ভারতের কাছে হেরে দল যখন মিক্সড জোন পার হচ্ছিল, অপেক্ষমাণ সাংবাদিকেরা বারবার ডাকছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমাকে। তিনি একবারও সেদিকে তাকালেন না, সোজা হেঁটে গেলেন বাসের দিকে।
হয়তো নিজেই বিব্রত হচ্ছিলেন। কারণ, তাঁর কাছে দলের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী। সেটি পূরণ করতে না পারার আক্ষেপ তো তাঁর থাকবেই। তা নেপালের বিপক্ষে আজকের সেমিফাইনালে কি সেই আক্ষেপ ঘুচবে ঋতুপর্ণার?
মাঠের লড়াইয়েই মিলবে সেই উত্তর। তবে ঋতুপর্ণা যে আজ নিজের পুরোনো ঝলক ফিরিয়ে আনতে মরিয়া থাকবেন, তা বলাই বাহুল্য। দলও তাঁর দিকেই অনেকটা তাকিয়ে আছে। গত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ নারী দলের শিরোপা ধরে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন ঋতুপর্ণা। ফাইনালে তাঁর বাঁ পায়ের অবিশ্বাস্য শট স্তব্ধ করে দিয়েছিল নেপালিদের।
এরপর গত বছরের জুলাইয়ে এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে স্বাগতিক মিয়ানমারের বিপক্ষে ঋতুপর্ণার বাঁ পায়ের জোড়া গোলেই ইতিহাস গড়ে প্রথমবার এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে ওঠে লাল–সবুজের মেয়েরা। এশিয়ান কাপেও চীনের বিপক্ষে তাঁর বাঁ পায়ে অবিশ্বাস্য এক শট দেখা গেছে। অথচ গোয়া সাফে হ্যাটট্রিক মিশনের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে চেনা যায়নি ঋতুকে।
ম্যাচের মাত্র ১১ সেকেন্ডে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর করা গোলটির উৎস ছিল ঋতুরই পাস। বাঁ প্রান্ত ধরে ২২-২৩টি ক্রসও করেছিলেন ম্যাচে। কিন্তু ভালো টাইমিং ও নিখুঁত না হওয়ায় ক্রসগুলো ফলপ্রসূ হয়নি। ঋতুপর্ণা একা নন, বাংলাদেশের আক্রমণে কেউই আসলে এবার প্রতিপক্ষ শিবিরে দাঁত ফোটাতে পারছেন না।
গত সাফে শামসুন্নাহার জুনিয়র যে ঝলক দেখিয়েছিলেন, এবার তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। পোস্টে শট নেই, হেডগুলোও ঠিকঠাক হচ্ছে না। তহুরা খাতুন তো রীতিমতো নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন, যার খেসারত হিসেবে একাদশে জায়গাও হারিয়েছেন।
তাঁকে সরিয়ে সুযোগ পাওয়া সুইডেনপ্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীও ৯০ মিনিট খেলার মতো ফিটনেস দেখাতে পারছেন না। টানা দুটি ম্যাচেই দ্বিতীয়ার্ধে তাঁকে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন কোচ। একজন স্ট্রাইকার যদি পুরো ৯০ মিনিট খেলতে না পারেন, তবে তো দলের আক্রমণভাগকে ভুগতে হবেই।
আক্রমণের ব্যর্থতার পাশাপাশি বাংলাদেশ নারী দলের রক্ষণেও বড় ফাটল ধরেছে। আফঈদার অফ-ফর্মের কারণে সুযোগ পাওয়া সুরমা জান্নাত চেষ্টা করলেও ভারতের বিপক্ষে প্রথম গোলটির দায় তিনি এড়াতে পারেন না। শিউলি আজিমের রক্ষণ দৃঢ়তা কিছুটা কমে গেছে। গোলকিপার মিলির সময়ও ভালো যাচ্ছে না। এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে যিনি পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মিলি নিজের অসাবধানতায় মালদ্বীপের বিপক্ষে মাথার ওপর দিয়ে গোল হজম করেছেন। সব মিলিয়ে দলে পারফরম্যানসের একটা সংকটই তৈরি হয়েছে।
কোচ পিটার বাটলার হাইলাইন ডিফেন্স কৌশলে অতীতে সাফল্য পেয়েছেন, সাফেও সেই ধারা ধরে রেখেছেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণের সময় ডিফেন্ডাররা দ্রুত নিচে নেমে আসতে পারছেন না, যার ফলে গোল খেতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে, গত দুটি সাফে বাংলাদেশের যে গতিময় ফুটবল দেখা গিয়েছিল, গোয়ার মাঠে তা উধাও।
মাঝমাঠে মারিয়া মান্দা চেষ্টা করে যাচ্ছেন ঠিকই, তবে সাবিনা খাতুনের মতো নেতা হতে তাঁর সময় লাগবে। কোচ বাটলার নতুনদের সুযোগ দিচ্ছেন, তা ঠিক আছে। কিন্তু নতুনেরাও তেমন কিছু করতে পারছেন কই! আজ আরও একবার তাই ঋতুপর্ণার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে বাংলাদেশকে। এবার কি জ্বলে উঠবেন তিনি?