দেম্বেলে ও কাভারাস্কেইয়া জোড়া গোল করেছেন
দেম্বেলে ও কাভারাস্কেইয়া জোড়া গোল করেছেন

চ্যাম্পিয়নস লিগ

পিএসজি–বায়ার্ন : এই আনন্দ রাখি কোথায়

‘ফুটবল যখন সবচেয়ে সুন্দর রূপে পৃথিবীর সামনে আসে, তখন আমি শুধু সেই মহিমায় মুগ্ধ হয়ে থাকি। সে সৌন্দর্য কোন দল সৃষ্টি করল, আমি তার পরোয়া করি না’—ফুটবলের রঙিন মঞ্চে কখনো কখনো এমন রাত নামে, যখন উরুগুয়ের কালজয়ী লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর এই কথাগুলোকে জীবন্ত ও সত্য হয়ে ওঠে।

এসব রাতে পছন্দের দল কিংবা খেলোয়াড়ের জন্য জমিয়ে রাখা আবেগ নয়, ফুটবলের প্রতি নিবেদিত ভালোবাসাটুকুই চিরভাস্বর হয়ে ওঠে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে জীবনানন্দ দাসের কবিতার সেই ‘বোধ’ যেন আমাদের ঘিরে রাখে আর আনন্দটুকু শুধু উপলব্ধি করা যায়।

ওপরের এ কথাগুলো কোন ম্যাচ নিয়ে, সেটা বোধ হয় আলাদা করে না বললেও হয়। তবু বলতে হয়, পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখ চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে গতকাল যে রাতটা উপহার দিয়েছে, তার রেশ ফুটবলপ্রেমীদের মনে আরও বহু বছর থেকে যাবে।

একক নৈপুণ্য থেকে শুরু করে দুই দলের বক্সের ভেতর আছড়ে পড়া ঢেউগুলো আরও অনেকবার চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আমাদের মনে করিয়ে দেবে, ফুটবল কেন সীমাহীন আনন্দ, আবেগ আর সৌন্দর্যের এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। গোল, পাস আর মুহূর্তগুলো মিলে কীভাবে যেন গড়ে তুলল এক অনন্য সুখের ভাষা।

ফুটবল ম্যাচে দিন শেষে জয়, পরাজয় কিংবা ড্রয়ের মধ্যে কোনো একটি ফল নিয়ে দুটি দল মাঠ ছাড়ে। কদাচিৎই আমাদের মনে যে হয়, ইশ দুই দলই যদি জিতে যেত কিংবা কোনো দলই যদি না হারত! গতকাল রাতে সেমিফাইনাল প্রথম লেগে পিএসজির কাছে ৫–৪ গোলে বায়ার্নের হারের পর এমনটাই মনে হয়েছে অনেকের। রোমাঞ্চকর এই ম্যাচের পাশে ‘পরাজয়’ শব্দটাই কেমন বেমানান!

বিশেষ করে বায়ার্ন ৫–২ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ৬৮ মিনিটে ব্যবধান কমিয়ে ৫–৪ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতা ফেরাতে না পেরে আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছেড়েছে। বিষয়টা অবশ্য অন্যভাবেও ভাবা যায়। দুই লেগের ম্যাচটি একপর্যায়ে বায়ার্নের জন্য প্রথম লেগেই শেষ হওয়ার পথে ছিল। কিন্তু দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় জার্মান ক্লাবটি। এখন ফিরতি লেগে বায়ার্ন ঘরের মাঠে আগে গোল পেলে দুই লেগ মিলিয়ে সমতাও চলে আসবে। ফলে ‘দ্য গ্রেট ইকুলাইজার’ না হলেও প্রথম লেগে প্রত্যাবর্তনের রসদ নিয়েই মাঠ ছেড়েছে বাভারিয়ান ক্লাবটি।

কেইনের গোল উদ্‌যাপন

আনন্দনগরী প্যারিসে এই ম্যাচ যে উত্তাপ ছড়াতে যাচ্ছে, সেই ইঙ্গিত আগে থেকেই ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছে দল দুটি। বিশেষ করে দুই দলের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গের জন্য যেন আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর সেই আতঙ্ক কেমন হতে পারে, দুই দলই গতকাল রাতে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। প্রতিমুহূর্তে আক্রমণ ও প্রতি–আক্রমণের ঝড়ে তটস্থ হয়ে ছিল দুই দলের রক্ষণ। ফলাফল, চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল প্রথমবারের মতো ৯ গোলের সাক্ষী হলো। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয়, পিএসজি (৪৩) ও বায়ার্ন (৪২) মিলে এক মৌসুমে ৪০-এর বেশি গোল করার ইতিহাসও এই ম্যাচেই লেখা হলো।

এই ম্যাচে যাদের জ্বলে ওঠার কথা ছিল, একে একে জ্বলে উঠেছেন সবাই। উসমান দেম্বেলে ও খিচা কাভারাস্কেইয়া করেছেন পিএসজির হয়ে জোড়া গোল। বায়ার্নের হয়ে গোল পেয়েছেন সময়ের সেরা ত্রয়ীর তিনজনই।

প্যারিসের পার্ক দে প্রিন্সেসে ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের সমর্থকেরা বিশাল তিফো তুলে ধরে মহারণের আবহ তৈরি করেন। পিএসজির ব্যানারে লেখা ছিল ‘ইউরোপ জয়’, আর অতিথিদের বার্তা ছিল ‘সবকিছু উজাড় করে দাও।’ দুই দলই ৯০ মিনিট ধরে নিজেদের উজাড় করে খেলেছে। তাতে প্রথমার্ধেই দেখা গেল ৫টি গোল। অবিশ্বাস্য ও রুদ্ধশ্বাস ফুটবল যেন তূরীয় আনন্দে ভাসিয়ে নিচ্ছিল বারবার। অনেক ফুটবল–পণ্ডিত তো, এই অর্ধকে ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ৪৫ মিনিটের স্বীকৃতিও দিয়েছেন।

সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার অ্যামাজন প্রাইমে বলেন, ‘আমি এই ম্যাচের খেলা দেখে হাসি থামাতে পারছি না। এটা একেবারে পাগলাটে, উন্মুক্ত ফুটবল। আমার দেখা সেরা ম্যাচগুলোর একটি। দুই দলই বিশ্বাস করে, তারা প্রতিপক্ষকে গোলের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারে।’ পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে তো, এটাকেই ক্যারিয়ারের ‘সেরা ম্যাচ’–এর স্বীকৃতি দিয়েছেন।  

পিএসজি–বায়ার্ন মিলে উপহার দিয়েছে অসাধারণ এক ম্যাচ।

প্রথমার্ধে শুরু হওয়া ঝড় থামেনি বিরতির পরও। পিএসজির ডাবলের জবাবে বায়ার্নের ডাবল। এই ম্যাচে যাদের জ্বলে ওঠার কথা ছিল, একে একে জ্বলে উঠেছেন সবাই। উসমান দেম্বেলে ও খিচা কাভারাস্কেইয়া করেছেন পিএসজির হয়ে জোড়া গোল। বায়ার্নের হয়ে গোল পেয়েছেন সময়ের সেরা ত্রয়ীর তিনজনই। হ্যারি কেইনের গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে গোল করেন মাইকেল ওলিসে ও লুইস দিয়াজও।

এককথায় দর্শকদের পয়সা উশুল এক ম্যাচ। বায়ার্নের হারের বেদনা সরিয়ে রাখলে, দুই দলের রক্ষণভাগ ছাড়া এই ম্যাচ শেষে কারোরই মন খারাপ হওয়ার কথা না। যদিও আক্রমণভাগকে প্রশংসায় ভাসিয়ে রক্ষণে হওয়া ভুলগুলোর দায় এড়ানোরও সুযোগ নেই। বায়ার্নের আক্রমণাত্মক খেলায় পেছনের ফাঁকা জায়গা বারবার কাজে লাগিয়েছে পিএসজি। আর পিএসজিও বায়ার্নের আক্রমণের চাপ সামলাতে না পেরে দ্বিতীয়ার্ধে পরপর দুই গোল খেয়ে বসেছে।

শেষ হাসি পিএসজিই হেসেছে

বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি বলেন, ‘আমরা ভুগেছি, কিন্তু বিপজ্জনকও ছিলাম। চ্যাম্পিয়নস লিগে অ্যাওয়ে ম্যাচে ৫ গোলে সাধারণত বিদায় নিশ্চিত হয়, কিন্তু আমাদের সুযোগগুলো আমাদের বিশ্বাস জাগিয়েছে। এখানে ডিফেন্স আর আক্রমণের পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম। মাঝামাঝি কিছু নেই।’ ইংলিশ কিংবদন্তি ওয়েইন রুনি বলেন, ‘আমি হ্যারি কেইনকে ভালোবাসি, কিন্তু ডিফেন্ডারদের প্রশংসা করার কোনো সুযোগ নেই। দুই দলেরই ডিফেন্ডিং ছিল সত্যিই দুর্বল।’

শেষ পর্যন্ত অবশ্য ৯০ মিনিট ধরে হতে থাকা সফলতা ও ব্যর্থতার ছোট ছোট গল্প মিলিয়েই মূলত লেখা হয়েছে ফুটবলের অনবদ্য এই উপাখ্যান। যে উপাখ্যান চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসের সেরা ম্যাচগুলোর তালিকায় জ্বলজ্বল করবে আরও অনেক দিন।