা সবাই মিলেই তো ফিফা। এ সমস্যাটা বিশ্বের সব খেলোয়াড়ের জন্যও। কারণ আমাদের ‘মাদারহাউস’ বড় সমস্যায় পড়েছে এবং আমাদের এর পাশে দাঁড়াতে হবে। এটা কিন্তু ফুটবলের সমস্যা নয়, কারণ প্রতিযোগিতাগুলো ভালোই হচ্ছে। এ সমস্যাটা দুর্নীতির। দেখা যাক কী হয়। দেখুন, ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার প্রশাসক হিসেবে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের সঙ্গে কিন্তু আপনি এটাকে মেলাতে পারবেন না। ফিফা অনেক ভালো কাজ করেছে, অনেক নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে এসেছে। এ সমস্যাটা কিছু মানুষ ও টাকাপয়সা নিয়ে। পুলিশ ওদের মতো কাজ করুক। আপনারা এটা আমার চেয়েও অনেক ভালো জানেন। আমিও সংবাদপত্র দেখেই জানতে পারি কী হচ্ছে। ভবিষ্যতে কী হয়, দেখা যাক। আমি জানি না। হয়তো জানি, কিন্তু এ মুহূর্তে আপনাদের বলতে পারছি না।