যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে শেষ মুহূর্তের বিশ্লেষণ। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। আর সেটি যখন আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের মহারণ, তখন রোমাঞ্চের পারদ আকাশ ছুঁতে বাধ্য।
এই সেমিফাইনালটিই আর্জেন্টিনার জন্য চলতি বিশ্বকাপে প্রথম আসল পরীক্ষা। কারণ, বিশ্বকাপের আগে আগে বা বিশ্বকাপের শেষ আট পর্যন্ত তারা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অপেক্ষাকৃত নিচের সারির দলগুলোর সঙ্গেই খেলে এসেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হওয়া সুইজারল্যান্ডই ছিল র্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে ওপরে, সেটিও ১৪ নম্বর। আর আজ র্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় দল আর্জেন্টিনা লড়তে যাচ্ছে চার নম্বর দল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
লিওনেল মেসি এই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন। তবে আমার বিশ্বাস, মেসির মতো খেলোয়াড়ের জন্য এটি কোনো বাড়তি চাপ তৈরি করবে না। সমস্যা যদি হয়, তা দলের অন্য খেলোয়াড়দের হতে পারে। জুড বেলিংহাম, হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকাসহ ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা ক্লাব ফুটবলে ইউরোপের বড় বড় সব ক্লাবে নিয়মিত খেলে অভ্যস্ত। তাঁদের শারীরিক ফুটবল ও হাই-ইনটেনসিটি গেম প্লে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ও তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য আসলেই এক বিরাট পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
তারপরও আমার চোখে ম্যাচটি ৫০-৫০। রাফ অ্যান্ড টাফ একটা ম্যাচ হতে পারে। প্রচুর ফাউল এবং বেশ কিছু কার্ড দেখার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারেন দর্শক। গোলের সুযোগ খুব বেশি আসবে না। তাহলে জয়ের সুযোগ কার বেশি? উত্তরে বলব, এই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে মেসির ওপর। তিনি ছন্দে থাকলে আর্জেন্টিনা কিছুটা এগিয়ে থাকবে।
কিন্তু আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলেও হুট করে গোল হজম করে বসে। কেপ ভার্দে ও মিসরের মতো দলের কাছেও ২টি করে গোল খেয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কাছে এক গোল। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ মাঝেমধ্যেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলে, যা এই ম্যাচে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
বিপরীতে, ইংল্যান্ডকে নিয়ে তাদের মিডিয়া বরাবরই অনেক মাতামাতি করে। ইংলিশ লিগই বিশ্বের সেরা—এমন দাবিও করে। যদিও ইংল্যান্ড একমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছিল সেই ১৯৬৬ সালে, ৬০ বছর আগে। তবে এবার ফাইনালে যেতে পারলে ট্রফি জেতারও ভালো সম্ভাবনা থাকবে ইংল্যান্ডের।
আর্জেন্টিনাকে জিততে হলে মেসিকে তাঁর সেরা খেলাটাই খেলতে হবে। তিনিই গেম চেঞ্জার। আর্জেন্টিনার বিল্ডআপ খেলাটা তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় এবং অনেক সময় ফাইনাল পাসটাও তিনিই বাড়িয়ে দেন। মিসরের বিপক্ষে মেসি গোল পাননি এবং মাঝখান দিয়ে সুবিধা করতে না পেরে উইংয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তেমনটা হলে আর্জেন্টিনার জন্য কঠিন হবে ফাইনালে ওঠা।
কোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত গোল করে দলকে জিতিয়েছেন হুলিয়ান আলভারেজ। মেসি ও আলভারেজের মধ্যে বোঝাপড়া জমে উঠলে আর্জেন্টিনার জন্য ভালো। আর মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে ম্যাক অ্যালিস্টারের ভূমিকা হবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ত্রয়ী ছন্দে না থাকলে আর্জেন্টিনার ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
ইংল্যান্ডের কথা বললে দারুণ ফর্মে আছেন জুড বেলিংহাম। রক্ষণ আর মাঝমাঠের মধ্যকার লাইন থেকে বল কেড়ে নিয়ে যেভাবে তিনি ওপরে যাচ্ছেন এবং গোল করছেন, তা প্রতিপক্ষের জন্য বিপজ্জনক। বেলিংহাম নিজের সেরাটা দিতে পারলে ইংলিশরা চালকের আসনে চলে যেতে পারে। তা ছাড়া ইংল্যান্ডের দুই উইঙ্গারও বেশ ভালো।
পাশাপাশি বেঞ্চের শক্তিও। বদলি নেমে মার্কাস রাশফোর্ড দারুণ কার্যকর। স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন বিশ্বের অন্যতম সেরা। তাঁকে বোতলবন্দী করে রাখার দায়িত্ব থাকবে অনেকটা মার্তিনেজ ও রোমেরোর কাঁধে। চোট কাটিয়ে মিডফিল্ডের ডেকলান রাইস ম্যাচটিতে খেললে ইংল্যান্ডের মাঝমাঠ আরও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
ম্যাচটি ৫০-৫০ হলেও মেসিই এখানে মূল নিয়ন্ত্রক। তাঁকে থামানো যেকোনো রক্ষণের জন্যই কঠিন। অনেক বড় বড় কোচই তাঁকে থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এই জায়গায় ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেলের কৌশল ও পরিকল্পনা কী হয়, তা দেখার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।
আমি ইংল্যান্ড দলে থাকলে আর্জেন্টিনাকে শুরু থেকেই চাপে রাখার কৌশল নিতাম। আর্জেন্টিনার উইং ব্যাকে কিছুটা দুর্বলতা আছে, ইংল্যান্ডকে ঠিক এই জায়গাটাতেই আঘাত করতে হবে। আর যেকোনো উপায়ে মেসিকে বলের নাগাল থেকে দূরে রাখতে হবে। সব মিলিয়ে ফুটবল–বিশ্ব আজ রাতে একটি ধ্রুপদি সেমিফাইনালের সাক্ষী হতে যাচ্ছে!
লেখক: বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক