‘জি’ গ্রুপে মিসরের সঙ্গে ইরানের লড়াই শেষ হয়েছে ১-১ গোলে।
‘জি’ গ্রুপে মিসরের সঙ্গে ইরানের লড়াই শেষ হয়েছে ১-১ গোলে।

কোন হিসাব মিললে নকআউটে যাবে ইরান

মিসর ১-১ ইরান

স্টেডিয়ামের আলো কখনো কখনো সত্যিটাকে একটু দেরিতে দেখায়।
বল যখন জালে জড়ায়, গ্যালারির উল্লাস আর বেঞ্চ থেকে ছুটে আসা খেলোয়াড়দের দৌড়—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই কোথাও একটা যন্ত্র বসে থাকে, মিলিমিটারের হিসাব কষে আবেগকে থামিয়ে দেয়।
ফুটবল আসলে মাঝেমধ্যে এতটাই নির্দয়। সিয়াটলে আজ মিসরের বিপক্ষে ইরানের ম্যাচটা ছিল ঠিক তেমনই। যেন একটা অসমাপ্ত গল্প, যেখানে শেষ লাইনটা লিখে ফেলার পরও কেউ এসে তা কেটে দিল।

মিসরকে এগিয়ে দেওয়া গোলের পর সাবেরের উদ্‌যাপন।

ম্যাচের শুরুতেই ধাক্কা। পাঁচ মিনিট না যেতেই গোল খেয়ে বসে ইরান। মিসরের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মোহাম্মদ সালাহ, তাঁর বাঁ পায়ের চেনা কারুকাজ থেকে তৈরি সুযোগে মাহমুদ সাবেরের শট। খুব জোরালো নয়, কিন্তু যথেষ্ট। আলীরেজা বেইরানভান্দের হাত ফসকে বল জালে ঢুকে যায়। একটা ভুল ইরানের, একটা গোল হজম, এভাবেই শুরু হয় চাপ। কিন্তু ইরান ভেঙে পড়েনি; বরং যেন চ্যালেঞ্জটাই উপভোগ করল।

রামিন রেজাইয়ান দুর্দান্ত এক গোল করে সমতায় ফেরান ইরানকে।

মেহদি তারেমি খুব দ্রুতই ম্যাচে নিজের ছাপ রাখতে চাইলেন। পেনাল্টি আদায় করলেন। গ্যালারিতে তখন নিশ্বাস বন্ধ। কিন্তু মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের সেই শট ঠেকিয়ে দেন। একটা সুযোগ হাতছাড়া, আরেকটা হতাশা। কিন্তু গল্প তখনো শেষ হয়নি। কয়েক মিনিট পরই রামিন রেজাইয়ান দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। ১৪ মিনিটেই সমতা, ১-১।

এরপর ম্যাচ কিছুটা অগোছালো হয়ে গেল। দুই দলই যেন নিজেদের খুঁজে পাচ্ছিল না। মাঝমাঠে বলের লড়াই, ছোট ছোট ফাউল, ছন্দপতন। মিসরের নকআউট নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল এই ম্যাচ শুরুর আগেই, তারা তাই খেলছিল একটু সংযত হয়ে। ইরান ধীরে ধীরে সাহসী হচ্ছিল। কিন্তু গোলের দেখা মিলছিল না।

ভিএআরে বাতিল হয়ে যায় ইরানের খলিলজাদেহর গোল।

তারপর শেষ মুহূর্তের সেই নাটকীয়তা। যোগ করা সময়ে প্রথমে তারেমির হেড, ক্রসবারে আঘাত। এক ইঞ্চি নিচে হলে গল্প অন্য রকম হতে পারত। তারপর সেই মুহূর্ত—যেটা লেখা হয়, আবার মুছেও ফেলা হয়। ৯৩ মিনিটে শোজায়ে খলিলজাদেহ বল জালে পাঠালেন। বক্সের ভেতর পিনবলের মতো লেগে থাকা বল, হঠাৎ তাঁর পায়ে এসে পড়ে, আর এক শটে গোল। স্টেডিয়াম ফেটে পড়ে, বেঞ্চ ছুটে আসে।

ইরান তখন বিশ্বাস করছিল—এটাই সেই জয়, যেটা তাদের শেষ ৩২-এ নিয়ে যাবে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর নাট্যকার। ভিএআর ডাকে, স্ক্রিনে চোখ, মুহূর্ত থেমে যায়। খুব সামান্য ব্যবধানে অফসাইড, মিলিমিটারের ফারাকে গোল বাতিল। একটা দল, যারা সেকেন্ড খানেক আগে স্বপ্ন ছুঁয়েছিল, হঠাৎ বাস্তবের মাটিতে পড়ে যায়।
এই ড্রয়ের ফলে মিসর ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে নকআউটে উঠেছে। আর ইরান? ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয়। এখন তাদের তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য ম্যাচগুলোর দিকে।

নকআউটের জন্য ইরানকে এখন তাকিয়ে থাকতে হবে অন্যদের দিকে।

সমীকরণ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করতে ইরানকে যেকোনো এক বা একাধিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করতে হবে: ১. ক্রোয়েশিয়াকে হারাতে হবে ঘানার, ২. কঙ্গোর বিপক্ষে উজবেকিস্তানকে অপরাজিত (জয় বা ড্র) থাকতে হবে, ৩. অস্ট্রিয়া বনাম আলজেরিয়া ম্যাচটি ড্র না হয়ে যেকোনো এক দলকে জয়ী হতে হবে, ভালো হয় যদি অস্ট্রিয়া আলজেরিয়াকে হারিয়ে দেয়।

ফুটবলে এমন অপেক্ষা খুব কমই আসে। সেই অপেক্ষার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটা বড় যন্ত্রণাও।

কারণ, তারা জানে, তাদের স্বপ্নটা ভেঙেছে কোনো বড় ভুলে নয়, শুধু মিলিমিটারের এক সিদ্ধান্তে।