ইউটিউবে আট-নয় বছর বয়সেই আলোড়ন তুলেছিল ছেলেটি। বলে এত দারুণ নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলার দক্ষতাও চোখধাঁধানো। ছেলেটির খেলার ভিডিও দেখে লিওনেল মেসির শৈশবকে মনে পড়েছিল অনেকেরই। তাতে নতুন একটি তকমাও লেপটে যায় ছেলেটির গায়ে, ‘কিড মেসি’ বা ‘খুদে মেসি।’
সেই ছেলেটির নাম জে জে গ্যাব্রিয়েল। চেলসি, আর্সেনাল, ওয়েস্ট হামের একাডেমি ঘুরে গ্যাব্রিয়েল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমিতে যোগ দেয় ২০২২ সালে। তার পর থেকে সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাকই চলছিল। অন্তত বাইরে থেকে দেখে এমনটাই মনে হওয়ার কথা সবার। ইউনাইটেডও তাঁকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনছিল। কারণ, গ্যাব্রিয়েলের প্রতিভা। বয়সে বড়রাও তাঁকে আটকাতে হিমশিম খান। এরই মধ্যে গত বছর এপ্রিলে ইউনাইটেডের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে অভিষেক হয় গ্যাব্রিয়েলের।
ইউনাইটেডের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে গত মৌসুমে ২৬ ম্যাচে ২৯ গোল করে প্রতিভার ছটা ভালোমতো বুঝিয়ে দেন গ্যাব্রিয়েল। ক্লাবও তাঁকে তুলে এনেছিল মূল দলের অনুশীলনে। প্রাক্–মৌসুমে মাইকেল ক্যারিকের দলের হয়ে মাঠে নামেন। কয়েক দিন আগে উয়েফা ইয়ুথ লিগে সাবাহর বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও করেন। সব মিলিয়ে গ্যাব্রিয়েলকে ভবিষ্যৎ ভেবেই তাঁকে ধীরে ধীরে তৈরি করছিল ইউনাইটেড। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। গ্যাব্রিয়েল এখন ইউনাইটেড ছাড়তে মরিয়া। ১৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার তাঁর নিবন্ধন বাতিল করার অনুরোধ করেছেন ক্লাবের কাছে। ফ্রি এজেন্ট হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক নোটিশও পাঠিয়েছেন।
গ্যাব্রিয়েলের সিদ্ধান্ত জেনে ইউনাইটেড রীতিমতো হতভম্ব। তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডের ক্লাবটি এখনো এই খুদে প্রতিভার আবেদন মঞ্জুর করেনি। গ্যাব্রিয়েলের এমন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কী রয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশায় আছে ইউনাইটেড। ক্লাবটির বিশ্বাস, গ্যাব্রিয়েলকে মূল দলে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করতে তারা সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, কারাবাও কাপের তৃতীয় রাউন্ডে ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচের একদিন আগে ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানান গ্যাব্রিয়েল। গতকাল রাতে ইউনাইটেডের হেরে বিদায় নেওয়া সেই ম্যাচে ক্লাবটির ইতিহাসে কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হতে পারতেন আগামী মাসে ১৬ বছরে পা রাখতে যাওয়া গ্যাব্রিয়েল।
বিবিসি জানিয়েছে, গ্যাব্রিয়েল ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে পেশাদারি ও ক্যারিয়ার নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তবে খেলোয়াড়টির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর বিশ্বাস, এ সমালোচনা অনুচিত এবং এতে গ্যাব্রিয়েলের পরিশ্রম ও নিবেদনকে অস্বীকার করা হচ্ছে।
সূত্রগুলোর মতে, গত গ্রীষ্মে ক্লাবের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে গ্যাব্রিয়েল যখন স্বল্প মেয়াদে ক্লাবে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তখন তাঁর ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্লাবের পক্ষ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যেগুলো রক্ষা করা হয়নি।
শুরুতে কোচ রুবেন আমোরিম এবং পরে মাইকেল ক্যারিকের অধীন গ্যাব্রিয়েল সিনিয়র দলের অনুশীলনে অংশ নিলেও মূল দলে অভিষেক নিয়ে গত মৌসুম থেকেই গুঞ্জন শুরু হয়। আশা করা হয়েছিল, ইউনাইটেডের প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতি সফরে গ্যাব্রিয়েল খেলবেন।
গত ১৮ জুলাই রেক্সহামের বিপক্ষে খেলতে হেলসিঙ্কি সফরে গ্যাব্রিয়েলের না থাকার কারণ হিসেবে প্রাক্-মৌসুম অনুশীলনে দেরিতে যোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে সে সফরে ইউনাইটেডের প্রতিটি স্কোয়াডেই ছিলেন, তবে স্টকহোমে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে শুধু ৮ মিনিটের জন্য মাঠে নামেন।
প্রত্যাশানুযায়ী সুযোগ না পাওয়াতেই কি ক্ষোভের জন্ম হয়েছে গ্যাব্রিয়েলের মনে? গত ২৪ জুলাই রোজেনবার্গের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের জন্য গ্যাব্রিয়েল ট্রনহেইমে গিয়েছিলেন। সেদিন ইউনাইটেড কোচ ক্যারিক ১১ জন বদলি খেলোয়াড় ব্যবহার করলেও মাঠে নামতে না পারা দুজন খেলোয়াড়ের একজন ছিলেন গ্যাব্রিয়েল।
ক্রোক পার্কে লিডসের বিপক্ষে ম্যাচের উদাহরণ টানা যায়। টটেনহাম থেকে যাওয়ার ৩ সপ্তাহ পর ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার টিনান টম্পসনকে সেই ম্যাচে মূল খেলানো হয়। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল দলের সঙ্গে গিয়েও ম্যাচটি খেলার সুযোগ পাননি। এরপরও সবার ধারণা ছিল কারাবাও কাপে হয়তো ইউনাইটেডের মূল দলে অভিষেক হবে গ্যাব্রিয়েলের।
এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ইউনাইটেডের সম্ভাব্য সবচেয়ে সহজ লড়াই ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে আজারবাইজানের দল সাবাহ এফকের বিপক্ষে ম্যাচ। প্রথমার্ধেই ইউনাইটেড ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় এবং ৭২ মিনিটের মধ্যেই দলটির কোচ ক্যারিক পাঁচজন বদলি খেলোয়াড়কে ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই বদলি তালিকায়ও গ্যাব্রিয়েলের জায়গা হয়নি। বয়স ১৫ বছর হওয়ায় উয়েফার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী ইউনাইটেডের ‘এ’ ক্যাটাগরির খেলোয়াড়দের তালিকায় গ্যাব্রিয়েলকে রাখা হলে তিনি খেলতে পারতেন।
ইউনাইটেডের কোচরা এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সিনিয়র খেলোয়াড় হওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা এখনো গ্যাব্রিয়েলের হয়নি। তবে খেলোয়াড়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবিটি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে। আর্সেনাল যেভাবে ১৫ বছর বয়সী ম্যাক্স ডাউম্যানকে সুযোগ দিয়েছে, বায়ার্ন মিউনিখও ১৭ বছর বয়সী লেনার্ট কার্লকে অভিষেক করিয়েছে—এসব উদাহরণ টেনে ইউনাইটেড কেন গ্যাব্রিয়েলের ক্ষেত্রে এমনটা করল না, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার।
ম্যানচেস্টার ইভিনিং নিউজ জানিয়েছে, ফ্রি এজেন্ট হওয়ার অনুরোধ জানানোর পর গ্যাব্রিয়েল দলবদলের কোনো ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ওল্ড ট্রাফোর্ড ছেড়ে চলে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কা করছে ইউনাইটেড। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবটি তাঁর চুক্তি বাতিল করতে রাজি না হলে এই তরুণ চলতি মৌসুম শেষ হওয়ার আগে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দিতে পারবেন না। তবে ইংল্যান্ডের বাইরে অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন গ্যাব্রিয়েল।
গ্যাব্রিয়েল আয়ারল্যান্ডের পাসপোর্টধারী হলে আগামী ৬ অক্টোবর ১৬ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর তিনি ইউরোপের অন্য কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়ার যোগ্য হবেন। তাঁর বাবা ও সাবেক ডিফেন্ডার জো ও’সিয়ারুইল আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলে খেলেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য মিরর’ জানিয়েছে, ইউনাইটেড খতিয়ে দেখছে গ্যাব্রিয়েলের বিদেশ চলে যাওয়া তারা আটকাতে পারে কি না। তবে যেকোনো দলবদলেই ফিফার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম অনুযায়ী ১৭ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড়দের পেশাদার চুক্তিতে সই করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, অন্যদিকে স্কলারশিপ চুক্তিতে সম্মত হওয়ার আগে একজন একাডেমি খেলোয়াড়ের বয়স অন্তত ১৬ বছর হতে হবে।
তবে গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে এই সমস্যার সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইউনাইটেড। খবর রয়েছে, চ্যাম্পিয়ন লিগের স্কোয়াডের জন্য ইউনাইটেডের ‘এ’ তালিকায় এই শীর্ষ প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে রাখা না হওয়ার কারণে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার ফলে গত সপ্তাহে সাবাহর বিপক্ষে জয়ী ম্যাচে তিনি খেলতে পারেননি।
গ্যাব্রিয়েলের এ সমস্যার সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইউনাইটেড। খবর রয়েছে, চ্যাম্পিয়ন লিগের স্কোয়াডের জন্য ইউনাইটেডের ‘এ’ ক্যাটাগরির খেলোয়াড় তালিকায় তাঁকে রাখার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মিরর জানিয়েছে, গ্যাব্রিয়েল ইউনাইটেডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের অনুরোধ জানানোর পর চারটি বড় ক্লাবের নজরে পড়েছেন। ইউনাইটেড তাঁর অনুরোধ এখনো মেনে না নিলেও সম্ভাব্য গন্তব্যের পথ খোলা আছে বেশ কয়েকটি।
‘দ্য অ্যাথলেটিক’ জানিয়েছে, গ্যাব্রিয়েলকে দলে ভেড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখ। রিয়াল গ্যাব্রিয়েলকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে আসছে। ইউনাইটেড চাইলে গ্যাব্রিয়েলের ক্লাব ছাড়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে কিংবা এ নিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। তবে গ্যাব্রিয়েল ইংল্যান্ডের বাইরে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।
প্রিমিয়ার লিগের নিয়মে বলা হয়েছে, ‘কোনো খেলোয়াড়ের নিবন্ধনের মেয়াদ চলাকালীন কেবল তখনই তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা সম্ভব, যদি সংশ্লিষ্ট সবাই (ক্লাব, খেলোয়াড় এবং তার অভিভাবক) এতে সম্মত হন।’ নিয়মে আরও বলা হয়েছে, ‘পক্ষগুলো যদি একমত না হয়, তবে যেকোনো পক্ষই লিখিত আবেদন করার মাধ্যমে চুক্তি বাতিলের অনুরোধ নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের কাছে একটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের দাবি জানাতে পারে, যেখানে অনুরোধের সম্পূর্ণ কারণ বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে।’
গ্যাব্রিয়েলের জন্ম ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের এনফিল্ডে। তাঁর বাবা জো ও’সিয়ারুইলের জন্মও ইংল্যান্ডে। কিন্তু মায়ের আইরিশ জাতীয়তার সুবাদে আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলে খেলেছেন জো ও’সিয়ারুইল। গ্যাব্রিয়েলের মা গ্রিক-সাইপ্রিয়ট বংশোদ্ভূত। লন্ডনে বেড়ে উঠেছেন গ্যাব্রিয়েল। তাঁর পারিবারিক শেকড় বেশ বৈচিত্র্যময়। বাবার দিক থেকে আইরিশ ও ত্রিনিদাদীয় এবং মায়ের দিক থেকে সাইপ্রাসীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় গ্যাব্রিয়েল আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর হয়ে খেলার যোগ্যতা রাখেন।