
বাংলাদেশ ০ (৪): ০ (৩) ভারত
রোনান সুলিভান যখন টাইব্রেকারের শেষ শটটি নিতে দাঁড়ালেন, মালদ্বীপের মালের জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন হাজারো প্রবাসী বাঙালির হৃৎপিণ্ড যেন ক্ষণিকের জন্য থমকে গিয়েছিল। বল জালে জড়ানোর পরপরই নিস্তব্ধতা ভেঙে গগনবিদারী উল্লাসে কেঁপে ওঠে মালের আকাশ।
দক্ষিণ এশিয়ার অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলের রাজত্ব ধরে রাখার যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ দেশ ছেড়েছিল, সেই স্বপ্ন ধরা দিল ফাইনাল শেষে। নির্ধারিত সময়ে গোলশুন্য ম্যাচে ভারতকে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা জাতীয় পতাকা নিয়ে মেতে ওঠেন বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে। টুর্নামেন্টের নতুন তারকা প্রবাসী বাংলাদেশী ফুটবলার রোনান সুলিভান জার্সি খুলে গ্যালারির দর্শকদের দিকে ছুঁড়ে মারেন, প্রবাসীদের উচ্ছ্বাস যেন থামছিলই না। মুদ্রার উল্টো পিঠে ছিল বিষাদ।
মাঠের এক কোণে সারি বেঁধে বসে থাকতে দেখা যায় হারের হতাশায় ম্লান ভারতীয় তরুণদের। নির্ধারিত সময়ের লড়াইয়ে সমানে সমান লড়লেও টাইব্রেকারের ‘লটারি’তে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে তাদের।
নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য ড্র হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় ভাগ্যনির্ধারণী টাইব্রেকারে। ভারতের হয়ে ঋষি সিংয়ের নেওয়া প্রথম শটটি ছিল দুর্বল, ঝাঁপিয়ে পড়ে তা আটকে দেন বাংলাদেশের গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন। এই একটি সেভই বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তুলে দেয়। এরপর ভারত টানা তিনটি গোল করলেও বাংলাদেশও পিছিয়ে ছিল না। মোর্শেদ, চন্দন ও বদলি নামা রিয়াদ ফাহিম ঠাণ্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ করে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় রাখেন ভালোভাবে।
বাংলাদেশের হয়ে চতুর্থ শটটি নিতে এসে স্যামুয়েল রাকসাম বল ক্রসবারে লাগালে ম্যাচ ৩-৩ সমতায় ফিরে আসে, বাড়ে উৎকণ্ঠা। তবে নাটকীয়তার তখনো বাকি ছিল। পঞ্চম শটে ভারতের ওমাং দোদাম বল পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে মারলে শিরোপার দুয়ার খুলে যায় বাংলাদেশের সামনে। সেই মহেন্দ্রক্ষণে স্নায়ুচাপ জয় করে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফুটবলার রোনান সুলিভান দলের হয়ে শেষ শটে সহজেই গোল করে বাংলাদেশকে ভাসান শিরোপা ধরে রাখার আনন্দে।
নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশই ছিল বেশি আক্রমণাত্মক। প্রথমার্ধে গোলের অন্তত দুটি নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করেছিল তারা। ১৩ মিনিটে রোনান সুলিভানের নিখুঁত ফ্রি-কিকে অধিনায়ক মিঠু চৌধুরীর হেড পোস্টে বাতাস লাগিয়ে বাইরে চলে যায়। ১৯ মিনিটে স্ট্রাইকার মানিকের বাড়ানো বলে রোনান ঠিকঠাক পা ছোঁয়াতে পারলে তখনই এগিয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মিঠু চৌধুরী ধন্যবাদ দিলেন দর্শকদের, ‘এমন একটা জয় নিয়ে গর্ব করাই যায়। দেশের হয়ে শিরোপা জিততে পেরে বেশি ভালো লাগছে। দর্শকদের ধন্যবাদ, তাঁরা পুরোটা সময় আমাদের সমর্থন দিয়ে গেছেন’ অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই কোচ মার্ক কক্সের প্রথম টুর্নামেন্ট, প্রথম শিরোপা জয়ও।
তবে ম্যাচ শেষে প্রশংসার মালাটা শিষ্যদের গলায়ই পরিয়েছেন তিনি, ‘এই ফুটবলাররা হারতে শেখেনি। তারা কখনো হাল ছাড়ে না। আজও (গতকাল) তারা সেটাই করে দেখিয়েছে। তারা তাদের পতাকার জন্য খেলে।’
টুর্নামেন্টে আগের তিন ম্যাচে সর্বোচ্চ ৯ গোল করে ফাইনালে আসা ভারত দ্বিতীয়ার্ধে জ্বলে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাল বাংলাদেশের অদম্য রক্ষণ আর মাঝমাঠের দৃঢ়তার কাছে নীল জার্সিধারীদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
শেষ দিকে রোনান ও ডেকলান সুলিভান দুই ভাই মিলে এমন চাপ সৃষ্টি করেন, যেটি ভারতীয় রক্ষণকে রীতিমতো দিশেহারা করে তোলে। ২০২২ সালে ভুবনেশ্বরে ভারতের কাছে ফাইনালে হারের পর অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছেড়েছিলেন বাংলাদেশের তরুণরা। চার বছর পর কাল সেই একই মঞ্চে একই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে মধুর প্রতিশোধই নিল তারা।
মাঝে ২০২৪ সালে ভারতকে সেমিফাইনালে ও ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-২০ সাফ জেতে বাংলাদেশ। বড়দের সাফে বাংলাদেশ দীর্ঘ ২৩ বছর শিরোপাহীন থাকলেও বয়সভিত্তিক ফুটবলে সাফল্যের এই ধারা দেশের ফুটবলকে আশার আলোই দেখাচ্ছে।