খোঁচা মারতে ওস্তাদ জোসে মরিনিও। রিয়াল মাদ্রিদের রক্ষণভাগ নিয়ে এ কোচ খোঁচাটা মারলেন পরোক্ষভাবে।
ম্যাচে ২১টি শট নিয়ে ইন্টার মিলান মাত্র ৭টি পোস্টে রাখতে পারলেও ব্যাপারটা ভালো লাগেনি মরিনিওর। খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পর্তুগিজ এই কোচের ম্যাচ নিয়ে বলা কথার তির তাই গিয়ে লাগল রিয়ালের রক্ষণে। অবশ্য শুধু নিজ দলের রক্ষণভাগই নয়, ম্যাচসেরা বেছে নেওয়া নিয়েও খোঁচা মারেন মরিনিও। ঠিক এ বিষয়েই অবধারিতভাবে উঠে আসে থিবো কোর্তোয়ার প্রসঙ্গ।
শুনুন মরিনিওর মুখেই, ‘খেলাটা ৬-৫ কিংবা ৬-৬ গোলে শেষ হতে পারত। পাগলাটে এক ম্যাচ। এমন খামখেয়ালি খেলা আমি পছন্দ করি না। আমার চাওয়া দল ৫, ৬ কিংবা ৭ গোল করুক এবং সেখানে কোনো অসাধারণ গোলকিপারের প্রয়োজনীয়তা না পড়ুক। কোর্তোয়া আজ ম্যাচসেরা না হলে কবে হবে!’
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে রিয়াল ম্যাচটি জিতেছে ২–১ গোলে। ম্যাচে মাত্র ৩৫.৬ শতাংশ বল দখলে রেখেছে মরিনিওর দল। এই কোচের খেলানোর ধাঁচ জানা থাকলে বল দখলে রাখার পরিসংখ্যান কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু দলের গোলকিপারকে যদি ছোট–বড় মিলিয়ে সাতটি সেভ করতে হয়, তাহলে মরিনিওর খানিকটা মাথা গরম হওয়াই স্বাভাবিক। সংবাদ সম্মেলনে সেটা আরও স্পষ্ট হলো রিয়ালের গোলকিপার থিবো কোর্তোয়া ম্যাচসেরা না হওয়ায়।
পোস্টে ৩৪ বছর বয়সী থিবো কোর্তোয়া আছেন আগের মতোই। হাত দুটি এখনো শিশুকে কোলে নেওয়া মায়ের মতোই বিশ্বস্ত। সেই ৭টি সেভের মধ্যে তিনটি ছিল নিশ্চিত গোল। কোর্তোয়া তা ঠেকাতে না পারলে স্কোরলাইন বলছে জিতত ইন্টার–ই। কিন্তু বেলজিয়াম কিংবদন্তির দৃঢ়তায় রিয়াল পার পেয়ে গেলেও ম্যাচসেরার স্বীকৃতি মিলল কি না গোলদাতা ফেদে ভালভের্দের!
স্বয়ং ভালভের্দেরই এই রায় পছন্দ হয়নি, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না ম্যাচসেরার পুরস্কারটা আমি পেয়েছি। এটা কোর্তোয়ার প্রাপ্য। সে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।’ শুধু রিয়াল মিডফিল্ডার নয়, সাক্ষী আছেন আরেকজন। তিনি অবশ্য সরাসরি বলেননি, তবে বুঝিয়ে দিয়েছেন এই ম্যাচে রিয়ালের আসল নায়ক কে। ইন্টার স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ। বারবার কোর্তোয়া নামের দেয়ালে মুখ থুবড়ে পড়ার পর আর্জেন্টাইন এই তারকার উপলব্ধি, ‘কোর্তোয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার। তবে গোলের সামনে আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে।’
মার্তিনেজের তো আর কোর্তোয়ার মতো উপলক্ষ স্মরণীয় করে রাখার অভ্যাস নেই। বড় ম্যাচ, মাইলফলকের ম্যাচ—এসব উপলক্ষ পেলেই বেলজিয়াম তারকার হাত দুটো কীভাবে যেন আরও প্রসারিত হয়ে ওঠে। যেমন ধরুন, ২০২২ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল—৯টি সেভ করেন। আর গতকাল রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগে শততম ম্যাচ (আতলেতিকো মাদ্রিদ ১২, চেলসি ১৬ ও রিয়াল মাদ্রিদ ৭২) খেললেন কোর্তোয়া।
বেলজিয়ামের প্রথম এবং অষ্টম গোলকিপার হিসেবে এই মাইলফলকের দেখা পেলেন কিংবদন্তি। ২০১৩-১৪ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর অভিষেকের পর আর কোনো গোলকিপার এই প্রতিযোগিতায় কোর্তোয়ার মতো এত সেভ করতে পারেননি।
চ্যাম্পিয়নস লিগে ন্যূনতম ১০০ ম্যাচ খেলেছেন মোট ৫৬ জন। কোর্তোয়া গোলকিপার হওয়ায় তাঁর তালিকাটা এই ৫৬ জনের মধ্যে আলাদা। গোলকিপারদের সেই তালিকায় কোর্তোয়ার আগে যাঁরা নাম লিখিয়েছেন তাঁদের সবাই কিংবদন্তি—ইকার ক্যাসিয়াস (১৭৭), ম্যানুয়েল নয়্যার (১৬১), জিয়ানলুইজি বুফন (১২৪), পিওতর চেক (১১১), ইয়ান ওবলাক (১০৬), ভিক্টর ভালদেজ (১০৬) ও অলিভার কান (১০৩)।
কোর্তোয়া গোলকিপারদের এ তালিকায় থেকেও একটি জায়গায় আবার আলাদা। একমাত্র গোলকিপার হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগে অন্তত দুটি ফাইনাল ম্যাচ খেলেছেন মাদ্রিদের দুটি ক্লাবের হয়ে—আতলেতিকো মাদ্রিদ (২০১৪) ও রিয়াল মাদ্রিদ (২০২২, ২০২৪)।
শুধু অর্জনে নয়, ইন্টারের বিপক্ষে ম্যাচেও কোর্তোয়া কতটা আলাদা বুঝে নেওয়া যায় একটি মুহূর্ত দিয়ে। ইতালিয়ান ক্লাবটি গোলকিপারের ভুলে একটি গোল হজম করেছে। কিন্তু রিয়ালের পোস্টে কতটা নিখুঁত ছিলেন সেটা ১৬ মিনিটেই বোঝা গেছে।
ইন্টার মিডফিল্ডার হাকান চালাহানগ্লুর জোরালো ফ্রি–কিকটি সরাসরি তাঁর দিকেই ছিল। কোর্তোয়ার ঠেকাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ফ্রি–কিকে গোলকিপাররা একটু নড়াচড়া করলেও কোর্তোয়া তাঁর জায়গা থেকে একটুও নড়েননি। কেন?
ম্যাচ শেষে মুভিস্টারকে বলেছেন সে কথা। অভিজ্ঞতা থেকে শিখে পোস্টে ওভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন কোর্তোয়া, ‘দুর্ভাগ্যবশত এল ক্লাসিকোতে রাশফোর্ড আমাকে আমার পোস্টেই শট করে ফাঁকি দিয়েছিল। শটটা খুব ভালো ছিল আর আমি সামান্য পজিশন ছেড়ে সরি। এরপর বিশ্বকাপে লামিনে যখন ফ্রি-কিক পায়, তখন আমি পোস্টে অনড় ছিলাম। আজও সেটাই করেছি। এখন সে যদি মানবদেয়ালের ওপর দিয়ে গোল করে ফেলে তাহলে হাততালি দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু আমি আর আমার পোস্ট ছেড়ে একচুলও নড়ব না।’