
দেড় বছর বিরতি শেষে মাঠে গড়ানো বাংলাদেশ নারী ফুটবল লিগের নবম রাউন্ড শেষ হয়েছে গত পরশু। এর মধ্যে ৪৫ ম্যাচে গোল হয়েছে ৩৪২টি, যাকে গোলবন্যা বললেও কম বলা হবে। এমন লিগ খেলে মেয়েরাই–বা কতটুকু শিখবেন, নাকি শুধু খেলার জন্য খেলা! লিগের মান নিয়ে এখন এসব প্রশ্নও উঠছে।
লিগ শুরুর আগে বাফুফে নারী উইং চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার বলেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ হবে। কিন্তু এক ম্যাচে ১৮ গোল, আরেক ম্যাচে ২৪ গোল; এ কেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নমুনা! সাবেক ফুটবলার রেহানা পারভীন তো লিগে কোনো লড়াই-ই দেখছেন না, ‘মনে হচ্ছে খেলার জন্য খেলা, কিছুই হচ্ছে না। এখানে (লিগে) কারা খেলছে? কয়টা দল ভালো খেলোয়াড় নিয়েছে? কতজন বিদেশি আছে? এখন জেলার খেলোয়াড়দের বিপক্ষে যদি জাতীয় দলের ফুটবলাররা খেলেন, তাহলে কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আশা করবেন?’
এখন পর্যন্ত লিগে সর্বোচ্চ ৭৯ গোল রাজশাহীর। ৮ ম্যাচের ৮টিতেই তারা জিতেছে। গোল হজম করেনি একটিও। ব্যক্তিগত গোলের তালিকায় এগিয়ে রাজশাহীর আলপি আক্তার। সর্বোচ্চ ২৫ গোল করেছেন তিনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ গোল ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের শামসুন্নাহার জুনিয়রের। অথচ পাঁচ বছর জাতীয় দলে খেলে শামসুন্নাহারের গোল ২৯ ম্যাচে ৮টি।
এত গোল দেখে রাজশাহীর কোচ মাহমুদা শরীফাও খানিকটা বিস্মিত। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘লিগের ১১ দলের মধ্যে চার-পাঁচটি দল আছে যারা অনেক নিম্নমানের দল গড়েছে। তাদের সঙ্গে যখন শীর্ষ ক্লাবগুলোর ম্যাচ পড়ে, তখন আর লড়াই জমে না। আবার নিম্নমানের দলগুলো একে অপরের মুখোমুখি হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এতেই তো বোঝা যায় লিগের মান কেমন।’
পয়েন্ট তালিকার চারে থাকা পুলিশ এফসির কোচ ওয়ালি ফয়সাল এ ধরনের লিগ আয়োজন না করারই পক্ষে, ‘আমি চাই, এ ধরনের লিগ যাতে আর না হয়। যে কয়টা দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব নিয়ে দল গড়বে, তাদের নিয়েই লিগ হওয়া উচিত।’
সাবেক এই লেফটব্যাক মনে করেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা সব দলে মোটামুটি সমানভাবে খেললে লিগ জমজমাট হতে পারে, ‘এক দলে পাঁচজন জাতীয় দলের খেলোয়াড়, আরেক দলে একজনও নেই; লড়াইটা কীভাবে হবে! তাই গোল গোনা ছাড়া উপায়ও নেই।’
খেলোয়াড়েরা অবশ্য লিগের মান নিয়ে সরাসরি কিছু বলতে চাইছেন না। জাতীয় দলের সিনিয়র এক ফুটবলার নাম প্রকাশ না করা শর্তে কাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো খেলা। লিগ হলে আমাদেরই লাভ, মাঠে খেলতে পারি আবার কিছু টাকাও পাই। লিগের মান কেমন, সেটা আপনারাই ভালো জানেন।’
২০২৩-২৪ মৌসুমে হওয়া নারী লিগেও অনেক গোল দেখেছেন দর্শকেরা। যদিও এবার লিগ শেষ হওয়ার অনেক আগেই পুরোনো রেকর্ড ভেঙে গেছে। সেবার ৩৬ ম্যাচে হয়েছিল ২০০ গোল। ম্যাচপ্রতি গোল ৫.৫৬টি। এবার ৯ রাউন্ড যেতেই ম্যাচপ্রতি গোল ৭.৬। বেশির ভাগ ম্যাচই হচ্ছে একপেশে। ষষ্ঠ রাউন্ডে কাছারিপাড়াকে ২৪-০ গোলে হারিয়েছিল ঢাকা রেঞ্জার্স। তার আগে দ্বিতীয় রাউন্ডে ফরাশগঞ্জ ২৩ গোল দেয় কাছারিপাড়াকে। সবচেয়ে বেশি ১১৯ গোল হজম করা দল এই কাছারিপাড়া।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর নারী লিগে এমন গোলবন্যা সচরাচর দেখা যায় না। প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলমান নারী লিগে এখন পর্যন্ত ২৭ ম্যাচে গোল হয়েছে ৯৩টি। নেপালের লিগ শুরু হবে ২৩ জানুয়ারি। তবে গত মৌসুমে দেশটির নারী লিগে ৬৯ ম্যাচে ২৯২ গোল হয়েছিল; ম্যাচপ্রতি গোল ৪.২৩।
গত বছর ভুটানের লিগে খেলতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নারী ফুটবলার। সেই লিগেও নিয়মিত গোলের মেলা বসত, যা নিয়ে খানিকটা বিরক্তই ছিলেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলার। তাঁর মতে, সেখানে নাকি খেলার গতি ছিল ‘হাঁটার মতো’।
বাংলাদেশের মেয়েদের লিগ নিয়ে অবশ্য বাটলার সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি। তবে দাবি করেছেন, বাফুফে তাঁর সুপারিশগুলো প্রয়োগ করেনি, ‘আমি এটা (লিগের গোল) নিয়ে কিছু বলতে চাই না। বাফুফে ও ক্লাবগুলোর ওপর আমার হাত নেই। তবে আমি যে সুপারিশগুলো দিয়েছিলাম, সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। আমার মনোযোগ এখন অনূর্ধ্ব-১৯ দল নিয়ে।’
আগামী শনিবার নেপালে শুরু সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের কারণে লিগে এখন বিরতি। পরের দুই রাউন্ড হবে ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি।