গোলের পর ভিনিসিয়ুসের উদ্‌যাপন
গোলের পর ভিনিসিয়ুসের উদ্‌যাপন

ভিনিসিয়ুসের জাদুতে বাঁচল ব্রাজিল

ব্রাজিল ১–১ মরক্কো

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে তিন দিন আগে। কিন্তু ছোট দলগুলোর ম্যাচে কি আর বিশ্বকাপ জমে! সবার চোখ ছিল তাই আজ ভোরে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশে থাকা দুই দল ব্রাজিল ও মরক্কোর লড়াই। অনেকের মতে, গ্রুপ পর্বে এটাই সবচেয়ে বড় ম্যাচ!

সেই বড় ম্যাচ ১–১ গোলে ড্র হওয়ায় রাত জাগার ক্লান্তি হয়তো পুরোপুরি উশুল হয়নি দর্শকের। ব্রাজিলের সমর্থকদেরও মনটা একটু উসখুস করার কথা। ভিনিসিয়ুসের পা থেকে উছলে পড়া জাদুতে গোলটি ছাড়া প্রথমার্ধে ‘হরর শো’ দেখায় ব্রাজিল। উল্টো ২১ মিনিটে ইসমায়েল সাইবারির গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর জয়ে ‘ফেবারিট’ ছিল মরক্কোই।

কারণ, মাঝমাঠে মরক্কোর ‘ফ্লুইড ফুটবল’ ঠেকাতে কাসেমিরোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। রক্ষণে রজার ইবানিয়েজের ‘নিখোঁজ সংবাদ’ও পরিষ্কার ফুটে ওঠে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে এই দুজনকে তুলে ফাবিনিও ও দানিলোকে নামিয়ে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ান ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তারপর ধীরে ধীরে ছন্দে ফেরার চেষ্টা করে ব্রাজিল। কখনো পেরেছে, কখনো পারেনি।

গত চার–পাঁচ বছরে ফুটবলে ‘বিপ্লব’ ঘটানো ‘আটলাসের সিংহ’ মরক্কোও ব্রাজিলের অগোছালো মাঝমাঠের সুযোগ নিয়ে আর গোল করতে পারেনি; বরং বিরতির পর ব্রাজিলই বেশি ভালো খেলার চেষ্টা করে। তবে যোগ করা সময়ে (৯৯ মিনিট) মরক্কো মিডফিল্ডার নিল এল আয়নাউয়ির দূরপাল্লার শট ব্রাজিলের গোলকিপার আলিসন রুখে দিতে না পারলে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচ থেকে আর পয়েন্ট পাওয়া হতো না ব্রাজিলের।

সাইবারির গোলে মরক্কোর উদ্‌যাপন

মরক্কোর মাঝমাঠের ক্ষুরধার খেলার সামনে ব্রাজিলের আসলে মাঝমাঠ বলতে তেমন কিছু ছিল না! এর মধ্যেই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ঝলকে সতীর্থদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন ভিনিসিয়ুস। যেন অনেকটাই ‘কামথ দ্য আওয়ার, কামথ দ্য ম্যান!’

ভিনিসিয়ুসের জ্বলে ওঠার রসদটা আসলে জুগিয়েছে সাইবারির ওই গোল। যে গোলে ভুল আছে ব্রাজিলের মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতার। বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি, সেখান থেকে বল পান মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ। তাঁর থ্রু পাসটা ধরে ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডারকে দুই পাশে রেখে আলিসনের মাথার ওপর দিয়ে চিপ করে গোল করেন সাইবারি। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকান দলের বিপক্ষে এটাই প্রথম গোল মরক্কোর।

আশ্চর্যের ব্যাপার, গোল হজমের পর পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা জেগে না উঠে আরও বাজে খেলেছে! মাঝমাঠে প্রচুর বল হারায়। ফলে বল নিয়ে এগিয়ে ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটেই ১২টি শট নিতে পেরেছে মরক্কো।

মাঝমাঠের খেলায় পারেনি ব্রাজিল। মাগালায়েসের মতো ব্রাজিলের অন্যরাও স্বচ্ছন্দে খেলতে পারেননি

কিন্তু এরপরই ভিনিসিয়ুসের চমক। ৩২ মিনিটে বাঁ প্রান্তে ব্রুনো গিমারেসের পাস পান ভিনি। চিরাচরিত ভঙ্গিতে কাট–ইন করে বক্সে ঢুকে মরক্কোর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ভিনিসিয়ুসের ডান পায়ের শট তিরের ফলার মতো আশ্রয় নেয় জালে। এ যেন রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ভিনির সেই চিরাচরিত গোল আর ডাগআউটে আনচেলত্তি!

ভিনির জন্য উপলক্ষটাও দারুণ ছিল। ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের ৫০তম ম্যাচে দলের হার এড়ানো গোল করলেন। ব্রাজিলের প্রয়োজনে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না—ভিনিকে নিয়ে এই দুর্নামটা এখন একটু হলেও ঘুচবে। তবে ব্রাজিল সমর্থকদের দুশ্চিন্তা বাড়বে রাফিনিয়াকে নিয়ে। প্রথমার্ধে ব্রাজিল উইঙ্গারকে প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ম্যাচের শেষ দিকে গিমারায়েসের ক্রস থেকে সহজ গোল করতে পারেননি রাফিনিয়া।

অবশ্য শুধু রাফিনিয়া কেন, একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা ইগর থিয়াগোও ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যে কর্নার থেকে হেডে গোলের দারুণ সুযোগ হারান। সেই সুযোগ নষ্ট হতে দেখে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হতাশা ঝাড়েন রোনালদো, কাকা ও রবার্তো কার্লোস। ব্রাজিলের সোনালি দিনের এসব সারথি নিশ্চয়ই নিজেদের অতীতকে স্মরণ করেছেন।

আনচেলত্তির দুশ্চিন্তা বাড়বে পাকেতাকে নিয়েও। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে দারুণ অ্যাক্রোবেটিক ভঙ্গিতে তাঁর শট একটুর জন্য মরক্কোর জালে আশ্রয় নেয়নি। সর্বশেষ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলা আফ্রিকান দলটির গোলকিপার ইয়াসিন বুনু শটটি ঠেকান। এর বাইরে পাকেতা শুধু মাঠে দৌড়েছেন, ব্রাজিলের সৃষ্টিশীল মাঝমাঠ কিংবা ইউরোপিয়ান ধাঁচের ‘ডিরেক্ট ফুটবল’—কোথাও প্রথম বিভাগে ‘পাস’ করবেন না পাকেতা। সাদামাটা লেগেছে।

ম্যাচ শেষে দর্শকদের অভিবাদনের জবাবে রাফিনিয়া

ব্রাজিলের এমন সাদামাটা ফুটবলের মাঝখানে একচিলতে আশার প্রতীক ভিনিসিয়ুসের গোলটি। আসলে ওই গোল ছাড়া ম্যাচে প্রায় কোনো সময়েই ব্রাজিলকে ব্রাজিলের মতো খেলতে দেখা যায়নি। উল্টো গত ৯২ বছরের মধ্যে এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হারের শঙ্কায় পড়েছিল ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত ভিনিতে রক্ষা!

‘সি’ গ্রুপ থেকে সমান ১টি করে পয়েন্ট পেল ব্রাজিল ও মরক্কো। আগামী শনিবার নিজেদের পরের ম্যাচে হাইতির মুখোমুখি হবে আনচেলত্তির দল।