ইতালি ফুটবল দল
ইতালি ফুটবল দল

প্লে–অফ ফাইনাল

ইতালি আর বিশ্বকাপের মাঝে ‘এভারেস্ট’

আর একটা মাত্র বাধা ইতালির সামনে। জেনেরো গাত্তুসোর ভাষায় যে বাধার নাম ‘এভারেস্ট’। ওটা পেরোলেই মিলবে বিশ্বকাপের টিকিট, ১২ বছর পর!

ইতালির কোচ যেটাকে ‘এভারেস্ট’ বলছেন, কাগজে-কলমে সেই বাধার নাম অবশ্য বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। যে দলটাও ইতালির মতো ২০১৪ সালের পর আর বিশ্বকাপ খেলেনি। পার্থক্য বলতে, ইতালি যেখানে চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে, বসনিয়া বিশ্বকাপে খেলেছে ওই একবারই। আর মিল বলতে ইতালির সর্বশেষ আর বসনিয়ার একমাত্র বিশ্বকাপে দুই দলই বিদায় নিয়েছিল প্রথম রাউন্ড থেকে। নিয়তির কী খেলা, আরেকটি বিশ্বকাপে যেতে সেই দুই দলই আজ মুখোমুখি প্লে–অফ ফাইনালে।

গত সপ্তাহে প্লে-অফের সেমিফাইনালে উত্তর আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে একটা বাধা পেরিয়ে এসেছে আজ্জুরিরা। সান্দ্রো তোনালি আর মইজে কিনের গোল বাঁচিয়েছে আরেকটা বিপর্যয় থেকে। কিন্তু সেদিন মাঠের খেলা দেখে ইতালিয়ান সমর্থকদের ভয় খুব একটা কাটেনি। কোচ গাত্তুসোর দুশ্চিন্তাও কাটেনি সম্ভবত, নইলে কী আর আজ রাতের ম্যাচটা ‘এভারেস্ট’ জয়ের মতো মনে হয়!

বসনিয়ার ঘরের মাঠ জেনিৎসার বিলিনো পলিয়ে স্টেডিয়ামে হবে ম্যাচটা। সেখানে তুষারপাত হয়েছে কয়েক দিন আগে। মাঠ ভেজা। গ্যালারিও থাকবে উত্তাল। গাত্তুসো সোজাসুজিই বলে দিয়েছেন, বৈরী পরিবেশে তিনি ‘শৈল্পিক ফুটবল’ চাইবেন না শিষ্যদের কাছ থেকে। তাঁর চাওয়া স্রেফ জয়। যে জয়ে মিলবে বিশ্বকাপে কাতার, সুইজারল্যান্ড ও কানাডার সঙ্গে গ্রুপ ‘বি’-তে জায়গা করে নেওয়ার টিকিট।

ইতালির কোচ জেনারো গাত্তুসো

তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই একটা বিতর্কে জড়িয়ে গেছে ইতালি দল। আর সেটা নিজেদেরই তৈরি। গত সপ্তাহেই বসনিয়া যখন পেনাল্টিতে ওয়েলসকে হারিয়ে ফাইনালে উঠল, তখন ইতালির ড্রেসিংরুমের উদ্‌যাপনের একটি ভিডিও ফাঁস হয়ে গেছে। যেখানে দেখা গেছে, ইতালির খেলোয়াড়েরা এমনভাবে উদ্‌যাপন করছেন, যেন ফাইনালে খুব সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছেন! সেই ভিডিওতে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার ফেদেরিকো দিমার্কোদের ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’ আর উচ্ছ্বাসকে বসনিয়ানরা দেখছে ঔদ্ধত্য হিসেবে। রোমা ও জুভেন্টাসে খেলা সাবেক বসনিয়ান মিডফিল্ডার মিরালেম পিয়ানিচ গাজ্জেত্তা দেলো স্পোর্তকে বলেছেন, ‘বসনিয়া ইতালিকে খোলা হাতে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষায় আছে।’ কথাটা হুমকির মতো লাগার কথা ইতালিয়ানদের কানে।

ইতালির সমালোচনা করেছেন ১৯৮২ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক কিংবদন্তি গোলরক্ষক দিনো জফও, ‘এটা ঠিক হয়নি। এতে শুধু প্রতিপক্ষকে আরও উৎসাহিত করা হয়েছে। আমি হলে এভাবে করতাম না।’ দিমার্কো অবশ্য পরে সাফাই গাইতে সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেছেন, ‘বসনিয়া বা বসনিয়ার মানুষের প্রতি কোনো অসম্মান দেখাইনি আমি। বলা হচ্ছে আমরা অহংকারী। অহংকারের কী আছে? আমরা শেষ দুটি বিশ্বকাপ খেলতেই পারিনি।’

এ উত্তেজনায় আবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম। তারা এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে নানা অপয়া সব লক্ষণও। যেমন আজকের ম্যাচে রেফারির দায়িত্বে থাকবেন ফ্রান্সের ক্লেমন্ত ত্যুর প্যাঁ। এই ভদ্রলোকই ছিলেন ইতালিয়ান ফুটবলে দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকা সেই উত্তর মেসিডোনিয়া ম্যাচের রেফারি, যে ম্যাচে হেরে ইতালি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেতে পারেনি।

বসনিয়া স্ট্রাইকার এডিন জেকো

বসনিয়া অবশ্য এসব কুসংস্কার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তাদের প্রেরণার উৎস এক চল্লিশ বছরের ‘বৃদ্ধ’—এডিন জেকো। কার্ডিফের সেমিফাইনালে শেষদিকে সমতা ফেরানো গোলটা তিনিই করেছিলেন। রোমা ও ইন্টার মিলানে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের কারণে ইতালির ফুটবলও প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছেন জেকো। তাঁর পাশে থাকবেন ১৮ বছরের কেরিম আলাইবেগোভিচ। সেদিন জেকোর গোলটা তিনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন। বুড়োর অভিজ্ঞতা আর তরুণের সাহস—ইতালির জন্য আজ সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।

নিজেদের ওপর চাপ কমাতেই হয়তো জেকো বলছেন, ‘ম্যাচটা আমাদের মাঠে হলেও আসলে ইতালিই ফেবারিট।’ তবে এর সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘জিততে পারলে সেটা শুধু আমার জন্য নয়, এই তরুণ প্রজন্মের জন্যও অসাধারণ একটা ব্যাপার হবে। আশা করি, আমরা সেটা করতে পারব।’

গাত্তুসো ঠিকই বলেছেন। ইতালির জন্য ম্যাচটা ‘এভারেস্ট’ জয়ের মতো ব্যাপারই।