ব্রাজিল কেন ঘুরে ঘুরে প্রীতি ম্যাচ খেলে

বাংলাদেশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পায়নি ব্রাজিল।

আগস্টের শেষ দিকে ঢাকায় এসেছিল ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) একটি প্রতিনিধি দল। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম পরিদর্শনের পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন তারা।

অক্টোবরের ৫–৬ তারিখের দিকে বাংলাদেশের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে চায় ব্রাজিল—দেওয়া হয়েছিল এমন প্রস্তাবও। তবে ব্রাজিলের মতো দলের জন্য যে বিপুল খরচ, সেটির সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ বলেনি বা বলতে পারেনি। বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দিলে ভিনিসিয়ুসদের এখন এখন ঢাকায় রওনা হওয়ার কথা। গতকাল রাতে কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে কার্লো আনচেলত্তির দল। এই ম্যাচের পরই বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিল দলটি। সেটি না হওয়ায় ব্রাজিল দলের এবারের ফিফা উইন্ডোর সমাপ্তি ঘটল কলকাতাতেই। ভারতে পা রাখার আগে অস্ট্রেলিয়ায় দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল দলটি।

তবে আগামী মাসেই আবার এশিয়ায় ফিরবে ব্রাজিল। নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে সিঙ্গাপুরে এসে স্বাগতিক ও জাপানের বিপক্ষে খেলবে আরও দুটি প্রীতি ম্যাচ। গত এক দশকের ইতিহাস বলছে, সুযোগ পেলেই দেশের বাইরে গিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলাকে ‘রীতি’ বানিয়ে ফেলেছে ব্রাজিল।

বোলাভিআইপি ব্রাজিলের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অ্যাওয়েতে সবচেয়ে বেশি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ভারতের ম্যাচটিসহ এ সময়ে মোট ৪৭টি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। এর মধ্যে ঘরের মাটিতে মাত্র চারটি, বাকি ৪৩টিই ব্রাজিলের বাইরে। অর্থাৎ, প্রীতি ম্যাচের ৯১.৫ শতাংশ ম্যাচই দলটি অ্যাওয়েতে খেলেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৫.৭ শতাংশ উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা খেলেছে ৮০.৫ শতাংশ।

প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রাজিল কেন ঘুরে ঘুরে প্রীতি ম্যাচ খেলে?

কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলা ব্রাজিলের মূল একাদশ

উত্তরটা মূলত অর্থনীতিতে

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল ব্র্যান্ডগুলোর একটি ব্রাজিল। সেই ব্র্যান্ডের মূল্য শুধু মাঠের ফলাফলে নয়, বিদেশের বাজারেও। ফলে ব্রাজিলকে নিজেদের দেশে নিয়ে এসে একটি ম্যাচ আয়োজন করতে পারলে আয়োজকদের জন্য সেটি বড় বাণিজ্যিক আকর্ষণ। টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, আতিথেয়তা, পর্যটন—সব মিলিয়ে ম্যাচটি একটি বড় ইভেন্টে পরিণত হয়। আর সেই চাহিদার বিনিময়ে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনও বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার সুযোগ পায়।

ভারতের কলকাতার ম্যাচটিই এর সাম্প্রতিক উদাহরণ। ‘মিন্টের’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ব্রাজিল ম্যাচের আয়োজনেই প্রায় ৫০ কোটি রুপি বাজেট ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনকে অ্যাপিয়ারেন্স ফি হিসেবে ৩৫–৪০ কোটি রুপি দেওয়ার কথা ছিল। ব্রাজিলের প্রায় ৯০ সদস্যের দলের চার্টার্ড ফ্লাইটেই খরচ হতে পারে আরও প্রায় ৬ কোটি রুপি। এগুলো অবশ্য অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হিসাব। এআইএফএফ বা সিবিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে অঙ্কগুলো নিশ্চিত করেনি।

অর্থাৎ, ভারতের মতো একটি দেশের জন্য ব্রাজিলকে আনা যেখানে অর্ধশত কোটি রুপির প্রকল্প, সেখানে ব্রাজিলের জন্য একই ম্যাচ বিদেশ সফরের আরেকটি বড় বাণিজ্যিক সুযোগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্নটি তাই ছিল এই বিশাল খরচের অর্থ কে দেবে এবং সেটি কীভাবে তুলে আনা হবে।

এবারের ফিফা উইন্ডোয় প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল ব্রাজিল। টাউনসভিল ও ব্রিসবেনে আয়োজিত সেই দুই ম্যাচ শুধু ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখা হয়নি। কুইন্সল্যান্ড সরকারই সিরিজটি আয়োজনের উদ্যোগ নেয় এবং এটিকে পর্যটন ও অর্থনীতির জন্য বড় আয়োজন হিসেবে প্রচার করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই ম্যাচের সিরিজটি কুইন্সল্যান্ডের আঞ্চলিক পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে অর্থনৈতিক সুবিধা আনার লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয়েছিল।

কলকাতায় নামার আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল ব্রাজিল

এমনকি সিরিজটির ৯০ শতাংশের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর কুইন্সল্যান্ড সরকার জানিয়েছিল, টিকিটধারীদের ৫৭ শতাংশই আয়োজক অঞ্চলের বাইরে থেকে আসছেন। অর্থাৎ ব্রাজিলকে ঘিরে ম্যাচের চাহিদা শুধু স্টেডিয়ামের টিকিট বিক্রিতে আটকে থাকছে না; দর্শকদের যাতায়াত, হোটেল, খাবার, বিনোদনসহ স্থানীয় অর্থনীতিতেও সেটির প্রভাব পড়ছে।

এই কারণেই একই আন্তর্জাতিক বিরতিতে ব্রাজিলের সঙ্গে দুটি ম্যাচ আয়োজন করা হয়।

ইউরোপীয়রা কেন কম খেলে?

ব্রাজিলের বাইরে গিয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলার প্রবণতার আরেকটি কারণ আন্তর্জাতিক সূচি। ইউরোপের বড় দলগুলো ফিফা উইন্ডোর বেশির ভাগ সময়ই উয়েফা নেশনস লিগ, ইউরো ও এর বাছাইপর্বের মতো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ব্যস্ত থাকে। ফলে প্রীতি ম্যাচ খেলার সুযোগ তুলনামূলক কমই থাকে।

বোলাভিআইপির একই হিসাবে, ২০১৭ সাল থেকে ইতালি তাদের ৬৫.২ শতাংশ প্রীতি ম্যাচ দেশের বাইরে খেলেছে। স্পেন খেলেছে ৩৬ শতাংশ, জার্মানি ৩৪.২, ইংল্যান্ড ২৫ আর ফ্রান্স মাত্র ১৭.২ শতাংশ। বিপরীতে ব্রাজিলের ৯১.৫ শতাংশ।

দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপের মতো নেশনস লিগ নেই, আর প্রীতি ম্যাচের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো দলের চাহিদাও অনেক। তাই ইউরোপ, এশিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজকদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের প্রস্তাব এলে সেটাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।

প্রীতি ম্যাচের বাজারে ব্রাজিল ফুটবল দলের চাহিদা অনেক

আন্তর্জাতিক ফুটবলে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে গিয়ে খেলতে শুধু আর্থিক লাভই যে হয়, তা নয়। এ সব ম্যাচে নতুন খেলোয়াড় পরীক্ষা করা যায়, দলের নতুন কাঠামোও তৈরি করা যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচে যেমন কার্লো আনচেলত্তি একাধিক খেলোয়াড় ও কৌশল পরীক্ষা করেছেন। ভারতের বিপক্ষেও একাদশে ৮টি পরিবর্তন এনেছেন।

তবে সবার ওপরে মূল লক্ষ্য আসলে অর্থপ্রাপ্তিই। ব্রাজিলকে তাদের দেশে নিয়ে যাওয়ার মতো অর্থ খরচ করার সামর্থ্য যেসব দেশ ও আয়োজকের আছে, তারাই সাধারণত এমন ম্যাচ আয়োজন করতে পারে। আর ব্রাজিলও জানে, তাদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে বিশাল দর্শক, বাণিজ্যিক মূল্য ও স্পনসরদের আগ্রহ।

সেই কারণেই ব্রাজিলের প্রীতি ম্যাচের মানচিত্রে এখন শুধু রিও ডি জেনেইরো, সাও পাওলো বা ব্রাসিলিয়ার নাম থাকে না। কলকাতা, টাউনসভিল, ব্রিসবেন, সিঙ্গাপুর—বিশ্বের বিভিন্ন শহর হয়ে ওঠে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অস্থায়ী ঠিকানা।