২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফি
২০২৬ বিশ্বকাপ ট্রফি

বিশ্বকাপে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শঙ্কায় অ্যামনেস্টি

২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের সতর্ক করেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপ যাঁরা গ্যালারিতে বসে দেখতে চান, তাঁরা ‘উদ্বেগজনক মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ শিকার হতে পারেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও আয়োজকদের পক্ষ থেকে টুর্নামেন্টকে ‘নিরাপদ, হৃদয়গ্রাহী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখন চরম সংকটের মুখে। অ্যামনেস্টির ভাষায়, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে কঠোর বিধিনিষেধ’ আরোপের কারণে বিশ্বকাপের পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।

গতকাল রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র ‘জরুরি মানবাধিকার পরিস্থিতি’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্য দুই আয়োজক দেশ মেক্সিকো ও কানাডার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মেক্সিকোতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা দমনে সেনাবাহিনীসহ প্রায় এক লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশ্বকাপ চলাকালীন সাধারণ মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মেক্সিকোতে রাস্তায় ফুটবল খেলেছেন বিক্ষোভকারীরা

কানাডার টরন্টোতে অমানবিক এক চিত্র ফুটে উঠেছে অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে। সেখানে গৃহহীন মানুষদের আশ্রয় দিতে একটি ‘উইন্টার ওয়ার্মিং সেন্টার’ বা শীতকালীন উষ্ণতা কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, ভেন্যুটিকে ফিফার ব্যবহারের জন্য আগেই বুক করে রাখা হয়েছে।

অ্যামনেস্টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে। বিশ্বকাপে ১০৪টি ম্যাচের ৭৮টিই অনুষ্ঠিত হবে সেখানে। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতি’র তীব্র সমালোচনা করা হয়। বিশেষ করে দেশটির ‘অভিবাসন ও শুল্কারোপ (আইসিই) এবং সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর (সিবিপি) মতো সংস্থাগুলোর মাস্ক পরিহিত সশস্ত্র এজেন্টদের মাধ্যমে গণগ্রেপ্তার ও আটকে’র ঘটনাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে অ্যামনেস্টি।

জবাবে যা বলছে যুক্তরাষ্ট্র

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-কে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বিশ্বকাপের এই আসর যেন নিরাপদ ও সফল হয়, তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সমর্থক, পরিবার ও অ্যাথলেটরা যেন তাঁদের সফরে প্রতিটি মুহূর্তে বাধাহীন চমৎকার অভিজ্ঞতা পান, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রস্তুতি চলছে। হোয়াইট হাউসের বিশেষ টাস্কফোর্সের কাছে এখন বড় অগ্রাধিকার হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছি।বিশ্বকাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় আমরা আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেলে সাজাব। টুর্নামেন্টে পুরোটা সময় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের অঙ্গীকার।’

অ্যামনেস্টির তোলা অভিযোগের বিষয়ে ফিফার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’। তবে এখনো তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর

বিশ্বকাপে সমর্থকদের জন্য ‘ভয়ের পরিবেশ’ ও কঠিন ভিসা শর্ত

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের স্টিভ ককবার্ন বলেন, ‘২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে দেশান্তর করা হয়। এই সংখ্যাটি মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে যাওয়া দর্শকদের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি।’

ককবার্ন যোগ করেন, ‘আইনগত সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় অবৈধ গ্রেপ্তার ও দেশান্তরের রেকর্ড ভাঙা জোয়ার তৈরি হয়েছে। লাখ লাখ অভিবাসী ও শরণার্থীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার খর্ব হচ্ছে। এসব নীতি মার্কিন সমাজে বিভাজন এবং একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সময়, যার প্রভাব নিশ্চিতভাবে সেসব সমর্থকদের ওপরও পড়বে, যাঁরা বিশ্বকাপের উৎসবে শামিল হতে চান।’

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বকাপের আয়োজক শহর ডালাস, হিউস্টন ও মায়ামির স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে আইসিই সহযোগিতার বিষয়ে কিছু ‘বিতর্কিত চুক্তি’ সই করেছে। অ্যামনেস্টির দাবি, এতে জাতিগত বৈষম্য (রেসিয়াল প্রোফাইলিং) এবং অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা বাড়বে। অ্যামনেস্টির চোখে আইসিইর এ কার্যক্রম ‘আধা সামরিক কায়দার অভিযান’।

‘দ্য অ্যাথলেটিক’ জানিয়েছে, বিশ্বকাপে বেশ কিছু দেশের সমর্থকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের শর্ত আরও কঠিন করা হয়েছে। পর্যটক ভিসা পেতে সমর্থকদের ‘বন্ড’ হিসেবে ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ১৮ লাখ টাকা) পর্যন্ত জমা দিতে হতে পারে। ফিফা পর্দার আড়ালে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ দিচ্ছে যেন অন্তত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

বিতর্কিত এই ‘ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রাম’ বিশ্বের ৫০টি দেশের ওপর কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি দেশ এবারের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। গত ২১ জানুয়ারি থেকে আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের নাগরিকদের ওপর এ নীতি কার্যকর করা হয়। গত সপ্তাহে এ তালিকায় যুক্ত করা হয় বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশ তিউনিসিয়াকে, যা আগামী ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।

মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার জনসংখ্যার দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ছেলেদের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। নতুন এই কঠিন শর্ত তাদের সমর্থকদের জন্য বড় বাধা।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে আইভরি কোস্ট, হাইতি, ইরান ও সেনেগালের সমর্থকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়, অন্য দেশের সমর্থকেরা সেখানে ‘ব্যক্তিগত পরিসরে অনুপ্রবেশমূলক নজরদারির’ শিকার হতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট যাচাই-বাছাই এবং তাঁরা ‘আমেরিকা-বিরোধী’ কি না, তা খতিয়ে দেখা।

২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় করলেও এর মাশুল সাধারণ সমর্থক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, খেলোয়াড়, সাংবাদিক বা শ্রমিকেরা দিতে পারেন না। ফুটবল এসব মানুষেরই—কোনো সরকার, স্পনসর বা ফিফার নয়। তাই তাঁদের অধিকারই এই টুর্নামেন্টের কেন্দ্রে থাকা উচিত।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি স্টিভ ককবার্ন

সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আয়োজক তিনটি দেশই (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) মানুষের ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের’ ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে ১১টিই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। এবারের বিশ্বকাপ আগামী ১১ জুন শুরু হয়ে চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত।

স্টিভ ককবার্ন বলেন, ‘২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় করলেও এর মাশুল সাধারণ সমর্থক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, খেলোয়াড়, সাংবাদিক বা শ্রমিকেরা দিতে পারেন না। ফুটবল এসব মানুষেরই—কোনো সরকার, স্পনসর বা ফিফার নয়। তাই তাঁদের অধিকারই এই টুর্নামেন্টের কেন্দ্রে থাকা উচিত। ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪টি শহর তাদের মানবাধিকার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। আর যারা এ পর্যন্ত তা প্রকাশ করেছে, তাদের কেউ-ই অভিবাসনসংক্রান্ত নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষার বিষয়ে একটি শব্দও বলেনি।’