পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে
পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে

মেয়েকে হারানোর শোক সামলে ফুটবল-মহাকাশে চিরন্তন এনরিকে

গতকাল রাতে ম্যাচটা পিএসজি হারতেও পারত। দারুণ ডিফেন্ডিং করা আর্সেনাল গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেনাল্টিটা না-ও হজম করতে পারত। ডেভিড রায়া সঠিক দিকে লাফ দিয়ে ঠেকিয়ে দিতে পারতেন উসমান দেম্বেলের শটটিও। এসব না হোক, আর্সেনাল তো ননি মাদুয়েকেকে নুনো মেন্দেস ধাক্কা দেওয়ার পর পেনাল্টিটা পেতেই পারত! এমন অনেক ‘যদি’ ‘কিন্তু’ হতেই পারত।

বাস্তবতা হচ্ছে, সেসব কিছুই হয়নি। ২০ বছর পর আর্সেনালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ওঠার আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালায়েসের আকাশের ঠিকানায় বল উড়িয়ে মারার পরপরই। ম্যাচের তো বটেই মৌসুমের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়টিই কিনা এভাবে ‘হিরো’ থেকে ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হয়ে গেলেন। এসব কিছু অবশ্য হতেই হতো। লুইস এনরিকেকে নায়ক থেকে মহানায়ক বানাবে বলেই যে মঞ্চটা প্রস্তুত হচ্ছিল।

দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে আগেই ইউরোপিয়ান এলিট কোচদের দলে আগেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন এনরিকে। ২০১৪–১৫ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর গত মৌসুমে পিএসজিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতিয়েছিলেন এনরিকে। কিন্তু এটুকুতেই যেন সন্তুষ্ট ছিলেন না এই স্প্যানিশ কোচ। গতকাল রাতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এনরিকে জিতলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। এই শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে অনন্য সব মাইলফলকের সাক্ষীও হলেন তিনি।

ইতিহাসের পঞ্চম কোচ হিসেবে তিন বা তার বেশি ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি জিতলেন এনরিকে। ৫ শিরোপা জিতে সবার ওপরে থাকা কার্লো আনচেলত্তি অবশ্য আপাতত ধরাছোঁয়ার বাইরেই আছেন। এনরিকে ছাড়া তিনটি করে জিতেছেন বব পেসলি, জিনেদিন জিদান ও পেপ গার্দিওলা। পাশাপাশি টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে জিদানের পাশেও বসছেন এনরিকে।

বর্তমান সংস্করণের চ্যাম্পিয়নস লিগে একমাত্র জিদানই টানা দুই বা তার বেশি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার কীর্তি গড়েছেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিদান চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিলেন টানা তিনবার। এখন এনরিকের সামনে সুযোগ আছে জিদানের সেই কীর্তিকে স্পর্শ করার, এমনকি ছাড়িয়ে যাওয়ারও। গতকাল রাতে হেরে গেলে এমন দুর্দান্ত সব কীর্তি অধরাই থেকে যেতে এনরিকের।

শিষ্যদের মাঝে এনরিকে

এনরিকের এই অর্জনের ধারা অবশ্য মোটেই সহজ ছিল না। বিশেষ করে ৯ বছর বয়সী মেয়ে জানাকে ক্যানসারে হারানোর পর এনরিকের জন্য পথটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছিল। এই জানাকে নিয়েই ২০১৫ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর একসঙ্গে উদ্‌যাপন করেছিলেন এনরিকে। সেই উদ্‌যাপনের ছবি ও ভিডিও গত বছরের মতো এবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বিশেষ করে মাঠে বাবা–মেয়ে মিলে বার্সার পতাকা পুঁতে দেওয়ার সেই দৃশ্য ফুটবল–ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক ছবি হয়ে আছে।

এসব ছবি ও ডিভিওই বলে দেয় বাবা–মেয়ের ভালোবাসার বন্ধনটা কতটা দৃঢ় ছিল। এমন কাছের কাউকে হারানোর পর স্বাভাবিকভাবেই ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন ছিল। কিন্তু এনরিকে সেই কঠিন কাজটিই করেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করে আবার উঠেছেন শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায়। এমন একটি ক্লাবকে পরপর দুবার ইউরোপসেরার মুকুট পরালেন, যাদের ওপর অন্ধভক্তরাও একসময় আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।

এমনকি ক্লাবটি লিওনেল মেসি, নেইমার ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো মহাতারকাদের একসঙ্গে খেলিয়েও সাফল্যের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেনি। আর সব সম্ভব হয়েছে মূলত এনরিকের অসাধারণ কোচিং–দর্শনের কারণে। এনরিকের এই সাফল্য যেন চিৎকার দিয়ে বলছে, ফুটবলে তারকা ফুটবলারই শেষ কথা নয়।

ট্রফিটাকে যেন আলিঙ্গন করতে যাচ্ছেন এনরিকে

নিজস্ব স্টাইল ও দর্শন আঁকড়ে ধরেও কেউ একজন চাইলে সফল হতে পারেন। ফলে এনরিকের এই সাফল্য মোটেই সাধারণ কিছু নয়। এ যেন কোচদের হয়ে ফুটবল বিশাল এক বার্তাও বটে। ডাগআউটেই যে খেলার দার্শনিক ভিত্তি তৈরি হয়, সেটিও যেন আলাদা করে জানিয়ে দিচ্ছে এনরিকের এই অর্জন।

গতকাল রাতে ম্যাচ শেষে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এনরিকে বলেছেন, ‘আসলে এই সাফল্য আরও বড় মনে হচ্ছে; কারণ, আমরা জানতাম আর্সেনালের বিপক্ষে খেলা কতটা কঠিন। এমন একটি দলের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের। তাই আমাদের দল এবং পুরো শহরের জন্য এই শিরোপা জেতাটা অবিশ্বাস্য এক অর্জন।’

হ্যাঁ, এনরিকে ও পিএসজির সাম্প্রতিক অতীতে চোখ রাখলে এই অর্জন অবিশ্বাস্যই বটে! এ যেন হৃদয়ে আলাদা আলাদা ক্ষত নিয়ে এক হওয়া দুটি সত্ত্বার ফুটবল–মহাকাশে চিরন্তন হওয়ার অসামান্য এক গল্প। এখন গল্পের এই ধারা আরও প্রলম্বিত হয় কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা।